শুক্রবার, ৬ জুন, ২০১৪

পর্তুগীজ না স্প্যানিশ ভাষার বিশ্বকাপ ?

ফরাসী রাইট উইঙ্গার লুই লরেন্ত সূচনা করেছিলেন যে উৎসবের, পরবর্তী সময়ে তা রুপ নিয়েছে দুনিয়ার তীব্রতম আবেগে। এর মাঝে পৃথিবী দেখে ফেলেছে অনেকগুলো যুদ্ধ আর বিপ্লব, বহু রাজা হারিয়েছেন সিংহাসন, সম্রাটদের প্রয়াণ করে দেয়া যুগে এসেছে জেনারেল আর রাজনীতিক হত্যাকাণ্ডের কাল, এরপরে সমাজতন্ত্র আর পুঁজিবাদের ডুয়েলেও একপেশে লড়াই হয়ে গেছে মাদার আর্থে। পৃথিবী পাল্টেছে, পাল্টেছে প্রথা। শুধু জোহানেসবার্গ সকারসিটি মাঠে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার ভলি জালে জড়াতেই লুই লরেন্ত এখনো ফিরে ফিরে আসেন, গোলের খেলা ফুটবলের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম গোলটাই ছিলো লুই লরেন্তের। বছর নয় আগে গত হওয়া লুই হয়তো গেছেন একটা আক্ষেপ নিয়ে। ইশ, যদি এই যুগের বিশ্বকাপে একটা গোল করতে পারতাম !


কারণ ছোটো হতে থাকা পৃথিবীতে, কমতে থাকা মানবীয় সম্পর্কের এই দিনেও বড় হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ, বাড়ছে ফুটবল নিয়ে উত্তেজনা। বিশ্বকাপ তাই, এই এখনো, মানুষের সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম।


আর বিশ্বকাপটা যখন ব্রাজিলে, আর সেটা মাঠে গড়াবে মাত্র কয়েকদিন পরেই, তখন চুপ করে থাকাটা তো একরকম ব্লাসফেমিই হয়ে যায়- না কি ??

কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপ ? নেইমার যাদুতে কনফেড কাপ ধাঁধিয়ে দেয়া ব্রাজিল ? নাকি প্রায় আট বছর ধরে টিকিটাকার কার্যকরী মন্ত্রে দুনিয়া শাসন করে আসা স্প্যানিশ আর্মাডা ? নাকি শেষ বাঁশি বাজার আগে যারা ফুটবলে হাল ছাড়ে না কখনোই, সেই প্রাথমিক পর্বে প্রতিপক্ষদের নাস্তানাবুদ করে সেমিতে এসে বারংবার চাপে ভেঙ্গে পড়া জার্মান মেশিন ? নাকি ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ জেতা ছাড়া অন্য অনেক ভাবেই ছাড়িয়ে যাওয়া লিও মেসি নামের অতিপ্রাকৃত ফুটবলারের সৌজন্যে এগিয়ে রাখবো আর্জেন্টাইনদের ? ট্যাকটিকাল ফুটবলের শেষ কথাটা সবসময়ই যাদের, সেই ইতালিকেই বা পিছিয়ে রাখি কী করে ?

ব্রাজিল রেসের বাজিতে জুয়ারিদের সবচেয়ে পছন্দের ঘোড়া হয়তো তারা নয়, তারপরেও ফ্রান্সকেও তোলা যাচ্ছে না বাতিলের ফর্দটায়
একই অবস্থা নেদারল্যান্ডের। লিও মেসি যদি রুপকথার গিলগামেশ হন, তবে বিশ্বকাপে এনকিদুও আছেন কিন্তু ! ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোময় পর্তুগাল হতে পারে অনেকেরই প্রথম পছন্দ। আর একগাদা ইউরোপ মাতানো তরুণ তুর্কি ভরা বেলজিয়াম দলটাও জন্ম দিতে পারে বিস্ময়ের।

কিন্তু এসবই তো হিসাব নিকাশ। বিশ্বকাপ তো শুধু হিসাবের ফুরিয়ার সিরিজ নয়। পেলে ম্যারাডোনার সাথে মেসি রোনালদোর পার্থক্য নির্ণয় হয় এই বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ জিদানকে এনে দেয় অমরত্ব, বাজ্জিও-সক্রেটিসকে ছুঁড়ে দেয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। এই বিশ্বকাপ নিয়ে কি আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা চলে ?

আবেগকে একটু দূরে ঠেলে সেই চেষ্টাটাই করে দেখি এ লেখায়।

গ্রুপ এ থেকে গ্রুপ এইচ, প্রাথমিক পর্ব থেকে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে ওঠা দলগুলোর সম্ভাব্য তালিকাটা আগে তৈরি করি একবার। ব্রাজিল, ক্রোয়াশিয়া, স্পেন, নেদারল্যান্ড, জাপান, গ্রিস, উরুগুয়ে, ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া, জার্মানি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, রাশিয়া।

গ্রুপ সি থেকে জাপান/গ্রিসের যে কাউকে সরিয়ে চলে আসতে পারে কলম্বিয়া, গ্রুপ ই
তে সুইসদের নামটা কেটে দিতে পারে ইকুয়েডর। বিশ্বকাপের লাভক্ষতির তালিকায় লম্বা দৌড়ে এতে তেমন কোন পরিবর্তন আসবে না মনে হয়। ফার্স্ট রাউন্ডের লড়াইটা জমবে গ্রুপ ডি আর গ্রুপ জিতে।

গ্রুপ ডি
তে উরুগুয়ে, ইতালিকে হঠিয়ে দিতে পারে ইংল্যান্ড। কিন্তু সত্যি কি পারে ? নাক উঁচু ইংরেজ মিডিয়া এবার যেমন চুপচাপ, যেমনটা অসমতল ছিলো ইংলিশদের বাছাইপর্বের রাইড- তেমনটা  ইতালি আর উরুগুয়ের চেয়ে তাদের যোগ্য করে তুলছে কি ? তলিয়ে দেখলে কাগজে-কলমে অন্ততঃ ইংল্যান্ডকে নাকচ করে দিতে হচ্ছে। গ্রুপ জিএর হিসাবটা একটু অন্যরকম। জার্মানরা ফার্স্ট রাউন্ডটা পেরিয়ে যায় হেসে খেলে, ইউরোপের উঠানে জার্মান ক্লাবগুলোর যা পারফরম্যান্স আজকাল- তাতে করে তাদের পক্ষে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা কোনো বাঁধা হবার কথা না। তবে পর্তুগালের কাজটা কঠিন করে দিতে পারে আমেরিকা। সেরা তারকা ডনোভান নেই, কিন্তু গত বছর সব মিলিয়ে জাতীয় রেকর্ড ১৬টা ম্যাচ জিতেছে মার্কিনিরা, এর মাঝে একটা আবার জার্মানদের সাথেই। একই গ্রুপে ঘানা নামের আফ্রিকান দলটাও আছে কিন্তু, গত বিশ্বকাপে যারা থেমেছিলো কোয়ার্টারে। পর্তুগালকে তাই সাবধান থাকতে হবে জার্মানদের বিপক্ষে গ্রুপের প্রথম ম্যাচটায়, কে জানে হয়তো প্রথম দুই ম্যাচ জিতে গেলে মার্কিনিদের বিপক্ষে পুরোশক্তির দলটাই নামালো না জার্মানরা। তবে পর্তুগালকে নির্ভার করতে একটা বিষয়ই যথেষ্ট। সেটা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ফ্যাক্টর।

সেই ফ্যাক্টর পক্ষে থাকলেও দল হিসেবে বেলজিয়াম মনে হয় হারিয়ে দেবে পর্তুগালকে, দ্বিতীয় রাউন্ডে। হ্যাজার্ড, কর্তুয়া, ভিন্সেন্ট কোম্পানি, কেভিন ডি ব্রুয়েন- দশে মিলে কাজ করে আটকে দেয়া সম্ভব রোনালদোকেও। পর্তুগালকে বাতিল করে দিলে তাই দ্বিতীয় রাউন্ডে বলার মতো লড়াই হবে একটাই। সেটা ব্রাজিল বনাম নেদারল্যান্ড। গত কোয়ার্টারে দুঙ্গার ফলাফল নির্ভর ব্রাজিল খেলতে চেয়েছিলো যেভাবে, সেই ট্যাকটিকস আসলে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছিলো ডাচরাই। আর রানার-আপ হবার রাস্তায় কোয়ার্টারে ল্যাং মেরে গিয়েছিলো ওই ব্রাজিলকেই। সেই লড়াইয়ের পুনরাভিনয়-ই কি হবে আবার ? স্বাগতিক ব্রাজিল ততদিনে বিশ্বকাপে খেলে ফেলবে তিন ম্যাচ- অর্কেস্ট্রায় টুকটাক বেসুরো থাকলে সেটা শুধরে যাবার কথা ততদিনে। পাল্লাটা মনে হয় ব্রাজিলের পক্ষেই ভারি।

কোয়ার্টারেও খুব সম্ভব বাকি তিন দলের চেয়ে কঠিনতর পরীক্ষাটা দিতে হবে হোস্টদেরই। উরুগুয়ে বনাম স্পেন, বেলজিয়াম বনাম আর্জেন্টিনা আর ফ্রান্স বনাম জার্মানি-তিনটা ম্যাচই কাগজে কলমে বেশ বড়। ট্যাকটিকাল দিকে খুব আকর্ষণীয় হবে শেষ ম্যাচটা। তারপরেও সব মিলিয়ে মনে হয় স্পেন, আর্জেন্টিনা আর জার্মানদের জয় বাদে অন্য কিছু ঘটাটা খুব কঠিন। কিন্তু ব্রাজিল-ইতালি লড়াইয়ে কী হবে ? ইতালির স্কোয়াড আর গত বছরের কনফেডারেশন কাপে দুই দলের লড়াই মাথায় রেখে এগিয়ে রাখবো ব্রাজিলকেই। সেলেসাওরা আজ্জুরিদের সেবার হারিয়েছিলো ৪-২ এ।

তাহলে সেমি-ফাইনালের সমীকরণ দাঁড়ায়ঃ  ব্রাজিল বনাম জার্মানি, আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন। ফাইনালে পৌঁছাচ্ছে কারা ?

লাতিন আমেরিকান আদ্রতা, খেলার ধরন, বড় ম্যাচের ফলাফল- সবকিছু বিবেচনা করে মনে হয় যেন অন্য তিন দলের চেয়ে পিছিয়ে রাখা যায় জার্মানিকে। ইউরোপের বাইরে ইউরোপের দল কাপ জেতে না- এই মিথও থাকবে বিবেচনায়। আর অন্য সেমিতে আর্জেন্টিনার সমতলে স্পেনকে নিয়েও আসছে ঐ মিথটাই। আফ্রিকায় তো রাজার মুকুট তারাই তুলেছে মাথায় ! আর খেলার ধরনেও দুই দলের পার্থক্য খুবই সামান্য। জিততে পারে যে কেউই। এর চেয়ে বেশি বললে হয়তো অক্টোপাস পল
ই নামই হয়ে যাবে ভবিষ্যৎ গণকের !

তাহলে শেষ বিচারে হাতের তিন হয়ে থাকছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন। প্রথম দলটা পর্তুগীজ ভাষী, অন্য দুই দলের ভাষা স্প্যানিশ। দলগুলোর ফুটবল ঐতিহ্যের মতো ভাষাটাও বনেদী। আর সেই ভাষায় আনন্দ চীৎকার দিতে বিশ্বকাপের চেয়ে বনেদী উপলক্ষই বা আর কোথায় পাওয়া যাবে ?

সেটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বরং কেবল ফুটবলে মেতে থাকাই মনে হয় ভালো। হিসাব নিকাশ বাদ দিয়ে দিন শেষে তো হাতে থাকে ওই উপলক্ষটাই। ট্রফি হাতে নিয়েছে উনিশটা দল, কিন্তু বিশ্বকাপ তো দিন শেষে ওই এক-একাকী-অদ্বিতীয়ই !!

সেই বিশ্বকাপের, সেই এক মাসের আনন্দযজ্ঞে মাতবার, সেই ফুটবল স্রোতে ভাসার সময় চলে এসেছে নিঃশ্বাস দূরত্বে। ওই দেখা যায় সবুজ মাঠে নেইমার-মেসি-রোনালদোকে, ওই শোনা যায় রেফারির হুইসেল !!

1 টি মন্তব্য: