রবিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৩

টেস্ট ক্রিকেটের সুন্দরতম দিন

টেস্ট ক্রিকেট বোধহয় নাটক ভালোবাসে। ৫ম দিনের শেষ তিন বল বাকি থাকতেও জোহানেসবার্গে সম্ভব ছিলো চার রকমের ফলাফলই। দক্ষিণ আফ্রিকার জয়, ভারতের জয়, ম্যাচ ড্র, ম্যাচ টাই। শেষ বলে স্টেইন ছক্কা মেরে নাটকের ট্রাজেডিটা আরেকটু জমিয়ে দিলেন স্কোরবোর্ডের পাঠকদের জন্যে। ইস, আর ৮টা রান হলেই তো জিতে যায় আফ্রিকা ! আক্ষেপটা আরেকটু বাড়তে পারে, যদি আপনি জানেন যে এর আগের ১৮ বল থেকে স্টেইন-ফিল্যান্ডার জুটি রান তুলেছে মাত্র ২ !!

ওয়ানডে সিরিজে বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইন আপ উড়ে গেছে প্রোটিয়াদের গতি আর বাউন্স ঝড়ে। -জোহানেসবার্গে লড়াই শুরুর আগে তাই প্রশ্ন ছিলো স্টেইন-গান আর মরকেলদের সামনে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না ভারত। পূজারা আর কোহলি বীরত্বে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল সেই প্রশ্নকে উলটো ঘুরিয়ে দিয়েছিলো টেস্টের প্রথম চার দিনে। জিততে হলে ভারতের চাই আট উইকেট, স্প্রিংবকদের লাগবে ৩২০ রান। সকালের মহা গুরুত্বপূর্ণ সেশনটা থাকলো সমানে সমান। গতকালের সেট ব্যাটার পিটারসেনকে ফেরালেন সামি, ধোনির মাথা ব্যথার কারণ হয়ে ওঠা ক্যালিস হলেন জহির খানের শিকার।

দৃশ্যপটে এলেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। ক্রিজের অপর পাশে থাকা ব্যাটসম্যানটিকে তিনি চেনেন স্কুল ক্রিকেট থেকেই, দুজনেই প্রাক্তন প্রোটিয়া কিপার ডেনিস লিন্ডসের শিষ্য। তেরো মাস আগে ঐ মানুষটির সাথে জুটি বেঁধেই অ্যাডিলেডের মাঠে শেষদিনে অস্ট্রেলিয়াকে রুখে দিয়েছিলেন ডি ভিলিয়ার্স, ধৈর্য্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে যে ইনিংসে তিনি করেছিলেন ২২০ বলে ৩৩।

ডি ভিলিয়ার্স এবার দেখালেন ধৈর্য্যের সাথে টেকনিকের গাঁথুনিটাও। ২০৫ রানের হারকিউলিয় এক জুটি গড়ে ইশান্তের বলে প্লেড অন হয়ে ডি ভিলিয়ার্স যখন ফিরছেন, তখন তার নামের পাশে লেখা ঝকঝকে একটা ১০৩; এর চেয়েও বড় কথা, আফ্রিকার তখন প্রয়োজন ‘মাত্র’ ৫৬।

টেস্ট ক্রিকেটের ১৩৬ বছরের বনেদী ইতিহাসের ওপর ততক্ষণে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। চার নম্বর ইনিংসে রান তাড়া করে জেতার আগের রেকর্ড ৪১৮, সেইটাকেও চল্লিশ পেছনে ফেলে জেতাটা খুবই সম্ভব ছিলো স্প্রিংবকদের।

ডুমিনি পারলেন না, ফিল্যান্ডার একটু চেষ্টা করেও স্টেইনের সাথে যুক্তি করেই যেন অদ্ভূতভাবে গুটিয়ে গেলেন। তারা চেষ্টা না করার দোষে দোষী হতেই পারেন ক্রিকেট ভক্তদের আদালতে। অন্যজনকে সে আদালতে দাঁড় করানো যাবে না। ডি ভিলিয়ার্সের সাথে মিলে ম্যাচ বাঁচানো সেই অ্যাডিলেড অধ্যায় দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে এসেছিলেন তিনি। রাহানের থ্রোতে রান আউট হয়ে ফেরার আগে খেলেছেন ৩০৯ বল, উইকেটে কাটিয়েছেন ৩৯৫ মিনিট। টেম্পারমেন্ট, স্কিল, স্ট্যামিনার সর্বোচ্চ চুড়া ছুঁয়ে ১৩৪ করে তিনি যখন ফিরছেন, টেস্ট ক্রিকেট স্বয়ং তখন তাঁর সমস্ত সৌন্দর্য্য নিয়ে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে বলছে, ‘ওয়েল ডান ফ্রাঁসোয়া ডু প্লাসি ! ওয়েল ডান !’

পাঁচ দিনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষেও, শেষ বিকেলে টেস্ট ক্রিকেটের সুন্দরতম রুপকে প্রত্যক্ষ করার এই মুহূর্তেও তাই, ডু প্লাসিকে ভোলা যাচ্ছে না।

২টি মন্তব্য: