শনিবার, ১ জুন, ২০১৩

মতি নন্দীর মানুষেরা

মতি নন্দীর সাথে আমার পরিচয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র- বিসাকে’র মাধ্যমে। তখন ইটিভির যুগ, ডাব্লু ডাব্লু এফের যুফ। ছয়টা টু সাতটা। রক, স্টিভ অস্টিন আর কার্ট এঙ্গেলের ধুন্ধুমার নাটক। ওই সময়টা তাই টিভির সামনে নড়বোই না। আবার আলো আমার আলো ওগোর গান গেয়ে বাস আজিমপুর সেন্টার মাঠের পাশে দাঁড়ায় সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। স্টিভ অস্টিন পর্ব শেষ করেই তাই ছুট। ছুটতে ছুটতেই সে যাদুভর্তি বাসে গিয়ে উঠতাম। আধঘন্টা ধরে ভাবতাম কোন বইটা নিবো। অবশেষে সাতদিনের জন্যে একটা বই নিতাম। বাহুল্য মনে হতো সাতদিন। সাধারণতঃ দুইদিনেই ধার নেয়া বইটা পড়া হয়ে যেতো।

তেমন এক সন্ধ্যায়, ইস্যু করেছিলাম মতি নন্দীর স্ট্রাইকার।


সে এক যাদু। ছোট সাইজের বই। কিশোর উপন্যাস। প্রসুন নামের এক স্ট্রাইকারের গল্প, সে-ই প্রসূন যার ফুটবলার বাবা ডুবিয়েছিলো যুগের যাত্রী ক্লাবের টাইটেল স্বপ্ন। ফাইনালের আগে পায়ের ব্যাথায় মাঠে নামতে চায় নি বাবা, ক্লাব জোর করে নামালো। আর ইনজুরড পা নিয়ে আধ হাত দূর থেকে বারের বাইরে বল উড়িয়ে দিলো। সেই বাবার ছেলে প্রসূন। সেই প্রসূন খেয়ে না খেয়ে খোয়াবনামায় পেলের ক্লাব সান্তোসে খেলতে চায়। একসময় ময়দানে হাতে-খড়ি হয়। একসময় যুগের যাত্রী ক্লাবে ঠাঁই। স্ট্রাইকারকে ভাংতে হয় অনেক দারিদ্র্যের ডিফেন্স, অপমানের বুটের চোরা লাথি, ময়দানের নোংরা রাজনীতির কঠিন ট্যাকল।

বইয়ের বাইরে পত্রিকার খেলার পাতা কিচ্ছুটি পড়তাম না আমি। মতি নন্দী একধাক্কায় আমার কাছে পালটে দিলেন মাঠের ঘাসের রং।

এরপর মতি নন্দীর সাক্ষাৎ পেয়েছি আনন্দমেলায়। প্রতি পূজাবার্ষিকীতে একটা করে উপন্যাস থাকতোই তার। অতি অবশ্যি, খেলা নিয়ে। ওটাই পড়তাম আগে। বাংলা সাহিত্যে প্রিয় নারী চরিত্র বলতে আমার কাছে অনেকটাই তাই কলাবতীকে বোঝায়। কলাবতী সিংহকে নিয়ে মতি নন্দী অনেকগুলো লেখাই লিখেছেন। আটঘরার (না বকদিঘি ?? এই নাম দুটা সবসময় পাঁচালো ছিল) সিঙ্ঘি আর বকদিঘির মুখুজ্যে বাড়ির রেষারেষি পড়ে দারুণ মজা পেতাম। সেই সিঙ্ঘি বাড়ির মেয়ে কালু, বাংলার মেয়ে টিমের উইকেট কিপার। কালুও চায় ক্রীড়া সাংবাদিকতায় নামবে। সে নামে। উৎপল শুভ্র, মোস্তফা মামুনদের লেখা পরে যে পেশাকে মনে হতো শুধু ক্যারিবিয়ান ট্যুর আর লারাদের সাক্ষাৎকার নেয়া- মতি নদীর উপন্যাসে সেটা পালটে গেলো। খেলার পেছনের খেলা বুটের কাদার চেয়ে কম নোংরা নয়।

যুতসই একটা প্লট খুঁজে তার মাঝে খেলাধূলার স্পিরিট নিয়ে আসায় মতি নন্দী তুলনাহীন। সাধন গুন্ডার অত্যাচারে তিষ্ঠ যখন এলাকার লোকে, চায়ের দোকানে কাজ করা শিবা তখন একটি ঘুঁষিতে পালটে নেয় নিজের জীবনের ট্র্যাক। শিবা ফিরবে বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন বক্সার হয়ে। কিংবা কলকাতার বস্তির কনকচাঁপা। জাতীয় সাঁতারে ‘ফাইট!! কোনি, ফাইট!!’ চীৎকারে মুহুর্তেই হয়তো কনকচাঁপা গড়বে রেকর্ড। কিংবা স্টপার। কমল গুপ্ত যেন জীবনের কাছে চিরকাল ঘা খেয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত- গুরুর আদেশে যে সবসময় চায় ব্যালেন্স করে চলতে। কখনো কখনো হয়তো জেতেও, যখন চিরকালের ময়দানের পলিটিক্সের জবাবে চিরশত্রু যুগের যাত্রীর টাইটেল স্বপ্ন থামায় পেনাল্টি বক্সের অশ্বথ হয়ে।

মানুষের জীবনই সবসময় মতি নন্দীর মূল কাঠামো। যেমন জীবন অনন্ত উপন্যাসটা। দুই বন্ধুর গল্প। দুর্দান্ত প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান জীবন, টেস্ট দলে ঢোঁকার দরজায় দাঁড়িয়ে দুর্ঘটনায় হারায় হাত। তবে তার হয়ে টেস্ট খেলার স্বপ্ন পুরায় তারই বন্ধু অনন্ত, পেসার। শেষ বিশ পাতার কী যে দুরন্ত সাসপেন্স !! আমার নিজের সবচেয়ে পছন্দের উপন্যাস নারান। খবরের কাগজের হকার নারানের হিরো এমিল জ্যাটোপেক। দূরপাল্লার দৌড়বিদ। জ্যাটোপেকের মতোই পরিশ্রমে অক্লান্ত নারান। সেই জ্যাটোপেকের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি নারানের। কিন্তু নারান হারেনি জীবনের রেসে।

মতি নন্দীকে দারুণ একটা কথা বলেছিলো বন্ধু রিফাত। খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় খুব ছোট্ট করে তিন লাইনে কিছু খবর থাকে। অবিরাম বাহাত্তর ঘন্টা সাইকেল চালনা বা বাষট্টি বছর বয়েসে ম্যারাথন শেষ করা। এই তিন লাইনের মানুষগুলোর জীবনের গল্প মতি নন্দীর গল্পের কঙ্কাল। একটা চাকরির জন্যে তাই তুলসী নামের মেয়েটা জিতে যায় ট্রায়াথালন, টেনিসের জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন মিনুর ট্রফির জন্যে তাই মধ্যবিত্ত বাবা-মাকে লড়তে হবে পুরো মহকুমার সাথে।

মতি নন্দীর ফিরিস্তি টানলে শেষ করাই হবে না আমার। বরং শেষ করবো দুইজন প্রিয় মানুষের কথা লিখে। এই আন্তর্জালেই দুজনের সাথে পরিচয়। সে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা পর্যন্ত গেছে বোধহয়।

একজন হিল্লোল দত্ত। স্যার না দাদা, কখন কী ডাকি তাকে ঠিক নেই। বইপড়ুয়া এই মানুষটি হারিয়েছেন খুব কাছের কাউকে। আমি ফোন করিনি তাকে। কোন আনুষ্ঠানিক শোকবার্তাও লিখিনি কোথাও। কী বলবো, বুঝে উঠতে পারিনি আসলে। জানি, আমি বা আমরা, হিল্লোলদার কাছে শেষ পর্যন্ত রিং-এর বাইরের এংলো ট্রেনার গোমেজ হয়েই থাকবো। দরদর করে বক্সার শিবার চোখের ওপরের কাটা থেকে যখন রক্ত ঝরে, তখন হয়তো ‘ফাইট কোনি, ফাইট’ শব্দরা আসলেই খেলো শোনায়। জীবনের ডি-বক্সে আমরা শোভাবাজার পেনাল্টি এরিয়ার কমল গুপ্তের মতোই একলা দাদা। ব্যালান্স- সব ব্যালান্স করে চলতে হয়। স্ট্রাইকার অনুপমকে আটকাতে হবে কমল গুপ্তকেই।

দ্বিতীয় মানুষটা সিমন ভাই। বিশালদেহী মানুষটা বাসের তলায় পড়ে এখন শুয়ে আছেন স্কোয়ারে। দুর্বল ডিফেন্স দিয়ে ক্রমাগত ভেতরে ঢুঁকছে নানা রকম দুঃসংবাদ। আপনি আর আমি একইদিন সচল হয়েছিলাম, মনে আছে সিমন ভাই ?? মনে পরে আপনার চেয়ার ভাঙ্গা, গোল কেক আর লেইম জোকগুলোর গল্প ?? ... আমি জানি আপনাকে কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার সাজে না সিমন ভাই। প্রথম দুই দিন আপনাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া আর কিছুতেই আমি আপনার ডিফেন্সে দাঁড়াতে পারি না। ডাগআউটের বাইরে থেকে তাই শুধু নিস্ফল চীৎকার করি- ফাইট সিমন ভাই, ফাইট !! ঘাতক বাসটাকে টাইটেল সেলিব্রেশন করতে কিছুতেই দেয়া যাবে না। জ্যাটোপেককে দেখবার লোভে নারান যদি ম্যারাথন শেষ করতে পারে-আপনার তান্তা বুড়িকে আবার কোলে নিতে আপনি এই সামান্য ক্রস আটকাতে পারবেন না ?? ...

পারতেই হবে সিমন ভাই। জীবনের কাছে হারা চলবে না।

যতদিন জীবনের সাথে মানুষ লড়বে, মতি নন্দীর আয়ূও ততদিন।

1 টি মন্তব্য: