মঙ্গলবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৩

অগ্নিপুরুষ

আজ মাসুদ রানার জন্মদিন।

আমাদের বয়স বাড়ছে। ফুটবল মাঠ ছাড়া হাফপ্যান্ট পড়লে লোকে বাঁকা চোখে তাকায়। নাইন্টি ফোরের সেই মনে গেঁথে যাওয়া সেলিব্রেশনের বেবেতো আর রোমারিও- তাদের দুইজনের ছেলেরাও নাম লিখিয়েছে পেশাদার ফুটবলে। রানা হারামজাদা এখনো সমানে লাম্পট্য চালিয়ে যাচ্ছে।



মাসুদ রানার সাথে পরিচয়ের সময় মনে নেই আমার। মনে আছে, পরিচয় হয়েছিলো ‘বিপর্যয়’এ। জার্মান ধনকুবের ম্যাক্স মরলকের হাতে নিখোঁজ বিসিয়াই এজেন্ট বাবুল আহমেদ নিয়ে তদন্ত করতে রানা এসেছিলো, সুইজারল্যান্ডে বোধহয়।

সত্যি বলতে, রানার আসল দৌড় জানার আগেই চিনেছিলাম তাকে। সময়টা কিশোর-মুসা-রবিনে’র। কাকাতুয়া নিয়ে সান্তা মনিকায় তোলপাড়। মোম্বাসায় ধরছি পোচার। ভিনদেশী রাজকুমারে ঝামেলার ভাস্তে বিদ্ঘুটে জব বলছে ‘অগোলোম- বগোলোম’ । লাইফ ওয়াজ গুড ম্যান !! বাভারিয়ান বরিস আর রোভারের ভাষায়- ‘হোকে’ ।

এরা বাদ দিলে রবিন হুড, এথোস-পর্থোস-আরামিস আর টম সয়ারের যুগ। এদের মাঝে রানা খোঁজার সময় কই ভাই। পিশাচ দ্বীপের অনুকরণে ‘প্রাচীর পেরিয়ে’ নাটকটাও তো যুইতের লাগলো না।

তারপর নাইন টেন। পোলাপানের হাতে হাতে বেঞ্চের তলায় ঘুরতো সংকেত। হেঁটে হেঁটে স্কুল থেকে আসার সময় নিউমার্কেটের সামনের বুকস্টল থেকে নতুন জাপানী ফ্যানাটিক, আর নাইলে নীলক্ষেতের সেকেন্ডহ্যান্ড আই লাভ ইউ ম্যান।

কাঁচাপাকা ভুরুর রাহাত খানের সামনে আসলেই ক্যামন যেন চুপসে যায় এমআরনাইন। এইটুকু বাদ দিলে আগাগোড়া দুর্ধর্ষ। হাতকাটা সোহেল, মায়াময়ী সোহানা, ধারালো রুপা, সেক্রেটারি ইলোরা, আর গিলটি মিয়াঁ।

ভাগ্য হয়েছিলো একবার কাজী আনোয়ার হোসেন, অদ্বিতীয় কাজীদার সাথে দেখা করবার। সে এক অভিজ্ঞতা। কোটি কোটি প্রশ্ন ঠিক হয়ে আছে মনে মনে, তাঁর অমায়িকতায় বেমালুম ভুলে গেছি সব। ঠিক এই সময় কে যেন জিজ্ঞাসা করলেন, কাজীদার নিজের সৃষ্ট প্রিয় চরিত্র কোনটি। ঘর আলো করা হাসি দিয়ে কাজীদা বললেন, গিলটি মিঁয়া !!

এই গিলটি মিঁয়ার মতো আমিও খাঁটি ঢাকার- নতুন ঢাকার- মানুষ ভাই। রমনা চিনি, সেগুণবাগিচা চিনি, বনশ্রী চিনি। কেবল হাজারীবাগের ওদিকটা গেলে একদমই কানা। মাসুদ রানা হাতে ধরে আমায় চিনিয়েছে প্যারিসের রাজপথ, পলিনেশিয়ান দ্বীপ বা মস্কোর অলিগলি।

কত বিচিত্র চরিত্র। রানার অসমবয়েসী বন্ধু লুবনা আভান্তি। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জার ক্যান্সারাক্রান্ত মেজর ফজল মাহমুদ। মুক্তবিহঙ্গের শত্রুর চেয়েও অসহ্য বন্ধু মাইকেল সেভার্স। মায়ানমারের উ-সেন।

সময়-অসময় জ্ঞান ছিলো না। নটরডেমের টেস্ট পরীক্ষার আগের রাতে। বাংলা ব্যাকরণ মাথায়। ডেনিশ ধর্মযাজকের ছদ্মবেশে থাকা রানার পেছনে তখন ধুরন্ধর গোয়েন্দা ক্লঁদ রাঁবো। সুবর্ণা এক্সপ্রেসের ঈদের বিনা টিকিটের দাঁড়িয়ে থাকা ভীড়। আমি তখন মিলান থেকে ছেড়ে আসা আটলান্টিক এক্সপ্রেসে, বাঁচাতেই হবে জেনারেল তুর্গেনিভকে। কারেন্টহীন শুক্রবারের আজিমপুরের দুপুর। বিকালে খেলার আগেই শেষ দেখতে হবে হংকং এর মাফিয়াদের।

তিনটা জিনিষ নাকি দুনিয়ার সবাই চেনে। কোক, যিশু আর পেলে। বাঙ্গালির ক্ষেত্রে মনে হয় যোগ করে দেয়া উচিৎ মাসুদ রানার। স্রষ্টা এখানে হোমসের ডয়েলের মতোই চলে গেছেন সৃষ্টির আড়ালে। মুদি দোকানীর হাতে পর্যন্ত রানার আড়ালে ঢেকে গেছে নমস্য কাজীদার নাম।

অগ্নিপুরুষ বইয়ের শেষ দু’টো বাক্য একেবারে মনে গেঁথে গেছে আমার।

‘গোজোর পাহাড়ে পাহাড়ে বাতাসের ফিসফিসানি। চাপা স্বরে কী সব জল্পনা-কল্পনা।‘

কল্পনার রঙ্গিন দিন শেষ। এখন মাসের শেষে, মাঝে মধ্যে কান্না পায়। অস্থির ফেসবুক, অস্থির রাজপথ, ভাঙ্গা মন্দির। মনে হয়, বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টিলেজেন্সের খুব দরকার ছিলো। দরকার ছিলো দুঃসাহসী, দুর্ধর্ষ- হোক বহুগামী- কিছু মাসুদ রানার।

রোদ উঠে গেছে জীবনের নগরীতে, কৈশোর থেমে গেছে তোমাদের জানালায়।

তবুও মাঝে মাঝে রাতে ঘুমোবার আগে, বা চলন্ত বাসে ফুলফলপ্রকৃতি দেখার ফাঁকে, বা আজকের মতো এলোমেলো স্মৃতি সন্ধায় সে জানালায় উঁকি দিলেই দেখি- কর্সিকার বন্দরে গ্লাসের পর গ্লাস হুইস্কি খেয়ে যাচ্ছে এক লোক। রোদে পোড়া বাদামী রঙ, গায়ে ডেনিম জ্যাকেট। অলস হাতে পায়রাকে বাদাম ছুঁড়ে দিচ্ছে লোকটা। চোখজোড়া তার অদ্ভূত মায়াময়। টানে সবাইকে, বাঁধনে জড়ায় না।

মাসুদ রানা তার নাম।

আর আজ, সেই মাসুদ রানার জন্মদিন।

শুভ জন্মদিন অগ্নিপুরুষ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন