শুক্রবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১২

শত আশা

করাচির হোটেল পার্ল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিছানায় শুয়ে ছিলেন ক্রেইগ ম্যাকমিলান। ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ তে পরাজয়ের পরে লাহোর টেস্টে ইনিংস আর ৩২৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হার, নিউজিল্যান্ডার ম্যাকমিলানের মনোবল পড়তির দিকে- সন্দেহ নেই। বিশাল এক হাই তুলে ঘড়ির দিকে তাকালেন ম্যাকমিলান। ঘড়িতে বাজে সকাল পৌনে আটটা। স্বাগতিক পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের শেষ টেস্ট আর ঘন্টা দুয়েকের মাঝেই শুরু হবে করাচি স্টেডিয়ামে। ম্যাকমিলান উঠতে যাবেন বিছান থেকে... ঠিক সেই মুহুর্তেই কেঁপে উঠলো পৃথিবী।


সম্বিত ফিরে পেয়ে ম্যাকমিলান নিজেকে আবিষ্কার করলেন হোটেল ঘরের মেঝেতে। তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে অজস্র ভাঙ্গাকাঁচের গুঁড়ো।...

মে মাসের ৮ তারিখ, ২০০২সাল। ক্রেইগ ম্যাকমিলানের স্মৃতি থেকে কোনদিনই মুছবে না দিনটা। করাচির দক্ষিণে এক বোমা বিস্ফোরণে দুইজন সাধারণ পাকিস্তানি নাগরিক আর এগারজন ফ্রেঞ্চ নাবিক সহ এই হামলায় নিহত হয়েছিলেন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ফিজিওথেরাপিস্ট নিজেও।

কুমারা সাঙ্গাকারার স্মৃতিতে ২০০৯ সালের লাহোরের লিবার্টি স্কয়ারের ঘটনা আরো তপ্ত বলেই বোধ হয়। গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে যাবার পথে এক পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দল আর তাদের পেছনের মিনিভ্যানে অবস্থানকারী আইসিসির এলিট প্যানেলের পাঁচ আম্পায়ার।
কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, চামিন্দা ভাস সহ মোট সাত লঙ্কান ক্রিকেটার আঘাত পেয়েছিলেন এ হামলায়। হামলা প্রাণের উপরেই এসেছিলো, সেটা অসফল রয়ে যায় বাস ড্রাইভার মোহাম্মদ খলিলের কর্তব্যপরায়ণতায়। চাকার উপরে সন্ত্রাসীরা গুলি চালালেও খলিল সেই অবস্থাতেই গাড়ি টেনে নিয়ে যান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

কর্তব্য সবাই পালন করছিলো ভাবলে ভুল হবে। গুলিচালনায় পেছনের মিনিভ্যানটিতে মৃত্যু হয় ড্রাইভারের, বুকে গুলিবিদ্ধ হন আম্পায়ার আহসান রাজা। মিনিভ্যান ও বাসের দায়িত্বরক্ষায় নিযুক্ত নিরাপত্তা প্রহরীরা কোন পালটা গুলিই ছুঁড়েনি পরবর্তী বিশ মিনিট, দাবি করেন ক্রিস ব্রড। প্রায় বিশ মিনিট পরে একজন পুলিশ অফিসার কভার নিতে ভ্যানের ভেতরে ঢুঁকলেও ভ্যান চালাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ক্রিস ব্রড এতোক্ষণ হাত দিয়ে চেপে রেখেছেন আহসান রাজার বুকের ক্ষত, রক্তক্ষরণ থামেনি। অবশেষে পুলিশ অফিসারটিকে হুমকি দেয়ার পরে ভ্যান চলা শুরু করে সামনে। পাকিস্তানের প্রতিশ্রুত ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার’ এই ছিলো হাল।

... তিলকরত্নে দিলশান পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে জানান, ইহজনমে আর পাকিস্তানে খেলতে যাবার সাধ নেই তার।

মুম্বাই হামলার পরে পাকিস্তানে ক্রিকেট দল পাঠাতে অস্বীকার করে ভারতও।

‘দিল্লু স্কুপ’ খ্যাত তিলকরত্নে দিলশান আর ‘হেলিকপ্টার শট’ খ্যাত মহেন্দ্র সিং ধোনি যদি অমাবস্যার চাঁদ হন পাকিস্তান রাষ্ট্রের মাটিতে- ‘সামনে ঝুঁকে জোরে পেছনের’ সাকিব আল হাসান কেন ব্যতিক্রম হবেন ??

সন্ত্রাসবাদ ছেড়ে না হয় নিখাদ ক্রিকেটীয় কারণগুলো বিবেচনা করা যাক।

লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ১২ জানুয়ারি একটি ওয়ানডে আর ১৩ জানুয়ারি একটি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলবে টাইগাররা। ক্রিকেটীয় কোন গুরুতর অর্জন সম্ভব হবে এই সিরিজে, মনে হচ্ছে না তা। বরং ‘এটা পাকিস্তানের বিশ্বকে জানান চেষ্টা যে এখানে সব ঠিক চলছে, কোন গোলযোগ নেই।‘ –এই তত্ত্ব পেয়ে যাচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা। এই তত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্যে অবশ্য চেষ্টা কম করছে না পিসিবি। একগাদা সাবেক তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া এক বিশ্ব একাদশকে কিছুদিন আগে মাঠে নামিয়ে ‘সফল’ও হয়েছেন তারা।

আইসিসির নির্ধারিত কিক্সচারে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফরের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। তদুপরি নিরপেক্ষ আম্পায়ার পাঠিয়ে ম্যাচ পরিচালনা করতেও অপারগতা জানিয়েছে আইসিসি। অর্থাৎ, পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সংশয়ে আছে খোদ আইসিসি।

গতকাল ২৬ ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি থেকে জানা যাচ্ছে যে, গত ৮ অক্টোবর আইসিসির যে সভায় মুস্তফা কামালকে ২০১২-১৪ পর্যন্ত আইসিসি’র সহসভাপতি নির্বাচিত করা হলো, সেই সভার আগেই সমর্থনের বিনিময়ে টাইগারদের পাকিস্তান সফরের ব্যাপারে লিখিত প্রতিশ্রুতি চায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড- পিসিবি। এবং মুস্তফা কামাল বোর্ডের সাথে পরামর্শ ছাড়াই সে প্রতিশ্রুতি লিখিত দেন। কালোডাক ??

অপরদিকে টাইগাররা দল না পাঠালে নাকি আসছে বিপিএলে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের ছাড়পত্র দেবে না পিসিবি, শোনা যাচ্ছে এমন ঘটনাও। পাকিস্তানি পত্রিকা ডনের দাবি, পিসিবির এই সিদ্ধান্ত নাকি বিসিবিকে জানানোও হয়েছে। বিসিবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী অবশ্য এই খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জানিয়েছেন, এরকম কোন চিঠি তারা এখনো পাননি।
এখানেই শেষ নয়।

২২ ডিসেম্বর তারিখেও পাকিস্তানের পেশোয়ারে আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির (এএনপি) সমাবেশে আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাদেশিক মন্ত্রী বশির আহমেদ বিলৌরসহ কমপক্ষে আটজন নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যু উপত্যকায় টাইগারদের যাওয়া আদৌ নিরাপদ কি ??

অন্যদিকে, সদলবলে পাকিস্তান ঘুরে এসে নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে বিসিবি’কে। সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা- যেটিকে নিয়ে সাইমন টোফেলের মন্তব্য ছিলো- ’২৫ জন কমান্ডো দিয়ে ঘিরে রাখার কথা ছিলো আমাদের, টিকিটিও দেখা যায়নি একজনেরও !!’

খেলোয়াড়দের মতামতও জানতে চেয়েছে বিসিবি। জাতীয় দলের পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা প্রধান এনায়েত হোসেন। সম্ভাব্য সফর নিয়ে কথা বলেছেন মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ, মাশরাফি বিন মুর্তজা, আবদুর রাজ্জাক ও তামিম ইকবালের সঙ্গে। অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশের পরও খেলোয়াড়েরা নাকি সফরের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাবই দেখিয়েছেন। সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ না বললেও জানিয়েছেন, রাষ্ট্র এবং বিসিবি পূর্ণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলে পাকিস্তানে যেতে তাঁদের আপত্তি নেই। সবকিছু তাঁরা ছেড়ে দিতে চান বোর্ডের ওপর।

বিসিবির প্রধান অবশ্য জানিয়েছেন, কোনো খেলোয়াড় বা কোচিং স্টাফকে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য জোর করা হবে। যাবার ইচ্ছে না থাকলে জোর করা হবে না কাউকেই। বিদেশী কোচিং স্টাফেরা অবশ্য যাবে না বলেই ধারণা বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অবশ্য ইতোমধ্যেই শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশের বোর্ডের ‘সময়োপযোগী ও সাহসী’ সিদ্ধান্তের প্রশংসা। সাবেক খেলোয়াড় ওয়াসিম আকরাম থেকে পিসিবি সভাপতি জাকা আশরাফ- বাদ যাচ্ছেন না কেউই। তাঁদের ধারণা নির্বিঘ্ন ভাবেই শেষ হতে যাচ্ছে এই সফর।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কী ??

পাকিস্তান সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মানববন্ধন হয়েছে। এই সফর নিয়ে দেশের অনেক মানুষের বিরুদ্ধ অবস্থানের কথা বিসিবি বিবেচনায়ও রেখেছে বলে জানা গেছে।
দেশের বাইরে প্রবাসীরাও প্রতিবাদ জানিয়েছে এই সফরের, রোববার বিকেলে বিসিবি সভাপতি পূর্ব লন্ডনের একটি হোটেলে তাঁর সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় ক্রিকেটারদের পাকিস্তান সফর নিয়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখেও পড়েছেন। সেই সমাবেশে বক্তারা সাবেক বিসিবি সভাপতি লোটাস কামালের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আইসিসি সহ-সভাপতি নিজের জন্যে আমাদের ক্রিকেটারদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

এরপরেও কি পাকিস্তান সফরে যাওয়া আমাদের খুবই প্রয়োজন ??

... নীতিনির্ধারক, বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যারা নেবেন, সবিনয়ে মনে করিয়ে দেই – ‘ইটস নট হু ইউ আর আন্ডারনীথ। ইটস হোয়াট ইউ ডু, দ্যাট ডিফাইনস ইউ।’

আপনাদের সদিচ্ছায় আমাদের অবিশ্বাস নেই, বিশ্বাসের অভাব আছে আপনাদের পথটাতে।

বিশ্বাসের অভাব আছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ওপর।

...শত আশা, একশো ষাট মিলিয়ন মানুষের বিশ্বাস রাখা যে লাল সবুজের জার্সিতে- অবিশ্বাসের বিষে তা নীল না হোক। লাল না হোক রক্তের দাগে।

৩টি মন্তব্য:

  1. এই লেখাটি পড়ে অনেক ভাল লাগলো ! অনেক সুন্দর আপনার লেখার হাত! ভবিষ্যৎ আরো টিউনের জন্য অপেক্ষায় রইলাম! আপনার সোস্যাল একাউন্ট গুলো আপডেট করতে চাইলে এখানে ভিজিট করুন আমি সারাদিন এমন ভাল লেখার সন্ধানে থাকি! ভাল লেখা পড়াই আমার একমাত্র লক্ষ http://www.buyfastlike.com

    উত্তরমুছুন
  2. Thanks for your marvelous posting! I quite enjoyed reading it, you happen to be a great author. I will remember to bookmark your blog and will eventually come back very soon. Go to best social plan for get more related topic. Have a nice evening!

    উত্তরমুছুন
  3. Awesome Man! This is incredible. I think this post is most valuable for us. I really appreciate it. I'd like to say thank you for sharing this valuable information with us. Take a look this to buy Instagram followers here. Thanks

    উত্তরমুছুন