রবিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১২

পুবের সূর্য

বন্যেরা বনে সুন্দর আর টাইগাররা খুলনায়- বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিলো জোর গুজব। সত্যতা আছে কথায়। খুলনার মাঠে দাপুটে দুই ম্যাচ জিতে আসা বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ঢাকায় এসে একটু পালটে গেলো বোধহয়। দুটো ম্যাচেই জেতা সম্ভব ছিলো। একটা বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন অভিষেক টেস্ট সেঞ্চুরির পর স্টিভ ওয়াহর স্যালুট রুপে তার লাল রুমাল জিতে নেয়া মারলন স্যামুয়েলস, ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পর্বে এসে নিজেকে যিনি বারবার চেনাচ্ছেন নতুন করে। দ্বিতীয় ম্যাচটা হয়ে রইলো বাংলাদেশের- ক্যাচ মিস তো ম্যাচ মিস- ক্রিকেট প্রবাদের শিক্ষা, ইন্ডিজ রেনেঁসার কাপ্তান ড্যারেন সামি সেটায় ছিলেন শিক্ষক।


শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের আজকে ম্যাচেও গ্যালারী টইটম্বুর, টাইগারদের টসে জিত, গাজীতে নাকাল গেইল... চিত্রনাট্যের যা কিছু পরিবর্তন, তা ওই মাশরাফির বদলে নেয়া শফিউলে। ১৭ রানে ৩ বার তেকাঠি পতন- বরাবরের মতোই সিরিজে বিপদে উইন্ডিজ। খুলনা থেকে ঢাকায় বল না নিতে পারলেও কিরন পোলার্ড জানান দিচ্ছিলেন স্টেডিয়াম থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কতক বল পাঠালেও পাঠাতে তিনি পারেন। সাথে থাকলো সাহসী ব্রাভোর ফিফটি। ব্রেক থ্রু এনে দিলেন দলের নতুন তুর্কি মমিনুল। আর মাহমুদুল্লাহ-শফিউল ভাগ করে করে নিলেন উইন্ডিজের লেজ। স্কোর ২১৭/১০- আগের ম্যাচের চাইতে ছক্কা পরিমাণ বেশি সেটা।

এই ছক্কাটা অব্যবহৃত থেকে যাবে, ম্যাচের দ্বিতীয়াংশের শুরুটা সেটাই জানালো- ঠিক গতকালকের ম্যাচের মতো। ১৩তে ৫ না হলেও ৩০এ ৩। ২-০তে পিছিয়ে পড়ে ২-৩ এ উইন্ডিজের সিরিজ জয়ের মঞ্চ রেডি।

হতে দিলেন না ‘ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপটেন’ মুশফিক। আর সাথে রইলো তার ডেপুটি, সেই মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ- সুনীল মনোহর গাভাস্কারের চোখে যিনি বিশ্বের সেরা আট নাম্বার ব্যাটসম্যান। সিরিজ জুড়েই রিয়াদ ছিলেন বাংলাদেশের আনসাং হিরো, আজকের ৯১ রানের পার্টনারশিপে শয়ের উপরের স্ট্রাইকরেটে ৪৮।

এরপর শুরু ফাইটব্যাক। বিস্ময় স্পিনার সুনীল নরেন (রোহান কানহাইয়ের ব্যাটিং যদি কানাইয়ের বাঁশি হতে পারে শঙ্করীবসুর কলমে, তাহলে নারাইনের নরেন হতে দোষ কোথায় দেঁতো হাসি) ফেরালেন দুই কান্ডারীকে। ক্রিজে দুই নতুন ব্যাটসম্যান মমিনুল আর নাসির, বল ঘুরছে, দর্শকেরা দুলছে, ঢাকার রাস্তায় কুয়াশা ছেয়ে যাচ্ছে, রাস্তা নিশ্চুপ হচ্ছে।

ঘরপোড়া গরুর মতো ঢাকাবাসী ভয় পাচ্ছে আরেকটা এশিয়া কাপ ফাইনাল ট্রাজেডির। আর খেলাটাকে টেনে নিচ্ছেন মমিনুল-নাসির। হবে বোধহয়, হতে পারে।

হওয়ার আগে মরণকামড় দিয়ে গেলেন নরেন, মমিনুলকে। সোহাগ গাজী নাকি ব্যাট চালাতে পারেন জাতীয় লীগে, শুনেছিলো টাইগার সমর্থকেরা, দেখলো আজ। ২১৪তে দলকে রেখে তিনিও যখন ফিরে গেলেন, তখন কিন্তু দর্শক প্রস্তুত একটা সিরিজ বিজয়ের জন্যে। নাটকটা জমিয়ে দিলেন এনামুল হক মণি। সিরিজের বেশ কিছু দৃষ্টিকটু সিদ্ধান্তের সাথে যোগ হলো রাজ্জাকের এলবিডব্লুর সিদ্ধান্তটাও। সেটা হয়ে যেতে পারতো সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও।

নাসির হোসেন তা হতে দিলেন না। ওডিয়াই সিরিজে রান পান নি চার নম্বরে খেলে, নাসির হোসেন আরেকবার বোঝালেন- সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের ওয়ানডে উন্নতির পেছনের মূল কারণগুলোর একটি হলো দুর্যোগের মুখে দাঁড়িয়ে তার ফিনিশিং দেয়ার কাজটা। মাইকেল বেভান বা যুবরাজ সিং পেতে বাংলাদেশকে এখনো হাঁটতে হবে বহুদূর, তবে সিঙ্গেল স্পেশালিস্ট নাসির হোসেন কিন্তু সেই সার্ভিস দিয়ে দিচ্ছেন দলকে নিয়মিতই।

এরপর ইলিয়াস সানির বোকামো নাটক হলো, প্রধানমন্ত্রীর দুইবার পতাকা ওড়ানো হলো, নাসির হোসেন উইনিং শটও নিলেন দুইবার।

ঢাকা তখন উচ্ছ্বাসে ভাসছে। পতাকা চলে এসেছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ভেঁপু বাজছে, ‘টাইগার্স নে তো বাজা দিয়া উইন্ডিজো কা, ব্যান্ড’ – এই জাতীয় স্থূল কথাতেও আমাদের খুব আনন্দ হচ্ছে।

সিরিজ জয়ের তাৎপর্যটা, আমার মতো আম দর্শকের কাছে মনে হচ্ছে, অন্যত্র। তিনটে ক্লোজ ম্যাচই প্রায় বের করে এনেছিলো উইন্ডিজ, ৩-২ এ জেতা সিরিজটা টাইগাররা ৫-০তে জিততে পারতো একটু এদিকওদিক হলেই। এই একটা জায়গায় ধরা পড়ে অভিজ্ঞতার ফাঁক।

দলের সেরা খেলোয়াড়টা ছাড়াই সিরিজ জিতে নিলো মুশফিক বাহিনী, অভিনন্দন বাঘের বাচ্চাদের। এতো নিয়মিত জেতার অভ্যাস করে ফেলাটা কাজের কথা খুব, ক্রাইসিস সিচুয়েশনে জেতার সম্ভাবিলিটিটাও বাড়ে।

... সেই এশিয়া কাপ দিয়েই শুরু। কাগজে কলমে এখন তো বাংলাদেশ এশিয়ার দ্বিতীয় সেরাই, এশিয়া কেটে ‘বিশ্ব’ আর দ্বিতীয় সেরা কেটে ‘শ্রেষ্ঠ’ লেখাটা খুব দুরুহ বলে মনে হচ্ছে না আর। আকরাম খানের ফিফটি আর কাগজ কেটে আশরাফুলের অভিষেক সেঞ্চুরির খবরে বছর মেতে থাকার সময় পার। বাঘের গর্জন এখন নিয়মিতই শুনেছে বিশ্ব, শুনবে আরো। পূবের সূর্যের মতোই ধ্রুবসত্য এটা এখন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন