শুক্রবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১২

জানালা মানুষ

অঞ্জন দত্তের গান প্রথম শুনবার সময়টা মনে নেই, কেবল এটুকু মনে আছে তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। প্রাইমারি স্কুলে পড়বার সময় আমার ধারণা ছিলো প্রতিবছর শীতকালে ঈদ হয়। আর সেই ঈদের জন্যে শীতের সকালে গ্রামের বাড়িতে পেছনের লাগোয়া গোসলঘরে কাঁপতে কাঁপতে মাথায় পানি দিয়ে গোসল করতে হয়। সেইরকম কোন একটা ঈদ করবার পর মামার গাড়িতে চেপে গ্রাম থেকে রওয়ানা দিয়েছি চট্টলা শহরের দিকে। মেজোমামার ভোক্সওয়াগনের জানালা দিয়ে ঢুঁকছে ঠান্ডা বাতাস, আমি আম্মার পাশে আধ বসা- অর্ধ দণ্ডায়মান অবস্থায় সামনের সিটের কাঁধ আকঁড়ে ধরে আছি। আর এরমাঝে কেমন একটা গলায় কে যেন সমানে চ্যাঁচিয়ে যাচ্ছে- বড় বড় বড় বড় গোল গোল চোখ, হরিপদ একজন সাদামাটা ছোটোখাটো লোক।......
সম্পূর্ণ সুস্থ সবল মেজোমামা গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বুক চেপে ধরে সেই গাড়ির ভেতরেই নিঃসঙ্গ মারা গেলেন কুলশীতে, পাঁচ বছর হয়ে যাবে কিছুদিন পর। মামার সাথে তার গাড়িরও বিদায় হয়েছে- অঞ্জন দত্ত রয়ে গেছেন আমার ল্যাপটপে, আমার নোকিয়া ফোনের মেমরিতে, আমার মন খারাপের দিনের বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে।

ফাইভ সিক্সেই ধার করা ক্যাসেট আর সামনের বিল্ডিঙের তিনতলার ভাইয়াটার জোরালো স্টেরিওর কল্যাণে মুখস্থ বেলা বোস আর বারান্দায় দাঁড়ানো রঞ্জনার গান। আম্মা পত্রিকার পাতায় দেখান ইন্টারে স্ট্যান্ড করা ছাত্রের বচন। আমি দিনে সাত ঘন্টা পড়াশোনা করেছি আর বড় হয়ে দেশের সেবা করতে চাই জাতীয় আজাইরা কথার মাঝে চোখ আটকে যায় আরেকটা লাইনে। অবসরে গান শুনি- অঞ্জন দত্তের।

নিজে ক্যাসেট কিনলাম মনে হয় ক্লাস এইটে। নিউমার্কেটের নীচতলার ওভারব্রিজের সাথের দোকানটার নাম ‘গীতাঞ্জলি’ ছিলো মনে হয়, মনে নেই। মনে আছে দিনরাত বাজিয়ে বাজিয়ে অস্থির করে ফেলছি বাসার সবাইকে ক্যাসেটের এপিঠ-ওপিঠ। সবচেয়ে মিষ্টি লাগে ‘তুমি না থাকলে’ গানটার গিটারে হাত বোলানো, সবচেয়ে মনখারাপ হয় শংকর হোটেলের নীলচে পাহাড়ের মেয়েটার জন্যে গাওয়া ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ গানটা শুনলে। বুকের ভেতরে সবচেয়ে বেশি ভারী হয় ‘শুনতে কি চাও তুমি’ গানটা শুনতে গেলে- কেনো, কে জানে।

ক্লাস নাইনে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ভাবে জীবনকে অত্যন্ত অর্থহীন মনে হয়। নতুন স্কুলের নতুন বন্ধুদের সাথে খাতির জমে, আব্বাকে দিয়ে দেশের বাইরে থেকে আনাই ওয়াকম্যান। খাতার ভেতর চ্যাপ্টা গোলাপ খুঁজে পাই না আমরা, মাথার ভেতরে এলভিস প্রিসলিকে নিয়ে উদাস মুখে ঘুরে বেড়াই। ছুটির দিনে দুপুরবেলায় খুব মনটন খারাপ হলে ক্যালসিয়ামের গানটান বাজিয়ে মন ভালো করার চেষ্টা করি। খোঁজখবর করে জানলাম বন্ধুদের সবার অবস্থা একই রকম, ল্যাংচে হেঁটে- ডিগবাজি দিয়ে- ভেঙচি কেটে আজকাল নাকি কারোরই খ্যাকখ্যাক হাসি পায় না। ভালোই মুসিবত। এরমাঝে কোন এক বদমাশ স্কুলের ব্যাগ থেকে চুরি করে নিয়ে গেলো সাধের ওয়াকম্যান।...

এই ওয়াকম্যান চিনিয়েছিলো মালা, মেরি এন আর ঢাকা-১২১৫ এর জয়িতাকে। মৌলালির মোড়টা মনে হতো খুব চেনা, ফেলুদার গোরস্তানে সাবধান পড়তে গিয়ে আর্কাস সাহিব-মার্কাস সাহিবের সময় মনে পড়ে এংলো পরিবারের নোনা দেয়াল থেকে ঝোলানো মলিন যিশুর কথা। এলোমেলো কত সব, অন্য লোকের গানে অঞ্জন আমাদেরকেই খুঁজে নিয়েছেন তার পুরোনো গীটারে।

নটরডেমের করিডোরে গেলে দুনিয়া বদলায় ম্যান। ডিজুসের রাত জেগে কনফারেন্স মাত্র চালু হয়েছে সে সময়, সাইন্স ফেয়ারের দিন গোণে ছেলেরা। অঞ্জন দত্ত অটুট ইস্টার্ণ প্লাজার বিগ বাইটের মতন, সত্যজিতের ছবি দেখতে বসে আধুনিক সিনেমায় দুষ্টু গানের প্রভাব ধরে হাসাহাসি। ঘুরেফিরে সাত দিন দাশবাবুর ও কেবিনের মতোই ছেলেপিলে খুঁজে নিয়েছে কত ফাস্টফুড শপ, প্রচুর জায়গা আমাদের চারশো বছরের পুরোনো এই ঢাকায়।

ঢাকার বুকেও পরিবর্তন আসছে, টের পাই। নর্থ সার্কুলার রোডের বাড়িগুলো ভেঙ্গে নতুন এপার্টমেন্ট উঠে। রিকশায় পাশ দিয়ে যেতে যেতে টের পাই এরকম কোন বাড়িতেই হয়তো বেহালার মাস্টার জেরেমি না হলেও শহীদুল জহিরের বান্দরের দুধ খাওয়া পোলা চানমিয়া আর জুলি ফ্লোরেন্সের ছায়া পড়ে আছে। ঢাকা বদলাচ্ছে, বখাটে ছোকরার ঠাট্টা তামাশা করার জায়গা নেই আর ভূতের গলিতে।

সব মিলে যায়। টার্ম ব্রেকের মাঝের সময়ে রাত জেগে ঢাকা শহরে হাঁটাহাঁটির সময়ে বিমলাদের চোখে পড়ে, কলাবাগানের জামে আটকে থাকা সময় ডিজেলের ধোঁয়া অগ্রাহ্য করা টোকাই আর আজিমপুর কলোনীতে দুপুর বেলা বেহালা বাজিয়ে আসা লোকটা- সব মিলে যায়। কীভাবে ??

পাগল করা সুর নেই গানে, গায়কীও চলনসই বড়জোর- তারপরেও কে জানে কোন ইন্দ্রজালে অঞ্জন দত্ত মাতিয়ে রাখেন আমাকে- আমাদের কয়েকজনকে। ফাঁকা ক্যাম্পাসের ড়্যাগ কর্ণারে ২৪৪১১৩৯ এর সুরে সিগারেটের ধোঁয়া ঘন হয়ে উপরে ওঠে শুধু, দীপ্তের সাথে হঠাৎ হেঁটে টিএসসি বিকেলেও লোকটা পিছু ছাড়ে না। জয়িতার সবুজ রঙ বিকেল ছোট করে দেয়। একদিন বৃষ্টিতে হঠাৎ কারো কাছে ধরা পড়ে যেতে বড় ইচ্ছে করে।

কয়েকদিন ধরে মন বিক্ষিপ্ত খুব। ইটারনাল সানশাইন অফ স্পটলেস মাইন্ড- নিয়ে এসেছি দেখবো বলে। দু’মিনিট দেখে বন্ধ করে দিলাম। পেলের আত্মজীবনী পড়া শুরু করেছিলাম, অর্ধেক গিয়ে আটকে গেলাম। ফেসবুক গুঁতাই, টি-টুয়েন্টি দেখি- মন বসে না কিছুতে। আমাদের ফিউচার খুবই অপরিষ্কার, ভরসা পাচ্ছি না কোনো...

তারপর একটু আগে ছেড়ে দিলাম প্লে লিস্ট, অঞ্জন দত্তের। শুনে যাচ্ছি।

কতকিছু পালটে গেছে। মেজোমামা নেই, আজিমপুরের টেপ-টেনিসের বল আর চোট্টা আম্পায়ার নিয়ে টেস্ট ম্যাচ নেই, তিন গোয়েন্দা নেই, এডাম গিলক্রিস্ট নেই। অঞ্জন দত্ত থেকে গেছেন দেবলীনা, ববি রায় আর ঝগড়াঝাঁটির গান নিয়ে। অনুভব করি এই শহরেরই অন্য কোথাও কেউ একজন গভীর আবেগে শুনছে চ্যাপ্টা গোলাপের গান, কেউ হয়তো সাদাকালো শহরের লাল-নীল সংবাদটা দিচ্ছে বেলা বোস’কে। তাল কেটে যাচ্ছে সদ্য গীটার বাজাতে শেখা ছেলেটার, কেটে যাচ্ছে আঙুল, দেখতে দেখতে আরো একটা দিন কেটে যাচ্ছে।

এই অসময়ে; এই টি-টুয়েন্টির ব্যস্ত সূচির মাঝে- এই ভড়ং ধরা এপেক আর ন্যাম সম্মেলনের মাঝে- এই প্রচণ্ড অস্থির বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সময়ের মাঝেও অঞ্জন দত্ত একটা জানালার মতন। সেই জানালায় পাশের বাড়ির কান্না শোনা যায়, সেই জানালায় বিকেলের রং হেমন্তে হলুদ আর কেরালার আকাশ একটু বেশি নীল।

অঞ্জন দত্ত আমার মন খারাপের মেঘের মাঝে সেই আকাশ দেখার জানালা। আমার নিজের জানালা-মানুষ...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন