রবিবার, ৮ জুলাই, ২০১২

আমিই মরিনহো

 হাঁটু মুড়ে ডাগআউটের পাশেই মাঠে বসে ছিলাম আমি। টাইব্রেকারের শেষ কিকটা নিতে মাঝমাঠ থেকে শোয়েইনি যখন সামনে এগুলো, তার স্থির অথচ জোরালো পদক্ষেপগুলো দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম যে সব শেষ, জার্মান স্নায়ূ আরো একবার বরফশীতল থেকে বিজয়ী হয়েই মাঠ ছাড়তে যাচ্ছে। তারপরেও একটা ক্ষীণ আশা ছিলো। যদি হয়, যদি হয়ে যায়...

হলো না। শোয়েইনির তীব্র গতির স্পটকিকটা ইকারের মাথার ওপর দিয়ে জালে জড়াতেই আমি উঠে হাঁটা ধরলাম, টানেলের ভেতর অদৃশ্য হলাম যথা সম্ভব দ্রুত। পরাজিত মুখ দেখানো- তাও আবার আপনাদের মতো অন্যের ভুল ধরতে সদাব্যস্ত মিডিয়ার সামনে- আমি একদমই পছন্দ করি না।

এতো মাতামাতির শুরুটাও তো আপনারাই করেছিলেন। প্রথম বছরে পর্তুগাল প্রিমিয়ার লীগ, পর্তুগীজ কাপ আর উয়েফা কাপের ট্রফি। দ্বিতীয় বছরে আবারো প্রিমিয়ার লীগ, পর্তুগীজ সুপার কাপ আর বহু কোচের আজীবনের আরাধ্য উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের শিরোপা- দুই বছরে পোর্তোর মতো একটা ক্লাবকে সাথে নিয়ে আরো ভালো কিছু করা কি সম্ভব ছিলো আদৌ ?... আব্রাহামোভিচ তখন জলের মতো টাকা ঢালছেন চেলসির পেছনে, প্রায় আধা শতাব্দীর ঐতিহ্য আবার স্টামফোর্ড ব্রিজে ফিরিয়ে আনতে উন্মুখ তখন তিনি। পোর্তোতে চোখ ধাঁধানো সাফল্যযুক্ত একটা নিকট অতীতের সাথে সেই নতুন যুগের চেলসির দায়িত্ব গ্রহণ করে আমি যদি নিজেকে অনন্যসাধারন দাবি করেই থাকি, এতে দোষের কি আছে তা আমি বুঝি না। আপনারাই বরং আগ বাড়িয়ে বড় বড় ফন্টে করলেন পত্রিকার হেডিং- ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ পেয়ে গেছে ‘অনন্যসাধারণ একজন’কে।

চেলসিতে পরের দুইবছরে অবশ্য আমি হাতে-কলমে বুঝিয়ে দিলাম আমি কেন সাধারণের দলে পড়ি না। লিভারপুলের বিরুদ্ধে লীগ কাপটাই ছিলো লন্ডনে আমার প্রথম শিরোপা। আমার এখনো মনে পড়ে, জেরার্ডের সেই বিখ্যাত আত্মঘাতী গোলের পরে আমি যখন লিভারপুলের সমর্থকেদের উদ্দেশ্যে ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করার ইশারা করলাম- কী অবিশ্বাসের দৃষ্টিতেই না ওরা তাকিয়েছিলো আমার দিকে !!

৫০ বছরের খরা কাটিয়ে সেই বছরেই চেলসি জিতেছিলো প্রিমিয়ার লীগ টাইটেল। পরের বছরেও আমরাই ছিলাম লীগ চ্যাম্পিয়ন। ইংল্যান্ডের সময়টা খুবই স্মরণীয় ছিলো আমার জন্যে। লীগ শিরোপা জেতার পরে শহরের রাস্তায় উৎসব করবার সময় সমর্থকদের দিকে আমার মেডেলটাও ছুঁড়ে দিয়েছিলাম আমি। ইংলিশ লীগের দুই পোড়খাওয়া ম্যানেজার এলেক্স ফার্গুসন আর আর্সেন ওয়েঙ্গারের সাথের কথার লড়াইটাও বেশ উপভোগ করতাম আমি। দুজনেই তারা নিজেদের কাজ ভালো বোঝে সন্দেহ নেই, কিন্তু আমার ঠিক পছন্দ নয় তাদের ধরণটা। লুকানোর কিছু নেই, হাফটাইমে রেফারির সাথে তাদের সৌজন্য বিনিময়ও আমি ভালো চোখে দেখি না মোটেই।

তিন বছরে ছয় শিরোপা এনে দেবার পরে চেলসি ছাড়লাম আমি, কারণ হিসেবে আব্রাহামোভিচের সাথে আমার বনিবনা না হবার ঘটনা ততদিনে জেনে গেছে ফুটবলবিশ্ব। আমার নতুন ঠিকানা হলো ইতালির ক্লাব ইন্টারন্যাজিওনাল।

ইন্টারেও প্রথম মৌসুম রীতিমাফিক কাটলো আমার, ইতালিয়ান সুপার কাপ আর সিরি-এ’র শিরোপা দুটো আমাদের ট্রফি কেসেই আসলো। আর পরের মৌসুম তো ইতিহাস। সিরি-এ’, ইতালিয়ান সুপার কাপ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের সাথে সাথে বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে ৪৫ বছর পরে ইন্টার ঘরে তুললো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের শিরোপা।

ইন্টারকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতানোর পরেই আমার মনে হলো এটাই ক্লাব ছাড়ার সঠিক সময়। স্বীকার করতেই হবে, ইতালির সময়টা ফুটবল মাঠের বাইরে খুব একটা সুখের ছিলো না আমার জন্যে। আপনারা- প্রেসের লোকেরা দু’দিন পরপরই উসকে দিচ্ছিলেন এক একটা বিতর্ক। মার্সেলো লিপ্পি, সুলে মুনতারি, ইতালিয়ান লীগের রেফারিং- একের পর এক ইস্যুতে আমার মন্তব্যকে নিয়ে আপনারা বাঁধালেন তুলকালাম। প্রেসের সাথে আমার এই সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয় আমার জন্যে। চেলসিতে থাকাকালীন বায়ার্নের বিরুদ্ধে এক ম্যাচে আমার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো উয়েফার। আপনারা দাবি করলেন আমি নাকি কাপড়ের ঝুড়িতে লুকিয়ে ড্রেসিংরুমে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেই ম্যাচেঅভিযোগই সার, প্রমাণ করতে পারলেন না কিছুই।

আপনারা বলেন আমি নেতিবাচক ফুটবলকে সমর্থন দিই। শুনুন, দিন শেষে গোণা হবে আপনার দেয়া গোল আর জেতা ট্রফির সংখ্যাটাই। কাজেই আমার দায়িত্ব হলো একটা দলকে জিততে শেখানো- এর বেশি কিছু নয়। ইয়োহান ক্রুইফ নামের এক ভদ্রলোক একবার পত্রিকার পাতার মাধ্যমে আমাকে শেখাতে চাইছিলেন সুন্দর ফুটবলের মাহাত্ব্য। জবাবে আমি তাকে কেবল বলেছিলাম, ‘অনুগ্রহ করে কী করে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে সুন্দর ফুটবল খেলে হারতে হয়- আমাকে তা শেখানোর চেষ্টা করবেন না। কারণ আমি তা শিখতে চাই না।’

... যাই হোক, আসল কথায় ফিরে আসি। যা বলছিলাম, বিশ্বকাপের ঠিক আগেই ক্লাব বদল করলাম আমি। ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনির জুতায় পা ঢুঁকিয়ে কোচ হলাম রিয়াল মাদ্রিদের। স্পেনে প্রথম মৌসুমটা অবশ্য বেশ কঠিন কাটলো আমার। মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের একমাত্র শিরোপা এলো কোপা ডেল রে’র ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে এক গোলে হারিয়ে। বার্সেলোনা অবশ্য সর্বনাশ যা করার করে ফেলেছে ততদিনে। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিতে আমাদের মাড়িয়েই ফাইনালে উঠলো তারা, কাপও জিতে নিলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে। ন্যূনতম পয়েন্ট ব্যবধানে লীগটাও জিতে নিলো তারা। মৌসুমের প্রথম ক্লাসিকোতে আমাদের ৫-০ গোলে পরাজয়টাকে ক্লাব প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ বলেছিলেন ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে পরাজয়’- আমি সেই খোঁচা ভুলিনি এখনো... তা, বারবার যদি রেফারিরা অমন পক্ষপাত করেন কোন দলের প্রতি- তাহলে সেই দলের জয়টা তো স্বাভাবিকই। গাস হিডিঙ্কের চেলসির সাথের সেই উয়েফা সেমির কথাটাই ভাবুন। চেলসির চার-চারটা নায্য পেনাল্টির দাবি নাকচ করে দিয়েছিলেন রেফারি, মনে পড়ে ?

... কি বললেন, রেফারির ভুল থেকে সব দলই অমন সুবিধা পায় ? পোর্তোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে পল স্কোলসের গোল বাতিল করে দেয়াটা আমার পক্ষে গিয়েছিলো বলছেন ? ... বার্সার বিপক্ষে সেমিতে ইন্টারের ডিয়েগো মিলিতোর গোলটাও অফসাইড ছিলো বলছেন?... হুম।

কেন জানি না, তবে নিয়তি বারবার আমার সাথে জড়িয়ে নিয়েছে বার্সেলোনার নামটা। হাফ-টাইমে রাইকার্ড কথা বলতে চেয়েছিলো রেফারির সঙ্গে, এই অভিযোগ তুলে আমায় পেতে হয়েছে ‘ফুটবলের শত্রু’ আখ্যাআবার মাথা গরম করে সেই বার্সেলোনারই সহকারী কোচ ভিলানোভার চোখে খোঁচা মেরে বসেছিলাম আমি।... শুনুন, স্বীকার করি- আজ পর্যন্ত যত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছি আমি, তার মাঝে গার্দিওলার বার্সেলোনাই সেরা- সবচাইতে নির্মম ফুটবল দলকিন্তু এ কথা স্বীকার করে তাদের স্নায়ূর লড়াইয়ে এগিয়ে রাখবো কেন আমি ? আমি মানুষ- সৃষ্টির সেরা জীব- নিজের সামর্থ্যের একশো ভাগের সাথে কুটিল রণনীতি দিয়ে তথাকথিত ওই ভিনগ্রহের দলকেও আটকে দিতে সক্ষম আমি, ঠিক জানি। কিন্তু দৈব যদি এসে দাঁড়ায় খেলার মাঠে আর বন্ধুর হাত বাড়ায় অমন ভয়ানক প্রতিপক্ষকে, নশ্বর মানুষের প্রতিনিধি হয়ে আমি তবে দাঁড়াবো কোথায় ?...

বহু বছর আগে, যখন কোচিং ক্যারিয়ারের হাতেখড়ি নিতে আমি ক্লাব থেকে ক্লাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি স্যার ববি রবসনের সহকারী হয়ে- স্যার ববি আমায় একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন। ‘কয়েকটা টানা পরাজয়ের মানেই যে তুমি পরাজিত- তা নয়।’ আমি তাই জানতাম, প্রতিপক্ষ যতই প্রবল হোক- মাটিতে তাদের নামতেই হবে একসময়। একদল জার্মান যন্ত্রের কাছে টাইব্রেকারে হেরে উয়েফা থেকে এবার বিদায় নিয়েছি বটে, তবে ভুলে যাবেন না- তিন বছর পর লা লীগার শিরোপা কিন্তু আবার ফিরে এসেছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতেই

সার্জিও রামোস, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরা যখন আমায় আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছিলো লীগ জয়ের- সেটি কিন্তু নিছক একটি উদযাপন দৃশ্যই ছিলো না। ফুটবল বিশ্বকে এই দৃশ্য জানান দিচ্ছিলো আরো একটি আগাম বার্তাও। খুব তাড়াতাড়িই আবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিততে যাচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ।

জেনে রাখুন- সর্বকালের সফলতম ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাস আবার নতুন করে লিখতে যাচ্ছি এই আমি, আমার নাম হোসে ডস সান্তোস মরিনহো।

...আর আমিই, লোকে বলে, দ্যা স্পেশাল ওয়ান !!  
          

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন