শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

ববি ফিশার কোথায় গেলেন

স্থান, কাল অভিন্ন। পাত্ররাই আলাদা কেবল।

মানে সেই ক্যাফেটরিয়ার নিষ্কর্মা কর্ণার, বাইরে সেই বেলা বারোটার ঝিম ধরা কর্কশ দুপুর। কেবল পাত্রের সংখ্যা একজন বেশি। আমাদের চারমূর্তির সাথে যোগ দিয়েছেন কবিরের এক কাজিন, আদনান ভাই।

ভদ্রলোক একেবারে জাঁদরেল ছাত্র। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে স্বনামধন্য সেই এমাইটির থেকে পিএইচডি করে এসেছেন। চেহারাও সেই পাঠ্যপুস্তকের বলদ কিছিমের ফার্স্ট বয়দের মতোই। সিঁথি করে আঁচড়ানো চুলের সাথে মানানসই গোল ফ্রেমের চশমা। তার ওপর ভদ্রলোকের পরনে আজ একদম সাহেবী পোষাক, কোথায় যেন ইন্টারভিউ দিতে যাবেন। গলির ভেতরে ট্যাক্সি যাবে না বলে আমাদের সাথে ক্যাফেতে চলে এসেছেন সময়ের আগেই রেডি হয়ে।

ক্যাফেটরিয়ার নিষ্কর্মা কর্ণারে আজ একটু আলাদা। নান্টু যথারীতি দুটো সিঙ্গাড়া খেয়ে ঝিমুচ্ছে, আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে চাইছে। আমি বসে বসে খেলা দেখছি। সামনে দাবার বোর্ডে আদনান ভাই রীতিমত নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছেন আমাদের টিচার ফরহাদকে। কবির যথারীতি অত্যন্ত নির্লজ্জ ভাবে আশেপাশের মেয়েদের বয়ান করছে তার কাজিনের সাফল্যগাঁথা। হারামজাদাটা গত এক হপ্তায় পাড়ায় হাগু করা কাক আর ভিক্ষে মাগা ফকিরদের পর্যন্ত শুনিয়েছে আদনান ভাইয়ের গপ্পো। শালার নিজের ক্লাসটেস্টে গড় বিশে তিন, কাজিনকে নিয়ে ফুটানিটা দেখো !!

কবির হাসিমুখে মেয়েগুলোকে বিদায় করতে করতেই ফরহাদের কিস্তিমাত হয়ে গেলো। বিজয়ী গর্বে গর্বিত আদনান ভাইকে দেখাচ্ছিলো ঠিক মোরগের মতন। ঠিক এই সময়েই ফরহাদের ঘাড়ে পড়লো এক চাপড়।

‘বাহ বাহ ! খুব দাবা খেলা হচ্ছে ?? একদম বিশ্বনাথন আনন্দ দেখি ...’

জলদগম্ভীর স্বরের মালিক আর কেউ নয়, আমাদের সেই পরিচিত মজিদ ভাই। উত্তরে হ্যামারফেস্ট থেকে দক্ষিণে পুয়ের্তোরিকো পর্যন্ত যিনি দুনিয়া গুলে খেয়েছেন !!

‘আনন্দ ?? উহু, কক্ষনো নয়...’ আদনান ভাই এই আগুন্তুকের দিকে সামান্য সন্দেহের দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন। ‘আমার পছন্দ ববি ফিশার। বই পড়ে অনেকটা তারই আদলে খেলবার চেষ্টা করি আমি...’

‘ববি ফিশার ?’ মজিদ ভাই প্রতিবাদ পেয়ে অভ্যস্ত নন আমাদের কাছ থেকে। তার ভুরু বাঁকিয়ে যায় অনেকটুকু। ‘... আচ্ছা। তা ববি ফিশারের সম্বন্ধে কি জানেন আপনি ?? তার শেষ পরিণতি কি ?? ... এই, তোরাও কিছু জানিস ??’ মজিদ ভাই আঙ্গুল তোলেন আমাদের দিকেও।

‘তা আর জানি না।’ সহাস্যে বললেন আদনান ভাই। ‘সেই কোরিয়া না জাপান, কোথায় যেন সে পটল তুলেছে বছর কয়েক আগে।’

‘হয় নি, উত্তর ভুল।’ মজিদ ভাই গম্ভীরতর।

‘তবে কি নির্বাসনে গেছে সে, কোন নাম না জানা দ্বীপে কি আধুনিক শহরে ?’ আন্দাজ করি আমি।

‘গুম করেছে নিশ্চয়ই কেউ তাকে।’ তিচার ফরহাদ চিন্তিত মতামত দেয়।

‘বেচইন হয়া আফ্রিকায় পলায়া রইছে !!’ নান্টুর অর্ধঘুমন্ত মাথা এরচেয়ে ভালো কিছু যোগাতে পারে না।

‘তোদের মুন্ডু !!’ আমাদের যাবতীয় ঢিলকে প্রত্যাখান করে বিটিভির ম্যান্দামারা কুইজমাস্টারের মতন মুখ শক্ত করে বললেন মজিদ ভাই। ‘ আসল ঘটনার কিছুই জানিস না তোরা, বোঝাই যাচ্ছে। ... আসল ববি ফিশার –যদি এখনও বেঁচে থাকে আর কি সে- এখন রয়েছে জাপানের রিকি দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণে সমুদ্রতলের এক পিরামিডের একতাল পাথরের নিচের কোন ঘরে। মনের সুখে দাবা খেলছে সে টিয়ারা গ্রহের বুদ্ধিমান প্রানীদের শেষ বংশধর- ওটিয়াস ক্যাট্রার সাথে।... ’

কী বলবো, তার কিছুই ঠাহর করে উঠতে পারি না আমরা প্রথমে। কোথায় ববি ফিশার, কোথায় টিয়ারা গ্রহের এক বিশ্রী নামওয়ালা কে যেন, কোথায় জাপানের রিকি দ্বীপ- মাথার ভেতরটা কেমন বোঁ করে চক্কর দিয়ে ওঠে আমাদের।

সবার আগে সামলে নেয় টিচার ফরহাদই। ‘ইয়ে, মানে কী রকম যেন রহস্যময় লাগছে বিষয়টা মজিদ ভাই। ব্যাপারটা মানে ঠিক... যদি একটু...’

ফরহাদের ইতস্ততঃ করবার কারণটা ধরতে পারি আমরা। মজিদ ভাইকে সরাসরি গল্প বলার জন্যে অনুরোধ করতে বাঁধছে ফরহাদের। কারণটা অবশ্য বাইরের কারোর জানবারও কথা নয়।

দোষটা অবশ্য মজিদ ভাইয়েরই ছিলো। মাঝেমাঝেই আমাদের টিউশনির পয়সায় ক্যাফেটরিয়ায় এসে চপ সিঙ্গারা খাওয়ার বিনিময়ে কিছু আজগুবি গল্পটল্প শোনান উনি, এই পর্যন্ত ঠিকই ছিলো সব। মানে অমন মজার গল্পগুলো শুনবার বিনিময়ে কিছু চপ সিঙ্গারা খাওয়ানোতে আপত্তি ছিলো না আমাদের। অথচ মজিদ ভাই একদিন ধুম করে আমাদের মাঝের এই অলিখিত কোড অফ কন্ডাক্ট ভেঙ্গে ফেললেন। তার পুরান দিনের কিছু  ইয়ারদোস্ত সহ নাকি ক্যাফেটরিয়ায় এসেছিলেন তিনি। তা আসুন, সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের অনুপস্থিতিতেই ক্যাফেতে বসে আমাদের নাম ভাঙ্গিয়ে বাকিতে খেয়ে যাওয়া- এটা আবার কেমন ভদ্রতা ?? ... কপাল পুড়েছে এতে কবিরের। যাবার সময় নাকি মজিদ ভাই ক্যাফে ম্যানেজারের কাছে ও ব্যাটার নাম বলে গেছে। নগদ ৮০০ টাকা জলে গেছে কবির বেচারার।

সমস্ত ঘটনার মূল নায়ক মজিদ ভাই যখন দিন দুই পরে ক্যাফেতে আসলেন, তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি কবির। ৮০০ টাকার শোধ তুলতে মজিদ ভাইকে জোচ্চোর বলে গালি দিয়েছে সে। আর ভয়ংকর, সাথে বলেছে এমন কী চাপাবাজও !!

মজিদ ভাই নিষ্কর্মা কর্ণারে বসে হাসিহাসি মুখ করে সমস্ত অভিযোগ শুনেছেন। এরপর বেরিয়ে গেছেন নিঃশব্দে। যাওয়া বলে যাওয়া। পাক্কা তিন সপ্তাহ আর ক্যাফের আশেপাশে দেখা গেলো না তাকে। আর হঠাৎ করেই আজকে এমন বিনা ঘোষণায় তিনি হাজির হয়ে গেলেন নিষ্কর্মা কর্ণারে, নিজে থেকেই আমাদের মুখে তুলে দিলেন একটি রসালো গল্পের সম্ভাব্য সুতো। মান-অভিমানের পালা শেষ হয়েছে কি না, বুঝে উঠতে পারি না আমরা ঠিক মতো !

সারাক্ষণ ঝিমায় বলেই বোধহয়, নান্টুর মগজে কেবল স্থূল বুদ্ধিটাই আছে। সমস্ত কূটনীতি বিসর্জন দিয়ে হতভাগা হাই তুলে বলেই বসলো, ‘মজিদ ভাই- গল্পটা বলেন। দেখেন না, আমার আবার হাই ঊঠতেছে খালি... জলদি শুরু করেন। নাইলে ঘুমায় যামু তো...‘

মজিদ ভাই চেয়ারে হেলান দিয়ে আমাদের চেনা এক ভঙ্গীতে হাতটা পাশে বাড়িয়ে দিয়ে পরিচিত স্বরে কেবল বলেন, ‘হুম!!’

মজিদ ভাইয়ের হাতের মুদ্রা দেখে সন্ধিপ্রস্তাবের সংকেত বুঝতে কষ্ট হয় না আমার। কিন্তু, যার উদ্দেশ্যে বাড়ানো হলো সন্ধি প্রস্তাব- সেই কবির গাধাটা কি বুঝতে পারবে এই সংকেত ? এরচেয়ে বড়প্রশ্ন, বুঝলেও সে কি তা মেনে নেবে ??

পুরো দুই সেকেন্ড আমাদের আশা-নিরাশার দোলনায় কাঁপিয়ে দিয়ে সাদা পতাকা তুলে ধরে নারীলিপ্সু কবিরটাও। মানে, মজিদ ভাইয়ের বাড়িয়ে দেয়া হাতে একটা সিগারেট।

সিগারেটে কষে দুটো টান দিয়ে মজিদ ভাই বলেন, ‘গল্পটা তাহলে শুরু করে দেই- কি বলিস ?’

‘কিন্তু’, দীর্ঘক্ষণের নীরব দর্শক আদনান ভাই হঠাৎ সরব হয়ে ওঠেন তার সেই মিহি গলায়। ‘এখন গল্প শুনতে বসাটা কি ঠিক হবে ? ...আর ঘন্টা দেড়েক পরেই আমার ইন্টারভিউ...’

‘আরে আদনান ভাই রিলাক্স। আপনি একটু চিন্তা করবেন না, আমিই আপনাকে সিএঞ্জি করে পৌঁছে দিয়ে আসবো মহাখালি...’ কবির একেবারে হাত নেড়ে উড়িয়ে দেয় আদনান ভাইয়ের অনুরোধ। মজিদ ভাই, শুরু করেন আপনি।

আদনান ভাইয়ের গোল চশমার দিকে অনুকম্পার একটা দৃষ্টিবাণ হেনে মজিদ ভাই গল্প শুরু করেন।

‘আমি তখন প্যারিসে রয়েছি, ছদ্মনামে-অবশ্যি। ইউনিয়ন কর্সের এক ছোটখাটো বদমাশের অধীনের একটা বড় চালান ধরিয়ে দিয়েছি মাত্র ফ্রেঞ্চ পুলিশকে। ভাবছি বিশ্রাম নেবো কয়েকদিন শুয়েবসে। ঠিক এই সময় লা মন্ডে পত্রিকার দ্বিতীয় পাতায় দেখতে পেলাম সাংকেতিক ভাষায় লেখা বিজ্ঞাপণ।

বিজ্ঞাপণটা আমারই উদ্দেশ্যে লেখা, সাংকেতিক ভাষায়। সারা দুনিয়ায় এই ভাষার অর্থ করতে পারবে কেবল দুইজন লোক। একজন আমি, অপরজন আমার বন্ধু হেন্ডারসন। জাতে সুইডিশ হলেও সে আজকাল কাজ করছে এফবিয়াইয়ের সাথে। ডিসট্রিক্ট নাইন- না কি যেন ওদের প্রকল্পের নাম।

সাংকেতিক বার্তা দেখে বুঝতে সমস্যা হলো না, আমায় খুঁজে না পেয়ে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই আমার উদ্দেশ্যে এই বিজ্ঞাপন হেন্ডারসনের। বিজ্ঞাপণে দেয়া হয়েছে একটা টেলিফোন নম্বর। বলা হয়েছে আমাকে, মজিদ আহমেদকে – যত দ্রুত সম্ভব এই নম্বরে যোগাযোগ করতে। হোটেল হিলটন থেকে সকাল ১১টায় ওই নম্বরে ফোন করে নিজের অবস্থান জানালাম আমি, আর ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় আমার হোটেল ঘর থেকে আমায় তুলে নিলো হেন্ডারসন। শহর থেকে কয়েকমাইল দূরের মিউডন বলে একটা এলাকার একটা প্রাইভেট এয়ারপোর্টে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলো ছোট্ট এক প্লেন। তাতে চেপে বসে টেকঅফ করবার আগে হেন্ডারসন বলতে গেলে কোন কথাই বললো না।  

‘খবরের কাগজে ববি ফিশারকে গ্রেপ্তার করার খবরটা চোখে পড়েছে তোমার, মজিদ?’ গম্ভীর স্বরে জানতে চাইলো হেন্ডারসন।

গত কয়েকিদিন প্রচণ্ড ব্যস্ততায় ছিলাম যদিও, তা সত্ত্বেও এই চাঞ্চল্যকর খবরটা চোখ এড়ায় নি আমার পাতা ওল্টাতে গিয়ে। ববির সাথে আমার ব্যক্তিগত সখ্যও আমার আগ্রহের একটা কারণ বলতে পারিস। বছর কয়েক আগে ঘরোয়া এক পিকনিক পার্টিতে কয়েক হাত খেলেছিলাম ববির সাথে। চার ম্যাচের দুটো ববি জিতেছিলো, একটা আমি। অপরটা ড্র। ছোকরা রীতিমতো ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো আমার...

সে যাক। আগের প্রসঙ্গেই কথা বলি। হ্যাঁ- প্যাসাডিনার রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়ানো এক পুলিশম্যান নাকি গ্রেপ্তার করেছে ববি ফিশারকে- ডাকাতির অভিযোগে। কিছুদিন আগে স্থানীয় এক ডাকাতিতে জড়িত থাকা কোন এক ডাকাতের সাথে নাকি তার চেহারার সাদৃশ্য পেয়েছে পুলিশ।

‘পড়েছি...কী ব্যাপার, ঠিক গুছিয়ে বলতো। ’ বললাম আমি। ‘ববি তো দাবি করছে সে একেবারেই কিছু জানে না এই বিষয়ে। সে বরং বলছে এটা তার বিরুদ্ধে পুলিশের ষড়যন্ত্র। ... আর পুলিশও তো তেমন কিছুই পায়নি তার বিরুদ্ধে। বরং দুইদিন পরেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাকে শুনলাম।’

‘ঠিকই শুনেছো।’ বললো হেন্ডারসন। ‘ কিন্তু, এখন যে কথাটা বলবো- তা শুনলে অবাক হতেই হবে তোমায়।... ববি ফিশার ঠিকই বলেছে। পুলিশ তাকে আটক করেছে বিশেষ একটা উদ্দেশ্য নিয়েই। আর দুইদিন পরে যাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে, সে আসলে ববি ফিশারের একজন ক্লোন মাত্র। আসল ববি ফিশার নয় !!’

কথাটা শুনে এতো অবাক হলাম আমি, যে কথা পর্যন্ত বেরুলো না মুখ দিয়ে !! বলে কী ব্যাটা হেন্ডারসন। দিনে দুপুরে ভাং খেয়ে এসেছে নাকি !!

‘কিন্তু কেনো ?? কেন এত ঝুটঝামেলা ??’ অবশেষে কোনরকমে প্রশ্নটা মুখ দিয়ে বের করে দিতে পারলাম আমি।

হেন্ডারসন একটা বড় শ্বাস ফেললো। ‘সেই ঘটনাই বলবার জন্যেই তো তোমাকে তুলে নিয়ে আসা...

ভাবছি, কোথা থেকে শুরু করবো। আচ্ছা, শোনো...’

মজিদ ভাইয়ের গল্পের ঠিক এই পর্যায়ে আবার মিহি গলার আদনান ভাই তার আবদার পেশ করলেন। ‘মিস্টার মজিদ, গল্পের বাকি অংশটা নাহয় কালকেই শুনি- কী বলেন ?? ... বয়েজ, আমার ইন্টারভিউ এর আর মাত্র ঘন্টাখানেক বাকি। এখনি রওয়ানা না দিলে ট্রাফিক জ্যামে...’

চোখ পাকিয়ে আমরা বাকি তিনমুর্তি তাকাই কবিরের দিকে। সেই দৃষ্টিতে প্রশ্ন, হারামজাদা- কী এক খাচ্চরকে তোর ভাই বানালি, যে এমন গল্পের মাঝে নাক ঢুঁকিয়ে দেয় সামান্য একটা চাকরির ইন্টারভিউ এর জন্যে ?? তাও আবার এমাইটির ডিগ্রি গায় ঝুলিয়ে ??

পরিস্থিতি নিজের করে নিতে কবির এবার হালকা ঝাড়ি দেয়। ‘আহ, আদনান ভাই। হয়েছে তো। বললাম তো আপনাকে নিয়ে যাবো। গল্পটা আগে শুনে নেই একটু... ’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিয়ে যাবে আপনাকে- চিন্তা করবেন না। ... কই মজিদ ভাই, কী হলও এরপরে বললেন না তো ?? শুরু করেন...’ টিচার ফরহাদ সময় নষ্ট করতে রাজি নয় একদম।

আদনান ভাইয়ের উপর একটা বিষদৃষ্টি হেনে মজিদ ভাই আবার গল্প শুরু করলেন।

‘ হ্যাঁ, হেন্ডারসন বললো- ‘তাহলে রেনাটো নিকোলাইকে দিয়েই শুরু করা যাক।...মজিদ, তুমি তো জানো মনে হয়- এফবিয়াই এর সাথে একটা বিশেষ প্রজেক্টে কাজ করছি আমি এখন। এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা। সেই লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার মানমন্দির গুলোর সাথে যোগাযোগ রাখছি আমরা- বেতারে করে মহাশুণ্যে ছুঁড়ে দিচ্ছি অবিরাম গাণিতিক সংকেত। ভিনগ্রহে যদি কোন বুদ্ধিমান প্রাণি থাকে, এবং সে যদি এই বেতার সংকেত ধরতে পারে- তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে তার কোন সমস্যা হবার কথা নয়।

কয়েকমাস আগেই হঠাৎ এই ফ্রান্সেরই এক কৃষক- রেনাটো নিকোলাই-আমাদের স্থানীয় এজেন্টকে জানালো এক অদ্ভূত ঘটনা। ক্ষেতে কাজ করবার সময় অদ্ভূত এক শিস দেবার আওয়াজ শুনে সে ছুটে যায় তার গোলাবাড়ির পেছনের আঙিনায়। গিয়ে দেখে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত আকাশ যান। হাত পঞ্চাশেক উঁচু সেটা, মাটিতে বসে আছে আর শিস দিচ্ছে সমানে। রেনাটোর উপস্থিতি এর টের পেয়েই মুহুর্তে উড়াল দিলো সেটা। পেছনে রেখে গেলো মাটিতে তার ল্যানডিং এর প্রমাণ।

... ঠিক এই ঘটনার পরেই দুনিয়া জোড়া পেতে রাখা আমাদের ট্রান্সমিটারগুলো ধরতে শুরু করলো অদ্ভূত সব সংকেত। কে যেন কী বলতে চায় আমাদের, অন্য কোন বেতার ভাষায়।

অবশেষে এই বেতার সংকেতের অর্থ বুঝতে পারলো আমাদের বিজ্ঞানীরা। হ্যাঁ, যা ভাবছি তাই ওটা- ভিনগ্রহের এক বুদ্ধিমান প্রাণি। দেখা করতে চায় সে পৃথিবীর মানুষদের কিছু প্রতিনিধির সাথে। সত্যিকারের প্রতিনিধি, যারা তার বেতার বার্তার অর্থ বুঝতে পারবে- পারবে তার সাথে যোগাযোগ করতে। আমাদের প্রেরিত বার্তা ধরে মুখোমুখি দেখা করার স্থান বেছে নিলাম আমরা, হাডসন ভ্যালী। ... পত্রিকায় দেখে থাকতে পারো তুমি, হাডসন ভ্যালীর আশেপাশেই ইউএফও আকৃতির কিছু উড়ন্ত চাকতি উড়বার খবর আজকাল প্রায়ই শোনা যাচ্ছে।

চমৎকার এক চাঁদনী রাতে সেই ভিনগ্রহীর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম আমরা নির্বাচিত কয়েকজন। তাকে ভড়কে দিতে চাইনি বলে পুলিশ বা ওরকম সুরক্ষাবাহিনীর কাউকে জানানোই হয়নি ব্যাপারটা। এলাকাটা মানুষে গিজগজ করলে হয়তো নামবেই না সে।

যথাসময়ে এলো সেই বুদ্ধিমান প্রাণি। কি এক যন্ত্র দিয়ে সরাসরি মাথার ভেতরে বার্তা পাঠিয়ে কথোপকথন চালালো সে। জানালো তার নাম ওটিয়াস ক্যাট্রা- সে এসেছে টিয়ারা গ্রহ হতে। জনালো সে আরো আজগুবি সব তথ্য। পৃথিবীর সাথে বহু পুরোনো তাদের গ্রহের যোগাযোগ। প্রায়ই পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় নেমে এসেছে তারা মানুষের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে। এবং মানুষকে রক্ষা করেছে বহু বিপর্যয় হতে। আর প্রতিবারই চলে যাবার সময় নিজেদের আগমনের চিহ্ন স্বরুপ রেখে গেছে একটা করে স্মারক।  সেটা কী আন্দাজ করতে পারো মজিদ ?? ... পিরামিড !!!

হ্যাঁ, পুরো দুনিয়ায় যত পিরামিড দেখি আমরা আজকাল- সবই নাকি তৈরীতে হাত ছিলো ওই টিয়ারা গ্রহের প্রাণিদের। মানুষের ইতিহাস আবার পুরো নতুন করে লিখতে হবে আমাদের- মজিদ, জেনে রাখো।

অবশেষে ওটিয়াস ক্যাট্রা আমাদের জানালো তার এবারের ভ্রমণের উদ্দেশ্য। টিয়ারা গ্রহের বায়ূমন্ডল হয়ে পড়েছে দূষিত। বসবাসের জন্যে নতুন গ্রহ চাই তাদের। তারা এসেছে বাস করবার জন্যে নতুন গ্রহ খুঁজতে, আর আমাদের এই পৃথিবী তাদের একের নম্বরের পছন্দ। ...

না , মারামারিতে যেতে চায় না ওটিয়াস। এবং তাকে মারার চেষ্টা করলেও সেটা ভালো হবে না নাকি। তার শরীরের ভেতরের এক জৈব ট্রান্সমিটার নাকি অবিরত সংকেত পাঠাচ্ছে তার মহাকাশযান মডিউলে। তার মৃত্যুর সাথেই নাকি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পিরামিডগুলোর লুকিয়ে রাখা খুপরি হতে পারমাণবিক বিস্ফরণ ঘটবে।

ওটিয়াস জানে, আমাদের সাধের এই গ্রহ এতো সহজে ছেড়ে দেবো না আমরা। আর পাষাণও নয় সে। সুযোগ না দিয়ে জিতে নিতে চায় না সে এই নতুন গ্রহ। উভয়দিক রক্ষার একটা উপায় বের করেছে সে নিজে। চমকপ্রদ উপায়, সন্দেহ নেই।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে, পৃথিবীর মানুষকে ষোলো গুটির একটা খেলা শিখিয়ে গিয়েছিলো টিয়ারা গ্রহের প্রাণিরা। আধুনিক মানুষ তাকে দাবা বলে জানে। ওটিয়াস প্রস্তাব করছে, তার সাথে পৃথিবীবাসীর দাবা খেলা হোক। যে জিতবে, পৃথিবীর উপর অধিকার তারই থাকবে শেষতক।

... এরপরের ঘটনার খানিকটা মনে হয় তুমি আন্দাজ করতে পারবে দোস্তো। ব্যাঙ্ক ডাকাতির অহেতুক ছুতো তুলে ববি ফিশারকে উঠিয়ে আনা হলো হাডসন ভ্যালীতে। দাবা খেলতে বসলো সে ওটিয়াস ক্যাট্রার সাথে। বললে বিশ্বাস করবে না মজিদ, পুরো আট ঘন্টায় শ দেড়েক চালের খেলা হলো। ফিশারকে পুরো নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো ওটিয়াস। পৃথিবীর ইতিহাসের সেরা দাবাড়ু হেরে গেলো টিয়ারা গ্রহের এক সাধারণ মহাকাশচারীর কাছে।

উপায়ান্তর না দেখে আমরা অনুরোধ করলাম ওটিয়াসকে, পৃথিবীর মানুষকে আরেকটা সুযোগ দেবার জন্যে। অজুহাত দেখালাম, পৃথিবীর সেরা দাবাড়ুরা এখনো জানে না ওটিয়াসের চ্যালেঞ্জ। খানিক অনুরোধের পরে আরেকটা সুযোগ দিতে রাজি হলো সে – তবে ববি ফিশারের বিনিময়ে !!

হু, ববির খেলা নাকি যারপরনাই পছন্দ হয়েছে ওটিয়াস ক্যাট্রার। ববি ফিশারকে তার কাছে দিয়ে দিলে সে আরো একটা সুযোগ দেবে পৃথিবীর মানুষকে। ববি ফিশারের মাথায় ছিট আছে জানতাম, কিন্তু সেদিন প্রমাণ পেলাম চাক্ষুষ। আমাদের কোন মতের তোয়াক্কা না করেই ব্যাটা হাসতে হাসতে রাজি হয়ে গেলো ওটিয়াস ক্যাট্রার প্রস্তাবে। পৃথিবীর খেলোয়াড়েদের সাথে খেলে আর নাকি আরাম পায় না সে- তার জন্যে এইরকম জবরদস্ত প্রতিপক্ষই দরকার।

সেই গভীর রাতে খেলার ফলাফল জানতে আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমন্বিত মহাকাশ অধিদপ্তরের মিটিং এ বসেছিলেন দুনিয়ার বাঘা বাঘা রাষ্ট্রনেতারা। ঝাড়া তিরিশ মিনিট আলোচনার পরে তারা রাজি হলেন পৃথিবী বাঁচানোর দ্বিতীয় সুযোগ নিতে, ববি ফিশারের বিনিময়ে।

বাইরের পৃথিবীর মানুষকে আতঙ্কিত হতে দিতে চাইনি আমরা, তাই ওটিয়াস ক্যাট্রার কাছে বলেকয়ে আদায় করে নিয়েছি আরো একটা সুবিধা- ফিশারের ক্লোন। হ্যাঁ, দুইদিন পরে লোক দেখানো সেই ক্লোনকেই পাঠানো হয়েছে লোকসম্মুখে।

গত দুইদিন ধরে পৃথিবীর সেরা সেরা দাবাড়ুর সাথে বৈঠক করেছি আমরা মজিদ। কেউই রাজি হয়নি এতো বড় একটা দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে। আজ রাতেই ওটিয়াস ক্যাট্রার সাথে খেলবার শেষ সময়। সব ভেবে তোমার কথাই মনে এসেছে আমার মজিদ। পেপার পড়েই বুঝেছি, ফ্রান্সে ছন্মনামে লুকিয়ে আছো তুমি। সংবাদপত্রে গোপন করে চিঠিও পাঠালাম তাই তোমায়।

...ববির সাথে তোমার দাবা খেলবার খবরও  জানি আমি। ভরসা করবার মতো আর কাউকেই আমি পাচ্ছি না আর দোস্তো। আমি জানি, চেষ্টা করলে তুমিই পারো বুদ্ধির খেলায় কিছু করে দেখাতে।‘

হেন্ডারসনের দীর্ঘ কাহিনী শেষ হতে হতেই জানালা দিয়ে দেখি প্লেন নামছে। বাইরে চাঁদের আলোতে ভেসে যাছি হাডসন নদীতীরের উপত্যকা। শহরের অন্যপাশটায় শিল্পাঞ্চলের সমারোহ থাকলেও এপাশটায় প্রকৃতি এখনো অকৃপণ। কিন্তু প্রকৃতির দিকে এখন মন নেই আমার। ভাবছি, গভীর ভাবে ভাবছি, কী করে এই সবুজ পৃথিবী রক্ষা পাবে ওটিয়াস ক্যাট্রার হাত থেকে...’

মিহি গলায় এইবার রীতিমতো আর্তনাদ করে উঠলেন আদনান ভাই। ‘আর মাত্র ২০ মিনিট আছে !! ... আমার চাকরিটা গেলো রে এইবার। কোন কুক্ষণে এই কবির ছেলেটাকে সাথে নিয়ে বের হয়েছিলাম... ধরে বেঁধে গল্প শুনাতে গিয়ে আমার চাকরিটা হতে দিলো না রে...’

গল্পের চুড়ান্ত ক্লাইম্যাক্সের সময়তেই এমন বাঁধা পেয়ে এমনকি নান্টুরও ঘুমঘুম ভাব কেটে যায়। ‘ কয় কি হালায় ?? মাথা গরম হইছে নাকি উনার ??...  আদনান ভাই, চুপ !! এদ্দম চুপ !! এমন গল্প শুনবার সুমায় ইন্টারভিউর চিন্তা করেনি কেউ ??  মুড়ি খান মিঁয়া !!’

কবির এবার রক্তের টান উপেক্ষা করেই ঝাড়ি দেয় আদনান ভাইকে, ‘ মিঁয়া, এময়াইটির ডিগ্রি পাওয়া লোকজনেও এমন বলদ হয়- আপনাকে না দেখলে বুঝতামই না জীবনে। কী এক সোনার চাকরি আমার... চুপ করেন, এদ্দম চুপ !! মজিদ ভাই, আপনি বলেন... ’

মজিদ ভাই সান্তনা দেবার ভঙ্গিতে একটু পিঠ চাপড়ে দেন আদনান ভাইয়ের। তারপরে আবার গল্প শুরু করেন।

‘হ্যাঁ, এসব ভাবতে ভাবতেই প্লেন কখন যেন ল্যান্ড করেছে। পথ দেখিয়ে আমায় নিয়ে চলেছে হেন্ডারসন। পুরো এলাকাটা আলোকিত হয়ে আছে ভ্রাম্যমাণ একটা আর্মি ক্যাম্পের আলোয়। পাংশু মুখে জায়গাটা ঘিরে রেখেছে আর্মির জওয়ানেরা, তারা জানে ওটিয়াস ক্যাট্রার বিরুদ্ধে তাদের এত সামরিক অস্ত্রশস্ত্র কোন কাজেই আসবে না।

এবং দেখা হলো আমার ওটিয়াস ক্যাট্রার সাথে। ... তোদের হলিউডের একশান ছবিতে যেমন এলিয়েন দেখা যায়, কতকটা ওরকমই তার চেহারা। দুটো পা, হাত চারটে কিলবিল করছে পিঠের আশেপাশে। কেমন পাতলা একটা চামড়ার আবরণে ঢাকা তার সাড়ে চারফুট লম্বা দেহটা। তবে হ্যাঁ, মাথাটা তার শরীরের তুলনায় বেদম বড়। ওটাই চোখে পড়ে প্রথমে।

মাথার ভেতরে কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠলো আমার। পরমুহুর্তেই মগজের ভেতরে কে যেন হেসে উঠলো। ‘তাহলে তুমিই পৃথিবীর সেরা দাবাড়ু ? তোমাকেই তাহলে খুঁজে এনেছে এই লোকেরা ??’

বুঝলাম ওটিয়াস আমার মগজে নির্দিষ্ট কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে নিজে কথা পাঠাচ্ছে। আমিও মনে মনেই জবাব দিলাম- ‘হ্যাঁ, আমিই সেই দাবাড়ু। তোমাকে মারবার কোন উপায় না দেখে দাবায়ই হারাবো ঠিক করেছি আমরা। ’

ওটিয়াস হেসে উঠলো।‘ হাহাহা, ভালোই বলেছো বন্ধু। তবে কথা বাড়িয়ে আর লাভ কি- এসো, খেলা শুরু করা যাক !!’ 

ঠিক সেই মুহুর্তেই ওটিয়াস ক্যাট্রাকে হারানোর উপায়টা ঝিলিক মেরে গেলো আমার মাথায়। আমি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়লাম। যাক, ব্যবস্থা হয়ে গেছে।

‘খেলা শুরু করবার আগে একটা সিগারেট হবে নাকি ?’ বললাম আমি। সেইসাথে পকেট থেকে নিজের সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে খুলে বাড়িয়ে ধরলাম ওটিয়াস ক্যাট্রার দিকে।

‘ধন্যবাদ, পৃথিবীর মানুষ। তবে আমরা টিয়ারার বাসিন্দারা কোন রকম মাদকদ্রব্যের প্রয়োজন বোধ করি না।’

‘বেশ,’ আমি যেন খেলোয়াড়ি ভদ্রতার মূর্ত প্রতীক। ‘ তাহলে আমারও দরকার নেই সেটা। এসো, খেলা শুরুর আগে করমর্দন করে নেয়া যাক। আমার দেশে খেলা শুরু করবার আগে সেটা করাই সাধারণ প্রথা।’

করমর্দন করে ওটিয়াস ক্যাট্রা খেলা শুরু করলো। হেন্ডারসন অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, কেন যেন আজ ওটিয়াস বড় উশখুশ করছে। খেলার দিকে ঠিক যেন মনোযোগ নেই তার আজ...’

মজিদ ভাইয়ের কাহিনির মাঝেই, আমি সবিস্ময়ে অনুভব করলাম – আমার আর কবিরের মাঝে বসা আদনান ভাইও কেমন যেন উসখুস করছেন। কী যেন হয়েছে তার। দ্রুত কবির দক্ষ হাতে চেপে ধরলো আদনান ভাইয়ের মুখ। গল্পে আর বাঁধা আসুক, এটা চাই না আমরা।

‘... আর এই মনোযোগ না দিয়ে খেলবার ফল হাতেনাতে টের পেলো ওটিয়াস ক্যাট্রা। মাত্র ৩৮ চালের মাথায় খেল খতম। কিস্তিমাত।

হেরে গিয়ে মুখ কালো হয়ে গেলো ওটিয়াস ক্যাট্রার। ‘এঁ ? ... হেরে গেলাম ?? সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণির আবাস বলে আমাদের টিয়ারা গ্রহকে নিয়ে গর্ব করতে পারবো না আর ?? এই মানুষ জাতটার কাছে হেরে গেলাম আমরা ??’

‘আরে ব্যাপার না।’ তাকে শান্তনা দেই আমরা। ‘খেলায় হারজিত আছেই। তা তুমিও তো এমন খারাপ খেলো নি...’

‘হুম... বেশ, তবে তাই হোক।’ ওটিয়াস ক্যাট্রা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যেন। ‘ কথা দিয়ে কথা রাখতে জানি আমরা। পৃথিবীর মানুষ- তোমরা এবার বেঁচে গেলে আমাদের হাত থেকে, এই গ্রহ তোমাদেরই রইলো। তবে আগেও যেমন বলেছি, দ্বিতীয় বাসস্থান হিসেবে তোমাদের পৃথিবীকে ভারী পছন্দ হয়েছে আমাদের। আমি তাই অপেক্ষা করবো তোমাদের সভ্যতার শেষ হওয়া পর্যন্ত। আমার মহাকাশযান নিয়ে আমি থাকবো এই পৃথিবীরই কোথাও ...’

আমি আর হেন্ডারসন স্বস্তির শ্বাস ফেললাম। যাক বিপদ এইযাত্রা তো কাটলো অন্ততঃ। মহাকাশযানের দরজায় পৌঁছে হঠাৎ ঘুরে হেন্ডারসনের হাতে কী একটা গুঁজে দিলো ওটিয়াস। ‘আর আমরা এখনো পৃথিবীর মানুষকে বন্ধুই মনে করি। যদি কোন সাহায্যের প্রয়োজন হয় কখনো, তবে তোমরা আমার ডাকলে আমি সাড়া দেবো। এই পৃথিবীরই কোথাও লুকিয়ে থেকে তোমাদের পর্যবেক্ষণ করবো আমি। ... বিশেষ দরকারে যদি আমাকে খুঁজে পেতে চাও তোমরা, তবে এই হলো তার হদিস।’

খানিক পরেই হাডসন ভ্যালীর উপত্যকা থেকে শুণ্যে উড়লো ওটিয়াস ক্যাট্রার মহাকাশযান। ...

...হ্যাঁ, সেবার বেশ বড়সড় প্রমোশন পেয়েছিলো দোস্তো হেন্ডারসন। তা, আমিও তো আর নিজের কৃতিত্ব নিয়ে বড়াই করতে যাইনি দুনিয়ার হর্তাকর্তা দেশগুলোর কাছে। বন্ধুর সুখেই আমার সুখ। তাছাড়া বেশ দামি একটা পোরশে সে আমাকে উপহার দিয়েছিলো সেবার...’
হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেলো যেন মজিদ ভাইয়ের গল্প। ক্যাফেটরিয়ার নিষ্কর্মা কর্ণারও থম মেরে গেলো একটু। কী থেকে কী হলো, কেউই যেন বুঝতে পারছে না ঠিক।

‘ক্কি... কিন্তু... মানে ওই যে বললেন ববি ফিশার কোন এক পিরামিডে আটক !!’ টিচার ফরহাদ আমাদের সবার মাথায় ঘুরতে থাকা প্রশ্নটা ছুঁড়েই দেয় মজিদ ভাইয়ের উদ্দেশ্যে। ‘ খোঁজ পেলেন কি করে তার ?? ওটিয়াস ক্যাট্রা পরে আপনার সাথে আবার যোগাযোগ করেছিলো বুঝি ??’

‘আরে নাহ !’ মজিদ ভাই ফুৎকারে উড়িয়ে দেন কথাটা। ‘ তোদের বললাম না, বিদায়ের আগেই হেন্ডারসনকে নিজের আবাসের ইঙ্গিত দিয়ে গেছে ওটিয়াস ?? ওটা আর কিছু নয়। একজাতের রঙিন মথ পোকা। ...

কি , চমকে গেলি ?? না না ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই মথ পোকার বৈজ্ঞানিক নাম হাইপোসমোকোমা চিলোনেলা। সাধারণ মথপোকাদের সাথে এর পার্থক্য হলো নিজেদের পানিশোষী ত্বকের কারণে এরা থাকতে পারে পানির তলায়ও। বিবর্তন এদের করে তুলেছে জলচর। কাজেই বছর কয়েক পরেই যখন জাপানের রিকি দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণে সমুদ্র তলদেশে একটা পিরামিড আবিষ্কার করে বসলেন বিজ্ঞানীরা, তখনই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে সমস্যা হলো না আমার। ভেবে দ্যাখ, ওটিয়াস ক্যাট্রা সংকেত দিয়েছে সে পানির নিচেই কোথাও থাকবে- আর টিয়ারা গ্রহের প্রাণিদের ঐতিহ্য বলে পিরামিডের প্রতি পক্ষপাত আছে তাদের। তবেই বোঝ, নিজের বন্ধু কাম জিম্মি ববি ফিশারকে নিয়ে দিন কাটানোর জন্যে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথায় হবে !!’

মজিদ ভাইয়ের ব্যাখ্যা শুনতেই শুনতেই আদনান ভাইয়ের দিকে মনোযোগ হারিয়েছিলাম আমরা। হঠাৎ তার চীৎকারে আমরা তাই সচকিত হয়ে উঠি।

‘মস্করা পেয়েছেন, না ?? গুল মারেন ??’ আমরা তাকিয়ে দেখি আদনান ভাইয়ের চোখ দুটো তার গোল চশমার নীচে ফুঁসছে। তার এই উত্তেজনা কেবল চক্ষুকোটরেই সীমাবদ্ধ নেই, কোন এক কারণে ভদ্রলোক সমানে নিজের গা মোচড়ামুচড়ি করছেন।

‘বুঝলাম আপনি দাবা ভালো গেলেন। ববি ফিশারকেও হারিয়েছেন, মানা গেলো। কিন্তু যেদিন আপনার সাথে খেলা হলো মহা বুদ্ধিমান ওটিয়াস ক্যাট্রার, ঠিক সেইদিনই তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হবে - না ?? এত্তো বড় কাকতাল হয় কখনো ?? জেমস বন্ডের সিনেমা এটা , আঁ??’ প্রবল বেগে নিজের পিঠ চুলকাতে চুলকাতে চ্যাঁচান আদনান ভাই।

‘নাহ, কাকতাল হবে কেন ??’ মজিদ ভাই এখন উদ্গীরণের পরে ভিসুভিয়াসের মতোই শান্ত। ‘বললাম না, সিগারেটের প্যাকেট বের করেছিলাম ?? ...তা, ভাগ্যও সাথে ছিলো বটে আমার। ওটিয়াস ক্যাট্রার পাতলা ত্বক দেখেই আমার মাথায় বুদ্ধিটা আসে। এরপরে তো হ্যান্ডশেকের ছুতোয় একটু ডলে দেয়াটা সহজ কাজ।’

‘কী ?? কী ডলে দিলেন আপনি ??’ আদনান ভাইয়ের গলায় কেমন একটা সন্দেহের সুর।

এময়াইটি গ্রাজুয়েট আদনান ভাই সবেগে ক্যাফেটরিয়ার ওয়াশরুমের দিকে ছুটে যাবার আগে মজিদ ভাই কেবল মৃদুস্বরে বললেন, ‘ চুলকানির মহৌষধ। গুঁড়ো করা বিছুটি পাতার পাউডার। ... খানিক আগে পিঠ চাপড়ানোর ছলে যেটা আমি আপনার শার্টেও অল্প করে ঢেলে দিয়েছি।’
              
   **************
ঘটনার আরো কিছু বাকি ছিলো, সেটা জানা গেলো পরেরদিন বিকালে।

গলির মোড়ে আমির মামুর দোকানে বসে চা খেতে খেতে ফুটবলের আলাপ করছিলাম আমরা। আমরা মানে আমরা চারজন। আদনান ভাই লোকটা ভয়ানক লুতুপুতু। কালকের ওই ঘটনার জের এখনো সামলে উঠতে পারেনি সে। কবির তাই তাকে বাসায় রেখে আসতে পেরে মহা স্বস্তি বোধ করছে, সাথে আমরাও। হঠাৎই দেখলাম রিকশায় চেপে হাস্যজ্জ্বল মনসুর ভাই চলে গেলো আমাদের সামনে দিয়ে। হাতে র্যাাপিং কাগজে মোড়া জিনিসটা নিশ্চয়ই উপহারের, আকারে বেশ বড়সড় সেটা। দূর থেকে দেখলাম সিঁড়ি বেয়ে মজিদ ভাইয়ের ফ্ল্যাটের দিকে উঠে যাচ্ছেন তিনি।

মনসুর ভাইয়ের মতন হিসেবি লোক অকারণে মজিদ ভাইয়ের সাথে উপহার নিয়ে দেখা করবে- এমনটা আমাদের কারুরই বিশ্বাস হয় না। অতএব আমরা অপেক্ষা করতে থাকি তার নেমে আসার জন্যে। রহস্যটা জানতে হয় তো !

মিনিট চল্লিশেক পরেই মনসুর ভাই নেমে আসেন গলিতে, হাতের প্যাকেট উধাও। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের সামনে আসতেই সটান দাঁড়িয়ে পড়ি আমরা।

‘আরে, মনসুর ভাই যে ! কেমন আছেন ??’

‘আরে, চারমূর্তি দেখি !! ভালো আছি, খুব ভালো আছি।’

‘মজিদ ভাইয়ের বাসায় কী একটা দিয়ে আসলেন দেখলাম,’ কবিরের গলায় উদাসীনতা। ‘ উপহারই তো মনে হলো। ...কোন উপলক্ষের বুঝি ??’

‘আরে নাহ! উপলক্ষ কী আবার ! মানে, চাকরিটা হয়ে গেলো তো...’ মনসুর ভাই যেন কৃতজ্ঞতায় গদগদ।

‘চাকরি !! আপনার ??’ আমরা চারজনেই কেমন যেন একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পাই বাতাসে।

‘হ্যাঁ, মহাখালির একটা ফার্মে। মজিদ ভাইকে পরশু বলেছিলাম- বস্‌, চাকরিটা মনে হয় এবারো হবে না। শুনছি কবিরের এমায়াইটি গ্রাজুয়েট এক কাজিনও সিভি ড্রপ করেছে। নেবে তো একজনকেই...

তা শুনে মজিদ ভাই বললেন, তিনি ব্যবস্থা করবেন। তার নাকি জানাশোনা আছেন ওই ফার্মে।...

তো সেই চাকরিটাই হয়ে গেলো আরকি আমার। মানে, ইন্টারভিউ বোর্ডে আমিই সবচেয়ে কোয়ালিফায়েড ছিলাম তো। ...একি, তোরা এরকম মুখ করছিস কেন হঠাৎ ? পেটে ট্রাবল দিচ্ছে নাকি আবার...’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন