রবিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১২

গুডবাই মিঃ ডিরেক্টর

আজ বিকালে ক্লাব সভাপতি সান্দ্রো রাসেল নিশ্চিত করেছেন খবরটা, ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার কোচের দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন জোসেপ গার্দিওলা। পরিসংখ্যানের হিসাবে ক্লাব ইতিহাসের সফলতম কোচ, সমর্থকদের প্রিয় ‘পেপ’ এই দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নিচ্ছেন চলতি মৌসুমের শেষেই- ৩০ জুনে। দায়িত্বকালের চার বছরে ক্লাবের শো-কেসে পেপ জমা করেছেন ১৩টি শিরোপা- তেরো সংখ্যাটিকে অশুভ করতে আগ্রহী পরিসংখ্যানবিদেরা তাদের সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন এই তথ্যটিকেও।

জোসেপ গার্দিওলাকে আগেই চিনতো বার্সেলোনার লোকেরা। ক্রুইফের স্বপ্নের দলের অপরিহার্য অংশ ছিলেন এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। ইয়োহান ক্রুইফ এই শিষ্য সম্পর্কে বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে, ‘এই ছেলের পা’র চাইতে মাথাটাই অনেক দ্রুত চলে মাঠে।’ বার্সেলোনার দায়িত্ব নিয়ে এই কথাকেই সত্য প্রমাণ করে দিলেন পেপ। নিজে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হলেও নিজের অধীনে বার্সেলোনার ফুটবল দর্শন করে তুলেছিলেন তিনি একটি ছোট্ট বাক্য। ‘আক্রমণ, আরো বেশি আক্রমণ।’ প্রখর দূরদৃষ্টিতে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মাশকেরানোকে তিনি বানিয়ে দিলেন দারুণ এক ডিফেন্ডার, দানি আলভেজকে প্রায়ই দেখা গেলো স্ট্রাইকার হিসেবে ডানপ্রান্তে, সার্জিও বাস্কুয়েটস কখনো মাঝমাঠে আক্রমণ শানাচ্ছে- কখনো কাজ করছে পুরোদস্তুর ডিফেন্ডার হিসেবে। এইরকম ছোটাখাটো উদ্ভাবনে পিছপা কখনোই ছিলেন না পেপ, যার আরেকটি উদাহরণ হতে পারে রোমের সেই উয়েফা ফাইনালের আগে খেলোয়াড়দের উদ্বুদ্ধ করতে ‘গ্লাডিয়েটর’ থিমের এই ভিডিওটা দেখানো।



পথের শুরুটা সহজ ছিলো না গার্দিওলার। ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের গরম জুতোতে পা গলানোর পরের প্রথম কয়েক হপ্তা সুবিধের কাটেনি বার্সেলোনার। সাংবাদিক গ্রায়েম হান্টারের ‘বার্সা- দ্যা মেকিং অফ দি গ্রেটেস্ট টিম’ বইতে বললেন সামান্য একটা ঘটনার কথা- যেটি পালটে দিলো পুরো দলের দর্শনটাই। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের নক-আউট পর্বে জায়গা করতে হলে হারাতে হবে সুইস ক্লাব বাসেলকে- তাদের নিজের মাঠে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ঠিক ম্যাচের আগের দিনেই বাবার মৃত্যু সংবাদ পেলেন দলের গোলকিপিং কোচ জুয়ান কার্লোস। সেদিকে যেতে হলে ৫০০ কিমি বাড়তি ঘুরতে হবে বার্সেলোনা দলকে। সিদ্ধান্ত নিয়ে দেরী করেননি পেপ। হ্যাঁ, অন্ত্যস্টিক্রিয়ায় যেতে হবে পুরো দলকেই। বার্সেলোনা দলটা শুধু একজনের নয়, দলটা সবার। ছোট্ট ঘটনাই বটে, তবে খুব সম্ভব রোনালদিনহো আর ডেকোর মত দুই দারুণ গুরুত্বপূর্ন খেলোয়াড়কে হারানোর পর এলেমেলো হয়ে পড়া দলকে একতাবদ্ধ করতে দরকার ছিলো এটার।

গার্দিওলার অর্জনের ফিরিস্তিটা পরিসংখ্যানের কাছেই থাক। এক মৌসুমে ছয়টি শিরোপা জেতা একমাত্র কোচ, সর্বকনিষ্ঠ কোচ হিসেবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়, প্রথম কোচ হিসেবে টানা চারটি এল ক্লাসিকো জেতার রেকর্ড- এরকম আর বহু উদাহরণ থাকতে পারে। অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে দিচ্ছে তার ফুটবল দর্শনটা। রাইকার্ডের অধীনে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলে যাওয়া বার্সাকে পেপ ভুলিয়ে দিলেন বহুক্ষণ বল পজেশন রেখে খেলার তত্ত্ব দিয়ে, সাথে রইলো ক্রমাগত উপরমুখী প্রেস করতে থাকা ডিফেন্স লাইন। সরলতম ভাবে ফুটবল খেলাটা হাতেকলমে শিখাতে চাইলে বিজ্ঞাপণ হতে পারতো গার্দিওলার বার্সেলোনাই। ছন্দময় এই পাসিং ফুটবলের নাম হয়ে গেলো টিকি-টাকা।

এই টিকি-টাকা জাদুতেই ভর করে প্রথমবারের মতোই স্পেন জিতে নিলো বিশ্বকাপ। ভিসেন্তে দেল বস্কের একাদশে ৭টা বার্সেলোনার খেলোয়াড় ছিলো বলেই নয় শুধু- যে কায়দায় খেললো বিশ্বকাপে স্প্যানিশরা, এর আড়ালেও চাইলে খুঁজে পাওয়া যাবে গার্দিওলার দর্শন।

৪ বছরে এখনো পর্যন্ত ১৩টি শিরোপা জিতে সর্বকালের সেরা ফুটবল দলের ছোট্ট তালিকাতে উঠে  এসেছে পেপের দল। ওয়েম্বলির ফাইনালে ৩-১ গোলে বার্সেলোনার সাথে পরাজয়ের পর ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিটি হাসিমুখে সায় দিলেন এই তত্ত্বে। স্যার এলেক্স বলেই দিলেন, সিকি শতাব্দীর কোচিং ক্যারিয়ারে এতো আক্রমণাত্বক- এতো অসাধারণ দল আর দেখেননি তিনি। গার্দিওলা চিরকালের বিনয়ী। 'সর্বকালের সেরা হতে চাই না, লোকে ১০-১৫ বছর মনে রাখলেই আমরা খুশি'।

এই চিরকালের গুডবয় ইমেজটাই ট্রেডমার্ক গার্দিওলার। চুইংগাম চিবোনো স্যার এলেক্সের ব্যক্তিত্বের প্রকটতা নেই তার মাঝে, নেই জোসে মরিনহোর মতো সর্বজয়ী আভিজাত্য। টুইডের হাল ফ্যাশনের স্যুট আর সরু টাইতে ডাগ-আউটের পেপ একদম সাধারণ ছিলেন; ছিলেন দর্শক আর খেলোয়াড়দের প্রিয়মুখ। মনে পড়ে ৫-০ এল ক্লাসিকোর সেই দৃশ্য। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো থো-ইনের বল নিতে গেয়ে ধাক্কা মেরেছেন গার্দিওলাকে, মুহুর্তে উত্তেজনা মাঠে, বার্সার খেলোয়াড়েরা মারমুখী হয়ে ঘিরে ধরেছে ক্রিশ্চিয়ানোকে। আর এত হট্টগোলের মাঝে থাকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির পেপ মাথা চুলকাচ্ছেন আনমনে- কী ঘটেছে, সেটা স্পর্শই করেনি তাকে যেন !

অগ্রজ ইশতিয়াক রউফ গার্দিওলার দর্শনের তুলনা দিতে গিয়ে ব্যবহার করেছেন একটা চমৎকার উপমা। কায়রোর রাস্তায় ইন্ডিয়ানা জোনসের মুখোমুখী এক চাবুক হাতের ডাকাত। চাবুক ঘোরাচ্ছে সে কায়দা কানুন দেখিয়ে। ইন্ডিয়ানা জোন্সের এতো সময় নেই হাতে। ঝটপট গুলি করে উত্তেজনায় পানি ঢেলে দিলো সে। গার্দিওলা, শেষ পর্যন্ত একবিংশ শতাব্দী ছিলেন ওই চাবুকওয়ালাই। তার কায়দা বুঝতে হয়তো সময় নিয়েছে সাফল্যকামী ফুটবল বিশ্ব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সুন্দর ফুটবলকে দ্রুত ফলকামী ফুটবল হারিয়েছেই একসময়। গার্দিওলার বার্সেলোনাকে তাই সময়ে সময়ে মনে হয়েছে অসহায়। তাই বলে এতে করে প্রতিপক্ষের কৃতিত্ব ছোট হয়ে যাচ্ছে না অবশ্যই, দিনের শেষে টিকে থাকেন তো ইন্ডিয়ানা জোনসই !

তবুও  ফুটবল রোমান্টিকদের দায় থেকেই সবসময়েই কিছু চাবুকওয়ালা আসেন। একবিংশ শতাব্দীতে এই দায়টা মিটিয়েছিলেন জোসেপ গার্দিওলা।



রাতের পর রাত জেগে দেখা সেই ছন্দময় বার্সেলোনার ফুটবল অর্কেস্ট্রার সেই পিছনের মানুষটি আজ বিদায় নিলেন, তাকে সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ জানাই। টিকি-টাকা ফুটবলকে অপছন্দ করতেই পারেন অনেকে, কিন্তু শ্রদ্ধা না করার উপায় নেই আপনার।

ধন্যবাদ জোসেপ গার্দিওলা। ডাগ-আউটের পাশে দাঁড়িয়ে আপনার হাত-পা ছোঁড়া কখন যে আমাদের দিনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছিলো, বুঝিনি সজ্ঞানে।

আপনার অর্কেস্ট্রা আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছিলো গত কয়েক বছর, যেমনটা ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই করবে আরো অগুনতি ফুটবলপ্রেমীকে। ভবিষ্যতে হয়তো আপনাকে আবার ডাগ-আউটে দেখা যাবে কোনদিন। ততদিন রইলো শুভকামনা। আর বিদায়।

গুডবাই, দ্যা ডিরেক্টর।

1 টি মন্তব্য: