বৃহস্পতিবার, ২২ মার্চ, ২০১২

ওরা এগারোজন

১৬০ মিলিয়ন মানুষের সমবেত দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজটা কত জোরালো হতে পারে ?? নীরব ঢাকা শহর বলছে খুব বেশি নয়। তবে মীরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের চত্বরে এশিয়া কাপ বিজয়ী পাকিস্তান ক্রিকেট দলের উল্লাসের ধ্বনিকে সেটা ছাড়িয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই।

অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে সাফল্যমন্ডিত দিন এই ২২শে মার্চ, ২০১২। ঘরের মাঠে এশিয়া কাপের আয়োজক শুধু নয়, বিজয়ীও আমরা হতে পারি- এই বিশ্বাস নিয়েই আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেছে পঞ্চগড় থেকে সেন্ট-মার্টিন। ক্রিকেট পরিবারের দরিদ্রতম সন্তান বাংলাদেশ হঠাৎ যেন হাতে পেয়ে গেছে মিডাসের স্বর্ণ পরশ- যা কিছু স্পর্শ করছেন টাইগারেরা, পরিণত হচ্ছে সাফল্যে। টানা তিন ম্যাচে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপ বিজয় হলে সেই মিডাসকে নিয়েও সিনেমাও বানানো যায়। আশুতোষ গোয়াড়িকার হয়তো টাইগার বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করতেন আরেকটি ‘লগান’ এর চিত্রনাট্য প্রস্তুতের আশায়।

দিনের শুরুতে সমস্তটা অবশ্য হয়েছে বাংলাদেশের চিত্রনাট্য অনুযায়ী। মুশফিকুর রহিম টসে জিতে ব্যাট করতে পাঠিয়েছেন পাকিস্তানকে। চেপে ধরেছেন মাশরাফি, নাজমুল আর রাজ্জাক। ইনফর্ম হাফিজ রান তুলতে ঘেমে নেয়ে একাকার। স্বল্প সময়েই বিদায় নাসির জামশেদ, ইউনিস খান আর অধিনায়ক মিসবাহের। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে তখন যেন ফিল্ডিং করছে এগারটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সিঙ্গেল নিতেও পেরিয়ে যাচ্ছে ওভার।

২৯ ওভারে ১০০র কোটা পেরুলো পাকিস্তান। পার করালেন উমর আকমল আর হাম্মাদ আযম। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুইজনকেই ফেরালেন সাকিব-রিয়াদ। উইকেটে এলেন অফফর্ম শহীদ আফ্রিদী। এলোপাতাড়ি মারে রানের গতি বাড়িয়ে দিয়ে আফ্রিদী যখন বিদায় নিলেন, তখনো বোঝা যায়নি কতটা যেতে পারে পাকিস্তান। বিপজ্জনক হিটার গুলের দ্রুত বিদায়ের পরেও পাকিস্তানের সংগ্রহ ৯ উইকেটে ২৩৬ পৌঁছলো শেষ উইকেটে আইজাজ চিমা আর সরফরায খানের ৩০ রানের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এক জুটিতে। চিরকালের খরুচে শাহাদাত হোসেনের শেষ ওভারে ১৯ রান খরচ হয়ে গেলো এই অনন্যসাধারণ ম্যাচের প্রচুর টার্নিং পয়েন্টের একটি।

অথচ বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুতেও বোঝাই যায়নি ক্রিকেট কতটা নাটক জমিয়ে রেখেছে এই ম্যাচের জন্যে। বুঝতে দেননি তামিম ইকবাল। খান তনয় একেকটা বাউন্ডারি হাঁকান, বাংলাদেশের যাবতীয় লোডশেডিং এর আঁধার গিয়ে চাপে উমর গুলেদের মুখে। নাজিমুদ্দিন আটকে গেছেন অপরিচিত খোলসে, তামিম ইকবাল তা বুঝতেই দিচ্ছেন না। ভাগ্যের ছোঁয়াও মনে হচ্ছিলো বাংলাদেশের সাথেই আছে আজ। আইজাজ চীমার বাউন্সার তামিমের ব্যাটের পেছনে লেগে চলে যাচ্ছে সীমানা পেরিয়ে, নাজিমুদ্দিনের পাগলা শট হাতে গিয়েও জমা পড়ছে না হাম্মাম আজাদের। এর মাঝেই দারুণ এক উদযাপনের মাঝে দিয়ে টানা চার নম্বর ফিফটি করলেন তামিম।

নাটকের শুরু এরপরেই। ইউনিস খানের হাতে জমা পড়ে ফিরে এলেন নাজিমুদ্দিন, তামিম আর জহুরুল। বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন বিজ্ঞাপণ নাসির হোসেন আর বাংলাদেশের জান সাকিব উইকেটে এলেন। চাপ বাড়ছে।

চাপ বাড়াচ্ছেন আফ্রিদী, আজমল, হাফিজ। ইনফর্ম নাসিরকে দেখালো বিপন্ন, সাকিবকে মনে হচ্ছিলো নিরুপায়। তিন স্পিনার সুযোগ বুঝে বল ফেলতে লাগলেন মাপা লাইন লেংথে। আস্কিং রেট উঠে এলো সাতের ঘরে। একটা দুটো চার মারছেন ব্যাটসম্যানেরা, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেটাকে খুবই স্বল্প মনে হচ্ছে।

দশ ওভারে প্রয়োজন চুরাশি। এমন সময়েই, প্রথমবারের মতো, সাকিব নাসিরকে জুটিকে মনে হচ্ছিলো কী করতে হবে তারা তা জানেন। মনে হলো না বেশিক্ষন। নাসির গেলেন। অগোছালো আইজাজ চিমার শিকার হয়ে সাকিব আল হাসান প্রমাণ করলেন তিনি মানুষই, মার্ভেল কমিকসের পাতা হতে নেমে আসা কোন মিউট্যান্ট নন। শেরে বাংলা স্টেডিয়াম তখনো উত্তাল। ক্যাপ্টেন আছেন এখনো।

সেই স্টেডিয়ামের শ্মশানের নীরবতা নামলো যখন মিড উইকেটের উপর তুলে মারতে গিয়ে বিদায় নিলেন মুশফিকও। আশা নেই আর। ৪০ বলে ৬০ দরকার। আশা এলো সম্পূর্ন অন্যদিক হতে। মর্তুজাপুত্র মাশরাফি বোধহয় পণ করেই এসেছিলেন গত বছর দুয়েক সমস্ত বড় জয়ে হাতে-কলমে অনুপস্থিত জ্বালা আজ জুড়োবেন। সে পণে উমর গুলের এক ওভারেই এলো চৌদ্দ রান। নিজের শেষ ওভারে ছোবল মেরে মাশরাফিকে তুলে নিলেন অবোধ্য আজমলই। সমীকরন দাঁড়ালো দুই ওভারে ১৯ এ।

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আর রাজ্জাক কেবল এক-দুই এর খেলাতেই এই প্রয়োজন নিয়ে এলেন ২ বলে চার রানে। শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম তখন অবর্ণনীয়। কেউ কাঁদছেন, কেউ প্রার্থনা করছেন, কেউ পাগলের মতন চ্যাঁচাচ্ছেন। এ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য !! এতোটা একতাবদ্ধ থেকে, এতোটা আবেগ শেষ কবে বুকে বুকে ধরেছিলো পদ্মার এই পলিদ্বীপের মানুষ ??

আইজাজ চিমাকে ফাইন লেগের উপর দিয়ে ওড়াতে গিয়ে বোল্ড হলেন রাজ্জাক। শেষ বলে এক রান তুলে পরাজয়ের ব্যবধান দুই রানে নামালেন শাহাদাত। এশিয়া কাপের এবারের বিজয়ী দলের নাম পাকিস্তান লেখা হলো।

সঞ্জয় খানের বহুল জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল ‘সোর্ড অফ টিপু সুলতান’ এর শেষ দৃশ্যে মনে আছে, একলা টিপু দাঁড়িয়ে আছেন মহীশুরের দূর্গের শেষ রক্ষাকর্তা হিসেবে, তার বিশাল তলোয়ারের আওতায় না এসেই তাকে বুলেট ছুঁড়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে সাধারণ ইংরেজ সৈনিকেরা।

মাহমুদ্দুলাহকে মনে হলো টিপু সুলতান রুপী বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রতীক। ব্যাটে ভর দিয়ে হাটুঁ গেড়ে বসে পড়েছেন পিচের উপরেই। টিভি ক্যামেরায় নীরবে ধরা পরছেন কাঁদতে থাকা নাসির হোসেন। অঝোরে কাঁদছেন অধিনায়ক স্বয়ং। ডেভিড এটেনবরো জানি না জানেন কী না, বাঘেরাও কাঁদে।

রাশভারী আব্বা বলছেন- ছেলেরা দারুণ খেলেছে। ক্রিকেট না বোঝা আম্মা তাকিয়ে আছেন শুণ্য দৃষ্টিতে। ছোটবোন কাঁদছে সশব্দে।

কাঁদছে পুরো বাংলাদেশ।

অথচ আজ তো কাঁদার কথা নয়। ১৬ কোটি মানুষকে নীরব অথচ একাত্ম করে দেয়া ছেলেদের কি কান্না শোভা পায় ??

আজ তোমরা পরাজিত নও টাইগাররা। আজ তোমরা জয়ীই। আজ থেকে বিশ্বের কোন মাঠেই তোমরা ‘অর্ডিনারী’ নও, আজ থেকে এই মহাদেশে ঘোষণা দিয়ে আবির্ভুত হলো আরেকটি ক্রিকেট পরাশক্তি।

ইংরেজ সেনারা অপরিচিত সেই বীরের মৃতদেহের সামনে গিয়ে তার তলোয়ারের খোদাই করা বাঘের মুখ দেখে অনুধাবন করেছিলো, তিনিই টিপু সুলতান। অস্ফুটে একজন বললো,’ তিনি তো বাঘই ছিলেন !’

আজ থেকে বহু বহু বছর পর যখন লাল-সবুজের এগারোটা জার্সি ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করবে, তখন হয়ত কোন ক্রিকেট ঐতিহাসিক লিখতে বসবেন সর্বজয়ী সেই দলের ইতিহাস। তিনি দেখবেন ২০১২ সালের ২২শে মার্চের দিনটি সেই ক্রিকেট পাগল জাতির ইতিহাসে খুব উজ্জ্বল হয়ে লেখা। তিনি অবাক হবেন।

আজকের ১৬০ মিলিয়ন বাংলাদেশীর একজনও যদি জীবিত থাকেন সেইদিন, তিনি সেই অনামা লেখককে জানাবেন- অবাক হবার কিছু নেই।

‘ওরা তো বাঘই ছিলো।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন