শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

বেলায়েভের প্রথম

 ১।

সমস্ত কিছুর শুরু একটা ফেসবুক গ্রুপ থেকে।

সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুক এখন অবধারিত ভাবে জুড়ে আছে আমাদের দিনযাপনের একটা দীর্ঘ সময়। গলাগলি থেকে গালাগালির, ভাবনার থেকে দুর্ভাবনার বিষয় যোগানোতে ক্লান্তি নেই ওটার। চমৎকার একটা সিনেমা দেখে সেটা বন্ধুদের জানিয়ে দিচ্ছে কেউ, কেউ শেয়ার দিচ্ছে এলক্লাসিকোর হাইলাইটস্‌।

এতো এতো চোখ ধাঁধানো পোস্ট-স্ট্যাটাসের ভীড়েও নিয়ম করেই ফেসবুকে লগিন করেই আমরা কয়েকজন চলে যাই একটা গ্রুপে, ‘বইপড়ুয়া’।


এই গ্রুপের শুরুটা আমাদের ক’জন বন্ধুদের মাধ্যমেই। ইচ্ছে ছিলো সেখানে আমরা জানাবো সদ্য পাঠিত বইটা সম্পর্কে আমাদের মত, জেনে নেবো অমুক লেখকের এই বইটা পড়ে কে মুগ্ধ হয়েছেন, কোন বইটা না পড়লে একদমই চলবে না। এভাবেই চলতে থাকে। আস্তে আস্তে গ্রুপ সদস্যেরা গ্রুপে যোগ করতে থাকেন তাদের পরিচিত অন্যান্য পড়ুয়াদের, জমে উঠতে থাকে আলোচনা, থ্রেডের দৈর্ঘ্য বৃহত্তর হতে থাকে, বড় হয়ে ওঠে পরিবার।

আমরা দেখি, বইপড়ুয়ারা একেকজন কী চমৎকার মানুষ !! বয়েসের ভেদাভেদ নেই, ধর্ম-জাতের খোঁচাখুঁচি নেই। শুধু মাত্র ‘আউট’ বই পড়ার মতো এতো নগণ্য একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে এতো দারুণ একের পর এক আলোচনা যে জমতে পারে, সে বড় আশ্চর্যের কথা। চট্টলার পড়ুয়া জানান দিচ্ছেন নারায়ন গাঙ্গুলীর বল্টুদার ফাঁপরবাজির খবর, ক্যারোলিনার জীবনানন্দ অন্তঃপ্রাণ মানুষটি বলছেন আবদুল মান্নান সৈয়দের কাব্য নিয়ে। বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তা হতে তারেক অণু কিংবা বাংলাবাজার হতে নজরুল ভাই জানাচ্ছেন সদ্যপ্রাপ্ত ছাই উড়িয়ে পাওয়া সেকেন্ডহ্যান্ড রত্নটির সংবাদ।

আর রঙ্গরসে গ্রুপ সদস্যেরা একেকজন মুজতবা আলী। শঙ্কু নিয়ে কুইজ ধরা হচ্ছে আকছার, কাশেম বিন আবুবাকারের ক্লাসিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে অহরহ, হ্যারল্ড পিন্টার থেকে হ্যারল্ড রবিন্সেরও নিস্তার নেই।

সে এক গ্রুপ আছে, কেবলই লাবণ্য ধরে।

২।

সেবা প্রকাশনীর হার্ড কভারের ‘রবিন হুড’ বইটার কথা জীবনে ভোলা সম্ভব হবে না আমার। উইলো কাঠের বিশাল ধনুকের রবিন হুড, উইল স্কারলেট-লিটল জন- সুন্দরী মেরি এনের রবিনহুড। এই বই প্রথম কাঁদিয়েছিলো আমায়।

বই পড়ে কাঁদার ঘটনা এরপরে আরো দু’বার। কেঁদেছিলাম মু-জা-ই স্যারের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ পড়ে, আর সবশেষে আলেক্সান্ডার বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’ পড়ে।

সেই শিঙ্গে বাজানো দরিয়ার দানো, লোভী পেদ্রো জুরিতা, অনিন্দ্যসুন্দরী গুত্তিয়েরে আর হতভাগ্য ইকথিয়ান্ডারের গল্পটা। সোভিয়েত জুলভার্ন বেলায়েভ মুগ্ধ করেছিলেন এরপরেও, তার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘হৈটি টৈটি’ তে। এ গল্পের বিষয়ও অনেকটা সেই উভচর মানুষের মতো অঙ্গ সংস্থাপনের, হাতির দেহে বসানো হবে মানুষের মস্তিষ্ক !! আক্ষেপের বিষয়, বেলায়েভ বাংলা পাঠকদের কাছে রয়ে গেছেন এক বইয়ের লেখক হিসেবেই, তার অন্য কোন বই বাংলা ভাষায় পাঠকের পড়ার ভাগ্য হয়নি মোটেই।

বইপড়ুয়া গ্রুপের সাথে হঠাৎ করেই যোগাযোগটা হয়ে গেলো সেই বেলায়েভের।

জানা গেলো, বইপড়ুয়া ফেসবুক গ্রুপ আত্মপ্রকাশ করেছে ‘বইপড়ুয়া প্রকাশনী’। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং বাংলা ভাষার প্রচুর প্রথম শ্রেণীর পাঠকের এই সম্মিলনটাকে বছরে অন্ততঃ একটা ভালো সাহিত্যের সাথে পরিচয় করাতেই। এই প্রকাশনীর সকল সমস্যার সমাধান এসেছে বইপড়ুয়াদের মাঝ থেকেই। লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক ইত্যাদি ইত্যাদি...

‘বইপড়ুয়া’ প্রকাশনীর প্রথম প্রকাশ আলেক্সান্ডার বেলায়েভের প্রথম উপন্যাস ‘প্রফেসর ডয়েলের মস্তক’, অদিতি কবিরের অনুবাদে পড়ে ফেললাম আজ।

৩।

‘প্রফেসর ডয়েলের মস্তক’-কে বৈজ্ঞানিক কল্পগল্পের আওতাতেই ফেলে দেয়া যায়। একটু মনোযোগী পাঠক হলে এই উপন্যাসের সাথে মিল খুঁজে পাবেন এইচ জি ওয়েলসের সেই ডাঃ মরোর ভয়াল দ্বীপের, কিছু লঘুস্বরে সত্যজিতের প্রফেসর হিজিবিজবিজ। সেই পুরোনো প্লট- এর শরীর কেটে ওর শরীরে লাগিয়ে দেয়া।

গল্পের শুরু হয় প্রফেসর কার্ণের অধীনে সুন্দরী ডাক্তার মারি লঁরোর চাকরি গ্রহণ দিয়ে। লঁরো অচিরেই আবিষ্কার করে, স্বনামধন্য সার্জন প্রফেসর কার্ণের স্টাডির ওই কাটা মুন্ডুটা কার্ণের ভূতপূর্ব গুরু প্রফেসর ডয়েলের। প্রফেসর ডয়েলের এই অসামান্য আবিষ্কারকে নিজের করে নিতে নোংরা চাল চালছে প্রফেসর কার্ন।

প্রফেসর কার্ণের অমানবিক পরীক্ষার পরবর্তী শিকার হয় টমাস নামের এক শ্রমিক আর ব্রিজিত নামের এক সাধারণ গায়িকা। প্রফেসরে ডয়েলের প্রত্যক্ষ সাহায্যে ব্রিজিতের কাটা মাথা জোড়া লাগানো হয় দুর্ঘটনায় নিহত স্বনামখ্যাত গায়িকা এঞ্জেলিকা গাই’য়ের সাথে।

পরিস্থিতি বাঁক নেয় তখনই, যখন চঞ্চল ব্রিজিত তার এই জোড়া লাগানো দেহ নিয়ে পালিয়ে যায় কার্ণের পরীক্ষাগার হতে। নিজের চুরি ঢাকতে মারি লঁরোকে এক দুর্গম পাগলা-গারদে আটকে দেয় কার্ণ। এদিকে পলাতক ব্রিজিতের সাথে দেখা হয়ে যায় প্রফেসর ডয়েলের পুত্র আর্থার ডয়েল ও তার বন্ধু আরমঁ লাঁরে’র। ঘটনা ঘটতে থাকে দ্রুত...

৪।

সংক্ষেপে এই হলো ‘প্রফেসর ডয়েলের মস্তক’ এর ঘটনা।

পড়তে গিয়ে আটকে যাইনি কোথাও, তবে বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’ এর সাথে তুলনা করে হতাশ হয়েছি কিছুটা। কিন্তু এই আক্ষেপ নিরর্থক জানি, কারণ ‘প্রফেসর ডয়েলের মস্তক’ বেলায়েভের প্রথম উপন্যাস। এই রচনার সময়কাল (১৯২৫) রাখলেও এই উপন্যাসকে মানতে হয়ে অত্যন্ত আধুনিক বলে। এই সামান্য তুলনাটা বাদ দিলে রীতিমতো উপভোগ্য এই উপন্যাস।

অনুবাদ বেশ ঝরঝরে। অদিতি কবির- বইপড়ুয়া গ্রুপের সবার প্রিয় খেয়াদি- স্বল্প সময়ে এই অনুবাদের জন্যে ধন্যবাদার্হ, অনুবাদের সাথে প্রয়োজনে বিভিন্ন টীকা যোগ করে দেয়াটা বইটিকে করে তুলেছে আরো আকর্ষণীয়। বহুবছর ধরে অনুবাদ করলেও এটি বেলায়েভের মতো তারও প্রথম গ্রন্থ।

সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন হিল্লোল দত্ত, প্রচ্ছদ করেছেন নজরুল ইসলাম। বইটির জন্যে চমৎকার একটি মুখবন্ধ লিখেছেন রাদুগা-প্রগতির স্বনামখ্যাত অনুবাদক দ্বিজেন শর্মা। বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৫০ টাকার এই উপন্যাসটি কমিশন সহ ১৯০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে একুশে বইমেলার লিটল ম্যাগ চত্বরের ‘সুনৃত’ স্টলে। এবং ‘পাঠসূত্র’তে।

৫।

ঘন্টা দু’য়েক ব্যয় করে প্রফেসরের মুন্ডু কাহিনী পড়তে খারাপ লাগে নি আমার, বেলায়েভের সাথে পরিচিত পাঠকদেরও খারাপ লাগার প্রশ্ন আসে না।

ফি বছর একটা করে ‘উভচর মানুষ’এর তুল্য সাইফাই প্রসব করা এমন কি বেলায়েভের পক্ষেও কঠিন কাজ। কিন্তু যারা আলোড়িত হয়েছিলেন সেই দরিয়ার দানোর কাহিনী পড়ে, প্রেমে পড়েছিলেন গুত্তিয়েরের, সাগর পারে দাঁড়িয়ে বুড়ো বালথাজারের সাথে চীৎকার করে বলেছিলেন ‘ইকথিয়ান্ডার, ফিরে আয় ব্যাটা আমার !!’; তাদের জন্যে বলছি- পড়লে হতাশ হবেন না।

সোভিয়েতের জুলভার্ন আলেক্সান্ডার বেলায়েভ, হতাশ করেন না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন