মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারী, ২০১২

দারুচিনি দ্বীপ আর আমরা

আজ রাতে আমাদের গলা খুলে গান গাইতে গাইতে ভলভো বাসে উঠবার কথা ছিলো, গন্তব্য সেই সেন্ট-মার্টিন, হুমায়ূন আহমেদের দারুচিনি দ্বীপ। আমরা আশা করেছিলাম দারুচিনি দ্বীপ উপন্যাসের শেষ দৃশ্যের মতই অত্যন্ত নাটকীয় পরিস্থিতি দেখা দেবে আজ রাতে। আমাদের বার্মা হয়ে উঠবে উপন্যাসের বল্টু চরিত্রটি- শেষ মুহুর্তে দৌড়ে বাসে উঠতে হবে তাকে। বার্মাকে নিয়ে মজা করতে তাকে বাসে উঠানোর ব্যাপারে আমরা ব্যাপক গড়িমসি করবো, শেষমেষ নিতান্ত অনিচ্ছায় তাকে বাসে উঠতে দেবো। এরপর অম্লান গান ধরবে। তার অটিস্টিক আর্টিস্টিক গলা শুনে গালিগালাজ করতে করতে আমরা ভলভোর আরামদায়ক গদীতে হেলান দিয়ে উত্তুরে বাতাস খাবো। মিথ্যা ভাবালুতায় আক্রান্ত হয়ে বলবো- নাহ, জীবন তো খুব একটা মন্দ না !!


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে রঙিন অংশ যেটা, সেই র‍্যাগ অনুষ্ঠানের পরে এরকম একটা দারুচিনি দ্বীপ সফরে যাবার ইচ্ছে আমাদের ছিলো। এরকম ইচ্ছে ছিলো আরো অনেক বন্ধুর। কেউ যেতো সুন্দরবন, কেউ কক্স সাহেবের বাজার, কেউ একটু দূরের দীঘা কি দার্জিলিং। আমাদের ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি আজরাতে।

কারণ আমাদের সাথী ঈশানের উপর এসেছিলো একটি বর্বর আক্রমণ। ব্লগে-ফেসবুকে-ফোনে-মুখে সবাই জেনে গেছে এতোদিনে, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রোশ আর অস্ত্রের শক্তি কতটা টেনে নামায় কাউকে।

এই ঘটনার পরেই বুকে শুধু আশা আর সাহস নিয়েই ক্যাম্পাসে নেমে পড়েছে বুয়েটিয়ানেরা। একত্রিত হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে। কেউ তাদের কানে মন্ত্র দেয়নি, কেউ তাদের পেছনে অস্ত্র ধরেনি, কেউ তাদের দেয়নি সাহায্যের কোন নিশ্চিত আশ্বাস। কিন্তু রবোনগরী গল্পের সেই ক্যাপসুলের মানুষটির মতই মানুষের উপরেই বিশ্বাস রেখে গেছে বুয়েটের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। গান গেয়েছে, করেছে মিছিল।

ভাসমান এই মিছিলের অগণিত মুখের মাঝে ক্ষুদ্র,অকিঞ্চিৎ আমাদের ঘুরে বেড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছে। অবাক হয়ে আমরা দেখেছি কী অসাধারণ শৃঙ্খলা আর একতার পরিচয় দিয়েছে ছেলেমেয়েরা। কোন গোলমাল নেই, কোন অসহিষ্ণুতা নেই। আমরা দেখেছি এমনকি তীব্র শীতের বাতাসে সারিবেঁধে মেয়েরা বসে আছে রেজিস্টার ভবনের করিডোরে, আমরা দেখেছি রাত জেগে ফটক আগলে রেখে ক্যাম্পফায়ার করেছে ছেলেরা।

সময়ের সাথে সাথে বেড়ে যাবার কথা অনিশ্চয়তা। কিন্তু ক্যাফেতে চলেছে হরদম টুয়েন্টিনাইন, রাত চারটায় ছেলেদের দেখেছি ক্যাফের প্রাঙ্গনে ফুটবলে লাথি মারতে, বুয়েটের বিশাল অডিটোরিয়ামের মঞ্চে সারি বেঁধে ঘুমিয়ে পড়েছে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেয়া ক্লান্ত ছাত্রের দল। কী অদ্ভূত, কী অবিশ্বাস্য !!

নববর্ষের রাতে লোকজনে কত আনন্দ করে। পটকা ফুটায়, প্রমোদ ভ্রমণে যায়, রাতজাগা পার্টিতে গান শুনে নাচে। আর বুয়েটের বেকুব পোলাপান নববর্ষ উদযাপন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে জাগরণের গান গেয়ে। নতুন বছরের সূর্য উঠেছে, নতুন আশা নিয়ে।

সকল কাঁটা ধন্য করে রায় এসেছে, অভিযুক্তরা শাস্তি পেয়েছে। বুয়েটের শিক্ষকদের স্যালুট !! স্যার, আপনারা সাধারণ ছাত্রদের জানান দিলেন এখনো কেবল আপনারা আছেন বলেই বুয়েট অনন্য আছে, কেবল আপনারা আছেন বলেই আমরা আশ্বস্ত হতে পারি- এটি দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসনেই আছে !! আপনাদের প্রতি সাধারণ ছাত্রেরা আস্থা হারায়নি কখনো, কখনো হারাবেও না।

মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিলো চৌরিচৌরা গ্রামবাসীদের আকস্মিক হঠকারিতায়। কিন্তু কই, বুয়েটের একটা কাঁচও তো ভাঙ্গেনি কোথাও !! গান্ধীর আদলে মুন্না ভায়ের মতোই হাসিমুখে গান-কবিতা-কার্ড চলেছে সমানে, কিন্তু ঘূর্ণাক্ষরেও বুয়েটের ছেলেপিলেরা একবারের জন্যেও অসহিষ্ণু হয়নি, গায়ের জোরও দেখায়নি।

হাসিমুখে একাকার প্রতিটা মুখের দিকে তাকিয়ে, প্রতিটি গর্বিত ফেসবুক স্ট্যটাস প্রত্যক্ষ করে, শান্তিপূর্ণ অবস্থানের প্রতিটা টুকরো ছবির দিকে তাকিয়ে আজ আমাদের বড় ভালো লাগে।

দারুচিনি দ্বীপ, তুমি মুড়ি খাও। আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থনে এই অনন্যসাধারণ তিনটি দিনকে আলো করে রাখা প্রতিটি বুয়েটিয়ান নাও টুপি খোলা কুর্ণিশ !!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন