মঙ্গলবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১১

ক্যানভাস

মাসুদ রানা, এলান কোয়ার্টারমেইন আর ঘনাদার কবলে আটকে যাওয়া ঘরের কোণার বুকশেলফ। মলাট উড়ে যাওয়া এরফান জেসাপ আর নীলক্ষেতের সেকেন্ডহ্যান্ড ইকথিয়ান্ডারও ভীষণ প্রিয়- ফেলে দেয়া হয়নি। তালিকা আরো দীর্ঘ করে দিচ্ছে ডিভিডিগুলো। হলনিবাসী আর অন্যান্য বন্ধুদের কাছ থেকে রাইট করে আনানো প্রিয় সিনেমাদের ফরমায়েশী ভল্যুমগুলোও পাশেই রয়েছে। বুকশেলফ তাই জনঘনত্বে সূত্রাপুর থানা ধরে ফেলেছে প্রায়। ঠাসাঠাসি করেও সেখানে জায়গা পায়নি বলে ভীষণ রকম অগোছালো ঘরের যত্রতত্র অন্যান্য বই। শোবার খাটের কোণে, জানালার পাশে, কম্পিউটার টেবিলের উপরে। অতএব ক্লাস এইটের স্বভাব পড়ুয়া মামাতো ভাইটির জন্যে বই বাছাই করে বুকশেলফে জায়গা করতে করতে আম্মাকে বলি যে আরেকটা বুকশেলফ দরকার- বইয়ের সংগ্রহ বড় হয়ে গেছে। ঘর গোছাতে বিরক্ত আম্মা অন্যমনষ্ক স্বরে কেবল বলেন, “ তুমিও তো বড় হয়ে গেছো।”

আমি থেমে যাই কথাটা শুনে।


‘বড়’ মানুষের সংজ্ঞা বোধহয় দিনে দিনে পালটায়। ক্লাস টু’তে পড়বার সময় কলোনীর নাইন-টেন পড়ুয়া মন্টি ভাইদেরকেই মনে হতো অনেক বড়, ক্লাস সিক্সে পড়বার সময় নিউজিল্যান্ডের মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান রজার টুজের অনুকরণে দাঁড়ি রাখা নাম ভুলে যাওয়া ভাইয়াটাকেই বড় মনে হয়। নটরডেমের করিডোরে সাইন্স ক্লাবের ভাইদের বড়ত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকে না।

অথচ, হঠাৎ করেই- আম্মার একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়েই আবিষ্কার করি- দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাটা পালটে গেছে কখন যেন। আমি কিংবা আমরা, হয়ে গেছি নিজে না হয়ে অন্য আরেকজন- যাকে সবসময় সুদূরের কেউ জেনে এসেছি। কারো চোখে আমরাও নিশ্চয়ই শুধু একজন মন্টি ভাই।

জীবনে কী হবো ঠিক করেছি অনেকবার। ম্যাকগাইভার- ম্যানড্রেক-সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট থেকে শুরু করে স্টীভ ওয়াহ পর্যন্ত দীর্ঘ সে তালিকা। সমস্যার জায়গাটা অন্যত্র। উচ্চ মাধ্যমিকের পরে এমন কোন বিশ্ববিদ্যালয় এ পোড়ার দেশে খুঁজে পাওয়া গেলো না- যেখানে শেখানো হয় মাসুদ রানার মতো মাতাল প্রেম করে বেড়ানো কিংবা স্টীভ ওয়াহর মতো লাগাতার কারিশম্যাটিক গালাগাল দিয়ে যাওয়া। কাজেই আর দশজনের মতোই, একসময় আবিষ্কার করলাম কান চুলকে-‘এবিসি একটি ত্রিভুজ, বি উহার কেন্দ্রবিন্দু’ মুখস্থ করে- কলম কামড়ে পরীক্ষা দিয়ে আমিও হয়ে গেছি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমাধারী একজন ছাত্র।

প্রথম বছর কেটে গেলো ওএবি চিনে নিয়ে পলাশীর কায়দা রপ্ত করতেই। ফটোকপি রাখতে হয় সেলিম মামার দোকানে আর সুন্দরী মেয়েদের একজনও মেকানিক্যালে পড়ে না।

দ্বিতীয় লেভেলে আমরা সড়গড়, অভিজ্ঞতা ফলানোর সময় ছিলো সেটা। বড় ভাইদের সালাম দিলেও চলেই না শুধু- জুনিয়রদের একটু আট্টু ধমকও দিতে হবে তোমার।

তৃতীয় লেভেল ফাঁকিবাজি আর বিরক্তির। এই সময় ছেলেরা আর্কির পেছনে গমনরত গুটিকয় সৌভাগ্যবানের দিকে তাকিয়ে ফোঁসফোঁস শ্বাস ফেলে। উদাস মনে ল্যাব রিপোর্ট কপি করতে করতে ভাবে- চারদিকের এই অসহিষ্ণু পরিবেশে পলাশী যেন ইবনে বতুতার ধনসম্পদপূর্ণ নরকের এক ক্ষুদ্রাকার সংস্করণ বিশেষ। বাজে, একদমই বাজে জায়গা এটা- সন্দেহ থাকে না কারোই।

এখন, এই চতুর্থ বর্ষের শেষে এসে কথা ছিলো আমাদের সম্ভাব্য মুক্তি উপলক্ষে আনন্দিত হবার। কেষ্টা বা নন্টের সাথে বিড়ি ফুঁকে শেষের অপেক্ষা করার। ক্যাফের সামনে ক্রিকেট খেলতে খেলতে দিন গোণার। অজ্ঞাত কোন কারণে সেটা হচ্ছে না কেনো জানি। শুধু মনে হচ্ছে; আর মাত্র পাঁচটা পরীক্ষার পর- হাতের আঙুলে গুণে এক থেকে পাঁচ- মাত্র পাঁচটা পরীক্ষার পরে আমরাও বড়ভাই হয়ে যাবো। চলে যেতে হবে এই হতকুচ্ছিত ক্যাম্পাস ছেড়ে।

... পলাশীর এই ক্যাম্পাসে এসেছিলাম শুধু একটা রোলনাম্বার নিয়ে। ঋনী হয়ে যাওয়ার সময় সাথে কিন্তু নিয়ে যাচ্ছি অনেক কিছু। বিখাউজ একগাদা ইঞ্জিনিয়ারিং বই, কারণে-অকারণে পাওয়া টিশার্টগুচ্ছ, বড়সড় একটা ফেসবুক বন্ধু তালিকা। সাথে যাচ্ছে অনেক অনেক গল্প। বুঝে-না বুঝে ইঁদুর দৌড়ের রিপোর্ট লেখার গল্প, ভালোবাসা পাওয়ার আর বন্ধু হারানোর গল্প, সিনেমা দেখা রাত বা ফুটবল দিনের গল্প। কোন বিচিত্র কারণে প্রত্যেকের গল্পের মাঝেই আশ্চর্য সমাপতন আছে বলে মনে হয়, গল্পের পাত্রদের নাম বদলে যায় কেবল।

আমরা সবাই নিয়মিত ক্লাস করতাম। অন্ততঃ প্রথম দুই সপ্তাহ তো বটেই!! ওএবির বিশাল বিশাল টানা বেঞ্চগুলোতে গাদাগাদি করে বসতো সবাই, একমনে লেকচার তুলতো। অদ্ভূত ছিলো দিনগুলো। খাচ্চর ফয়েজী কবিতা লিখে আনতো, ক্লাসে ঢুঁকে পড়া বেড়াল নিয়ে বেশ রসালো মন্তব্য আসতো পেছনের বেঞ্চি থেকে, টুয়েন্টি নাইনের ‘রং কি’ ‘চলে!’- চলেফিরে বেড়াতো সবার মুখে। এমনকি ইফতিও টিচার হতে চাইতো সে সময়। যে সব বিশ্রী রসিকতা করে আজকাল সে আমাদের হাসানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে- তার চাইতে এই রসিকতাটা অনেক তীব্রই ছিলো আসলে- আমরা বুঝিনি তখন। ঐ চোদ্দো দিনের পরেই অবশ্য বুঝে যায় সবাই, সবার দ্বারা সব হবার নয়। এরপরের চারবছর তাই একদল নিয়মিত মুখ গুঁজে কান খাড়া করে নানা কালিতে লেকচার তুলে গিয়েছে, আরেকদল পরীক্ষার আগের রাতে পলাশী হতে ফটোকপি করে সেই জ্ঞানসাগরের নুড়ি কুড়িয়ে গিয়েছে। শ্রম বিভাজনের আদর্শ নমুনা। এর মাঝে চারকালিতে পরীক্ষা দিয়ে গিয়েছে কুলীন সম্প্রদায়- আড়চোখে দেখবার অসুবিধার সংকেত এসেছে গগণবিদারী কাশির আওয়াজে। দিনে দিনে শুণ্য বেড়েছে ক্লাসটেস্টের প্রাপ্ত নাম্বারে, এসেছে অভ্যস্ততা। আমরা ঘৃণা করতাম ক্লাস, আর ভালোবাসতাম ক্লাস করতে আসাটা।

আমরা আর ক্লাস করবো না।

ভালোমানুষ স্যারগুলোকে কম জ্বালাই নি আমরা। ভুলোমনা অঙ্কের স্যারটা ক্লাস নেবার সময় পেছনের বেঞ্চের ছেলেরা মমতাজের গানের তালে নেচে নেচে ইউটিউবে ভিডিও আপলোডিয়ে দিয়েছে, স্যার নিশ্চুপ ছিলেন। এমনকি দুর্ধর্ষ আশিক স্যারের ক্লাসেও সুযোগ পেলেই ফাস্ট বেঞ্চে একটু ঝিমিয়ে নিয়েছে বার্মা আর হাঁ করে ঘুমানো মুখ থেকে লালা ঝরিয়ে নিয়েছে রাণিক্ষেত- স্যার ভালোবাসায় নীরব থেকেছেন। দেখাদেখির ক্লাসটেস্টে টুকলির দায়ে মিশুর খাতা কেড়ে নেয়া হয়েছে, ক্ষমাপ্রার্থী মিশুর পেতে দেয়া হাতের তেলোয় গুটিগুটি করে লেখা সূত্র দেখে আঁতকে উঠেছি আমরা- ম্যাডাম পরম ক্ষমাশীল। খাতা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্লাস পালানোর ছুতো খুঁজে বের করা হয়েছে অভিনব ভাবে। ও পজিটিভ রক্তের সন্ধানে অনুসন্ধানী হয়ে স্যারকে মানবিক আবেদন জানিয়েছে ছেলেরা, বার্ড ফ্লু আক্রান্ত হয়ে ক্লাস করতে পারেনি **** (নাম উহ্য রাখলাম, এই টার্মেও এই পদ্ধতি প্রয়োগের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।)। নিত্য ছল খোঁজায় ক্লান্ত হয়ে পড়লে সরাসরি ক্লাস পালাও। স্যার পেছনে ফেরা মাত্র উধাও হয়ে গিয়েছে শেষ তিন বেঞ্চ। হুঁ হুঁ বাবা, পড়ালেখা সহজ ব্যাপার নয়।

আমরা ভালো হয়ে যাবো এবার, স্যারদের আর জ্বালাবো না।

প্র্যাকটিকালের কতশত ঘটনা!! বুয়েটে ক্লাস শুরুর ২০ মিনিটের মাথায় জ্ঞান হারালো মোস্তাফিজ আর নগদে চলে এলো স্প্রাইট। আমাদের আক্ষেপ, আহা- একটু চেষ্টা করলে আমরাও তো পেতে পারতাম ওটা।... প্র্যাকটিকালের নায়ক ছিলো আবার শাফি। মেকানিক্যাল ড্রয়িং থেকে প্রোগ্রামিং এর সমস্যা, ফ্লুয়িড থেকে হিটল্যাব- মামার তুলনা মামা নিজেই। ... খুব ভয়াবহ ছিলো সেশনালের কুইজগুলো। পিতার উচ্চতা ও মাতার রক্তের গ্রুপ দিয়ে পুত্রের টেনসাইল স্ট্রেংথ বের করবার প্রক্রিয়াগুলো বড় সহজ হবার কথা নয়। আর বোর্ড ভাইভা থাকলে তো হলোই। গিয়েই মুখে স্কচটেপ দিয়ে দিতাম, স্যারেরা সুখ মিটিয়ে নিতেন। কাজটা আসলে সহজ। সিজিপিএর কারণে আজকাল তিনের বেশি গুণতেই পারি না, এরপর কতগুলো প্রশ্ন এলো- তার হিসেব তো না রাখলেও চলে।... আর স্মরণীয় সংলাপের অভাব তো কোনকালেই ছিলো না। ক্রিস্টাল কনসেপ্টের জানে আলম জানিয়ে দেবে ল্যাব ইন্সট্রাকটরকে ‘আপনি স্যার থিওরীটা ঠিকমতো বুঝতে পারতেসেন না।’, ড্রয়িং রিপিটের R-কে রাইট ভেবে আনন্দে উদ্বেলিত হবে ফারুক, আর এমন কি স্ক্যামেটিক ডায়াগ্রাম ফটোকপি করে দিয়ে দেয়া কবিরকে স্যার বলবেন, ‘বাবা, তোমার কি পড়ালেখা করার একটুও সময় নাই ??’

বাঁশ খেয়ে পাণ্ডা বনে যাবার সেশনাল কুইজগুলোর দিন শেষ এখন।

আমাদের একটা ফুটবল দল ছিলো।... সেই অস্থিরতার ১-১ এ যেদিন হঠাৎ পাওয়া ছুটি এসেছিলো মালেক স্যার অঙ্কের খাতা খুলে না বসায় আর একদল লক্ষীছাড়া, ঘাড়ত্যাড়া, ত্যাঁদড় ছেলের দল বেরিয়ে পড়েছিলো ছুটে বেড়ানোর সন্ধানে; সেই দিন শুরু হয়েছিলো এই ফুটবল দলের। দল দাঁড়াতে সময় লাগে না। বাম উইঙে সৌরভের দুর্দান্ত গতি আর মাঝমাঠের জাদুকর শাহীনকে কেন্দ্র করে থাকে শোয়েন্সটাইগার মারুফ, সুযোগসন্ধানী জয়নুল আর স্কোরার দিপ। তিহানটা চিরটাকাল প্রতিশ্রুতিশীল স্ট্রাইকারই থেকে গেলো, ফাঁকা পোস্টে গোল মিস করাও যে একটা শিল্প হতে পারে- সেটা এ ব্যাটাকে না দেখলে বোঝাই যায় না!! ...আর খেলা যাদের সাথেই হোক না কেন, সবসময় পাশে থেকে চ্যাঁচিয়ে যায় বন্ধুরা। বড় ভাই হোক, ছোট পোলাপান, ব্যাচমেট- স্লেজিং কাকে বলে তা চেনাতে এই সমর্থক বন্ধুরা কাউকেই ছাড় দেয় না। আমাদের ভালোবাসার ‘মেকা সকারুজ’ আসলে কোন ফুটবল দল ছিলো না, ছিলো আমাদের সব থেকে আবেগের জায়গা; আমাদের পরিবার।

মেকা সকারুজের জার্সি পড়ে আমাদের আর মাঠে নামা হবে না। এই র‍্যাগ ফুটবল ফুরিয়ে গেলেই।

আমাদের নিজেদের একটা কফি হাউজ ছিলো। সেখানে কফি ছিলো না অবশ্য, বরং ছিলো একে অপরকে ল্যাং মারা। ০৬’ কর্ণার নাম দিয়েছিলাম আমরা এই কফিহীন কফি হাউজের। ক্লাস হচ্ছে না- বাং মেরেছি-ল্যাবের শেষ-টার্ম ফাইনালের প্রশ্ন কঠিন; আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল ঐ অডিটোরিয়ামের সামনের কোণাটুকুই। গুগল মেরে খেলার ফলাফল জানা নাহিয়ান এখানেই বলবে কালকে মেসি কীরকম দুর্ধর্ষ পাস দিয়েছে, সৌরভের অনুযোগ থাকবে কে কেন কীভাবে ‘ল্যালায়া পড়ে’, জিয়ার নিচু গলার স্বরে থরথর কেঁপে উঠবে অডিটোরিয়ামের দরজাটা আর মোস্তাকিম জানাবে গতকাল ফেসবুক মডারেশন করবার সময় সে অমুককে কীরকম লেগস্পিনমূলক মন্তব্য দিয়েছে। আহা, কাজ করতে করতে মারাই যাবে ছেলেটা!

আড্ডা দেয়ার মতো ফালতু কাজে আর সময় নষ্ট করতে হবে না আর।
... ...
... ...
... ...

এইভাবে কত অসংখ্য-অগণিত স্মৃতি। আমার, আমাদের। চরিত্রগুলোর নাম পালটে দিলে সেটা গণ্ডী পেরিয়ে সবার গল্প হয়ে যায়। র‍্যাগ কর্ণারে আজকাল আনাগোণায় এতদিনের চেনা ক্যাম্পাসের অচেনা বন্ধুরাও কখন যেন হয়ে গেছে আমাদেরই অংশ। বিস্মিত না হয়েই দেখি, আমাদের গল্প আর ওদের গল্পগুলো কত অভিন্ন আর কতটা আপন। নাচের সময় মিলেমিশে যায় যেমন অম্লান আর মির্জা, মাস্তির আড্ডায় তেমন এক হয়ে যাচ্ছে নাহিয়ান আর তানজিল। দিগন্ত বা দীপ্ত যেমনটা থাকে, সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত মারগুবও তেমন আছে আমাদের সাথে। নামগুলো বদলে যাচ্ছে, আমাদের স্মৃতির রঙ তাতে পাল্টাচ্ছে না।

প্রিয় গায়ক অঞ্জনের একটা চমৎকার গান ছিলো, এক বেহালাওয়ালাকে নিয়ে। ক্লাস নাইনের গভীর রাতের হোমটাস্ক সারবার সময় কানে ওয়াকম্যান গুঁজে যখন শুনতাম- ‘এখন বুঝেছি, সে অদ্ভূত সুরের কী মানে’; বুঝিনি কেন- কিন্তু একটা ভয়াবহ শূণ্যতা ভর করতো বুকের মাঝে। এখন সে সুরের মানে বুঝতে পারি যেন।

বুড়িয়ে যাওয়াটা বড় হওয়া নয় আসলে, বড় হওয়া মানে মানুষের ইচ্ছাবৃত্তের পরিধি ছোট হয়ে যাওয়া।

ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়া ওরা তাই ফোনে ফেসবুকে ব্লগে মুখে আমাদের বলে- এই রঙের স্মৃতিতো থাকে না বেশিক্ষণ। বাস্তবের বাষ্প হয়ে উড়ে যায় খুব দ্রুত। সময়ের চোরাবালিতে ডুবে যায়।

জানে সবাই, চোরাবালি সব কিছু টেনে নিতে চায়। দিল চাহতা হ্যায়’র মতো বন্ধুত্ব সবসময় রঙিন থাকবে না হয়তো। হয়তো আমরাও ভুলে যাব সব। আমরাও ক্যাম্পাস ছেড়ে গিয়ে ফোনে ফেসবুকে ব্লগে মুখে বলে যাবো- মনে নেই। মনে থাকে না।

আমরা ভীত, কারণ বিস্মৃতির চোরাবালি নির্দয় জেনারেল ডায়ারের মতোই অমোঘ। সে গ্রাস করতে চাইবে আমাদের বৃষ্টির ফুটবল, আমাদের পড়ন্ত বিকেলের ক্যাফেটরিয়ার গান। আমাদের দুঃসহ পরীক্ষাদিন, আমাদের চায়ের সাথে ডালপুরি বিকেল, আমাদের রাতজাগা ভাঙ্গা গলার এলক্লাসিকো।

আম্মার কথায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া চশমার কাঁচের আড়ালে চোখ মুছে বুকশেলফের বই গোছাতে গোছাতে আমি তাই ভাবি, টিনটিনের কমিক্সের মতোই রঙিন থেকে যাবে এই স্মৃতিরা। অথবা, রঙিন ক্যানভাসের মতো। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টিলেজেন্সের দুর্ধর্ষ-দুঃসাহসী-নারীলোভী স্পাই মাসুদ রানার মতোই চিরতরুণ থেকে যাবে বন্ধুর মুখ।

মনে মনে আমি ঠিক জানি, চোরাবালি কতখানি দুর্বল বিশাল জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ ক্যানভাসটার রঙের সামনে।

আমি আমি জানি জানি, আমি আমি জানি জানি...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন