শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০১১

একাত্তরের সেনাপতি

সীমান্তের সন্ধ্যা

তারা দুইজন বসে আছেন মুখোমুখি, একটা প্রায় শুকনো খালের উপরের কালভার্টে।

চারপাশ ঘন সবুজ। অশ্বথ আর পিপুল গাছের উঁচু বেষ্টনী চারপাশে, পশ্চিমাকাশের সূর্যের আলো সেটা ভেদ করে ঢুঁকতেও পারছে না ঠিকমত। অসহ্য গরম। এই তপ্ত আবহাওয়ায় ঘন ছায়ার মাঝে বসে থাকলে অবসন্ন লাগাটা স্বাভাবিক। আমীর-উল ইসলামের সেটি লাগছেও।

জায়গাটা সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডের কাছে, জীবননগর, টঙ্গি খাল। সময়টা শেষ বিকাল। দিনটা ৩০ মার্চ, ১৯৭১।


তারা দুইজনে অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করছেন মাহবুব উদ্দীন আর তৌফিক এলাহীর জন্যে। আমীর-উল ইসলাম মনে মনে আরেকবার নিজের সঙ্গীর সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। ভদ্রলোক প্রথমেই সীমান্তের ওপারে সশরীরে না গিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন মাহবুব আর তৌফিক সাহেবকে দিয়ে। বার্তাটি সংক্ষিপ্ত এবং স্পষ্ট।

স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবিসংবাদিত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের দুইজন শীর্ষস্থানীয় নেতা এসেছেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। ভারত সরকার তাদের যথাযোগ্য সামরিক মর্যাদা দিয়ে বরণ করতে সম্মত রয়েছেন কি না।

আমীর-উল ইসলাম বয়েসে তরুণ বলেই যেন একটু বেশিই উত্তেজিত, অযথা চঞ্চল। তার থেকে থেকে মনে পড়ছে যে এখানে রচনা হচ্ছে একটি স্বাধীন জাতির ইতিহাস আর হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার প্রতিটা পাতা অনুভব করছেন তারা দুইজন। এ এক বিরল সৌভাগ্য। মাহবুব আর তৌফিকের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে অভ্যাসবশত আমীর-উল ইসলাম নিজের দাঁড়িতে হাত বোলান। এবং চমকে ওঠেন। পরমুহুর্তেই তার মনে পড়ে যায়, শখের ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি তিনি কেটে ফেলেছেন ঢাকা ত্যাগের সময়েই। নিজের কাছেই নিজে বোকা বনে যাওয়া আমীর-উল ইসলাম  হেসে ফেলেন।

ঠিক সে সময় আমীর-উল ইসলাম  লক্ষ্য করেন, তার সঙ্গীও হাসছেন। নিঃশব্দে।

হতচকিত আমীর-উল ইসলাম প্রশ্ন করেন, ‘ ভাই, আপনি...হাসছেন যে ??’

‘ভাবছি, ’ নিঃশব্দ হাসি মুখে ঝুলিয়েই বলেন তার সঙ্গী, ‘ভাবছি, যে আমি আজ হেরে গেলাম।’

আমীর-উল ইসলাম ঠিক বুঝতে পারেন না কথাটা। ‘ কিন্তু... আপনি এই মুহুর্তে এই কথাটা বলছেন কেন ভাই ?? আমরা তো বিজয়ের পথেই যাচ্ছি...’

তার সঙ্গী হেসে ফেলেন এবারও। বলেন, ‘ঠিক তা না। ... ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান তৈরী হলো- তখন থেকেই আমার ক্লাসের অমুসলিম বন্ধুরা আমায় বলতো, তোদের এই পাকিস্তান টিকবে না। কিন্তু, কী আশ্চর্য দেখেন- আমি না বুঝেই তাদের সাথে তর্ক করতাম তখন। ওদের যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতাম যে কী কী কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্রটা টিকে যেতে পারে...।
অথচ আজকে দেখেন, ওদের কথাটাই কিন্তু ঠিক প্রমাণ হয়ে গেলো। আমি তর্কে হেরে গেলাম শেষতক।... এজন্যেই বললাম, আমি আসলে আজকে যুক্তিতে হেরে যাওয়া একজন মানুষ।’

আমীর-উল ইসলাম কী বলবেন খুঁজে পান না। ২৫শে মার্চের রাতে ঢাকায় কী ঘটেছে, তা তো তারা নিজের চোখেই দেখেছেন। আমীর-উল ইসলামের মাথা আবার ক্রোধে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তারুণ্যের আবেগে তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের নেশায় টগবগ করতে থাকেন তিনি।

অসহনীয় গরমে বসে থাকতে না পেরে একসময় কালভার্টের উপর গা এলিয়ে দেন আমীর-উল ইসলাম। পিঠে যেন ছ্যাঁকা পড়ে যায় প্রথমে। সারাদিনের গরমে তেতে আছে জায়গাটা। তবুও অবসন্ন শরীর ওইটুকু সহ্য করে নিয়ে বিশ্রাম চায়।

আমীর-উল ইসলামের চোখে হালকা ঘুম নেমে আসে। তার সঙ্গী বসে থাকেন একাকী, গভীর চিন্তায় ডুবে থেকে ধ্যানমগ্ন।

সন্ধ্যার খানিক পরেই হঠাৎ বুটের শব্দ। পাশের ঝোপ থেকে মার্চ করে এগিয়ে আসে একদল জওয়ান। সবার পেছনে উঁকিঝুকি দিচ্ছে মাহবুব আর তৌফিকের পরিচিত মুখ।

সামরিক উর্দি পড়া একজনকে কথা বলতে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। এগিয়ে এসে সামরিক উর্দি তাদের দু’জনকে বলে, ‘ স্যার, আমি ক্যাপটেন মহাপাত্র। ইউ আর ওয়েলকাম টু আওয়ার ক্যাম্প।’

পেছনের সৈনিকেরা তলোয়ার উঁচিয়ে ধরে, সশব্দ স্যালুট জানায়। পরিপূর্ণ সামরিক মর্যাদায় স্বাধীন বাংলাদেশের দুই প্রতিনিধি প্রবেশ করেন ভারতে।

অবিলম্বে এসে পৌঁছেন ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের আইজি, গোলোক মজুমদার। তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েন আগত দুই ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি’দের দেখে। জীবনে এমনটা দেখেননি তিনি। এরা আবার কেমন ধারা ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি’ !! খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি মুখে, পরণে ময়লা গেঞ্জি আর লুঙ্গি- যেমনটা কৃষকদের থাকে !!

গোলোক মজুমদার কাজের মানুষ। অনাবশ্যক কথা না বাড়িয়ে দ্রুততার সাথে জীপে তুলে নিলেন তাদের দুইজনকে। জীপ স্টার্ট নিলো। গন্তব্য সেই দমদম।

কৌতূহল দমাতে পারছিলেন না গোলোক মজুমদার। থাকতে না পেরে অবশেষে আরোহীদের দিকে ফিরে তাদের পরিচয় চেয়েই বসলেন তিনি।

-‘আমার নাম আমীর-উল ইসলাম।’, তরুণটি বলেন।

-‘আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একজন প্রতিনিধি মাত্র,’ তরুণের সাথের ছোটোখাটো মানুষটি একগাল হেসে বলেন। ‘ আমার নাম তাজউদ্দীন আহমদ।’

জীপ ছুটে চলেছে দমদমের রাস্তায়। ইতিহাস তখনো জানে না- ইতিহাস জানবে আগামী দুইশত বাষট্টি দিনে- এই ছোটোখাটো মানুষটি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ভেতরের-বাইরের অগণিত শত্রুর সাথে লড়াই করে যাবেন প্রতিনিয়ত, বহুবার স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একক নির্ভুল সিদ্ধান্তে হতাশ করবেন স্বাধীনতার শত্রুদের। বঙ্গবন্ধুর প্রবল ব্যক্তিত্বের আড়ালে চিরকাল অনালোকিত থেকে যাওয়া এই মানুষটিই জাতির সবচেয়ে সংকটের সময়ে নেতৃত্ব দেবেন প্রচারের আড়ালে থেকে।

হয়ে উঠবেন, ৭১’ এর নিঃসঙ্গ সেনাপতি।

ভূট্টোর ভয়

শেষ পর্যন্ত তাজউদ্দীন ??

সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির প্রাণের নেতা হিসেবে এতদিন তো শেখ মুজিবের নামই শুনে এসেছে সবাই, শুধুমাত্র তর্জনি উঁচিয়েই পূর্ব পাকিস্তান অচল করে দিয়ে শেখ মুজিবও প্রমাণ করে দিয়েছে তার প্রবাদতুল্য জনপ্রিয়তা। ক্র্যাকডাউনের প্রথম প্রহরেই মুজিবকে গ্রেপ্তার করবার পরেই তো মেরুদন্ডহীন, কালোরঙা বাঙ্গালির মনোবল ভেঙ্গে যাবার কথা। এই এখানেও, প্রতিবারের মতোই, ঝামেলা পাকাতে এসে উদয় হয়েছে এই তাজউদ্দীন ??

ফরমান আলী ভেবে পায় না, এই লোকটা আসলে কোন ধাতুতে তৈরী। অস্ত্র নেই-সেনাবাহিনী নেই- নিজের মাটি পর্যন্ত নেই। পূর্ব পাকিস্তানের বেহেনচোত বাঙ্গালিগুলোর এই অর্থহীন সংগ্রাম কতদিন টিকিয়ে রাখতে পারবে কোন নেতা ?? কতদিন ধরে বাঙালিদের স্বাধীনতার মিথ্যা স্বপ্ন দেখাতে পারবে এই নাছোড়বান্দা তাজউদ্দীন ??

রাও ফরমান আলীর মনে পড়ে যায়, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কথা।...

গত মাসেই, মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা চলছে। আলোচনা তো অজুহাত আসলে। তলে তলে আসলে সময় নিচ্ছিলেন ফরমান আলীরা, একত্রিত করছিলেন তাদের সৈন্যদের। লোক দেখানো আলোচনায় জুলফিকার আলী ভুট্টোও এসেছিলেন ঢাকায়। বিশেষ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তাকে আর ইয়াহিয়াকে নিয়ে বসেছিলেন ভূট্টো। নিজের হোটেলে, ইন্টারকন্টিনেন্টালে।

ইয়াহিয়ার মুজিবকে বড় ভয়। বাঙালি জাতটা হুজুগে। এই ব্যাটার ভাষণে যে কোন সময় ক্ষেপে গিয়ে কিছু একটা করে বসতে পারে লোকে। মুজিবকে তাই গ্রেপ্তার করাই উচিৎ, মত রাখেন ইয়াহিয়া।

ঢকঢক করে গলায় প্রিয় পানীয় ব্ল্যাক ডগ ঢেলেছিলেন ভুট্টো। এরপরে, মনে পড়ে ফরমান আলীর, তাদের দুজনকে চমকে দিয়ে সজোরে চাপড় মেরেছিলেন টেবিলে। ‘আর এতেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?? তাই মনে হয় আপনাদের ??’

-‘লিসেন। আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম এবাউট শেখ মুজিব, ’ রক্তলাল চোখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলেন ভূট্টো। ‘ ইমোশনাল এপ্রোচে তাকে দমিয়ে ফেলা যায়। বাট... দ্যাট লিটল ম্যান বিহাইন্ড হিম, দ্যাট লিটল নটোরিয়াস ম্যান, ফাইল হাতের ওই তাজউদ্দীন- তাকে আটকানো বড় শক্ত। ... দিস গাই ইজ ভেরী থরো। দিস তাজউদ্দীন, আই টেল ইউ, উইল বিকাম ইউর মেইন প্রবলেম !!’

হাতে ধরা বিশেষ বার্তাটি ফরমান আলী আরেকবার পড়ে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে গতকাল মুক্ত মেহেরপুরের মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের অনুষ্ঠানটির কথা। তাজউদ্দীন অসাধ্য সাধন করেছে। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনা করেছে, সীমান্ত এলাকায় নিরন্তর ছোটাছুটিতে একত্রিত করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের, গঠন করেছে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার।

রাও ফরমান আলীর মনে হয়, ভূট্টো সাহেব ঠিকই বলেছিলেন। তাজউদ্দীন, ইতিমধ্যেই তাদের প্রধাণতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফরমান আলী ঠিক করলো, অচিরেই একটি প্রচারপত্র বিলি করতে হবে। সেখানে তাজউদ্দীনকে বলা হবে ভারতের দালাল। সেই সাথে আরো একটা ঘোষণা দেয়া দরকার। কূটনৈতিক স্টাফ ছাড়া অন্য সকল ঢাকাবাসীকে বলা হবে তাদের কাছে কোন অস্ত্র থাকলে তা নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে জমা দিতে। অস্ত্র ছাড়া কতক্ষণ টিকে থাকবে এই হিন্দুয়ানি বাঙালিরা ??

জানতো না ফরমান আলী, সে সময় আরো একটি মারাত্বক অস্ত্র বহন করছিলো প্রতিটি মুক্তিকামী বাঙ্গালিরাই। ঢাকা থেকে জিঞ্জিরা পালানোর পথে এক অবিন্যাস্ত দাঁড়ির যুবক; যার নাম নির্মলেন্দু গুণ; সেই অদ্বিতীয় অস্ত্রটি নিয়ে একসময় লিখে ফেলবেন একটি কবিতা- 
‘ পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্দিগ্ধ সৈনিক। ...
আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী, প্রকাশ্যে ফিরেছি ঘরে,
অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্বক
একটি আগ্নেয়াস্ত্র,- আমি জমা দিইনি।’

...ফাইলের আড়ালে থাকা তাজউদ্দীনের এই অস্ত্রটিকেই ভূট্টো সবচেয়ে বেশি ভয় করতেন।

শিলিগুড়ির সভা

সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন কেবল নির্বাচনে জয়ী গণপ্রতিনিধিরা, স্থির ছিলো এটাই। অথচ প্রথম বক্তা শেখ আবদুল আজিজ সভাপতির আহবানে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন এমন অনেক ছাত্রনেতার মুখ, যাদের এখানে আদৌ থাকবার কথা নয়।

গতকালও এমনটাই ঘটেছিলো। মূল অধিবেশনের পূর্বের প্রস্তুতিমূলক অধিবেশনেই উপস্থিত হয়েছিলেন এই ছাত্রনেতারা। এক পর্যায়ে মাইক দখল করে নিয়ে উচ্চারণের অযোগ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেছিলেন মুজিবনগর সরকারকে। বলাবাহুল্য, তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিলেন এই সরকারের ‘প্রধানমন্ত্রী’।

শিলিগুড়ির এই গহীন অরণ্যের সাথে খুব মানিয়ে গেছে আজকের কনফারেন্সের সভাপতির কালো আচকান আর মাথার কালো টুপি। খন্দকার মোশতাক ভেতরে তীব্র উল্লসিত এইসব অনাহূত ছাত্রনেতাদের দেখে।

‘স্বাধীনতা চাও, না বঙ্গবন্ধুকে চাও ??’ এই আবেগী প্রশ্নের মাধ্যমে গত কিছুদিন ধরেই শেখ মুজিবের কাছের ছাত্রনেতাদের উসকে দিয়ে আসছেন তিনি। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে দেশের মূল নেতৃত্ব তাদের কাছেই থাকবে, এটাই প্রত্যাশা ছিলো এই ছাত্রনেতাদের। প্রবাসী সরকারের প্রধাণমন্ত্রী তাজউদ্দীনের উপরে তাদের ক্ষোভ তাই খুব স্বাভাবিক। তদুপরি ধুরন্ধর মোশতাক তাদের কানে তুলেছেন বিষমন্ত্র- এখনো যদি যুদ্ধ বন্ধ করে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়, তবেই হয়তো বেঁচে যাবেন শেখ মুজিব। আর নইলে...

দাঁতে দাঁত চাপলেন খন্দকার মোশতাক। সিনিয়রিটির সুবাদে এখন দলের প্রধাণ তো তারই হবার কথা, কোত্থেকে উড়ে এলো এই তাজউদ্দীন ?? যাক, এর শোধ তিনি আদায় করে নেবেন ঠিক। এই আবদুল আজিজকেও উসকানি দেয়া হয়েছে। এই মুহুর্তে তার বক্তব্যে সে ধুয়ে দিচ্ছে প্রবাসী সরকারকে।

উপস্থিত শ’তিনেক এমপি আর এমএনও-রা অনুভব করতে থাকে, একটা ভয়ানক পরিস্থিতি জমাট বাঁধছে এই সভাকক্ষে। আবদুল আজিজের প্রবল আক্রমণের শিকার হচ্ছেন তাজউদ্দীন সরকার।

ঘটলো এক নাটকীয় ঘটনা। বিচক্ষণ পরিষদ সদস্য ময়েজউদ্দীন বুঝতে পারলেন আবদুল আজিজের উদ্দেশ্য- তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে চান উপস্থিত সকলকে। হঠাৎ মঞ্চে লাফিয়ে উঠে ময়েজউদ্দীন শার্টের কলার ধরে সরিয়ে দিলেন আবদুল আজিজকে।

বারুদে আগুণ পড়লো যেন। উপস্থিত ছাত্রনেতারা ক্রমাগত স্লোগান উড়াতে লাগলো, ‘ বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে আনো। ’ জোরগলায় তারা জানাচ্ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রতি তাদের অনাস্থার কথা।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম হতভম্ব হয়ে পড়লেন। দাঁড়িয়ে মুখ খুলতে গিয়েও পারলেন না তিনি। ছাত্রনেতাদের অকথ্য, অশালীন আক্রমণে বসে পড়তে হলো তাকে। বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীরও একই দশা। মুখ খুলবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন তিনিও। মাথাটা হেঁট হয়ে যাচ্ছে প্রবাসী সরকারের সদস্যদের। তাদের প্রতি এমন অবিশ্বাস প্রদর্শন করছেন নবীন, উত্তেজিত ছাত্রনেতারা- উন্মোচন করে দিচ্ছেন তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব- ভারত সরকারের কাছে এরপরেও তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা আর রইবে কি এরপর ??

সকলের অলক্ষে হাসছেন খন্দকার মোশতাক। আর অন্যদিকে, সকলের চোখের সামনে উঠে দাঁড়ালেন তাজউদ্দীন। হাতে তুলে নিলেন মাইক্রোফোন। কোলাহল স্পর্শ করতে চাইলো ছাদ, কিন্তু তাজউদ্দীন স্পষ্ট করে উচ্চারণ করতে লাগলেন এক একটি বাক্য- আর থেমে যেতে লাগলো সমস্ত আক্রমণ।

[i]“আমরা স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা পেলেই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে পাবো। ...

আজ যদি বঙ্গবন্ধু মুজিবের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পাই, তাহলে সেই  স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যেই আমরা পাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে।...

বাংলাদেশ যদি আজ এত রক্তের বিনিময়েও স্বাধীন না হয়, তাহলে বাংলাদেশ চিরদিনের জন্য পাকিস্তানি দখলদারদের দাস ও গোলাম হয়ে থাকবে।

... আর এই অধিকৃ্ত পূর্ব পাকিস্তানে যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েও আসেন, তবু তিনি হবেন পাকিস্তানের গোলামীর জিঞ্জির পরান এক গোলাম মুজিব। বাংলাদেশের জনগন কোনদিন সেই গোলাম শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলে গ্রহন করবে না, মেনে নিবে না।

...স্বাধী্নতা ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আর কোন অস্তিত্ব নেই, আর পরিচয় নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পরাধীন বাংলায় বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবেন না।

... মুজিব স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেতে ফিরে আসবেন এবং তাকে আমরা জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনব ইনশাল্লাহ।”[/i]

তাজউদ্দীনের ভাষণ শেষ হওয়া মাত্র আবেগে দাঁড়িয়ে গেলো শিলিগুড়ির সভাকক্ষ। নির্দ্বিধায় তারা আস্থা রাখলেন তাজউদ্দীনের অধীনে প্রবাসী সরকারের ওপর। ‘জয় বাংলা !! জয় বঙ্গবন্ধু !!’ স্লোগানে কেঁপে কেঁপে উঠছিলো শিলিগুড়ি। ওদিকে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ছাত্রনেতারা। বুঝে গেছেন, এই মুহুর্তে জনমত তাদের পক্ষে নেই।

ছোট্ট একটি পাথরখন্ডও কখনো কখনো পারে বিশালাকার কোন নদীর গতি বদলে দিতে। তেমনি, বক্তা হিসেবে দারুণ কোন সুখ্যাতি যার কখনোই ছিলো না, সেই তাজউদ্দীনই এই ক্ষুদ্র পরিসরের ভাষণের মধ্য দিয়ে দ্বিমুখী স্রোতে টলায়মান স্বাধীনতাযুদ্ধ নামের জাহাজটিকে আনলেন নিয়ন্ত্রণে। ইতিহাসের যাদুকরী নয়টি মিনিটে সেনাপতি দূর করলেন সকল অনাস্থা আর অবিশ্বাস, নিশ্চিত করলেন লাল-সবুজের একটি জাতির জন্ম।

তুমুল হাততালির সাথে সাথে নিজের চেয়ারে ফিরে গেলেন তাজউদ্দীন। পাশে বসা বঙ্গবীর ওসমানী মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদুস্বরে তাকে বললেন, ‘ ভালো বলছো তাজউদ্দীন। আজকে লক্ষণ বেশি সুবিধার দেখতে ছিলাম না...’

এরপরে সভার কাজ চলে, একসময় শেষও হয়।

সম্মেলনের আগামীকাল চলবে নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। ক্যামেরা এগিয়ে এসেছে তখন, সভার প্রথম দিনের শেষ মুহুর্তটিতে ধরে রাখতে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তাই দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন সকলকে। তাজউদ্দীনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ তাজউদ্দীন ভাই, আসেন। ছবিটা তুলে নেন।’

অন্তর্মুখী তাজউদ্দীন মাথা নাড়লেন। ছবি তোলায় তার বড় অনীহা। নজরুল ইসলাম উত্তরটা জানতেন,  তাই খুব বেশি অবাক হলেন না তিনি। বরং অন্যান্য সহকর্মীদের এগিয়ে আসতে বললেন।

ছবি তোলা হলো। স্বাধীনতা আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ছবিতে হাস্যজ্জ্বল। কেবল একজন হাসছিলেন না। তিনি খন্দকার মোশতাক।

অথচ খন্দকার মোশতাক এরপরে হাসবেন আরো দুইবার।

প্রথমবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল সাড়ে সাতটায়, যখন আগামসি লেনে তার বাড়ির সামনে ট্যাঙ্ক পাহারায় আনা সামরিক জীপের দরজা খুলে মেজর রশীদ তাকে স্যালুট করবে।

এবং দ্বিতীয়বার সে ঘটনার একাশি দিন পর, যখন তার আদেশ পেয়ে নিরুপায় ডিআইজি প্রিজন খুলে দেবেন কেন্দ্রীয় কারাগারের দরজা আর ক্যাপ্টেন রিসালদার মোসলেমউদ্দীন সশস্ত্র সেনাদল নিয়ে প্রবেশ করবে ভেতরে। নির্লজ্জ বুলেট বর্ষণে তারা হত্যা করবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথানের দিনে সংগ্রাম চালিয়ে নেয়া সৈয়দ নজরুল ইসলামকে, এগার দফার সমর্থনে জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ বর্জন করা কামরুজ্জামানকে, বহু সংগ্রামের অক্লান্ত যোদ্ধা ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে।

...আর অবশ্যই, এই তাজউদ্দীনকে।
 
একজন বিস্মৃত মানুষের খোঁজে

প্রতিদিন রাত নয়টা বাজবার ঠিক দশ মিনিট আগেই লাইব্রেরিয়ান মোজাফফর মিয়া বিশাল ঘরটার একপ্রান্ত হতে ফ্যানের সুইচ নিভিয়ে দেয়। আজকেও ব্যতিক্রম হয় না এর। সুইচ নেভানোর শব্দ শুনে সে হাত চালায়। সামনের বইগুলো থেকে দ্রুত হাতে খাতায় তুলে নিতে থাকে দরকারী সব। আরো মিনিট পাঁচেক পরে, ইতিহাসের এসাইনমেন্ট খাতাটা নিয়ে রিজওয়ান সুহান পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসে।

হাঁটাপথে টিএসসি যাবার সময় তার পাশ কাটিয়ে দ্রুত গতির একটা ছোটো মিছিল চলে যায় উলটো দিকে। নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছে এক স্থানীয় নেতা, বিশাল ব্যানারের মাঝে তার পাশে দেখা যাচ্ছে পরিচিত আরেকজনের ছবি। রিজওয়ানের খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে; মুক্তিকামী ওই নেতা সত্যিই বুকে ধারণ করেন তার পাশের মানুষটির আদর্শ, একদিন তিনি সত্যিই তার পাশের মানুষটির মতোই হবেন। কী অসাধারণ-ই না ছিলেন মানুষটি !!

পাঁচ ফুট এগার ইঞ্চির দেহ নিয়ে কাঁচাপাকা ব্যাকব্রাশ চুল আর সম্মোহনী কালো চোখজোড়ার শেখ মুজিব আজ মৃত্যুর এতো বছর পরেও তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে মুগ্ধ করেন সবাইকে। তবুও কেনো যেন, রিজওয়ান সুহান ব্যানারে ঝোলানো অনন্যসাধারণ শেখ মুজিবের পেছনে আড়ালে থাকা একজন সাধারণ মানুষকে দেখতে পায়।

মানুষটি পরম মমতায় টেকনাফের নীল জল থেকে তেঁতুলিয়ার তপ্ত মাটি স্পর্শ করে গিয়েছিলেন প্রাণের দাবি ছয়দফাকে ফাইলবন্দী করে, একাত্তরের উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিটি চরণের বাস্তব রুপ দিয়েছিলেন অভাবনীয় সাংগঠনিক দক্ষতায়, ছোট্ট একটি ডাকোটা বিমানে করে সীমান্ত আকাশে অক্লান্ত ওড়াওড়িতে তুলে এনেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়কদের আর পুরাণের ভরতের মতই শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তনে হাসতে হাসতে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন সিংহাসন।

অথচ মানুষটির বুকে আক্ষেপ ছিলো। ছিলো একটি অকথিত, রোমাঞ্চকর গল্প। দুইশত ছেষট্টি দিনের যে গল্প তিনি বলে যেতে পারেন নি তার মুজিব ভাইকে। না-বলা সেই গল্প জমে থাকা বুকটিকে ছিদ্র করে বেরিয়ে গেছে ধাতব বুলেট আজ থেকে ঠিক তিনযুগ আগে। ১৯৭৫ এর ৩রা নভেম্বর।

হাঁটতে হাঁটতে রিজওয়ান সুহান নিজমনে তাজউদ্দীনের কাছে ক্ষমা চায়। আশা করে,  লিটল নটোরিয়াস ম্যানের ওই না-বলা গল্পটা একদিন ঠিক ঠিক কেউ লিখে দিয়ে যাবে।


১। তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত তথ্যচিত্র- 'তাজউদ্দীন আহমদঃ নিঃসঙ্গ সারথী'
২। মূলধারা ' ৭১- মইদুল হাসান
৩। তাজউদ্দীন আহমদ, বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর- কামাল হোসেন
৪। ইতিহাসের রক্তপলাশ, পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর- আবদুল গাফফার চৌধুরী
৫। বাংলাদেশ, লীগ্যাসি অফ ব্লাড- এনথনি মাসকারেনহাস
৬। আত্নকথা ১৯৭১- নির্মলেন্দু গুণ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন