রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১১

বিশদ বাঙলা

জিইসির মোড়ে আসতেই কালো টিশার্টের অম্লানকে চোখে পড়ে। স্বভাবসুলভ উত্তেজিত পায়চারী করতে করতে সে অপেক্ষারত। আমি রিকশা থেকে নামবার পরেও অম্লানের পায়চারী থামে না। প্রশ্নের উত্তরে অম্লান জানায় যে তার আরেক বন্ধু শাকিলেরও আসবার কথা রয়েছে। অতঃপর আরো খানিক অপেক্ষা করতে হয় আমাদের। মিনিট দুয়েক পায়চারী করে অম্লান আর বিলম্ব করতে রাজি হয় না, পাশ্ববর্তী সেন্ট্রাল প্লাজায় ঢুঁকে পড়ে। একটি বইবহুল সকালের আশায় আশান্বিত হয়ে উঠি আমি, একটি ব্যয়বহুল সকালের আশঙ্কায় শঙ্কিত।

ভ্রমণসূচীর মূল পরিকল্পনা অম্লানের। তার খুচরো পয়সা সাইজের চাচাতো-ফুপাতো-খালাতো-মামাতো ভাইবোনেরা নাকি তাদের পলাশীবাসী বড়দার কাছ থেকে বই উপহার চায়। উদ্দেশ্য এমন মহৎ হওয়া সত্ত্বেও অম্লানের আগ্রহের আতিশয্যে আমার কেবলই মনে হয় হয় এ ভ্রমণে ক্রীত বইগুলোর উদ্দেশ্য আর কিছু নয়, এ কেবল অম্লানের কোন তালতো বোনের উদ্দেশ্যে যাওয়া।... যাকগে, নিকুচি করি উদ্দেশ্যের। কেবল বই দেখার আনন্দেই অম্লানের সঙ্গী হবো বলে এই ঈদের আগের দিন সকালে বেরিয়ে পড়েছি। হাতে সময় বেশি নেই। ঘন্টা তিনেক বাদেই চট্টলার মূল শহর থেকে গ্রামের দিকে বেরিয়ে পড়তে হবে, অতএব দেরী করা চলবে না একদমই।

কিন্তু অম্লানের চোখ দুটো কেবলই ঝামেলা পাকায়। ঈদ শপিং এ ব্যস্ত অগণিত মাসিপিসির ভীড়ে তারা কেবলই চকিতচিত্তচাঞ্চল্যদায়ীচপল তরুণী খুঁজে বেড়াতে চায়। অম্লানকে পাহারা দিতে ব্যস্ত থেকে আমার প্লাস চশমার কাঁচের আড়ালে চোখদুটো তেমন অবসর খুঁজে পায় না। এরই মাঝে দোতালায় দুটো বইয়ের দোকান খুঁজে পাওয়া যায়। একটি চলনসই। সুনীল-সমরেশের নীলক্ষেত প্রিন্ট আর সেবার প্রতিটি সিরিজের সবচেয়ে আকর্ষক বইগুলোর সংস্করণে ভরপুর। নীলক্ষেত প্রিন্ট ছেড়ে আমরা সেবা নিয়ে পড়ি কিছুক্ষণ। সম্ভবত এটি বাংলাদেশী বইপড়ুয়াদের সনাক্তকারী চিহ্ন, যাদের দ্বি-প্রজাতিক নাম হবে সেবা গেলানোস্টিকটাস। এ দোকান ছেড়ে পাশে বেশ বড়সড় একটা দোকানে ঢুঁকি এরপর। বইয়ের পাশাপাশি স্টেশনারী, আর্টপেপারের একটা আলাদা প্রান্ত দোকানের, নামটা ভুলে গেছি দোকানের।

অম্লান প্রথমেই কালি ও কলমের ঈদ সংখ্যার খোঁজ করে। সেটা দেখা যায় এককোণে আর সব ঈদ সংখ্যার সাথে রাখা। প্রথম আলো, যুগান্তর, সমকাল, সাপ্তাহিক ২০০০- আর যা আছেআরেকপাশে আছে আনন্দমেলা, আননন্দলোক, দেশ এর পূজাসংখ্যা। নেড়েচেড়ে দেখি আমরা। এক ঈদসংখ্যায় আকালের বাংলাদেশে ভাত না পাওয়া গেঁয়ো যোগী প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সাহেবের কবিতা দেখে আমরা উদাস হয়ে যাই। উদাস ভাব কাটিয়ে হঠাৎ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে অম্লান। রোযার দিনে হঠাৎ জনসমক্ষে এনার্জী প্লাস বিস্কুট কী করে সে পেলো জানতে চাওয়ার জন্যে ঘুরেই পুন্ডরীক কুন্ডুর রহস্যভেদ হয়। দোকানে তরুণী বটে, তবে তন্বী নয়- এমন জনাকতক ক্রেতার আগমন ঘটেছে। অম্লান দোকানের সেপ্রান্তে গিয়ে বিক্রেতার সাথে বাংলাদেশী কবিতায় লিটল ম্যাগের উপযোগিতা শীর্ষক এক গুরুগম্ভীর আলাপ জুড়ে দেয়। আমি ঘর থেকে বেরোবার আগে আয়না দেখে এসেছি, অতএব চুপিসারে দোকানের অপরপ্রান্তে সরে যাই।

দোকানটা আকারে বড় হলেও তেমন বৈচিত্র্য দেখি না। দোকানের এপাশেও নীলক্ষেত প্রিন্ট। ফেলুদা পাহাড়ে চড়ছেন, কলকাতা দাঁপাচ্ছেন। নীলক্ষেতের চেয়ে দামেও বেশ বেশি মনে হয়। খুচরো পয়সাদের দেবার জন্যে উপহার হিসেবে বইগুলো পছন্দ করার মতো বটে, তবে নীলক্ষেত প্রিন্টের এই দাম শুনে পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। অম্লান কালিআরকলম বগলস্থ করে নিয়ে আসে।

দোকান থেকে বেরোতেই অম্লানের বন্ধু শাকিল এসে যোগ দেয় আমাদের সাথে। সে দীর্ঘদেহী-সুদর্শন ডাক্তার মানুষ, অথচ কসাইয়ের পরিবর্তে উন্মাদের সীলছাপ্পড় মেরে রেখেছে বুকের মাঝে।

এবং এইবার, অম্লান একটা দারুণ তথ্য দেয়। নুশেরা আপার কাছে কোন আলোচনায় যেন সে শুনেছে, মেহেদীবাগের ওদিকে একটা ভিন্নরকম বইয়ের দোকান আছে। কী সে দোকান, কী তার প্রকৃতি- সে সব বিস্তারিত বলতে পারে না সে। তবে জানায়, দোকানটা নাকি আর দশটা বুকস্টোরের মতন নয়। চমৎকার সব বই আর ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাপনা। দোকানটা কোথায়, সে বিষয়েও তার ধারণা খুব স্পষ্ট নয়। আমাদের চমকে দিয়ে উন্মাদ শাকিল জানান- দোকানটা তার চেনা, এক বন্ধুর সূত্রে।

দুটো ম্যাড়মেড়ে বইয়ের দোকানে ঢুঁকে হতাশ আমি বেশ আশান্বিত হয়ে উঠি আবার। খানিক বাদেই আমাদের তিনজনকে রিকশায় দেখা যায়। জিইসির মোড় হতে মিনিট সাতেক পাহাড় ঠেলে উপরে তুলে আমাদের বিভবশক্তি বাড়ায় রিকশাচালক, পরবর্তী মিনিট তিনেক সে বিভবশক্তি গতিশক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে যায়। রিকশা থামে একটা একেবারেই চোখেনাপড়া বাড়ির সামনে।  চারপাশে সমস্ত আধুনিকতার স্পর্শযুক্ত বিলবোর্ডে রংবেরঙের পোশাকের মডেলেরা শোভা পাচ্ছে, ভীড়ের মাঝে হাঁটাই দায়। এর মাঝে কেবল সাদা কাগজে মেরুন রঙের মার্কারে লেখা ‘বিশদ বালা’ চোখে পড়ে না একদমই।

দোকান দোতলায়। সিঁড়ি দিয়েই ওঠার পথে রুচির প্রশংসা করতে হয় আমাদের। চে-আইনস্টাইন-সত্যজিৎ-খনা-লীলাবতীর আবহের সাথে চোখজোড়া অভ্যস্ত হয়ে ওঠে দোতলায় উঠবার পথে। উঠে প্রথমে খাপছাড়া বোধহয় ব্যবস্থাটুকু।

খানিকপরে বুঝতে পারি সজ্জা। প্রতিটি ঘরে ভিন্নভিন্ন রকম সামগ্রী সাজানো। ঢুঁকেই সাদা, অবিন্যাস্ত চুলদাঁড়ির যে ভদ্রলোককে চোখে পড়ে- তিনি বোধহয় কর্তা। তার ঘরের সামনে দিয়ে গেলে বামের ঘরে টিশার্ট আর ফতুয়ার সহাবস্থান। আমার চোখ বইয়ের সন্ধানে ঘুরছে। কোথায় গেলো সেগুলো...

অবিন্যাস্ত চুলের ভদ্রলোক বলেন আমায় বলেন বই ভেতরে। আমি টিশার্ট বাম দিক রেখে ডানে মোচড় নেই। সরু করিডোরের মাঝ দিয়ে কিছুদূর গিয়েই বামের ঘরটা বইয়ের। ঢুঁকেই চমৎকৃত হতে হয়। পুরো ঘরের দেয়াল জুড়ে থরে থরে সাজানো বই। দর্শন, প্রবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, উপন্যাস, বাবুতোষ এইসব শ্রেণীতে ভাগ করে খুব চমৎকার করে সাজানো রয়েছে। দেখে একনজরে দোকানের চাইতে ব্যক্তিগত সংগ্রহ বলেই বোধ হয় বেশি। আমি আর অম্লান মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি। কট্টর বইপড়ুয়া না হলেও ডাক্তার সাহেবকেও বেশ ভাবগম্ভীর দেখায়।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রকযন্ত্রের মৃদু শব্দে অভ্যস্ত হবার পূর্বেই সেলসম্যান (ভুল না করলে, অজয়দা তাঁর নাম) আলাপ জুড়ে দেন বই নিয়ে। চমৎকার ঘরোয়া আড্ডা জমে ওঠে অজয়দার সাথে সপ্রতিভ অম্লানের। ইলিয়াস থেকে শুরু করে শাহাদুজ্জামান, কেউই বাদ পড়েন না। বিশেষ করে ‘রাহু চন্ডালের হাড়’ নামের একটা বইয়ের খোঁজ করছিলো অম্লান, সেটা অবশ্য পাওয়া যায় না। তাই বলে অম্লানের বইকেনা থেমে থাকে না। রুশ গল্প সঞ্চয়ন আর জহির রায়হানের গল্পসমগ্র কিনে নিতে মনস্থ করে সে। আমি আর শাকিল এবই সেবই ওল্টাই। বাচ্চাদের জন্যে রংচঙে টিনটিন যেমন, তেমনি হক সাহেবদের গল্পগ্রন্থ কিংবা সুনীলের উপন্যাস- নীলক্ষেত মুদ্রণ নয়- একেবারে আদি আনন্দ প্রিন্টেড। আমার পকেটের ধর্মতলা কর্মখালি টাইপ অবস্থা, অতএব খুব একটা সাহস করে উঠতে পারি না।

বিল মেটাতে গিয়ে চোখে পড়ে দোকানে আরো অংশ ছিলো। হস্তজাত সামগ্রী, স্যুভেনিরে বোঝাই সে অংশে আর যাওয়া হলো না সেদিন। তবে বুঝতে পারি, সেদিকেও যথেষ্ঠ পরিকল্পনা আর সুরুচির পরিচয় দিয়েছেন এরা।

অম্লান কথাবার্তায় বেশ করিৎকর্মা। সে দেখি অবিন্যাস্ত চুলের ভদ্রলোকের সাথে বেজায় আলাপ জুড়ে দিয়েছে। নুশেরা আপার মাধ্যমে এই খনির সাথে পরিচিত হবার কথা ব্যক্ত করতেই ভদ্রলোক উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। বোঝা যায় নুশেরা আপা বেশ পরিচিত মুখ এখানে। ভদ্রলোক আরো চমৎকার একটা তথ্য দেন। প্রতি বিষ্যুদবার নাকি সাহিত্যআসর টাইপ একটা আড্ডা বসে এখানে। আগ্রহী আমার প্রশ্নের উত্তরে জানান, পরবর্তী আড্ডা হবে ১৫ তারিখে। অতএব এ যাত্রায় আর এ আড্ডায় আসা হবে না, বেশ বুঝে যাই।

এরকম একটা দোকান দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো। লোকে কেবল বই কিনবে না, বই নিয়ে আলোচনা করবে। দরদামের চেয়ে বিষয়বস্তু আলোচনার বেশিরভাগ জুড়ে থাকবে। কোণে হয়তো থাকবে একটা ছোট্ট কফিশপ। পড়ুয়াদের জন্যে কয়েকটা টেবিল, প্রয়োজনে হয়তো সেখানেই খানিক পড়ে নেয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত বইটা। আর একেকদিন বিশেষ আড্ডা হবে। নবীন লেখকের বই প্রকাশ হবে, কাউকে নিয়ে আলোচনা সভা হবে, প্রবীণ লেখক এসে দর্শন দেবেন কোনদিন। ‘বিশদ বাঙলা’য় হয়তো এ স্বপ্নের বাস্তবরূপ নেই, কিন্তু চেষ্টাটা আছে। এই চেষ্টা ফ্যালনা না।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বোধ হয় মানুষের ভিড়ে আমাদের ঢাকায় বইয়ের দোকানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। টি-শার্ট আর ফতুয়ার মডেলে বইয়ের প্রচ্ছদ ঢেকে যাচ্ছে শহরে। এইরকম দোকান দেখে তাই খুব ভালো লাগে। চট্টলার বইপ্রেমীরা এই নিভৃতকোণে এসে মাঝে মাঝে ঘুরে যাবেন আশা করি। ভালো লাগবে।

বইপড়ুয়ারা তো এখন বিলুপ্ত হতে যাওয়া এক প্রজাতি। তাদের জন্যে মুঠোফোন কোম্পানীদের বিজ্ঞাপণ নেই, একুশে বইমেলায় ছাড়া মুখ দেখা নেই। ভরসা থাকুক এইরকম কিছু উদ্যোগ।

২টি মন্তব্য:

  1. আপনি কি এখন চাটগাঁয় নাকি ভাই? আগে বললে তো আমিও যেতে পাত্তুম। আপনি আর অম্লান্দা লুক এতো খারাপ কেনু??

    উত্তরমুছুন