বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০১১

দুনিয়া কাঁপানো ছয় দল

কালো মাণিক পেলে বেশি ভালো খেলতেন, নাকি ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা ?? মিশেল প্লাতিনি তুলনামূলক কতটা এগিয়ে জিনেদিন জিদানের চাইতে, অথবা পিছিয়ে ?? ১৯৭০ এর ব্রাজিল বেশি ভালো, না ১৯৫৪ এর হাঙ্গেরী ?? স্বপ্নের দল হিসেবে ক্রুইফের বার্সেলোনা না সাচ্চির মিলান- কোন দলটি এগিয়ে ?? ... ভিন্ন সময়ের- ভিন্ন প্রজন্মের খেলোয়াড় বা দলগুলোর মাঝে তুলনা করা যে তুলনা করা যে শুধু খুব কঠিন, তা নয়। বরং বলা যায়, এটি প্রায় অসম্ভব।


তারপরেও সমর্থকেরা তুলনা করে, প্রাক্তন খেলোয়াড় বা ধারাভাষ্যকারেরা তুলনা করেন- সাংবাদিকেরা দিস্তা দিস্তা কাগজ উড়ান। সর্বকালের সেরা ফুটবল দল কোনটি ?? আরেকটু স্পষ্ট করে প্রশ্নটা করলে, ক্লাব পর্যায়ে সর্বকালের সেরা দল কোনটি ?? প্রশ্নটা এইভাবে করায় ভুরু কুঁচকাতে পারে অনেকে- পালটা প্রশ্ন আসতে পারে; কেন কেবল ক্লাব দল- জাতীয় দল নয় কেন ?? সবিনয়ে জানাই, এই প্রশ্নের কোন যথোপযুক্ত উত্তর দেবার মতো ধৃষ্টতা আমি রাখি না। আন্তর্জাতিক ফুটবলে যেখানে সারা বছর জুড়ে ক্লাব পর্যায়ের ফুটবল ক্যালেন্ডার ব্যস্ত থাকে- সেই সময়ের ফুটবল দর্শক হিসেবে ‘সেরা দল’ শব্দদ্বয়ের সাথে আমার প্রতি বছর হাতে গোণা কয়েকটা ম্যাচ খেলা জাতীয় দলগুলোকে রাখা মানানসই বলে মনে হয় না।

নানা মত যাচাই বাছাই করে ফুটবল বোদ্ধারা সর্বকালের সেরা দলের ক্ষুদ্রতম তালিকায় তুলে এনেছেন ছয়টি দলকে। এদের মাঝেও পার্থক্য অনেক। কেউ হয়তো সময়ের বিস্তারে অপেক্ষাকৃত বেশি দিন সফল, কেউ হয়তো ট্রফির সংখ্যায় এগিয়ে, কারো আবার প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথের ব্যবধানটুকু বিস্তর। তবে এইটুকু নিশ্চিত, এখনো পর্যন্ত সর্বকালের সেরা ক্লাব দল নির্ধারণ করতে হলে প্রতিযোগীদের তালিকায় রাখতে হবে এই ষষ্ঠককেই। এই লেখার আলোচনা তাই সীমাবদ্ধ থাকলো এদের মাঝেই।

রিয়াল মাদ্রিদ (১৯৫৫-৬১)- অপরাজেয় ফুটবল দল

সর্বকালের সেরা ক্লাবদলগুলোর মাঝে যেটি সবচেয়ে প্রাচীনতম, সেটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছিলো ১৯৫৩-৫৪ মৌসুমে। ক্ষুরধার ফুটবল মস্তিষ্কের যে লোকটি শুরু করেছিলেন এই দুনিয়া কাঁপানো দল গঠনের কাজ, দুনিয়াজোড়া ফুটবল ভক্তদের প্রায় প্রত্যেকেই জানেন তার নাম- হয়তো একটু ভিন্নভাবে। হ্যাঁ, রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান হোমগ্রাউন্ড স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে সেই সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ইয়াস্তের নামেই। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের পর জৌলুস হারিয়ে ফেলে ধুঁকতে থাকা রিয়াল মাদ্রিদের জন্যে এই ম্যানেজার ঠিক করলেন নয়া কৌশল- প্রায় আধাশতাব্দী পরে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ যে পথ আবারো অনুসরণ করেছিলেন। অর্থাৎ, রিয়াল মাদ্রিদকে ‘নক্ষত্রপুঞ্জ’ করে গড়ে তোলা।

সেই লক্ষ্যেই কলম্বিয়ান ক্লাব মিলানোরিস থেকে উড়িয়ে আনা হলো জাদুর কাঠি (নাকি পা ??)ওয়ালা এক আর্জেন্টাইনকে- যার নাম আলফ্রেড ডি স্টেফানো। স্টেফানো এলেন। এলেন ফুটবল ইতিহাসের আরেক মাস্টার ম্যাজেশিয়ান, ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্সের হাঙ্গেরীর প্রণেতা- ফেরেঞ্চ পুসকাস। আরো আছেন ইতিমধ্যেই স্প্যনিশ সংবাদমাধ্যমে ‘কান্টাব্রিয়ান সাগরের ঝড়’ উপাধি লাভ করা স্ট্রাইকার ফ্রান্সিসকো জেন্টো। বড় নামের মাঝে আরো ছিলেন রক্ষণের মিগুয়েল মুনোজ আর মাঝমাঠের হেক্টর রিয়াল। দল প্রস্তুত, যাদের অস্ত্র- আশ্চর্য সুন্দর ফুটবল; যাদের লক্ষ্য- বিশ্বজয়।

সে এক এমনই বিজয় অভিযান, যার সামনে রীতিমতো উড়ে গেলো বিশ্বের বাকি ফুটবল দলগুলো। ১৯৫৫ থেকে শুরু করে পরের ১১ বছরে ৮ বার স্প্যানিশ লীগের শিরোপা ঘরে তুললো রিয়াল মাদ্রিদ। থেমে রইলো না এখানেই। এখনকার উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের পূর্বরুপ ইউরোপিয়ান কাপের প্রথম পাঁচ আসরের পাঁচটিই (১৯৫৬- ১৯৬০) টানা গেলো মাদ্রিদের ট্রফির তাকে। এই দলের স্বর্ণযুগের হাইলাইটস চাইলে ১৯৬০ সালের হ্যাম্পডেন পার্কের ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের কোন দর্শককে খুঁজে বের করুন। ৭-৩ ব্যবধানে এইন্ট্রাক্ট ফ্র্যাঙ্কফুর্টকে রীতিমতো কাঁদিয়ে ছেড়েছিলো মাদ্রিদ। চার গোল করে পুসকাস হারিয়ে দিয়েছিলেন তিন গোল করা ডি স্টেফানোকে।

ফুটবলীয় সৌন্দর্য বাদ দিয়ে তাই কেবল ট্রফি সংখ্যার হিসাব করলেও, স্টেফানোর রিয়াল মাদ্রিদ বলতে গেলে অনতিক্রম্য।

আয়াক্স (১৯৭০-৭৩)- টোটাল ফুটবলের যাদুকরেরা

‘ব্যাটা হয় জিনিয়াস, নয় তো বদ্ধ উন্মাদ !! ’- রাইনাস মিশেলের সম্পর্কে এই ধরণের মনোভাব পোষণ করা লোকের সংখ্যা নেহাত কম ছিলো না। ফুটবলের তো নিয়মকানুন কিছু আছে, নাকি ?? ডিফেন্ডার রক্ষণের কাজ করবে, মিডফিল্ডার আক্রমণের বল যোগাবে আর স্ট্রাইকার গোল দেবে- এই তো ফুটবল খেলা। মিলিটারী কায়দায় কোচিং করানো রাইনাস মিশেল এই ধারণাটা পালটে দিলেন, চালু করলেন ‘টোটাল ফুটবল’ নামের এক কায়দা। সেই কায়দাতেই ভর করে কি না, কে জানে- ১৯৬৯-৭০ এর ডাচ লীগ জিততে কোন সমস্যা হলো না আয়াক্সের। এমনকি, সেই মৌসুমেই ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে অভিজ্ঞ এসি মিলানের মুখোমুখি হলো আয়াক্স। ৪-১ গোলে আয়াক্সকে মোটামুটি অনায়াসে পরাজিত করে দিলো মিলান।

রাইনাস মিশেল ভুল থেকে দ্রুত শিক্ষা নিলেন। নতুন করে ঢেলে সাজালেন আয়াক্সকে। সেই লক্ষ্যেই ডিফেন্ডার রুদ ক্রল আর মিডফিল্ডার গ্যারি মুরেন আয়াক্সের যুব ফুটবল একাডেমী থেকে মূল দলে এলেন। তবুও মিলানের সাথে পরাজিত আয়াক্সের একজন স্ট্রাইকারকে ঘিরেই আবর্তিত হলো দলের যাবতীয় ছক কাটা। তার নাম ইয়োহান ক্রুইফ। পরের তিন বছরে যথাক্রমে প্যান্থিনাইকোস, ইন্টার মিলান আর জুভেন্টাসকে হারিয়ে টানা তিনবার ইউরোপ সেরার মুকুট পড়লো আয়াক্সেরা। এই সময়ে তাদের ট্রফিকেসে আরো উঠলো তিনটা ডাচ লীগ, তিনটা ডাচ কাপ, একটা করে ইউরোপিয়ান সুপার কাপ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ও উয়েফা সুপার কাপ। বিশ্ব ফুটবল তখন অবাক বিস্ময়ে দেখছে নতুন এক ফুটবল দর্শনের এই ভয়াল সুন্দর রুপ।

কি ছিলো এই ‘টোটাল ফুটবল’ ?? ছিলো অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর পারষ্পরিক সমঝোতার এক দারুণ মিশ্রণ। প্রজাপতির মতো মাঠময় ছুটে বেড়াতেন আয়াক্সের ফুটবলারেরা, কারো কোন নির্দিষ্ট জায়গা নেই। স্ট্রাইকার যেমন দলের প্র্য়োজনে রক্ষণে নেমে আসছেন- দরকারে আক্রমণে উঠে যাবেন তেমনি ডিফেন্ডার, তার জায়গা দখল করে নেবে কোন মিডফিল্ডার।

রাইনাস মিশেল ১৯৭১এ বার্সেলোনার উদ্দেশ্যে ব্যাগ গোছানোর পরে ক্রুইফেরও বিদায় ঘটলো আয়াক্স থেকে। নতুন কোচ সরে আসলেন এই ‘টোটাল ফুটবল’ নামের নিয়ম ভাঙ্গা ফুটবল থেকে। ৭৩-৭৪ মৌসুমে ক্রুইফের বার্সেলোনায় চলে যাবার পরেই তাই কার্যত ভেঙ্গে পড়লো আয়াক্সের এই দুর্দমনীয় দলটি. রাইনাস মিশেলকে গত শতাব্দীর সেরা ফুটবল কোচ নির্বাচন করে, ফিফা তাই যেন বিনীত শ্রদ্ধা জানিয়েছিলো এই দলটির প্রতিই। 

লিভারপুল (১৯৭৬-৮২)- আক্রমণাত্বক ফুটবলের শেষ কথা

সারা ক্যারিয়ার “ইউ উইল নেভার ওয়াক এলোন!!” গাইবার পরেও একদিন বিল শ্যাঙ্কলি ওয়াক করলেন, নিজেই। ক্লাব ইতিহাসের তখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল এবং জনপ্রিয় ম্যানেজারের পদত্যাগে হতাশ এনফিল্ডপ্রেমীদের সামনে বিল শ্যাঙ্কলির চাপাচাপিতেই ক্লাবকর্তারা ক্লাবের ভার তুলে দিলেন রবার্ট পেইসলির হাতে। কেউ জানতো না, লিভারপুলের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটুকু লিখতে চলেছেন এই বব পেইসলিই।

প্রথমে কেভিন কিগান, রে কেনেডিদের নিয়ে; এবং পরে টেরি ম্যাকডারমট, কেনি ডালগ্লিস আর ইয়ান রাশদের মতো তরুণদের নিয়ে বব পেইসলি গড়ে তুললেন এক অজেয় দল। সেই সময়টায় বেকেনবাওয়ার আর জার্ড মুলারের সৌজন্যে ইউরোপ কাঁপাচ্ছে বায়ার্ন মিউনিখ। বব পেইসলির লিভারপুল ১৯৭৭ সালের ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে হারিয়ে দিলো সেই বায়ার্ণকেই। পেইসলি সেই রাতেই বলেছিলেন ফুটবল ইতিহাসে ঢুঁকে পড়া তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি, “ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ওদের হারালাম আমরা। প্রথমবার হারিয়েছিলাম ১৯৪৪- এ !!”

বিস্ময়করভাবে এফ-এ কাপ কখনোই জিততে পারেনি পেইসলি যুগের লিভারপুল। এই সামান্য আক্ষেপটুকু বাদ দিলে প্রাপ্তির ভাঁড়ার প্রায় পূর্ণ বব পেইসলির। তারা জিতেছিলো চারটা ইংলিশ লীগ শিরোপা, তিনবারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ানশিপ, তিনবারের ইউরোপিয়ান কাপ, একটা করে উয়েফা কাপ ও উয়েফা সুপার কাপ। [ সমসাময়িক ব্রায়ান হাওয়ার্ড ক্লফ নামের আরেক জিনিয়াস ম্যানেজারের জন্ম না হলে হয়তো প্রাপ্তির খাতাটা আরো বড় হতো বব পেইসলির, কিন্তু সে গল্প আরেকদিন করা যাবে।]

আক্রমণাত্বক ফুটবলের সাথে কখনো আপোস না করা বব পেইসলি বিখ্যাত ছিলেন তার ঠোঁটকাটা স্বভাবের জন্যেও। সবসময়েই তিনি বলতেন, “Football is a beautiful game & should be played in a beautiful way .”। লোকে বলে, পেইসলি কথা রাখতে জানতেন !!

এসি মিলান (১৯৮৮-৯১)- ডাচ ত্রিভুজে বিশ্বজয়ী

সিলভিও বার্লুসকোনি লোকটা টাকার কুমীর, জানেন সবাই। কিন্তু আরিগো সাচ্চি কোচ হিসেবে কেমন ?? ‘মিলানকে সাফল্য এনে দেবার মতো হাই-প্রোফাইল কোচ নয়’, এই মতটাই শোনা গেলো জোরেশোরে।

টাকা থাকলেই চলে না, দল হয়ে উঠতে হলে দরকার একটা পরিণত ফুটবল মস্তিষ্ক। আরিগো সাচ্চি সাইন করালেন স্পোর্টিং লিসবনের ডিফেন্ডার ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ডকে, সাচ্চির হাতের ছোঁয়ায় যিনি জন্ম দিলেন কালজয়ী এক হোল্ডিং মিডফিল্ডারের। প্রজন্মের সেরা কল্পনাশক্তি সম্পন্ন মিডফিল্ডার রুড খুলিতও এই দলের অংশ। সেই সাথে আরো একজন, ইতালিয়ান টিভিতে যার ড্রিবলিংয়ের সাথে তুলনা করে নাকি একবার দেখানো হয়েছিলো ব্যালে নর্তকীদের নাচ; ফন বাস্তেন। বিশ্বজয়ের জন্যে মিলানের এই ডাচ ত্রিভুজ ছিলো যথেষ্টর চাইতেও বেশি। সাথে যোগ করুন রক্ষনভাগের ফ্রাঙ্কো বারেসি, পাওলো মালদিনি আর আলেসান্দ্রো কোস্ত্রাকুর্তার নাম। মিলান রক্ষণ ভাঙ্গার চেয়ে চীনের প্রাচীর গুঁড়ানো স্ট্রাইকারদের জন্যে সহজ।

এই দল নিয়ে সাচ্চির প্রথম বড় সাফল্য এলো প্রথম মৌসুমেই। ম্যারাডোনা যাদুতে বলীয়ান নাপোলিকে পিছনে ফেলে ইতালিয়ান সিরি-আ হলো তাদের। সেই বছরেই ইউরোপিয়ান কাপের সবচেয়ে একতরফা ফাইনালগুলোর একটির জন্ম দিয়ে ৪-০ গোলে স্টুয়া বুখারেস্টকে উড়িয়ে দিলো মিলান। এমনকি পরের বছরেও বেনফিকাকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় ইউরোপিয়ান কাপ জয় করলো রোজেনারিরা। এই বছরেই ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ফিফা ব্যালন ডি’অর পুরষ্কারের জন্যে মনোনীতদের শীর্ষ তিন ফুটবলার নির্বাচিত হলেন একই ক্লাব থেকে। ক্লাবটি এসি মিলান, খেলোয়াড় তিনজন সেই বাস্তেন-খুলিত-রাইকার্ড।

সাচ্চির প্রস্থানের পরেও মিলানের সাফল্যধারা রইলো অক্ষুণ্ণ। ফ্যাবিও কাপেলোর হাত ধরে মিলান ৯১-৯২ মৌসুমে তারা অপরাজিত রইলো টানা ৫৮ ম্যাচ, ফুটবল ইতিহাসে পরিচিত হলো ‘দা ইনভিন্সিবল’  নামে। টানা তৃতীয় বারের মতো ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে উঠে মিলান হেরে গেলো অলিম্পিক মার্সেইয়ের কাছে। এসি মিলানের সুসময় ফুটবল বিশ্ব দেখেছে এরপরেও অনেকবারই, কিন্তু সাচ্চির সেই ডাচ ত্রিভুজের কল্যাণে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া ঔজ্জ্বল্য আসেনি আর এরপরের কোন ট্রফিতে।

বার্সেলোনা (১৯৯১-৯৪)- ক্রুইফের স্বপ্নের দল

নিজে খেলেছেন শতাব্দী সেরা কোচ রাইনাস মিশেলের অধীনে, টোটাল ফুটবলের আয়াক্স দলের কান্ডারী হয়ে ছিলেন, ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডের ‘ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’ দলের হয়ে বিশ্বের অগণিত ফুটবল সমর্থকের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ইয়োহান ক্রুইফের নিজের হৃদয়টা বাঁধা পড়ে গেলো স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার কাছেই। নিজে খেলোয়াড় থাকাকালীন সময়েই এই ক্লাবের জন্যে তরুণ ফুটবলার গড়ে তুলতে ১৯৭৯ সালে সভাপতি জোসেপ নুনেজের কানে তোলেন যুব ফুটবল একাডেমী স্থাপনের প্রস্তাব। গড়ে উঠলো ‘লা মেসিয়া’- আজকের দিনের বার্সার খেলোয়াড় তৈরীর কারখানা।

১৯৮৯-৯০ মৌসুমে বার্সার ম্যানেজারের দায়িত্ব নিলেন ক্রুইফ। টানা পাঁচবার লা লীগা জয় করে তখন চিরকালের প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদ যোজন যোজন এগিয়ে। ইউরোপের মুকুট তখন সাচ্চির মিলানের মাথায়। ক্রুইফ ডেনমার্ক থেকে উড়িয়ে আনলেন মাইকেল লাউড্রপ নামের স্ট্রাইকারটিকে, নিজের হাতে গড়া একাডেমী থেকে মূল দলে আনলেন জোসেপ গার্ডিওলাকে, প্রজন্মের সবচেয়ে সেরা ডিফেন্ডারদের একজন- রোনাল্ড কোম্যানকে আনলেন বার্সা রক্ষণে। সালিনাস আগেই ছিলেন, পরে এসে যোগ দিলেন রিস্টো স্টয়চকভ। ‘স্বপ্নের দল’ প্রস্তুত।

টানা চার মৌসুমের লা লীগা শিরোপা এলো এই দলের ট্রফি কেসে। তারা জিতলো উয়েফা কাপ। ক্লাব ইতিহাসের সেরা তখন পর্যন্ত সেরা দিনটি এলো এই দলের হাত ধরেই। ১৯৯২, ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে, ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে। তখন পর্যন্ত অধরা হয়ে থাকা এই শিরোপা আর বার্সেলোনার মাঝে বাঁধা হয়ে ছিলো ইতালির সাম্পাদোরিয়া। রোনাল্ড কোম্যানের বহুদিন মনে রাখার মতো এক ফ্রি-কিকে প্রথমবারের মতো ইউরোপ সেরা হলো বার্সেলোনা।

এছাড়াও, তিনটি স্প্যানিশ কাপ সহ মোট এগারোটি শিরোপা চার বছরে ঘরে তুলেছিলো ক্রুইফের বার্সেলোনা। ফলশ্রুতিতে, ক্রুইফ বনে গেলেন ক্লাব ইতিহাসের সেরা ম্যানেজার। ইয়োহান ক্রুইফ তখনো জানতেন না ভবিষ্যতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসবেন তারই শিষ্য জোসেপ গার্ডিওলা!!

বার্সেলোনা (২০০৮-??)- পাসিং ফুটবলের আগ্রাসন

বিশ্বফুটবলে ২০০৬ সালে শেষ হলো রোনালদিনহো রাজত্ব। বলতে গেলে একক চেষ্টায় বার্সাকে লা লীগা ও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ এনে দেয়া রোনির বিদায়ের পর লা লীগার মুকুট চলে গেলো রিয়াল মাদ্রিদের হাতে। বিদায় নিলেন ম্যানেজার ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড, যার রেখে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করতে ইয়োহান ক্রুইফের পরামর্শে ক্লাব কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দিলেন সাবেক বার্সা মিডফিল্ডার পেপ গার্ডিওলাকে।

নিজেদের একাডেমী লা-মেসিয়া থেকে মূল দলে ততদিনে সদ্য নিয়মিত হয়েছেন মিডফিল্ডার আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা আর লিওনেল মেসি। পেপ গার্ডিওলা একাদশে নয়া সংযোজন হলেন পেদ্রো রড্রিগুয়েজ আর সার্জিও বুস্কেটস। জেরার্ড পিকে আর দানি আলভেজকেও ন্যু ক্যাম্পে আনলেন পেপ। দলে আগে থেকেই রয়েছেন বহু যুদ্ধের যোদ্ধা কার্লোস পুয়োল আর জাভি হার্নান্দেজ। দাঁড়িয়ে গেলো পেপ গার্ডিওলার দল।

প্রথম মৌসুমে মাঠে নেমেই ইতিহাস গড়লেন পেপ। এক মৌসুমে সম্ভাব্য যে ছয়টি শিরোপা জেতা সম্ভব, সে ছয়টিই (লা লীগা, কোপা ডেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ, উয়েফা সুপার কাপ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়স লীগ) জিতে নিলো বার্সেলোনা। এর আগে এই কীর্তি করে দেখাতে পারেনি কোন ক্লাবই। পরের দুই মৌসুমে আরো দুইবার লা লীগা, একবার করে স্প্যানিশ সুপার কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতে নেয়ায় গার্ডিওলার অর্জিত ট্রফি সংখ্যা এখনো পর্যন্ত দশ।

গার্ডিওলার বার্সেলোনার খেলবার ধরণটা নেহাতই সরল। পাস, পাস এবং পাস। বল পায়ে রেখেই প্রতিপক্ষকে আক্রমণে ব্যস্ত করে গোলমুখ খুলে দেয়া। ক্লাব ফুটবলের কিংবদন্তী ম্যানেজার স্যার এলেক্স ফার্গুসন তো ২০১১ ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে পরাজয়ের পর বলেই বসলেন, তার ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি এই দলের চেয়ে ভালো কোন দলের বিপক্ষে খেলেন নি।

তারমানে সাচ্চির মিলান কি ক্রুইফের বার্সেলোনার চেয়ে এই বার্সা এগিয়ে ?? মৃদুভাষী ম্যানেজার পেপ বলেন, ‘আমরা জানি না আমরাই সর্বকালের সেরা দল কি না। তবে আজ থেকে ১০-১৫ বছর লোকে যদি আমাদের মনে রাখে; তবে সেটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।’


*******  *******   ********

সর্বকালের সেরা ছয়টি ক্লাব দলের সম্পর্কে এই হলো অতি সংক্ষিপ্ত আলোচনা। সন্দেহাতীত ভাবেই, কে সেরা তা নির্ণয় বলতে গেলে অসাধ্য।

এর বাইরেও কথা থাকে। ফুটবল দর্শকের নিজস্ব পছন্দ-ধরণ-দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী আরো অনেক দলই হতে পারে সেরা। সেটি হতে পারে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের নক্ষত্রপুঞ্জ রিয়াল মাদ্রিদ, অথবা ১৯৯৯ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়ী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, অথবা থিয়েরে অঁরি যুগের আর্সেনাল। কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের আরো অন্য যে কোন দল।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। আক্রমণাত্বক ফুটবলের সাথে সাফল্যের কোন বিরোধ নেই। বর্ণিত ছয়টি দলের কেউই আক্রমণাত্বক-দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের সাথে আপোষ করেনি। তারা সফল হয়েছে কি না, এর জবাব ইতিহাসই দেবে, দিচ্ছে। তারপরেও পেশাদারিত্বের এই যুগে আর্সেন ওয়েঙ্গারদের মতো ম্যানেজারেরা কমে যাচ্ছেন- আক্ষেপ এইটাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন