মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০১১

লাইটস ! ক্যামেরা !! একশান !!!

জীবন থেকে নেয়া

আইসক্রিমওয়ালা, ম্যাকগাইভার, শচীন টেন্ডুলকার কি পাওলো মালদিনি হতে চাইবার বয়েস পেরিয়ে গেলে একটা বয়েসে বোধহয় সব বাঙ্গালিই সিনেমা বানাতে চায়। ভুঁড়িওলা নায়ক 'ইয়া ভীশুমাই' বলে একাই দশবারোটা এন্ড্রু সাইমন্ডস টাইপের দামড়াকে পিটিয়ে লাশ করে দিচ্ছে বা ফ্রক পরিহিত চল্লিশোর্ধ্ব নায়িকা আদুরে গলায় বাবাকে 'ড্যাডি' সম্বোধনে ডেকে ব্যাডমিন্টন খেলতে যাচ্ছে- এইসব দেখে শৈশবের বিটিভিযুগে আমরা প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর সময় কাটিয়ে এসেছি। এরপরেও খাঁচা ভাঙ্গার গান নিয়ে খান আতা থাকেন, আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি থাকে; সবই থাকে ঐ সিনেমার পর্দায়। কাজেই সিনেমা বানাতে চাওয়াটা আমাদের রক্তেই থাকে। কেউ গুরু মানেন সত্যজিৎ, কিয়োরুস্তমি; কেউ মানেন কাজী হায়াতকে। পার্থক্য কেবল ঐটুকুই।


বুয়েটে প্রায়ই নানাবিধ উপলক্ষে সিনেমা বানানো হয়। সেগুলো দৈর্ঘ্যে টিভি নাটকের সমান হয়তো, তবুও আমরা তাদের সিনেমা বলতেই ভালোবাসি। হোক স্বল্পদৈর্ঘ্যের- নিজেরা বানিয়েছি তো, নিজেদের কাহিনী-অভিনয় তো। লোকে যারে সিনেমা বলে সিনেমা সেই নয়,বুয়েট যারে সিনেমা বলে... হুঁ হুঁ বাওয়া।

সিনেমা বানানোর এই গৌরবময় তালিকায় এতোদিন আমরা কোনভাবেই যুক্ত ছিলাম না। অন্যান্য ব্যাচের, ডিপার্টমেন্টের বড়ভাই বা বন্ধুরা চমৎকার সব সিনেমা বানাতো; আমরা কেবল আঙুল চুষতাম আর ইয়ে ফেলতাম। সিনেমা বানানোর চেয়ে ওগুলো করা ঢের সহজ কাজ। এহেন আমাদের মতো স্যারে খেদানো- ল্যাগ ঠেকানো ছেলের দলও সিনেমা বানাতে নামলাম। কারণ ঐতিহ্য। অনেকদিন ধরেই নাকি যন্ত্রকৌশল অনুষদের ব্যানারে ডিপার্টমেন্টের সবচে বুড়োধাড়িরা মেকানিক্যাল ফেস্টিভাল উপলক্ষে সিনেমা বানায়। অতএব আমাদেরও বানাতে হবে। কাজেই আমরা প্রায় প্রত্যেকেই এককাপ চা আর দুইখান বেনসন পুড়িয়ে ক্যাফেটরিয়াতে সিনেমা বানাতে বসে যাই।

সিনেমা বানাতে প্রথমেই চাই চিত্রনাট্য আর পৃথিবীর সহজতম কাজগুলোর একটা হলো চিত্রনাট্য লেখা। অন্ততঃ আমাদের ইফতি তাই বলে। পাঞ্জেরী গাইড প্রণেতা কামরুল হাসান শায়কের মতোই ইফতি তরতরিয়ে চিত্রনাট্য লেখে; আমরা ওবামালাদেনের লাশ ফেলে দেই আর বুয়েটে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ দেখতে পাবার গাণিতিক সম্ভাবনা আলোচনা করি। একসময় চিত্রনাট্য লেখা শেষ হয়। ইফতি যথারীতি প্রতিভার যথাযথ পরিচর্যা করে চমৎকার চিত্রনাট্য লেখে। গল্পের মূল বিষয়বস্তু জনা পাঁচেক আরাকান ডাকাতের বিশালবক্ষা এক মাফিয়া কন্যাকে অপহরণ করা। আমাদের খুবই পছন্দ হয় গল্পটা। কাহিনীর মাঝে মাঝেই গতি আর বেশ ইয়ে আছে, যাকে বলে রীতিমত পশমহর্ষক। সমস্যা দেখা দেয় অন্যত্র। এই গল্পে সিনেমা বানানোর বাজেট বুয়েটের তাবৎ পোলাপান তাদের একমাসের টিউশনীর ফি দিয়েও কুলাতে পারবে না। অতএব এই গল্প বাদ।

আমরা তাই চিত্রনাট্য খুঁজে পেতে আর দেরী করি না। লাইফ ইজ ওয়ান, গড ইজ ওয়ান, শাকিব খান ইজ ওয়ানের মতোই মেকানিক্যালও ওয়ান। আমরা আমাদের চিত্রনাট্য খুঁজে নেই জীবন থেকে। স্থির করি, সিনেমার অধিকাংশ দৃশ্যই হবে জীবন থেকে নেয়া। তবে এটিকেই বুয়েটের তাবৎ ভাইবেরাদারদের সামগ্রিক চিত্র মনে করলে বিশাল ভুল করবেন। বুয়েটিয়ান ভাইরা অতিশয় ভদ্র, এই সিনেমার সাথে তাদের কোনরুপ সাদৃশ্য নিতান্ত কাককাঁঠাল বিশেষ।

একেই বলে শুটিং

সিনেমা বানাতে গেলে চিত্রনাট্যের পরে দরকার হয় চিত্রগ্রহণ, মানে শুটিং। আর এই কাজে প্রয়োজন পরিচালকের। পরিচালক খুঁজে পেতে আমাদের দেরী হয় না। সাজ্জান হক এবং নাহিয়ান নাসির, একবচনে নাসির হক হয়ে বসেন আমাদের সিনেমার পরিচালক। আমাদের পরিচালকেরা সিনেমা সম্পর্কে রীতিমত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কোন দৃশ্যে মন্তাজের ব্যবহার হবে, কোন দৃশ্যে কেবল শব্দ সংযোজন অনুভূতির গভীরতা বুঝিয়ে দেবে, কোন দৃশ্যে জিবামের ব্যবহার অত্যাবশ্যক- এই নিয়ে তাদের বেশ উচ্চকন্ঠ শোনায়। অথচ শুটিং শুরুর প্রাক্কালে ক্যামেরাম্যান কাম সিনেমাটোগ্রাফার রাজন ভাই যখন জিজ্ঞেস করেন ক্যামেরা এঙ্গেল কী হবে, তখন নাসির হক হতভম্ব হয়ে মিনমিন করে জিজ্ঞাসা করে, 'ক্যামেরা এঙ্গেল কোন জিনিস ??'... থাবড়া দিয়ে দাঁত ফেলে দেয়ার দরকার শালাদের।...

যাই হোক, দুই করিৎকর্মা পরিচালক নিয়ে আমাদের শুটিং শুরু হয়। শুটিং করতে গিয়ে চরিত্রের প্রয়োজনে কেউ গুলশান এভিন্যু নাটকের স্টাইলে চৌদ্দখানা চড় খায়,  কাউকে আবার অবলীলায় কোহেকাফ নগর থেকে বুয়েটে আমদানী হয়ে আসা একমাত্র জ্বীন ওরফে জিয়ার ছিয়াশি সিক্কার খান বারো চাপড় সহ্য করতে হয় দাঁত কেলিয়ে রেখে।

শুটিং করবার সময় দুটো বিশেষ দৃশ্যের কথা না বললেই চলে না। প্রথমটা হচ্ছে পলাশীর বহুতল এক ভবনের ছাদে ক্যাম্পফায়ারের দৃশ্য। আকাশের কাছাকাছি গিয়ে আমাদের ঘিঞ্জি ঢাকাকে বড় চমৎকার লাগে। অমন বিশাল ফাঁকা বিরান ছাদে রাতেরবেলায় উঠে আমাদের মতো কাঠখোট্টা মানুষদেরও কলম থেকেও দু'দশটা বোদলেয়ারের মেঘদল টাইপের কোবতে বেরিয়ে আসছিলো আরেকটু হলেই। দ্বিতীয় দৃশ্যটার শুটিং হয় বুয়েট ক্যাফেটরিয়ার সামনে। কনভোকেশন গাউন আর হ্যাট জোগাড়ের গোলমালে একসময় দেখা যায় এটা হয়ে গেছে সিনেমার সবচেয়ে ব্যয়বহুল দৃশ্য। পরিচিত বিভিন্ন ব্যাচ-ডিপার্টমেন্টের নানা বন্ধু/ভাইদের দিয়ে এই দৃশ্যটির শুটিং করা হয়। দৃশ্যটা ধারণ করতে অমন কাঠফাটা গরমে এই বিশাল আলখাল্লা চড়িয়ে প্রায় আধঘন্টা যেসব বন্ধুরা এই সিনেমাটা করতে সাহায্য করেছেন- আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার সীমা নেই, আপনাদের ধন্যবাদ।

শুটিং এর সময় খুবই দুঃখজনক একটা ঘটনাও ঘটে। নাহিয়ানের শখের অত্যন্ত দামী ক্যামেরাটা শুটিং এর গোলমালে চুরি যায় সোহরাওয়ার্দী হল থেকে। শখের ক্যামেরা হারিয়েও শুটিং চালিয়ে যাওয়ায় নাহিয়ানকে ধন্যবাদ।

একটু দুষ্টুমি দেখে যান, প্লিজ, দুষ্টুমি দেখে যান

সিনেমার শুটিং শেষ হলো। ইতিমধ্যে নাসির হক চলে গেছেন এডিটিং এর কাজে। ক্যাম্পাস আর হল জীবনের চিত্র ফোটানোর অত্যন্ত বাজে চেষ্টা করা হয়েছে বলে সিনেমার নামকরন করা হয়েছে 'ক্যাম্পাস'। জিয়া ইতিমধ্যেই কুৎসিততম একটি পোস্টারে ক্যাফেটরিয়ার দেয়াল ছেয়ে ফেলেছে। বীভৎস এই পোস্টারটির অলঙ্করণে ব্যবহার করা হয়েছে কটকটে হলুদ রঙের অক্ষর, নীল ব্যাকগ্রাউন্ডে। পোস্টারটির প্রকৃতিই এরুপ যে, একনজর চোখ বুলিয়ে গেলে এই পোস্টারের কোথাও নায়িকা বপু বিশ্বাস লুকিয়ে আছেন বলে বোধ হয়। এই জাতীয় পোস্টার দেখার পরে বুয়েটিয়ান ভাইবোনেরা সিনেমাটি সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করেন- জানতে মন চায় !!

যাক, সিনেমার জন্যে যারা কাজ করেছেন তাদের একটু করে ধন্যবাদ দিয়ে গেলে মন্দ হয় না বোধহয়। নীলয়-নাহিয়ান-ইফতি-জিয়া-জিমি, সাথে ০৭'এর সামি আর ০৮' এর সাদ্দাম সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোতে তাদের সাধ্যমত অতি-অভিনয় করেছে। এছাড়া বাদবাকি চরিত্রে আরো অনেকেই ছিলেন। সিনেমাটোগ্রাফার রাজন ভাইকে বিরাট ধন্যবাদ, তার অভিজ্ঞতার কল্যাণে ছোটখাটো অনেক সমস্যা এড়ানো গেছে। আমাদের ০৬'এর রাহাদা, ০৭'এর আসিফ আর ০৮' এর মারুফ পর্দার পেছনে থেকে কাজ করে গেছে- তাদেরকেও ধন্যবাদ। নেপথ্যে কাজ করে যাবার জন্যে সবচেয়ে বড় ধন্যবাদটা পাবে আমাদের সিদ্দিক মামা, ওরফে শাফি। প্রত্যেকটা কাজের মাঝে সমন্বয় করা থেকে শুরু করে সিনেমার অগণিত ছোটবড়ো সমস্যা সমাধান করে মামা প্রমাণ করে দিয়েছে তার নামকরণের সার্থকতা। মামার জয় হোক !!

সিনেমাটি দর্শকের সামনে আসছে আগামী ১৩ই মে, বাদজুম্মা বেলা সাড়ে তিনটায় বুয়েট অডিটরিয়ামে, মেকানিক্যাল ডে'তে। সকলে আমন্ত্রিত।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই সিনেমায় এমন কী আছে- যা দেখার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। উত্তর হচ্ছে, কিছুই নেই। ক্যামেরার কারসাজি নেই, গল্পের দুর্দান্ত মোচড় নেই, ইংগমার বার্গম্যান বা মিখাইল বালাশকোভের সিনেমার মতো জীবনের গভীর তত্ত্ব নেই। এ নিছক সাদামাটা আমাদের গল্প। আমাদের ক্লাস পালানো, আমাদের আড্ডা, আমাদের বন্ধুত্ব আর আমাদের ভালোবাসার গল্প। এ কেবল দুষ্টুমির গল্প।

একদিন না হয় একটু দুষ্টুমিই দেখে গেলেন সবাই।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন