রবিবার, ১ মে, ২০১১

গড়পারের মানিক

আমি বইমেলায় মানুষটার একটা চমৎকার পোস্টার দেখেছিলাম। বিশাল মানুষটাকে এক বাই দেড় হাতের সেই ছোট্ট পোস্টারে সিনেমা পরিচালকদের চিরচারিত ভঙ্গীতে দুই হাতের মাঝ দিয়ে কিছু একটা খুঁজতে দেখেছিলাম। ভুল করে ভুলে যাওয়া আরো কতশত গানের মতই পোস্টারটা পরে কিনে নেয়া হয়নি আর। ঘরের দেয়ালে জর্জ হ্যারিসন আর চে'র পোস্টারের পাশে লাগানোও হয়নি কোনদিন। সেই মানুষটার আরো নানা ভঙ্গীমার পোস্টার পরে খুঁজে পেয়েছি নানা জায়গায়। কিন্তু কোনটাই মনে ধরেনি সেই ভুলে যাওয়া ছবির মতন।

মানুষটা লিখতে জানতেন। নিরিবিলি গরমের ছুটির দুপুরে হঠাৎ করেই এক রেলস্টেশনে রতনবাবুর মাঝ দিয়ে দ্বৈত্বসত্তার মুখে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বিহারের উত্তরে সেই নাম ভুলে যাওয়া জায়গার ডাকবাংলোয় মিঃ শাসমলের শেষ রাতটা আমি আজো ভুলিনি, ভয়ে। অসমঞ্জবাবুর কুকুরটা ওই সাহেবের সামনে অমন করে হঠাৎ হেসে উঠেছিলো কেনো- সেটা বুঝে উঠতে গিয়েই যে আরো বড় একটা বিস্ময়ের ধাক্কা পেয়েছিলাম, সেটাও জ্ঞানের কথার কচকচানি এড়িয়ে তিনি ছাড়া এমন করে আর কেউ দিতে পারতেন বলে বোধহয় না।

মানুষটা আবার- তাঁরই ভাষায় বলতে গেলে- রহস্যের খাসমহলও বানাতেন অনায়াসে। 'বিকাশবাবুর রেডিও, শশীবাবুর সিং, এক থেকে সাত, মগনলালের বজরা আর আফ্রিকার রাজা।' এইসব বলে কয়ে মাথার ভেতর গোলমেলে প্রচুর প্যাঁচ লাগাতেন তিনি। 'দ্যা সার্কাস হুইচ এস্কেপড ফ্রম দি গ্রেট ম্যাজেস্টিক টাইগার ...' জাতীয় বর্ণনার গুণে টানটান রহস্যের মাঝেই যেমন হেসে নিতাম খুব করে, যেমন গুণগুণ করতাম 'যব ছোড় চালে লখনৌ নগ্‌রী' বলে- ঠিক তেমনি দিনেদুপুরে খাস কলকাতার বুকে বসে গোরস্থানে তপেসের দাদার সঙ্গে হারিয়ে যেতাম পেরিগাল রিপিটার রহস্যে।

মানুষটার কল্পনার দৌড় ছিলো। পোষা বেড়ালের হাতের থাবায় সৌরজগৎ এর ক্ষুদ্রতম গ্রহ ভেঙ্গে ফেলার ঘটনা অবাক করে, পৃথিবী দখলের স্বপ্নে বিভোর মৃত্যুঞ্জয়ী আলেকজান্ডার এলয়সিয়াস ক্রাগ যখন নিজদূর্গে হেরে যায় এথেন্সের এক সাধারণ পকেটমারের কাছে- তখন উত্তেজনার উন্মাদনায় শীতের রাতে আমার কম্বল ছিটকে পড়ে, মানস সরোবরের ওপারে এক আশ্চর্য কল্পনার জগৎ দেখতে গিয়ে বিস্ময়ে আমার স্কুল বিকেলে ফুটবলে লাথি মারা পর্যন্ত হয় না।

মানুষটা ছবিও আঁকতে পারতেন দারুণ। স্কেচের আশ্চর্য আলোছায়ায় ফুটিয়ে তুলতেন টিপুর বন্ধু গোলাপীবাবু কি জটাধারী নকল সন্যাসীদের। তারিণীখুড়োর ক্রিকেট ম্যাচ আর ভোজরাজের কঙ্কালের ঘাড়ে চেপে বসার দৃশ্যও ভুলবার নয়। কপালের বামদিকে সিঁথি নিয়ে চারমিনারে টান দিচ্ছেন প্রদোষ মিত্তির আর মক্কেলের পাশে বসে উত্তেজিত লালমোহন গাঙ্গুলী- এই ছবি তো বলতে গেলে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক রহস্যোপন্যসের ট্রেডমার্কই হয়ে গেছে !!

শেষ হয়েও যা শেষ কথা নয়- মানুষটা সেলুলয়েডের ফিতার টানে স্বপ্ন দেখাতে পারতেন। 'জলসাঘর' এর বিশ্বম্ভর রায়ের রুপে ছবি বিশ্বাস ছড়ি হাতে গান শুনবার দৃশ্যটা কল্পনা করুন। অপুর ছেলে চোখ বড় বড় করে বলছে- ' বাবা কাকে বলে ?? '...... অথবা হীরক রাজার দাঁতে দাঁত পিষে বলা 'এরা যত বেশি জানে, তত কম মানে।'... একেকটা দৃশ্য কথা বলে দেয় একহাজার একশো অনুভূতির।

" He touched something & that turned into gold. "- এই চমৎকার কথাটা লেখা ছিলো আমার সেই না কেনা পোস্টারে। বড় সত্য কথা। ছেলেভোলানো মিডাসের রুপকথাকে বাস্তবে নামিয়ে এনেছিলেন মানুষটা, হাত দিয়েছেন যেখানে- আক্ষরিক অর্থেই হীরক রাজার খনির চেয়েও সুফলা করে তুলেছেন সেই ক্ষেত্রটি।

ফরেস্ট গাম্পের স্মৃতিতে থাকে না প্রথম কেনা জুতোর কথা- আমার মতোই। আমার মনে ঝাপসা হতে থাকে ফুটবলে প্রথম দেয়া গোল কিংবা অপরিচিত ক্লাস নাইনের নতুন স্কুল- প্রথম ঘন্টার ক্লাস। এসবের মাঝেও কিছু স্মৃতি পুরনো হয় না। পুরনো হয়নি অসমঞ্জবাবুর ব্রাউনীর হাসি, পুরনো হয়নি শঙ্কুর হাতের এনাইহিলিন গান, পুরনো হয়নি বাদশাহী আংটির লখনৌ অভিযান।

কখনো পুরনো না হওয়া শৈশবের এই অগণিত স্মৃতির পেছনের যে মানুষটা; গড়পারের রায় বাড়ির মানিক; সেই এক-অদ্বিতীয়- অতুলনীয় সত্যজিৎ রায়; তাঁর আজ জন্মদিন।

শুভ জন্মদিন ওস্তাদ !!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন