মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল, ২০১১

কালে খানের কাটরায়


মজিদ ভাই নিস্পৃহভাবে বললেন, "আমি কোথাও যেতে পারবো না। কোথাও নয়।"

হতভম্বের মতো একে অপরের মুখ চাওয়া ছাড়া আমাদের কিছু করবার নেই এখন। কী যে করা উচিৎ, তা ভেবেই পাই না আমরা।

- "সে কী মজিদ ভাই !! দারুণ জমজমাট অনুষ্ঠান হবে সেখানে," ফন্দিবাজ কবির বলে। "নামীদামী শিল্পীরা আসবেন অনেকেই। "

- "আর সাথে বিশাল খানাপিনার আয়োজন তো আছেই। না গেলে কিন্তু পস্তাবেন মজিদ ভাই !! ", টিচার ফরহাদ আরেকটু জোরালো চেষ্টা করে।


- "চলেন না মজিদ ভাই, যাবেন না কেনো ?? কেবল আপনি যাবেন বলে কত কষ্ট করে, কতবার বলেকয়ে পাসগুলো যোগাড় করলাম- আর আপনি...", কোন যুক্তির ধার না ধেরে নেহায়েৎ আবেগ দিয়ে এবার মজিদ ভাইকে পরাস্ত করতে চাইলাম আমি। কিন্তু তরল নাইট্রোজেন বা থর মরুভূমিতে দিগভ্রষ্ট কম্পাস যাকে টলাতে পারেন না, সেই মজিদ ভাই এতো সহজে টলে গেলে তো হতোই। তখন ব্যাংকক থেকে ব্লাডিভস্তোক তক তার নাম শুনে গাদ্দাফি কি ওবামারা আর কেঁপে উঠতেন না।

- "উঁহু, পরশু আমি কোথাও যাবো না। যাওয়াটা সম্ভবই নয়। বুঝতে পারছিস না তোরা।" এক মুহুর্তের জন্যে মজিদ ভাই যেন চিন্তিত হয়ে পড়েন কথাটা আমাদের বলবেন কি না, তা ভেবে। কি ভেবে বলেই ফেলেন, " যদি আমি বেরোই আর আমাকে না পেয়েই যদি ফিরে যায় আন্দ্রে পল ?? তাহলে আবার কতদিন অপেক্ষা করে থাকতে হয় কে জানে। ... না না, মুহুর্তের জন্যেও আমি বাড়ি ছেড়ে যাবো না সেদিন। সামান্য ভুলের জন্যে তীরে এসে তরী ডোবাতে চাইনা আমি।" 

ক্যাফেটরিয়ার নিষ্কর্মা কর্ণারে বসে মজিদ ভাইয়ের কথাগুলো কেমন যেন রহস্যে ভরা মনে হলো আমাদের কাছে। রীতিমত হেঁয়ালি।

- "হুঁম, বাড়িতেই আসবে তাহলে আন্দ্রে পল, তাই না ?? ", সব বুঝে গেছে এইরকম একটা ভাব করে মাথা দোলালো কবির। " তা এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, সশরীরে না এসেও তো আর পারা যায় না। কি বলেন ?? "

বাতাসের গতি বুঝে নিয়ে আমিও মজিদ ভাইকে শুনিয়ে ক্যাফের পিচ্চিটাকে চটপটির অর্ডার দেই। তারপরে মুখ ফেরাই মজিদ ভাইয়ের দিকে। "খুব জরুরী ব্যাপার নিশ্চয়ই ?? মানে ওই যে অপেক্ষার কথা বলছিলেন, সেটা নিশ্চয়ই বিশেষ মূল্যবান কিছুর জন্যেই। গুটেনবার্গ বাইবেল বা তুতানখামেনের মমি জাতীয়। ব্যাপারটা যদি একটু খুলে বলতেন... "

মজিদ ভাই খুলে বলবার আগে চটপটির পুরো প্লেটটা সাফ করে দিলেন, একটা সিগারেট আর এক কাপ চাও শেষ হলো। আধো ঘুম আধো জাগরণের নান্টু পর্যন্ত উঠে দুয়েকবার গলা সাফ করে নিলো এই বিরতিতে। কাজেই এই বিরতিতে গোড়ার দিককার কথাও একটু বলে নিলেই পারি।

২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির আয়োজনে একটা চমৎকার অনুষ্ঠান আছে। মেজোমামা সরকারী বড় চাকুরে, নিখিল বাংলাদেশ বস্ত্রখাত না পানের বরজ কিসের যেন একটার মহাপরিচালক। সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে তিনিও ছিলেন। প্রতি বছরই এই রকম অনুষ্ঠানে দাওয়াত পান বলে এবছর মামার মাঝে উৎসাহের বেশ যেন খামতিই দেখা গেছে। স্ব-পরিবার আমন্ত্রিত হয়ে তিনি যে পাঁচখানা পাস পেয়েছিলেন, সেই পাঁচটাই আমি ঘাপিয়ে দিয়েছি। আমি, ফরহাদ, কবির আর নান্টু তো প্রস্তুতই- ইচ্ছে ছিলো সাথে মজিদ ভাইকেও নিয়ে যাবো। কিন্তু কিসের কি !! ধারণা ছিলো, মজিদ ভাইকে এসে এই দাওয়াতের কথা বলার পরেই উনি আমাদের মাথায় তুলে নাচতে থাকবেন। তার বদলে বরং দেখলাম উনি আরো চুপসে গেছেন। কি সব অদ্ভূত হেঁয়ালিও বানাচ্ছেন সমানে।

চায়ের কাপ শেষ করে মজিদ ভাই মুখ খুললেন। " তাহলে, জানতে চাস আন্দ্রে পল লোকটা কে- আর তার সাথে আমার অপেক্ষা করবার সম্পর্কটা কোথায়। এইতো ?? "

- "মানে, আপনার যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে... মানে..." টিচার ফরহাদ কথা যোগাতে চেষ্টা করে। বলার মতন তেমন কিছুই পায় না সে।

- "হুঁম, শোন তবে। " মজিদ ভাই সুদূরে চোখ রেখে ক্যাফেটরিয়ার নিষ্কর্মা কর্ণারে তার আরেকটা অভিযানের বয়ান আরম্ভ করেন।

- "বছর পাঁচেক আগের কথা। আমি তখন এই ঢাকাতেই, ছোটাছুটি থেকে অবসর নিয়ে থিতু হবার চেষ্টা করছিলাম সবে। এখন যে প্রোডাকশন হাউজের চাকরিটা দেখছিস,  সেই চাকরিটার বিষয়েই কথাবার্তা চলছিলো তখন। কাজেই হাতে বেশ সময় ফাঁকা পড়ে থাকে। এরকমই এক দিন, সময়টা জুন মাস মনে হয়। বলা নেই, কওয়া নেই- হঠাৎ বিকেলে ফোন। খাস ফরাসী উচ্চারণের 'কি খবর দোস্তো ?? দেশে এসে পুরোন বন্ধুকে একেবারেই ভুলে গেলে??' সম্ভাষণ শুনে চমকে উঠলাম।

- 'ওহ, পল !! তুমি ?? এতোদিন পর ?? ' মুহুর্ত পরেই ধরে ফেললাম আমিও- ফোনের অপর প্রান্তের লোকটা আর কেউ নয়, ফ্রেঞ্চ ইতিহাসবিদ আন্দ্রে পল। পুরোন দোস্তো। ফ্রেঞ্চ সিক্রেট সার্ভিসে কাজ করবার সময় বিশেষ একটা কাজের খাতিরে তার সাথে পরিচয় হয়েছিলো। এরপরে পরিচয় বন্ধুত্বের রুপ নিতে সময় লাগেনি। তারপরে দু'জনে একসাথে আরো বেশ কিছু ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। ... যাক, সেসব আরেক গল্প। কিন্তু অমন ঠাটা পড়া গরমের দিনে পলের ফোন পেয়ে সত্যি বেশ ভালো লাগছিলো। এই ভালো লাগাটা খানিক পরেই প্রচন্ড বিস্ময়ে রুপ নিলো, যখন শুনলাম পল এখন খোদ ঢাকাতেই। এয়ারপোর্টের অদূরে একটা বেশ নামী হোটেলে উঠেছে। আমাকে তার বিশেষ দরকার। সম্ভব হলে যেন এখুনি গিয়ে দেখা করি। ফোনে আর কথা না বাড়িয়ে আসছি জানিয়ে, রওয়ানা দিলাম আমি।

পুরো রাস্তাটা ট্যাক্সীতে ভাবতে লাগলাম প্রয়োজনটা কি হতে পারে। পল পড়ুয়া মানুষ। নিতান্ত দরকারী কিছু না হলে এই রকম পৃথিবী পাড়ি দিয়ে ঢাকা শহরে তার আসবার কথা নয়।

হোটেলটা বেশ ছিমছাম। রিসেপশনের কাউন্টারে দাঁড়িয়েই খাতাটা একনজর দেখে পলের রুম নাম্বার জেনে নিলাম। লিফট দিয়ে ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছতেও দেরী হলো না।

ঘরে ঢুকেই দেখলাম পুরো ঘরে বইপত্র-খাতা-পুরোন কাগজ ছড়িয়ে একাকার। পলের সাথে এ অভ্যেস একেবারে মানানসই। পুরোন বন্ধুকে অনেকদিন পরে দেখলে যা হয়, খানিক 'কেমন আছো, ভালো তো' টাইপ কথাবার্তা চললো। একটু শান্ত হবার পরে বসে পলের কাছে জানতে চাইলাম ঘটনা কী। পলও নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে একটা কোলার বোতলে হালকা চুমুক দিতে দিতে ঘটনাটা খুলে বললো আমায়। 
    
' বুঝলে মজিদ,' বলতে থাকে পল। ' গবেষণার খাতিরে গত বছরখানেক ধরে আমি রয়েছি লন্ডনে। গবেষণার বিষয়, গত শতাব্দীর নিকৃষ্টতম গণহত্যাগুলো। তোমাদেরই মুক্তিযুদ্ধও কিন্তু পাকিস্তানি হানাদারেদের এইরকম এক গণহত্যা দিয়েই শুরু হয়েছিলো। যা হোক, গত তিনমাস ধরে ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সেইসব গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ- পেপারকাটিং আর প্রবন্ধ ঘেঁটে বেড়াচ্ছি। কাজটা ক্লান্তিকর- সন্দেহ নেই। তবে মাঝে মাঝে শিউরে উঠি, বুঝলে- মানুষ যে কত হীনমনা হতে পারে, তা এইসব ইতিহাস না ঘাঁটলে বোঝা যাবে না।...

আসল প্রসঙ্গে আসি। এইসব পুরাতন বইপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতেই তিনদিন আগে আমার হাতে এসে পড়লো একটা ডায়েরী। জার্নাল টাইপ। ডায়েরীটা লিখেছে এন্ড্রু রেমন্ড নামের এক আমেরিকান। ডায়েরীর বিক্ষিপ্ত দিনলিপি থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাড়াটে হিসেবেই কাজ করতো এই এন্ড্রু। ১৯৭১ এর মার্চ মাস পর্যন্ত সে এই ঢাকাতেই অবস্থান করছিলো। '

আন্দ্রে পল সোজা হয়ে বসে, তার গলার স্বরে উত্তেজনা লক্ষ্য করি আমি। ' ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, ২৫ মার্চের দুইদিন পরের ডায়েরির এন্ট্রি। এন্ড্রু লিখেছে, অপারেশন সার্চলাইটের রাতে- পাকিস্তানি সেনারা যখন তোমাদের এই ঢাকাবাসীদের নির্বিচারে হত্যা করছিলো, ঠিক সেই সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার দেয়া একটা বিশেষ পাস নিয়ে মোট চারজন ভাড়াটে আমেরিকান তখন যন্ত্রপাতি বোঝাই এক লরিতে মূল্যবান কিছু একটা নিয়ে ছুটে যাচ্ছিলো ঢাকার রাজপথ ধরে। সন্ধ্যে ছয়টার বিমানে পশ্চিম পাকিস্তানে রওয়ানা দেয় ইয়াহিয়া, তবে যাবার আগে এই কাজটা করবার দায়িত্ব দিয়ে যায় তাদের চারজনের হাতে।

এন্ড্রুর ডায়েরীতে তার সঙ্গী হিসেবে নাম রয়েছে জন রিড নামের আরেক আমেরিকানের। বাকি দুইজনের পুরো নাম উল্লেখ না করা হলেও ডায়েরীতে তাদের ডাকা হয়েছে এলেক্স এবং স্টিভেনসন বলে। পুরো ঢাকা শহর যখন নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞের শিকার হচ্ছে, এই চারজন তখন ব্যস্ত মূল্যবান কিছু একটা পুরোন ঢাকার ইমামগঞ্জ এলাকার চম্পাতলী লেনে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখতে। রেমন্ড বলেছে, লোভী ইয়াহিয়া এক ঢাকা শহরে খোঁজ পেয়েছিলো অমূল্য এক প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের। ইয়াহিয়া আশা করেছিলো পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে লোকেদের চোখের আড়ালেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে সরিয়ে নেবে সেই জিনিসটা। তবে, মূল্যবান বস্তুটা কী, সে প্রসঙ্গে কোন সূত্রই ডায়েরীতে দেয়া নেই। তবে লরি বোঝাই ভারী যন্ত্রপাতির কথা বলা আছে, এ থেকে আন্দাজ করা যায় সেটা বড়সড় কিছুই হবে। তাছাড়া, ছোটখাটো কিছু হলে ইয়াহিয়া নিশ্চয়ই সাথে করেই সেটা নিয়ে যেতে পারতো।

এন্ড্রু রেমন্ড এবং তার তিন সহযোগী পরদিনেই বিশেষ একটা ডাকোটা বিমানে উড়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। আশা ছিলো, অচিরেই সেই লুকিয়ে রাখা জিনিসটা বের করে নিয়ে যেতে পারবে... কিন্তু ইয়াহিয়ার কপালটা মন্দ। জীবনে আর ওই মূল্যবান বস্তুটা ফিরিয়ে নেয়ার ভাগ্য হয়নি তার। রেমন্ড ডায়েরীতে উল্লেখ করেছে- ওই অমূল্য সম্পদটি এখনো মাটিচাপা পড়ে রয়েছে চম্পাতলী লেনে। তোমরা এখন জায়গাটিকে ছোটকাটরা বলে চেনো।'

উত্তেজিত স্বরে পল বলে, 'চিন্তা করতে পারো মজিদ ?? ইয়াহিয়া পর্যন্ত লোভে জর্জরিত হয়ে উঠেছিলো যে কিউরিওর লোভে, সেই জিনিস তোমাদের ঢাকা শহরে মাটির নীচে পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে ??... এই সংবাদ পেয়েই আমি তোমার কথা মনে করে আর দেরী করিনি। ছুটে এসেছি ঐ কিউরিও উদ্ধারে। দারুণ একটা ঐতিহাসিক আবিষ্কার হবে সেটা।'

আমি বলি, 'শান্ত হও পল। এখন সন্ধ্যে রাত পেরিয়ে গেছে। আজকে আর কিছু করা যাবে বলে বোধ হচ্ছে না। পুরোন ঢাকার অলিগলির উপর আরেকটা রাত আস্থা রাখো। তোমার ঐ কিউরিও আজ রাতটা জিরোক। কাল সকালেই আমরা দেখতে যাবো ছোটকাটরা।'

পলকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে কোন রকমে নিরস্ত করা গেলো। পারলে সে তখনই বেরিয়ে পড়তে চায়। যা হোক, সে রাতে বাসায় ফেরবার সময় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো মাথায়,  কিউরিওটা কী হতে পারে ??

পরদিন সকালেই আবার হোটেলে গেলাম,  পলের সাথে বেরিয়ে পড়বার জন্যে অবশ্য পুরো দিনের প্রস্তুতিটা নিয়ে নিয়েছিলাম। অথচ ঘরে ঢুকতেই পলের মুখে কিরকম যেন একটা শঙ্কার ছায়া দেখলাম বলে মনে হলো। ' মজিদ, মনে হচ্ছে আমাদের পেছনে লোক লেগেছে। ' বললো পল। 'গতকাল রাতেই আমার ঘরে কে যেন হুমকি দিয়ে একটা চিরকুট রেখে গেছে। তাতে লেখা- ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও, কালে খানকে খোঁজবার চেষ্টা করলে তার ফল ভালো হবে না।'

'দেখো তো ব্যাপারটা, ' কাঁদোকাঁদো স্বরে বললো পল, বেচারা বইয়ের জগতের মানুষ- বাস্তবের জগতের লোভী দিকটার পরিচয় পেয়ে সে রীতিমত উদভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। ' চিরকুটটা যে হুমকি দিয়ে লেখা, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কে লিখলো, সে কীভাবে জানলো আমরা কোন কিছু খুঁজছি, কালে খান লোকটাই বা কে... এসব তো আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। '

চিরকুটটা দেখলাম। চমৎকার বিশুদ্ধ ইংরেজীতে ইউরোপীয় ঘরানার হাতের লেখা। যে লিখেছে, সে আর যাই হোক- পলের মতন ফ্রেঞ্চ নয়। চিরকুট দেয়াটা বাইরের লোকের চেয়ে হোটেলের কোন বাসিন্দাই দিয়েছে-সেটা ভাবাই যৌক্তিক। অথচ এয়ারপোর্টের কাছে বলে এই হোটেলে সর্বদাই বিদেশীদের ভিড় লেগে আছে, ও পদ্ধতিতে আলাদা করা যাবে না কাউকে।

মাথায় একটা নতুন চিন্তা আসলো তখন। পলের সাথে হোটেলের রিসেপশনে গিয়ে পলের সাথে একই দিনে যারা হোটেলে উঠেছেন, তাদের নামটাও দেখলাম। তালিকা ছোট হলো না। ঐদিন প্রায় চল্লিশজন ভিনদেশীর সাথে পল হোটেলে উঠেছে। তাদের মাঝে আবার দশ-বারো জন এসেছে পলের সাথে একই বিমানে। এদের মাঝে যে কেউই হুমকি দিয়ে চিরকুটটা লিখতে পারে। আবার সেটাও কিন্তু নিশ্চিত নয়, এমনও তো হতে পারে হোটেলের বাইরে থেকেই কেউ এসে পলের ঘরে চিরকুটটা ফেলে দিয়ে গেছে। সেই ক্ষেত্রে সন্দেহ করবোই বা কাকে ?? ...

কি ভেবে নামগুলো দেখলাম একবার। এরপর একটা ফোন করলাম ইন্টারপোলে। সব শেষে, একটা ট্যাক্সী ডেকে পলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পুরোন ঢাকার দিকে। মনটা বেশ ফুরফুরে, পলকে বলেকয়ে পুরো টুরিস্টের পোষাকে বের করে এনেছি।

ট্যাক্সীতে উঠে পলের হতভম্ব ভাবটা কাটানোর জন্যে বললাম, ' চিন্তা করো না পল। তোমার রহস্যময় চিরকুটের লেখকের পরিচয়টা মনে হয় হদিস করতে পেরেছি। সন্ধ্যেয় ইন্টারপোলে আরেকটা ফোন করলেই নিশ্চিত হয়ে যাবে সব।'

পল এখনো কৌতুহলী। ' কিন্তু কে- কীভাবে কিছুই তো বুঝতে পারলাম না। ... কালে খান লোকটাই বা কে ??'

'তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর পাবে যথাসময়ে।' বললাম আমি।' আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলি- প্রশ্নটা হবে 'কালে খান কে' নয়, 'কালে খান কি ?'। সত্যি বলতে কি, তোমার ঐ মূল্যবান কিউরিওটা কী হতে পারে, সেটা আমি কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। কিন্তু এই চিরকুটটা পড়ে বরং একটা নিশ্চিত পথের সন্ধান পেলাম। এজন্যে চিরকুট লেখককে একটা ধন্যবাদ দেয়াই যায়...

 কালে খান কোন ব্যক্তিবিশেষ নন। কালে খান একটা কামান। মুঘল আমলের এই কামান নিয়ে স্মৃতিকথায় লিখে গেছেন অষ্টাদশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হয়ে রাইটার হয়ে ঢাকায় আসা রবার্ট লিন্ডসে, আর  পরবর্তীতে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে আসা চার্লস ডয়েলি। পুরোন ঢাকারই লালবাগ কেল্লায় এখন 'বিবি মরিয়ম' নামের একখানা কামান দেখা যায়। এই কামানের সমসাময়িক অপর আরেকটি কামান ছিলো, যেটি দীর্ঘকাল ধরে নিখোঁজ। সেই কামানটিই 'কালে খান'। কামান দুইটিই তৈরী হয়েছিলো সপ্তদশ শতকে। ধারণা করা হয় মগ আর আরাকানদের আক্রমণ ঠেকাতে। কালের প্রভাবে এখন বিবি মরিয়ম হয়ে উঠেছে ডাহাকার একটি দর্শনীয় বস্তু, কিন্তু দুইশো বছর পূর্বে কালে খানের জমকের সামনে এই বিবি মরিয়ম দাঁড়াতেই পারতো না। বিখ্যাত অষ্টাদশ শতকের ভূগোলবিদ জেমস রেনেল এই কামনের বিবরণে লিখেছেন এটি প্রায় তেইশ ফুট লম্বা ছিলো। নির্মাণ আর গঠনে এটা ছিলো এতো চমৎকার, যে দেশীয়রা এর উপর অলৌকিকত্ব পর্যন্ত দাবি করতো। রবার্ট লিন্ডসে নিজের স্মৃতিকথায় বলেছিলেন- কুসংস্কারাচ্ছন্ন দেশীয়রা বলতো এটা স্বর্গ থেকে পতিত হয়েছে। এজন্যে তারা প্রদীপ জ্বেলে এটিকে পূজোও দিতো

... বিবি মরিয়মের তুলনায় কেন এতো বেশি সম্মান ছিলো কালে খানের ?? কারণ, কিংবদন্তী দাবি করে, এই কামানের ভেতরে গোপনে কোথাও লুকিয়ে রাখা আছে মুঘল ইতিহাসের গোপন ইতিহাস। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুইশো বছর ধরে এই কামানের কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে একদম শুণ্যে মিলিয়ে যায় কালে খান। কেউ বলে বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে গেছে কালে খান। কেউ দাবি করে এই কামান সবসময় রাজার অধীনে থাকে। কাজেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, এরপরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর তাদের পথ ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজ্য এবং ক্ষমতালোভী ইয়াহিয়ার কাছে এই কামান চলে যাবে, সেটাও খুব কঠিন কিছু মনে হয় না। কেবল একটা জায়গা বোঝা যাচ্ছে না। চিরকুট লেখক কি করে জানলো, এই কালে খানের কথা ??...'

কামানের ইতিহাস শুনে পুরো রাস্তা উত্তেজিত হয়ে রইলো পল। ভেতরে ভেতরে আমিও কম রোমাঞ্চিত নই। মুঘল ইতিহাসের গোপন দলিল আর হারানো কামানের খোঁজ কি সত্যি পাওয়া যাবে এবার ?? ...

ট্যাক্সী থামলো চম্পাতলী লেনে। ছোট কাটরার অবস্থা দেখে রীতিমত হতাশ হলো পল। কিসের ঐতিহ্য-ইতিহাস, ভাঙ্গা দুয়েকটা দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এককালের চমৎকার এই দালানের চারপাশে কেবল মানুষ পিঁপড়ের মতো গিজগিজ করছে। ভিনদেশী পলকে দেখে কৌতূহলী হয়ে এগিয়েও এলো অনেকে। খানিক চেষ্টা করে তাদের বোঝাতে সক্ষম হলাম যে পল একজন সাধারণ টুরিস্ট। এইসব পুরোন দালান-টালান দেখতেই আসা তার। এদের হাত থেকে কোনক্রমে নিস্তার পেয়ে অবশেষে আমরা পৌঁছলাম এন্ড্রুর ডায়েরীতে বর্ণনা করা জায়গাটায়।

কাজে লাগতে পারে ভেবে গাইগার কাউন্টার- মেটাল ডিটেকটর জাতীয় টুকটাক যন্ত্রপাতি ব্যাগে করে নিয়েই আসা হয়েছিলো। লোকজনের চোখ এড়িয়ে মেটাল ডিটেকটরটা বের করে খানিক এদিকওদিক করলাম আমরা। এন্ড্রুর ডায়েরী লেখার পরে তিরিশ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে। কাজেই ভূগর্ভের লুকিয়ে রাখা কোন কিছু সামান্য নড়েচড়ে গেলে অবাক হবার কিছু নেই। ভাগ্য বেশ ভালোই বলতে হবে। মিনিট পাঁচেকের বেশি অপেক্ষা করা লাগলো না। যন্ত্রটার ইয়ারপিসে বেশ বড় রকমের কম্পন ধরা পড়লো। প্রায় বিশফুটের কাছাকাছি এলাকা জুড়ে এই কম্পন, মাটির প্রায় দশফুট গভীর থেকে। বন্ধু পল আনন্দে প্রায় দিশেহারা। সন্দেহ নেই, কালে খানকেই খুঁজে পেয়েছি আমরা। অথচ দিনের বেলায় চারপাশের কর্মব্যস্ত পরিবেশের মাঝ থেকে এই কামান বের করে আনার কোন রাস্তাই নেই। কাজেই পলকে জানিয়ে দিলাম আজ রাতেই হবে কামানটাকে উপরে তুলে আনার কাজ। অন্ততঃ নিশ্চিত হতে হলে মাটি খোঁড়া ছাড়া উপায় নেই আর। যন্ত্রপাতি ব্যাগে ঢুকিয়ে ট্যাক্সীর দিকে ফিরছি আমরা, ঠিক এই সময়েই ঘটলো ঘটনাটা।

হঠাৎ কোথা হতে ছুটে এসে প্রচন্ড বেগে পলকে ধাক্কা দিলো একটা লোক। ছিটকে পড়লো পল। লোকটা পলের হাতের ব্যাগটা তুলেই ছুট। পল আঘাত পেয়েছে নাকি সেটা দেখবো, নাকি লোকটার পিছনে ছুটবো; এই দোনামোনাতে নষ্ট হলো কয়েকটা মুহুর্ত- আর লোকটা উধাও হয়ে গেলো পুরোন ঢাকার গোলকধাঁধায়।

সৌভাগ্যক্রমে পলের আঘাত এমন কিছু ছিলো না। একটু ছড়ে গেছে শুধু। পলের ব্যাগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিলো নাকি জানতে চাইলাম, বিমূঢ় হয়ে থাকা পল কেবল জানালো এন্ড্রু রেমন্ডের ডায়েরীটা ছিলো সেখানে। বুঝলাম, পিছনের অজ্ঞাত শত্রুটি আমাদের অনুসরণ করে কালে খান পর্যন্তও পৌঁছে গেছে। সারা রাস্তা এরপর ট্যাক্সীতে নীরব হয়ে রইলো পল। হোটেলে ঢুকেই তাকে ভালোমত নাওয়া-খাওয়া সেরে পাঠিয়ে দিলাম বিছানায়। এরপরে, দুটো গুরুত্বপূর্ণ ফোন সেরে পলকে বিদায় জানিয়ে আমি চললাম রাতের অভিযানের প্রস্তুতি নিতে। উত্তেজনার ষোলকলা পূরণ করতে গরম কেটে গিয়ে ঢাকার আকাশে তখন দেখা দিচ্ছে বর্ষার মেঘ।

সময় মধ্যরাত। বৃষ্টির বেগ নিতান্ত কম নয়। আর তার মাঝে পুরোন ঢাকার ছোট কাটরার পেছনে দু'জন ব্যস্ত মানুষকে দেখা যাচ্ছে। একজনের হাতে টর্চলাইট,  বৃষ্টির ধারাকে ছিন্ন করে দেওয়া তীব্র আলোকরশ্মিতে দেখা যাচ্ছে অপর মানুষটির হাতে একটি হালকা মাটি কাটার ড্রিল। ড্রিলমেশিনের মৃদু গর্জনকে ঢেকে দিয়েছে বৃষ্টির শব্দ। মাটি সরানো হচ্ছে। প্রায় দশফুট নাগাদ পরেই মাটি কাটার মৃদু আওয়াজটা বদলে গেলো। টর্চলাইটের আলোতে প্রাচীন যেই বস্তুটির অংশবিশেষ মাটির নিচে দেখা গেলো- সেটি কামান ছাড়া আর কিছু নয়।

- 'ইউরেকা মজিদ !! ইউরেকা !! ', সোল্লাসে চ্যাঁচিয়ে উঠলো আন্দ্রে পল। ' কিংবদন্তীর কালে খানকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেলো তাহলে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাঝে কি সাড়াটাই পড়ে যাবে- চিন্তা করো !! '

- 'ঠিক বলেছো।' উল্লাস সংবরণ  করে বলি আমি। ' এবার আর সরকারী সংস্থাদের জানাতে অনুমানের উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। চাক্ষুষ প্রমাণ দেখে কেউই আর অবিশ্বাস করবে না। আমাদের কাজ আপাতত শেষ। '

বৃষ্টির শব্দে পেছনের পায়ের শব্দ শুনতে পাইনি। পায়ের আওয়াজ শুনে তাই চমকে পেছনে তাকাতে যাচ্ছিলাম আমরা। ' একদম ঠিক বলেছেন জনাব মজিদ। আপনাদের কাজ শেষই বটে।... উহুহু, পেছনে ফেরবার কোন চেষ্টা করবেন না। আগে মঁসিয়ে পলের হাতের টর্চলাইটটা সামনের ঐ পাথরের উপর রাখুন। হ্যাঁ, এবার ফিরুন। তবে চালাকির কোন চেষ্টা করবেন না। আমার ডানহাতে একটা কোল্ট রিভলবার একদম প্রস্তুত হয়ে আছে।'

- 'কিন্তু... তুমি... তুমি কে ?? ' কাঁপাকাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে পল।

- 'উনি আর কেউ নন।' নিরাসক্ত গলায় জবাব দেই আমি। ' এন্ড্রু রেমন্ডের ডায়েরীতে সহযোগী হিসেবে যে জন রিডের নাম লেখা ছিলো- ইনি সেই ভাড়াটে বদমাশ জন রিডের পৌত্র জেমস রিড। কালে খানের খোঁজ না করবার জন্যে পাঠানো চিরকুটটার ইনিই লেখক।'

- 'হাহাহা,' গলা কাঁপিয়ে হাসলো খানিক লোকটা। ' চালাক লোক আপনি মজিদ, সন্দেহ নেই। হোটেলের খাতায় আসল নামটা লেখার পরেই বুঝতে পেরেছিলাম এই পরিচয় ফাঁস হতে পারে। কি আর করা, ঝুঁকিটা নিয়েই নিয়েছিলাম। রিসেপশনের খাতায় মঁসিয়ে পলের খানিক পরেই আমার নাম- তবুও কেউ ধরে ফেলবে এটা ভাবতে একটু কষ্টই হয়।'

- 'কষ্টের কী আছে, ' বলি আমি। ' ইন্টারপোলে পরিচিত লোকজন আছে আমার। তারাই জানালো একাধিক ব্যাংক ডাকাতির কেসে সন্দেহভাজন হিসেবে তোমার নাম থাকলেও প্রমাণের অভাবে তোমাকে বারংবার ছেড়ে দিয়েছে মার্কিন পুলিশ। এরপরে যখন জানলাম, ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে ফোন করে এন্ড্রু রেমন্ডের জার্নাল এই মুহুর্তে কে পড়তে নিয়েছে- সেটাও জানতে চেয়েছো তুমি; তখন দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে আর তো সমস্যা হবার কথা না। '

- 'নাহ, কাজের লোক তুমি মজিদ আহমেদ, স্বীকার না করে পারি না। '

- 'কাজের লোক তো তুমিও কিছু কম নও।' বিনয় দেখিয়ে বলি আমি। ' হাজার মানুষের রক্তে হাত রাঙানো ইয়াহিয়ার হয়ে ভাড়া খাটতো তোমার দাদা আর তার সুযোগ্য নাতি হয়ে তুমি ব্যাংক ডাকাতি করো, ইতিহাসবিদদের দিকে পিস্তল উঁচিয়ে বেড়াও।'

- 'হয়েছে হয়েছে, আর ওসব উঁচু বক্তৃতা দিও না। ... চিরকুট দেখিয়ে সাবধান করতে চাইলাম, দিনে দুপুরে স্থানীয় মাস্তান দিয়ে ধাক্কা পর্যন্ত দেয়ালাম- তার পরেও গাধার মতন কামানটার পিছেই লেগে রইলে তোমরা। স্টুপিড সব...'

- 'কিন্তু, কালে খানের কথাটা তুমি কি করে জানলে ?? ' প্রশ্ন ছোঁড়ে পল।

- 'ওটা আর এমন কি। ঘরের কোণার পুরোনো চিঠিপত্র ফেলতে গেলাম সেদিন। বেরিয়ে পড়লো বাবাকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে লেখা দাদুর একখানা চিঠি। বিস্তারিত লেখা ছিলো সব ঐখানে। দাদুর বন্ধু রেমন্ড যে নিজের ডায়েরীতে সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গেছে, তাও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। কাণ্ডটা দেখো, ঠিক কামান লুকোনোর জায়গাটার কথা আসতেই দেখলাম চিঠিটা ইঁদুরে খেয়ে নিয়েছে। ভাগ্যটা খুব খারাপ ভেবেছিলাম। কিন্তু ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে ফোন করতেই যখন জানলাম রেমন্ড সাহেবের ডায়েরী হাতে নিয়ে ঢাকার দিকে রওয়ানা হয়েছেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আন্দ্রে পল, তখন শাপেবর কথাটার আসল মজা বুঝলাম। হেহে... এরপরের অংশ তো তোমরা জানোই। ঘড়ির কাঁটা ধরে তোমাদের অনুসরণ করে এই পর্যন্ত চলে এলাম। '

- 'হুম, কথা তো অনেক বললে, ' বলি আমি। ' কিন্তু আমাদের নিয়ে কি করবে- বললে না তো।'

- 'সে কী, গোয়েন্দা উপন্যাস পড়োনি দু'চারটা !! ' অবাক হলো যেন জেমস রিড। 'সোজা দুটো গুলিতে দুইজনকেই স্বর্গে পাঠাবো। ... দারুণ লোক ছিলে তুমি মজিদ আহমেদ, কী আর করা। আর কখনো দেখা হবে না তোমার সাথে। মঁসিয়ে পল, আপনি আল্লা-খোদার নাম বলে নিন। অউ রিভোয়া।'

ধীরে সুস্থে কোল্ট উঁচিয়ে নিশানা তাগ করলো শয়তানটা। ... আর ঠিক সেই মুহুর্তেই সার্চলাইটের সুতীক্ষ্ণ আলো এসে পড়লো বদমাশটার চোখেমুখে। একটা সেকেন্ডের জন্যে প্রবল আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিলো ব্যাটার, সেটাই যথেষ্ট ছিলো। পরমুহুর্তে আমার হাতের ঘুঁষি খেয়ে যখন ব্যাটা মাটিতে গড়াচ্ছে- ঠিক তখনি সার্চলাইটের পেছনে শোনা গেলো একদল মানুষের গলার আওয়াজ।

সূত্রাপুর থানার ওসি পলাশ মন্ডল জিভ কাটলেন। 'এহ হে, এক্কেরে পিস্তল বাইর কইরা ফেলাইসে দেখি খাচ্চরটা... সরি স্যার। কি করমু কন, বর্ষার ফাস্‌ট বিষটি স্যার- এক্কেরে প্যাকের কাদা জইমা গেসে রাস্তাত। গাড়িই আটকায়া পড়সিলো শালার...'। "


ক্যাফেটরিয়ার নিষ্কর্মা কর্ণার মুখর হয়ে উঠলো মজিদ ভাইয়ের নীরবতায়। সবার আগে টিচার ফরহাদই মুখ খুললো, " কিন্তু মজিদ ভাই, কামান তো পাওয়া গেলোই। কাজেই আপনি যে বললেন আন্দ্রে পলের জন্যে অপেক্ষা করছেন?? তা কী জন্যে ?? কামানটাই বা কোথায় ??"

- "বলছি, শোন। কালে খান মুঘল আমলের আর দশটা কামানের মতোই দেখতে। তবুও কিংবদন্তী কেন ওটার নামে এতো রঙ নিয়ে ছড়িয়েছে ?? ... কারণ, আগেই বলেছি- কথিত আছে কামানের ভেতরের কোন গোপন খাপে লুকানো রয়েছে মুঘল ইতিহাসের অমূল্য সব দলিল। কামান তো প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করে নেবে সরকার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে ওসব দলিল কি কখনো আর উদ্ধার করা যাবে তখন ?? ... এই কথা ভেবে আমি একটা আইনবিরুদ্ধ কাজ করেছি বটে। সে রাতেই কামানের গোপন কুঠুরি থেকে সাংকেতিক ভাষায় লিখিত দলিলগুলো দিয়ে দিয়েছি পলকে। অবশ্যই ধার হিসেবে। পল কথা দিয়েছে, এই দলিলগুলোর অর্থোদ্ধার হয়ে গেলেই সে আমায় ফেরত দিয়ে যাবে। পল বলেছে, কোন এক স্বাধীনতা দিবসেই সে আসবে। এই দিনের তাৎপর্য সে ভালোই বোঝে।...আমারও তাই ২৬ মার্চে ঘর ছেড়ে বের হওয়া হয় না কখনো।"

- "কিন্তু জেমস রিডের কী হলো ?? ব্যাটাকে জেলে পোরা হয়নি ??" প্রশ্ন করে কবির।

- "ওসব সাদা চামড়ার বদমাশকে কি আমাদের জেল আটকে রাখতে পারে ?? তার উপর ইয়াহিয়ার দালালের নাতি হারামজাদা- উপর মহল থেকে ভালোই চাপ এসেছিলো। দুদিন পরেই বের হয়ে নিজ দেশে ফিরে গেছে হারামজাদা। সেখানে অবশ্য জেল খাটতে হচ্ছে তাকে।"

- "আর কামানটা ?? কালে খান এখন কোথায় ?? " আমার প্রশ্ন।

মজিদ ভাই এবার যেন খানিকটা আনমনা হয়ে যান। খানিক পরেই মুখ খোলেন, তবে অনেক ধীরে-ক্যাফেটরিয়ার নিষ্কর্মা কর্ণার এবার যেন অন্য কোন মজিদ ভাইকে আবিস্কার করে আজ এতোদিনের পরিচয়ের পর। " কামানটা ?? ... সরকারী মহলে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিলো কামানটা যাদুঘরে রাখা হবে। অথচ তা হলো না। ... চমৎকার একটা দেবীমূর্তি খোদাই করা ছিলো কালে খানের গায়ে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যায় কলকাঠি নেড়ে ছিলো যারা - তাদের একটা অংশই তো ভোল পালটে এখন আমাদের মসনদে। ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে প্রথমে কামানটা প্রদর্শন বন্ধ করে দিলো তারা। এরপরে কামানটা হারিয়ে গেলো। সরকারী চাকুরে বন্ধুদের কাছে শুনেছি কামানটা বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে... কী চমৎকার একটা জিনিস ছিলো সেটা !! কতদিনের ইতিহাস !! সব শেষ হয়ে গেলো..."

নিষ্কর্মা কর্ণার বেমানান রকম গম্ভীর। আমি, ফরহাদ, কবির; এমন কী নান্টুও নিশ্চুপ।

মজিদ ভাই ঘৃণার একদলা থুতু ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। " দুর্ভাগা দেশ আমরা। দুর্ভাগা জাতি। "

 **************

মজিদ ভাইয়ের গালগল্পগুলো আমাদের টেবিলে চাপড় মারা বিনোদনের অংশ হলেও এবার আমরা হাসতে পারিনি। বরং তার শেষ কথাটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলো আমাদের সবাইকে।

২৬শে মার্চকে তাই আর আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাঝ দিয়ে পালন করলাম না আমরা। আমন্ত্রণপত্র থাকা সত্বেও গেলাম না বঙ্গভবনে। এর বদলে স্বাধীনতা দিবসে আমাদের পাড়ায় যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, ঘুরে ঘুরে তাঁদের কাছ থেকে সংগ্রহ করলাম সেই কালো রাতের অভিজ্ঞতা। ফরহাদ ঠিকমতো রেকর্ডারে টুকে নিলো সব। ভবিষ্যতে ইন্টারনেটে তরুণ প্রজন্মের কাছে এইসব ইতিহাস ছড়িয়ে দেয়া হবে।

এইসব কাজে পুরো স্বাধীনতা দিবস পেরিয়ে গেলো। কাজেই খবরটা আমাদের কানে পৌঁছলো পরদিন।

সকালের ক্লাসে যাবার আগে ঘুম তাড়াতে ক্যাফেটরিয়ায় বসে চুমুক দিচ্ছি চায়ের কাপে। কবির ছুটতে ছুটতে এলো কোত্থেকে। আমাদের প্রশ্নবোধক দৃষ্টির সামনে সামনের টেবিলে মেলে দিলো খবরের কাগজ। প্রথম পৃষ্ঠার নীচের দিকে একটা খবরের ঊপর হাত রাখলো সে।

খবরটায় লেখা, ২৬শে মার্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে হিথরো ছেড়ে আসা একটা বোয়িং বিমান গতকাল আকস্মিক এক অঘটনে জরুরী ল্যান্ডিং করেছে মাঝপথে। বিমানের একজন যাত্রী হঠাৎ করেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। যাত্রীটি ছিলেন প্রখ্যাত ফরাসী ইতিহাসবিদ আন্দ্রে পল।



1 টি মন্তব্য:

  1. ব্যবহৃত ছবিটি ১৮৭৫ সালের ছোট কাটরার।

    আন্তর্জাল হতে সংগৃহীত।

    উত্তরমুছুন