বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১১

লাইফ ইজ বিউটিফুল

আমার পছন্দের সিনেমার তালিকায় সবচেয়ে উপরে রয়েছে যে সিনেমাটি, সেটির নাম 'লাইফ ইজ বিউটিফুল'। জীবন বড় সুন্দর। সিনেমা নিয়ে যারা একটু সময় ব্যয় করেন, তাদের প্রায় সকলেই রবার্তো বেনিনির এই ইতালিয়ান ক্লাসিক দেখে থাকবেন। যারা সিনেমাটি দেখেননি, তাদের জন্যে গল্পের টুকরো অংশ বলে দেয়া যায়। সিনেমার কাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। ইহুদীদের উপর জার্মান নাৎজীদের নিপীড়ণের গল্প। ইহুদী পিতা গুইডোর গল্প। পুত্র জোশুয়াকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে আড়াল করতে চাওয়ার চেষ্টা নিয়ে গল্প। সিনেমার শেষে অপেরার সুরে মাথায় ঘুরতে থাকে একটাই আপ্তবাক্য, লাইফ ইজ বিউটিফুল- লাইফ ইজ বিউটিফুল। জীবন বড় সুন্দর।


এই জাতীয় আবেগ নির্ভর সিনেমা আমায় বড় নাড়া দেয়। কঠিন বাস্তবের জগতে সেটি হয়তো মানুষ হিসেবেই আমার দূর্বলতা। এই ধরণের সীমাবদ্ধতা আমার আরো আছে। অতি দ্রুত আবেগতাড়িত হয়ে পড়া আমার সেইসব অগণিত সীমাবদ্ধতার একটি। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে এই অবান্তর লেখা লিখতে বসেছি সেই দূর্বলতার বশেই।

এই লেখার উৎপত্তি একটি ভিডিওক্লিপ দেখবার পর। যুদ্ধ বিষয়ক একটি ভিডিওক্লিপ। ১৯৭১ সালের ঢাকার অদূরের একটি গ্রাম থেকে নিউ ইয়র্কের এবিসি নিউজের প্রতিবেদক হাওয়ার্ড টাকনারের সচিত্র প্রতিবেদন। ভিডিওক্লিপটি সকলের দেখা উচিৎ ভেবে জুড়ে দিচ্ছি আধুনিক সিধুজ্যাঠা ইউটিউবের ঠিকানা।



সূর্যাস্তের ঠিক পূর্বে এই গ্রামটিতে হানা দেয় সেনাবাহিনী। নির্বিচারে হত্যা করে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধদের। মোট ৭৫ জন। মহিলাদের মারবার পূর্বে ধর্ষণ। ছোট শিশুদের মারবার পূর্বে বিশেষ স্থানে বেয়নেট ঢুকিয়ে দেয়া। জীবন্ত মানুষদের আটকে রেখে পোড়ানো।

আড়াই মিনিটের এই ভিডিওক্লিপটি দেখবার পরে আমি অযথা অসহ্য বোধ করি। 'ইটস্‌ আ ম্যাসাকার।'  শ্বেতাঙ্গ প্রতিবেদক হাওয়ার্ডের গলাটাও কি একটু ভারী শোনায় ?? জানি না। সেটি আমার অপ্রকৃতস্থ মস্তিষ্কের কল্পনা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ষাট বছর পরে, ২০০৫ সালের ঘটনা । কোন একটা আমন্ত্রিত জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নেহাত মজা করে নাৎজী স্বস্তিকা চিহ্ন শরীরে এঁটে ছবি তুললেন কনিষ্ঠ ইংরেজ রাজপুত্র হ্যারি। এবং অতিদ্রুত তুমুল আলোড়ন উঠলো গণমাধ্যমে, নিন্দার ঝড়। জনতার কাছে মাথা নুইয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন হ্যারি। ইংরেজরা নিছক খেয়ালের বশে প্রিন্স হ্যারির এই স্বস্তিকা চিহ্ন ধারণ মেনে নেয়নি। কারণ, ষাট বছরের পুরোনো সেই গণহত্যা তাদের হৃদয়ে এখনো নিশ্চয় রক্তপাত ঘটায়। সেই স্মৃতি তারা একটা দুই ঘন্টার সিনেমা ভেবে মস্তিষ্কের নিউরন থেকে সরিয়ে ফেলেনি।

প্রচুর পতাকা ওড়ানো সমর্থকের সামনে মীরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান ক্রিকেট দল উড়িয়ে দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। যেকোনো পর্যায়ের ক্রিকেটে দশ উইকেটে জয় একটা খুব বড় সাফল্য। আমার যাবতীয় ক্ষুদ্রতা আড়াল করে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানাই। সমর্থকেদের জন্যে জানাই শুভকামনা।

এরপর, আমি আবার ওই ভিডিওক্লিপটি দেখতে বসি। আমি আবার অসহ্য বোধ করি।

'খেলা আর রাজনীতি এক নয় ' কিংবা 'পুরোনো ইতিহাস মনে রেখে কী হবে', এইসব ঝলমলে কারুকাজ করা ন্যাপকিন সরিয়ে রেখে- আমি বদ্ধচিন্তার মানুষ- পকেট থেকে বাংলাদেশের নাম লেখা একটা পুরোনো শতছিন্ন রুমাল বের করে চোখ মুছি।

লাইফ ইজ বিউটিফুল- জীবন বড় সুন্দর।  কথাটা যারা বলেন, তারা মিথ্যে বলেন।  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন