বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০১১

হুমায়ূনের হুমায়ূন

ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে আমার সাম্প্রতিক ধারণা খুব উঁচু নয়। তবে এই ধারণা সবসময়েই বহাল ছিলো বলে ভাবলে ভুল করা হবে। ঠাকুর বুড়োটা যে বলে গিয়েছিলেন- সহজ কথা যায় না বলা সহজে, সেই কঠিন কাজটি হুমায়ূনের চেয়ে ভালো করে পরিচিত কে করে গিয়েছেন- বলা কঠিন। এরপরেও হুমায়ূনের নিয়ে আমার অভিযোগ আছে, যেমনটা আছে আমার মতোই অগণিত মনোযোগী পাঠকের। যেই ঔপন্যাসিক 'নন্দিত নরকে' আর 'কোথাও কেউ নেই' লিখতে পারেন, তিনি কী করে 'সানাউল্লাহর মহাবিপদ' বা 'হলুদ হিমু কালো র‍্যাব' লেখেন ভেবে অবাক হই। পরম মমতায় হিমু আর মিসির আলীকে গড়ে তোলেন যে হুমায়ূন-তাকেই দেখি সময়ের সাথে পাষাণ জেনারেল ডায়ার হয়ে হিমু আর মিসির আলীর বুকে উন্মুক্ত গুলি চালাতে।


হুমায়ূন কি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে পারেন ?? একই সাথে – হ্যাঁ এবং না। হুমায়ূন বলেন, তাকে ঘিরে থাকা প্রকাশকেরা বলেন এবং মিডিয়া আর পত্রিকারা বলেন- হ্যাঁ। আমি ও আমার মতো কতিপয় নাদান পাঠক বলি- না। কাজটা সুনীল গাঙ্গুলী পারেন ‘সেই সময়’ বা 'পূর্ব-পশ্চিমে'র মোড়কে, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় পারেন 'তুন্দ্রাভঙ্গের তীরে' বা 'কুমারসম্ভবের কবি'র কলমে ,  শওকত আলীর 'প্রদোষে প্রাকৃত জনে' ,ছেলেভোলানো হলেও প্রেমেন্দ্র মিত্তির পারেন 'সূর্য কাঁদলে সোনা'র অভিযানে। একটু  চেষ্টা করে হাসনাত আবদুল হাইয়ের 'সুলতান' কি 'নভেরা', বা হালের শাহাদুজ্জামানের 'ক্রাচের কর্ণেল'কেও ঢুকিয়ে আমি ঢুকিয়ে ফেলি ঐতিহাসিক ঊপন্যাসের ঝোলায়। হুমায়ূন পারেন, বলবেন অনেকে, যেমনটা পেরেছেন 'জোছনা ও জননীর গল্পে' বা 'মধ্যাহ্নে'। পাঠক হিসেবে আমি বৈশ্যশ্রেণীর হলেও নিয়মিত এবং মনোযোগী। সেই ব্যক্তিগত অবস্থানে থেকেই আমি বলবো, কয়েকটা ইতিহাস নির্ভর সাল-তারিখ-নামাবলী এবং ঘটনা ছাড়া আমার আলোচ্য উপন্যাসদ্বয় পাঠকালে কখনো মনে হয়নি আমি ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়ছি। মনে হয়েছে আমি কেবল হুমায়ূনের চিরকালীন মানবিক উপন্যাসই পড়ে যাচ্ছি, যা কেবল টাইম মেশিনে চেপে পেছনের সময়ে জুড়ে বসা।  

দিনটা বিষ্যুদ আর মনটা উড়ুউড়ু বলে মন বসলো না অটোমোবাইলের ক্যাঁচক্যাঁচানিতে। অতএব ম্যাট্রিক শেষে আপাত অবসরে থাকা বোনের কাছ থেকে মৃদু ধমকে কেড়ে নিলাম তার ধার করে আনা হুমায়ূনের নতুন উপন্যাস, বাদশাহ নামদার। লোকমুখে যেটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে শুনেছিলাম।

ঐতিহাসিক চরিত্রের মাঝে  আমার মুঘল বাদশাহ বাবরকে বেশ মনে ধরে। ছোটবেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বেশ কিছু চাররঙা কমিকস পাওয়া যেতো, বিখ্যাতদের বাবুতোষ জীবনী নিয়ে। বাবর, তিতুমীর, এ কে ফজলুল হক- এরকম আরো নামধাম। তার মাঝে ফারগানার মতো ছোট্ট একটা নগররাষ্ট্র হতে বারবার ঘা খেয়েও দিল্লীশ্বর হয়েছিলো বলেই হোক, অথবা কবির মন নিয়ে যোদ্ধার জীবনযাপন করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলেই কি না- বাবরের প্রতি আমার টানটা একটু বেশিই। পরবর্তীতে তার আত্নজীবনী তুযুক-ই-বাবর আর পিরিমকুল কাদিরভের ঐতিহাসিক উপন্যাস বাবর পড়ে সেই আকর্ষণে ভাটা পড়েনি। অথচ সেই বাবরের সন্তান হিসেবেও হুমায়ূন আমার কাছে খুবই অনাকর্ষণীয় একজন ছিলেন। ভাইদের হাতে ক্রমাগত নাস্তানাবুদ হচ্ছেন, এরপরেও তাদের ক্ষমা করে দিচ্ছেন; শেরশাহ তাকে শায়েস্তা করে ভারতবাসীর মন জিতে নিচ্ছেন, পুত্র আকবরকে ত্যাগ করে যাচ্ছেন শত্রুর দয়ার অপেক্ষায় রেখে- পরাক্রমশালী বাবর আর ইতিহাস আলো করে রাখা আকবরের মাঝে হুমায়ূনের স্থান কোথায় ?? একালের ঔপন্যাসিক হুমায়ূন বাদশাহ নামদার উপন্যাসে স্থান করে দিয়েছেন সেকালের খামখেয়ালী বাদশাহ হুমায়ূনকে।

বাদশাহ হূমায়ূনের রাজত্বকাল খুব শান্তির ছিলো না, জানেন সকলেই। দুরারোগ্য রোগাক্রান্ত হুমায়ূন আর পিতা বাবরের মৃত্যু সংক্রান্ত ঘটনাটি যেমন রহস্যময়, তেমনি ব্যাখ্যার অতীত সব ঘটনা জুড়ে রয়েছে হুমায়ূনের সমস্ত জীবন। উপন্যাস বাদশাহ নামদার এ এইসব নানা অদ্ভূত ঘটনাবলীর মাঝ দিয়ে উঠে এসেছেন ব্যক্তি হুমায়ূন, লেখকের বর্ণনায় হুমায়ুন ধরা পড়েছেন কবি, খেয়ালী, চিত্রকর এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন বাদশাহ হিসেবে। স্বভাবসুলভ হালকা চালের কথোপকথনকে সঙ্গী করেই হুমায়ূন আহমেদ তার চরিত্রের সাথে বেমানান শ্রম আর গবেষককের স্থিতধী দৃষ্টিতে এনেছেন বাদশাহ হুমায়ূন। পরম মানবিক হুমায়ূন। উপন্যাসের পার্শ্বচরিত্র হিসেবে এসেছেন বৈরাম খান- মীর্জা কামরান- আচার্য হরিশংকর- হামিদা বানু এবং আরো অনেকেই।  পাঠক হিসেবে আমার একদিনের বাদশাহ নিজাম ভিস্তিওয়ালার ঘটনা যেমন জানা ছিলো,  ঠিক ততটাই অজ্ঞাতে ছিলো  আকিকা বেগমের উপাখ্যান কিংবা  শেরশাহ পুত্র ইসলাম শাহের কথা।  সেইসাথে অসাধারণ সব শায়েরের উদ্ধৃতি থাকে উপন্যাস জুড়ে। এইসব নানা গল্পের মাঝে এগোয় বাবরপুত্র হুমায়ূনের জীবনী বাদশাহ নামদার- কেবল মানুষকে সাথে করেও যে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখা সম্ভব, হুমায়ূন আহমেদ তা করে দেখান।

বাদশাহ নামদার প্রসঙ্গে অভিযোগও আছে। সর্বসাধারণের অভিযোগ এর অত্যাধিক দামটা। ধ্রুব এষের করা একটি অসাধারণ প্রচ্ছদযুক্ত বইটির পৃষ্টা আকারে ছোট আর ফন্টের সাইজ বড় করে পৃষ্ঠা সংখ্যা বেশ বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। একে এখন দেখাচ্ছে মোটাসোটা বিদেশি পেপারব্যাক থ্রিলারের মতন।
আরেকটি অভিযোগ আমার রইলো হুমায়ূন আহমেদের কাছেই। এই জাতীয় একটা চমৎকার উপন্যাস পড়ার পর প্রায়ই নির্ঘন্ট দেখবার শখ জাগে। প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বইগুলো ঘেটে দেখার উপায় হুমায়ূন রাখেননি। বইতে নিয়মিত টীকা যোগ করা হলেও রেফারেন্স দেয়া হয়নি প্রায় সর্বদাই, সেটি থাকলেই বইটি সম্পূর্ণ হয়ে উঠতো বলে মনে হচ্ছে আমার।

বড়সড় কোন আশা নিয়ে ‘বাদশাহ নামদার’ পড়তে বসিনি আমি। বসবার পড়ে তাই ঠিক ১০০ মিনিট পরে যখন উঠে বসি বিছানা থেকে, তখন বুঝি; এখনো- এই অসময়েও আমাকে আক্ষরিক অর্থেই বই শেষ না হওয়াতক বসিয়ে রাখতে পারেন একটি লেখকই। তাঁর নাম হুমায়ূন আহমেদ। ‘বাদশাহ নামদার’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে আমি তাই ক্ষমা করে দেই গত কয়েক বছরে হুমায়ূনের প্রতি জমা করে রাখা যত ক্ষোভ।

সাথে অনুযোগও থাকে। যে ঔপনাসিকের বলপয়েন্টে বেরোয় বাদশাহ নামদার- প্রতি বছর তাঁর মনোযোগী পাঠকদের কেনো মাতম করতে হয় " হায় হুমায়ূন ! হায় হুমায়ুন ! " বলে ??

৪টি মন্তব্য:

  1. কোন লেখকের সাথে যদি লাভ-হেট ব্যাপার থেকে থাকে, হুমায়ুনের প্রতি আমার তা আছে। বাদশাহ নামদার পড়ে আমিও মুগ্ধ হয়েছি; মুগ্ধ হয়েছি হুমায়ূনের জানার পরিধি দেখে আবারো।
    তবে তাকে ক্ষমা আমি করতে পারবো না; এতটা মেধা নিয়ে পাঠককে বছর বছর একগাদা সস্তা জিনিস গেলানোর দায় তিনি এড়াতে পারেন না।।


    লেখা ভালো হয়েছে বরাবরের মতোই।

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  3. চমৎকার রিভিঊ।

    নির্ঘন্ট আমিও চাইসিলাম। কিন্তু ব্যাটা লুকখ্রাপ।

    উত্তরমুছুন
  4. হুমায়ুন আহমেদই সম্ভবত এক পিস মানুষ, যার কোনো কিছুই আমার চোখে দোষ হিসেবে ধরা পরেনা! আমি জানি, এটা খুবই খারাপ। তবুও, কেন যেনো পারিনা! এ লোকের দেবী,নিশিথীনি, বৃহন্নলা, নন্দিত নরকে, কোথাও কেউ নেই, শংখনীল কারাগার- পড়েছি বলেই হয়তো তিনি আমার কাছে সাধারণ মানুষ, সাধারণ লেখকের থেকেও অনেক উপরের কোনো এক স্থানে, যেখান থেকে কোনো দোষ-ত্রুটি দেখা যায়না !

    উত্তরমুছুন