বুধবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০১১

বিশ্বকাপের কালো ঘোড়া

তাঁরা পনেরোজন। কেঊ ডানহাতে ব্যাট ধরেন, কেউ বামহাতে বল ঘোরান। কারো কাজ একপ্রান্ত আগলে রেখে সঙ্গত দিয়ে যাওয়া, কেউ হয়তো কার্যকরী স্লগ ওভারে বিরোধী দলের টুঁটি চেপে ধরতে। দায়িত্ব, বয়স আর কার্যকারিতায় এমন নানা পার্থক্য অবশ্যই আছে তাদের মাঝে। তবুও এক বিন্দুতে মিলে যাচ্ছে এই পনেরোজনের নাম। কারণ ২০১১' ক্রিকেট বিশ্বকাপে এই পনেরোজনই বাংলাদেশের প্রতিনিধি, আমাদের স্বপ্নসারথী। এরা হলেন-



১। সাকিব আল হাসান (অধিনায়ক),
২। তামিম ইকবাল (সহ-অধিনায়ক),
৩। ইমরুল কায়েস,
৪। জুনায়েদ সিদ্দিকী,
৫। শাহরিয়ার নাফীস,
৬। রকিবুল হাসান,
৭। মো.আশরাফুল,
৮। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ,
৯। মুশফিকুর রহিম,
১০। সোহরাওয়ার্দী শুভ,
১১। নাঈম ইসলাম,
১২। শফিউল ইসলাম,
১৩। রুবেল হোসেন,
১৪। নাজমুল হোসেন
১৫। আব্দুর রাজ্জাক

... এই পনেরো তরুণ তুর্কীর সাথে কোচ হিসেবে যোগ করুন জেমি ড্যারেন সিডন্সের নাম, অনেকের মতেই টেস্ট খেলতে না পারা সেরা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার। আরো আছেন বোলিং কোচ ইয়ান পন্ট এবং ফিল্ডিং কোচ জুলিয়ান ফাউন্টেন।

সিডন্সের অধীনে সাকিব-তামিমের বাংলাদেশ দল, 'টাইগার'রা বিবেচিত হচ্ছে এই বিশ্বকাপের দান উলটে দেবার ক্ষমতাসম্পন্ন দল হিসেবে। বোদ্ধা কিংবা সমালোচক নয়, সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী দর্শক হিসেবে বিচার করতে চাই এই বিশ্বকাপে বাঘের গর্জনে শুনবার সম্ভাবনা আসলে ঠিক কতটুকু, কী করতে পারে বাংলাদেশ দল- আমাদের দল।
[img]http://img3.allvoices.com/thumbs/event/598/486/65816988-bangladeshs-cricket.jpg[/img]

বিশ্বকাপ একাদশঃ

প্রায় নিশ্চিতভাবে, বিশ্বকাপের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি বার উঠে আসছে যে প্রসঙ্গটি- সেটি হলো একাদশ নির্বাচন। প্রধান নির্বাচক রফিকুল আলম এবং সহকারী নির্বাচকদ্বয় আকরাম খান ও জাহিদ রাজ্জাক মাসুমের জাতীয় নির্বাচক কমিটি পনেরো সদস্যের দল নির্বাচনে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বিতর্ক যা, সেটি কেবল দুইটি ক্ষেত্রে। প্রথমত- স্কোয়াডে মোঃ আশরাফুলের উপস্থিতি , দ্বিতীয়তঃ মাশরাফি বিন মর্তুজার অনুপস্থিতি।

মোঃ আশরাফুল ও রকিবুল হাসানের অন্তর্ভুক্তি জন্ম দিয়েছে স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান অলক কাপালিকে কেনো দলে নেয়া হয়নি- এই বিতর্কের। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষের হোম সিরিজের ঠিক পূর্বে জাতীয় লীগের ওয়ানডে টুর্নামেন্টে আশরাফুল করেছিলেন ৭ ম্যাচে ৩৩১ রান । রকিবুল হাসানের সংগ্রহ ছিলো ৩ ম্যাচে ১৯১ রান এবং অলক কাপালির ৫ ম্যাচে ১৩০ রান। দেখা যাচ্ছে, জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে সিরিজে যথাযথ ভাবেই ডাক পেয়েছিলেন আশরাফুল এবং রকিবুল। সেই সিরিজে অবশ্য একটিমাত্র ম্যাচে সুযোগ পেয়ে আশরাফুল করেছিলেন ৬ রান এবং পরের তিন ম্যাচে তার পরিবর্তে খেলার সুযোগ পেয়ে রকিবুল করেছেন ৬৫, ১২, ০ রান। এই সিরিজের পরে ঘরোয়া প্রিমিয়ার ডিভিশন লীগেও বেশ ভালো করেছেন আশরাফুল ও রকিবুল। সেখানে ৩৮ গড়ে আশরাফুলের সংগ্রহ ৩৮২ এবং ৩৫ গড়ে রকিবুলের সংগ্রহ ৩১৫ রান। অতএব, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা অলক কাপালির জায়গা স্কোয়াডে না হওয়াতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। নির্বাচকেদের ধন্যবাদ দিতেই হয় চাপের মুখে এই রকম সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে।

মাশরাফি বিন মর্তুজার অতীত রেকর্ড আর অনমনীয় আগ্রাসী মনোভাবের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে তাকে বাংলাদেশের সেরা পেসার বলে গণ্য করা হচ্ছে। ইনজুরি থেকে এখনো পুরো সেরে ওঠেননি 'নড়াইল এক্সপ্রেস', বিশ্বকাপের ঠিক পূর্বে হয়তো সেরে উঠবেনও। কিন্তু তার দীর্ঘদিনের ইনজুরি সখ্যতা এবং বর্তমান এক্স-রে রিপোর্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইনজুরি থেকে সেরে উঠেই ম্যাচে নেমে গেলে তার ডান হাঁটুর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সংগত কারণেই, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরো অনেক কিছু যিনি দিতে পারেন, সেই মাশরাফির এই ঝুঁকিটা নেয়া উচিৎ হবে বলে মনে হয় না। আডিওস ম্যাশ- এবার হলো না। ইনজুরিকে জয় করে আপনি বিশ্বকাপের পরে আবার ফিরবেন আপনার পরিচিত রুপে, এই কামনা।

পনেরোজনের স্কোয়াড হতে এগারজনের একাদশ বাছাইটাও সহজ কাজ হবে না। ন্যূনতম ছয়টি ম্যাচ খেলতে হবে প্রতিটি দলকে, কাজেই সহজেই বোঝা যায়- একটি একাদশেই আটকে থাকছে না প্রতিটি দলের স্ট্র্যাটাজি। পরিসংখ্যান আর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের দলিল ঘেঁটে আপাতত কেবল অনুমান করা যায় কোন একাদশকে প্রাথমিক ভাবে মাঠে নামাতে চাইবেন নির্বাচকেরা।

ইনিংস ওপেন করবার ক্ষেত্রে তামিম ইকবাল এবং ইমরুল কায়েস অবশ্যই অটোমেটিক চয়েস। তামিমের চোখ জ্বালানো ব্যাটিং-এর পাশে ইমরুলের শ্রমিকসুলভ প্রান্ত আগলে রাখার কাজটা নজরে একদমই পড়ে না, কিন্তু গত পুরো বছর জুড়ে ইমরুল ছিলেন ধারাবাহিক। এই দু'জনের জায়গা দলে সিমেন্টে বাঁধানো বলে মনে হচ্ছে।

ওয়ানডাউনের ক্ষেত্রে নির্বাচকেদের কাজটা খুব কঠিন হয়ে যাবে। কারণ গত বছর বেশ ভালো পারফর্ম করেছেন এই জায়গায় খেলা জুনায়েদ সিদ্দিকী ও শাহরিয়ার নাফীস। দুই বাঁহাতির মাঝে আরো একটি মিল হলো- এরা দুজনেই মেকশিফট ওয়ানডাউন ব্যাটসম্যান, যারা পূর্বে ইনিংস ওপেন করতেন। আইসিএল থেকে ফিরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ করেছেন নাফীস তবে ডাক পাননি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষের সিরিজে। সেখানে আবার ভালো করেছেন জুনায়েদ। সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় অবশ্য জুনায়েদকে একটু পেছনেই রাখতে হচ্ছে, কারণ সাম্প্রতিক চলতে থাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লীগে নাফীসের রানসংগ্রহ ৩৯১- সমসংখ্যাক ম্যাচে জুনায়েদের সেখানে মাত্র ৩০২। আন্তর্জাতিক ওয়ানডে রেকর্ডেও নাফীস এগিয়ে, তার ৩৩ গড়ের পাশে জুনায়েদের গড় মাত্র ২৪। সিডন্সের অন্যতম প্রিয় শিষ্য সিদ্দিকীর পক্ষে থাকবে অবশ্য গত বিশ্বকাপে নাফীসের দুঃসহ ফর্মের ইতিহাস।

চার নম্বর জায়গা ছেড়ে পাঁচে সাকিব আল হাসান আর ছয়ে মুশফিকুর রহিমের জায়গা পাকা। প্রিমিয়ার লীগের পুরোটা ওয়ানডাউনে ব্যাট করে ৭২ গড়ে ৫৭৬ রান করা মুশফিক নির্বাচকেদের মধুর সমস্যায় ফেলে দিয়ে ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশনও পেতে পারেন। সাত নাম্বারে অবধারিত পছন্দ মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ব্যাটিং সক্ষমতার পাশাপাশি তার অফস্পিন আমাদের বাঁহাতি স্পিনার ত্রয়ীদের মাঝে বৈচিত্র্য আনবে নিশ্চিত। 

সাকিব ছাড়া অপর বাঁহাতি স্পিনারদ্বয় খেলবেন আট ও নয় নাম্বারে। নয়ে আবদুর রাজ্জাক অবশ্যই থাকবেন। আটে খুব সম্ভব সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় সোহরাওয়ার্দী হবেন নির্বাচকেদের পছন্দ। আটের জন্যে নাইম ইসলামও বিবেচনায় থাকবেন- তার ব্যাটিং সক্ষমতার জন্যে তিনি থাকছেন নির্বাচকেদের অন্যতম অপশন হিসেবে। দুই পেসার খেললে দশ ও এগারো নাম্বারে সম্ভাব্য পছন্দ হিসেবে আসছেন যথাক্রমে শফিউল ও রুবেল। এছাড়া নাজমুল তো রইলেনই বদলি পেসার হিসেবে ঝালিয়ে দেখার জন্যে।

চার নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটির জন্যে লড়াই চলবে আশরাফুল এবং রকিবুলের মাঝে। মোঃ আশরাফুলের ব্যাটিং প্রতিভা নিয়ে কারোই সংশয় নেই বোধ হয়, ঠিক তেমনি সংশয় নেই যে টেম্পারেমেন্টের দিক থেকে রকিবুল আশরাফুলকে ফেলে দিচ্ছেন অনেকটা পেছনে। সাম্প্রতিক ফর্ম দু'জনের ভালো। বিশ্বকাপের ঠিক পূর্বে আশরাফুল দাবি করছেন বড় আসরের বিগ ম্যাচে তার ভালো করবার কথা এবং অতীত রেকর্ড বলছে আশরাফুল ভুল বলছেন না। সিডন্সের নিজস্ব পছন্দের খেলোয়াড়দের একজন রকিবুলের পক্ষে আছে তার সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ওয়ানডে রেকর্ড। সাবেক নির্বাচক ফারুক আহমেদও তার এক কলামে প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে একাদশে রাখেন নি আশরাফুলকে। এতে করে আশরাফুলের উপর চাপ কমবার প্রত্যাশা করছেন তিনি। কাজেই আশঙ্কা সরিয়ে রেখে আমরা আশায় বুক বাঁধি আসুন। কারণ হিসেবে ২০০৭এর বিশ্বকাপে দঃআফ্রিকার বিপক্ষের ম্যাচে মধ্যাহ্ন বিরতিতে ইয়ান চ্যাপেল আর টনি গ্রেগ বাংলাদেশের ক্রিকেট সাহিত্যে চিরকালের জন্যে ঢুকে যাবার মত যে কথোপকথনটি চালিয়েছিলেন, সেটিই তুলে দিই।
- " আশরাফুল খেললে কি হয় জানো তো ?" 
- " খুব জানি। ... অস্ট্রেলিয়াও হারে !! "


মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠঃ

স্কোয়াড থেকে এধারওধার করে বিশ্বকাপের একাদশ পাওয়া গেলো। এইবার দেখে নিতে চাই রেসের নামতে যাওয়া কালো ঘোড়াদের হাতের অস্ত্রগুলো ঠিক কী কী।

বাংলাদেশ দলের মূল শক্তি বোলিং। ক্রিকেট বিশ্বে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ দলের নাম রটে গেছে বাঁহাতি স্পিনারদের দেশ বলে। তিন বাঁহাতি স্পিনার, একজন অফ স্পিনার, সাথে দুই মিডিয়াম পেসার- এই হলো বাংলাদেশের বোলিং সেনাদল। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ দল দেশের মাটিতে প্রতিপক্ষকে গত দু'বছরে তিনশো রানের সীমা পার করতে দেয়নি [বাংলাদেশের করা ২৯৬ রানের জবাবে ভারত অবশ্য গত বছরের জানুয়ারীতে ২৯৭ করেছিলো ১৫ বল হাতে রেখেই।]। কাজেই পরিচিত কন্ডিশনে আমাদের বোলারদের উপর আস্থা রাখা যায়।

বোলিং ডিপার্টমেন্ট বাদে টাইগারদের পক্ষে থাকবে চিরচেনা মাঠ আর দর্শক সমর্থন। সেই সাথে যোগ করুন বর্তমান স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের সাম্প্রতিক ফর্ম। সব মিলিয়ে জমাট একটা লড়াইয়ের আশা আমরা করতেই পারি।

মুদ্রার অপরপিঠে বাংলাদেশের দূর্বল দিকগুলোর তালিকা তৈরী করলে তার শীর্ষে আসবে ব্যাটিং ডিপার্টমেন্টের ধারাবাহিকতার অভাব। তামিম-ইমরুল-নাফীস-জুনায়েদ-সাকিব-মুশফিক-রকিবুল-আশরাফুল; প্রত্যেকেরই সামর্থ্য আছে দীর্ঘক্ষণ ব্যাট করার। কিন্তু সত্যিকারের ব্যাট হাতে ধারাবাহিক ঐ সাকিব-তামিম, আর গত বছরের ইমরুলকে ছাড়া কাউকে আমরা এখনো পাইনি। কেবল বিশ্বকাপের নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরাতন সমস্যাই ব্যাটসম্যানদের এই অধারাবাহিকতা।

সমস্যার আরেক নাম পাওয়ার প্লে। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে, 'ব্যাটিং পাওয়ার প্লে'। ওয়ানডে ক্রিকেটে এখন যে পেশাদারিত্বের চল, তাতে সামান্য হিসেবের গোলমালে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়বার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। স্ট্র্যাটাজিক ভুলের ফাঁদে পা দিয়ে পুরো ৪০ ওভার ভালো ব্যাটিং করেও ব্যাটিঙের শেষ দশ ওভারে ক্ষতি হতে পারে অপূরণীয়। গত বছর দেড়েক ধরেই দেখা যাচ্ছে হাতে যথেষ্ট পরিমাণ উইকেট নিয়েও ব্যাটিং পাওয়ার প্লে'র সদ্ব্যবহার বাংলাদেশ দল করতে পারছে না। অন্যান্য দলগুলোর উদাহরণ থেকে দেখা যায় মোটা দাগে হাতে চার উইকেট থাকলেই ৪১-৪৫ ওভার তারা পাওয়ার প্লের জন্যে বরাদ্দ করে ব্যাটের ঐ আক্রমণের ধারা শেষ ৫ ওভারেও নিয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বারবার হাতে উইকেট থাকলেও শেষ ৫ ওভারের জন্যেই জমিয়ে রাখা হচ্ছে পাওয়ার প্লে'র অপশন। অনেক ক্ষেত্রেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত দেরী করায় উইকেটে জমে ওঠা ব্যাটসম্যান হচ্ছেন আউট আর দলের খাতায় ১৫-২০ রান কম সংগ্রহ হচ্ছে। এই সমস্যা বিশ্বকাপের মত বড় আসরে বেশ প্রভাব ফেলতে পারে। আশার কথা, কোচ সিডন্স সম্প্রতি জানিয়েছেন এই পাওয়ার প্লে'র সমস্যা কাটিয়ে উঠতে লোয়ার অর্ডারে মাহমুদুল্লাহ এবং মুশফিককে নিয়ে কাজ করছেন তিনি। আশায় রইলাম এর সুফল পেতে। 
  
যারা প্রতিপক্ষঃ 

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ প্রতিপক্ষ হিসেবে পাচ্ছে ভারত, আয়ারল্যান্ড, ওয়েস্ট-ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তিনটি দলের বিপক্ষে জয় পেলেই কোয়ার্টার ফাইনালে যাবার সম্ভাবনা থাকে, তবে সেটি হয়ে যায় গ্রুপের অন্যান্যদের উপর নির্ভরশীল। পক্ষান্তরে চারটি জয় পেলে পরের পর্বে উত্তরণের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ হয়ে যায়।

বিশ্বকাপের প্রথমেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে র‍্যাঙ্কিং-এর শীর্ষ টেস্ট দল ভারতের। গত বিশ্বকাপে এই বাংলাদেশের কাছে হেরেই প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়া ভারত এবারো শিরোপার অন্যতম দাবিদার। কাজেই নিশ্চিতভাবেই গতবারের মত কালো ঘোড়াদের এগিয়ে যেতে দিতে চাইবেন না মহেন্দ্র সিং ধোনি। এই বাড়তি সতর্কতা বাংলাদেশের কাজটা করে দেবে খুবই কঠিন। ১৯ ফেব্রুয়ারীর ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে জয় পেতে বাংলাদেশকে তাই খেলতে হবে সত্যিকারের গুড ক্রিকেট।

ভারতের বিপক্ষের চিত্রনাট্যটা সম্পূর্ণ উলটে যাবে আইরিশদের বিপক্ষে। কেবল গত বিশ্বকাপেই নয়, এরপরেও বাংলাদেশকে আরো একবার হারিয়েছে আইরিশরা। বাংলাদেশ অবশ্য ২০০৮ এর হোম সিরিজে 'বাংলা ওয়াশ' করেছিলো এই আইরিশদেরই। অঘটনের শিকার হয়ে চিকেন ড্যান্স দেখতে না চাইলে বাংলাদেশকে থাকতে হবে সতর্ক।

'বড়দল'গুলোর ভেতরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষের খেলায় বাংলাদেশ হতে পারে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী। একসময়ের ক্রিকেট সাম্রাজ্যের মুকুট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আজকাল বড় অসহায়। রেকর্ড বলছে গত এক বছরে এমনকি ঘরের মাটিতেও জিম্বাবুয়ে ছাড়া অন্য কোন দলকে হারাতে পারেনি ইন্ডিজ। বিশ্বকাপের দলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় বলতে আছেন কেবল ক্রিস গেইল, রামনরেশ সারওয়ান আর শিবনারায়ণ চন্দরপল। কিরণ পোলার্ড, ডেভন স্মিথদের প্রতিভা নিয়ে সংশয় না থাকলেও এখনো বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচে তাদের খুব বেশিবার ঝলসাতে দেখা যায়নি। কাজেই ঘরোয়া কন্ডিশনে নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু প্রয়োগ করলে ইন্ডিজ বধের আশা আমরা করতেই পারি।

বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার ইংল্যান্ডও পড়েছে বাংলাদেশের গ্রুপে। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে আগে অজিদের কাছে গো-হারা হেরে আসা ইংল্যান্ড গত বছর দুয়েক ধরে মোটামুটি অজেয় রুপেই ছিলো একদিবসী ক্রিকেটে। এদের বিপক্ষের ম্যাচে বাংলাদেশের প্রেরণা হতে পারে গত বছরেই দেশের আর ইংল্যান্ডের মাটিতে দলটির বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স। মীরপুরের মাঠে পেতে পেতে মরগানের এক অসামান্য সেঞ্চুরিতে জয় হাতছাড়া হলেও জুলাই মাসে ব্রিস্টলের মাটিতেই টাইগাররা ইংল্যান্ডকে দিয়েছে পরাজয়ের স্বাদ। ব্যাটে-বলে সমানতালে লড়াই চালাতে পারলে এই ম্যাচ হতে পারে সত্যিকারের স্নায়ূক্ষয়ী।

নেদারল্যান্ড খুব সম্ভব হতে যাচ্ছে সবচেয়ে অনায়াস প্রতিপক্ষ। তবে, যেহেতু এই দল সম্পর্কে প্রায় সকলেই অন্ধকারে- কাজেই বাড়তি একটু সতর্কতা টাইগারদের অবলম্বন করা উচিৎ। এই অজ্ঞানতার অংশটুকু বাদ দিলে আর নেদারল্যান্ডের সাথে দুঃচিন্তার কিছু থাকে না।

গ্রুপের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ থাকবে প্রোটিয়াসেরা। স্মিথের দঃআফ্রিকা চমৎকার ব্যালেন্সড দল। তবুও স্পিনের বিপক্ষে আফ্রিকানদের দুর্বলতা চিরন্তন। কাজেই নিজেদের সেরা খেলাটা যদি ম্যাচের প্রথম থেকেই খেলে বাংলাদেশ দল, তবে স্মিথদের উপর একটা চাপ সৃষ্টি করা খুবই সম্ভব। আর কে না জানে, হঠাৎ চাপে ভেঙ্গে পড়বার অভ্যেসটা প্রোটিয়াসদের পুরোনো।

প্রতিপক্ষদের এইসব শক্তি দূর্বলতা বাদ দিলে মাঠে দুই দলের খেলাকেই প্রভাবিত করতে পারে আরো দুটো জিনিস। প্রথমটি শিশির। আয়ারল্যান্ড আর দঃ আফ্রিকা বাদে বাংলাদেশের বাকি চারটি খেলাই দিবারাত্রির। এইক্ষেত্রে পরে ব্যাট করা দল পেতে পারে কিছু বাড়তি সুবিধা।

দ্বিতীয় নিয়ামকটি হলো সমর্থন। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ। নিশ্চিত থাকুন, গ্যালারীর লাল-সবুজের ঢেউ থামবে না এক মুহুর্তের জন্যেও। গ্রায়েম স্মিথ, এন্ড্রু স্ট্রস, ড্যারেন সামি, মহেন্দ্র সিং ধোনি - শুনতে পাচ্ছেন নাকি ?? দৌড়ান, বাঘ আইলো !!... 


... এবং স্বপ্নঃ

টেস্ট ক্রিকেটে টাইগারদের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৈরীকৃত একটি ভিডিওক্লিপ দেখলাম সেদিন [পাঠকের সাথে শেয়ার করবার ইচ্ছাটা ছিলো পুরোমাত্রায়, কিন্তু কোন ফাঁকে যেন ব্যক্তি মালিকানার খপ্পরে পড়ে ভিডিওটি সাধারণের জন্যে নিষেধ হয়ে গেছে।]। খুলে দেখতে ইচ্ছা করছিলো না প্রথমে। ভাবছিলাম, কী হবে দেখে- ইনিংসেই তো হেরেছি বেশিরভাগ- দু'চারটে লড়াইয়ের স্মৃতি ভরসা কেবল। কী মনে করে দেখেই ফেললাম। মুরালি কার্তিকের বল সুইপ করে স্কোয়ার লেগে পাঠিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অবিনশ্বর সেঞ্চুরিটির মুহুর্তটি দেখলাম। সাব্বির-কানেরিয়া-গুল বধ করে অলক কাপালির হ্যাট্রিক দেখলাম। লর্ডসে সেঞ্চুরির পরে উদ্ধত তামিম ইকবালের হাত উঁচিয়ে অনার বোর্ডে নাম খোদাইয়ের ইঙ্গিত করা দৃশ্যটা দেখলাম। ... এবং জঘন্য নিন্দেমন্দ করা দলটার জন্য গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে এলো। মনে হলো, এই তো আমার দেশ। এটাই তো আমার দল। এই ছেলেরাই তো দুর্যোগ আর মন খারাপের খবরে ভরা দেশটাকে একের পর এক স্বপ্ন সত্যি করে দেখাচ্ছে।

কাজেই বাস্তবতার মরু আর পরিসংখ্যানের দুস্তর সায়র পেরিয়ে স্বপ্নদ্বীপের কথা বলি। ইশকুলের ঘণ্টার নিয়ম মেনে নিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলে এটা আর বিশ্বকাপ থাকে কেন ??... সংখ্যা আর ইতিহাসই যদি ভবিষ্যৎ বাতলায় তবে লাহোরের মাটিতে কী করে রচে পুঁচকে শ্রীলঙ্কার বিজয়মহাকাব্য, চেস্টার-লি-স্ট্রিটের জীবনের ইনিংসে হার্শেল গিবসের মত তুখোড় ফিল্ডার কী করে স্টিভ ওয়াহর হাতে তুলে দেন বিশ্বকাপ, ত্রিনিদাদের রাজপুত্র কী করে ক্রিকেটের রোমাঞ্চকরতম নাটকটির জন্ম দিয়ে কোর্টনি ওয়ালশকে সঙ্গী করে শেষ উইকেটে মাটিতে নামান অজিদের যুধিষ্ঠিরের রথ ?? ... উত্তর একটাই, কারণ খেলাটা ক্রিকেট; যেখানে প্রতিটি ম্যাচেই ঘটতে পারে-ঘটতে থাকে নতুন কিছু আর টিভি সেটের সামনে কি গ্যালারি থেকে নখ কামড়ে-টেবিল চাপড়ে দর্শক খোঁজে সেইসব অনিশ্চয়তার অমৃত।

অতএব দোষটা কোথায়, যদি স্বপ্নে দেখি মিড-উইকেটের উপর দিয়ে মিচেল জনসনকে আছড়ে ফেলছেন তামিম ইকবাল কিংবা মোঃ আশরাফুলের আরেকটি স্কুপে অনূদিত হচ্ছে হরভজন সিং-এর শিরোপাস্বপ্নের এলিজি ?? স্বপ্নের পরিধিটাকে যদি আরেকটু বাড়িয়ে নিই- তবে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে শেষ ওভারের ইয়র্কারে কুমারা সাঙ্গাকারার স্ট্যাম্প উড়িয়ে ২০১১ সালের আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা হয়ে যাচ্ছেন আমাদের রুবেল-নাজমুল-শফিউল; এটিই বা বলতে দোষ কোথায় ??...  

হারানোর কিছু নেই যাদের, তেমন একদল যূথবদ্ধ একদল গ্লাডিয়েটরদের একত্রিত করে প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে চাই একজন ম্যাক্সিমাস ডেসিমাস। ৯৬'এর অর্জুনা রানাতুঙ্গা কি ৯৯'এর স্টিভ ওয়াহ যেমনটা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত ম্যারাডোনা, দৈত্যসম অতীত ইতিহাসকে বধ করতে সোনার কৌটোর মাঝে লুকিয়ে রাখা প্রাণভোমরা, বিজ্ঞাপণের সীমানা পেরিয়ে সত্যিকারের 'বাংলাদেশের প্রাণ' হয়ে ওঠা সাকিব আল হাসান কি পারবেন সেই ম্যাক্সিমাস হতে ??...

পারবেন সাকিব। আপনি পারবেন, আপনারা পারবেন। এ স্বপ্ন সত্যি করার ক্ষমতা আপনারা রাখেন- আমরা জানি, জানেন আপনারাও। ১৯শে ফেব্রুয়ারী, শেরে-বাংলা স্টেডিয়াম হতে শুরু হোক অন্যান্যদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়ার কাজটা।

বাঘের গর্জন শুনুক বিশ্ব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন