শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১০

ইনসোমনিয়া

"Memories are all we end up with. At least pick the nice ones."
- Morales
  [The Secret In Their Eyes ( El Secreto De Sus Ojos)]

মৃত্যুর পূর্বমূহুর্তে শহরের লোকেরা নাকি ফিসফিসিয়ে 'নির্জনপুর ! নির্জনপুর !' বলে থাকে। এই শহরের মানুষেরা মুখোশও পড়ে থাকে সবসময়ই- হয়তো মৃত্যুর সময়েও তারা সেটি খুলে নিতে অলসতা বোধ করে। কাজেই ঠিক মরণের ক্ষণে সেইসব ফিসফিস স্বরকে তাদের মুখোশের অন্তরালের প্রলাপ বলে আখ্যা বোধহয় দেয়া যায়। অথবা ইটের, অথচ মানুষের, শহরে আজীবন নির্জনতার দেখা না পেয়ে হতাশ লোকেরা বিষন্নতা থেকেই নির্জনপুর খোঁজে- ব্যাখ্যাটা হয়তো এভাবেও দেয়া যায়। আরো শুনি, ' নির্জনপুর ! নির্জনপুর !' বলে ডাকের পরেই নাকি লোকেরা মারা যায়- অথচ শহুরেরা কিন্তু বেঁচে থাকে এরপরে আরো বহুক্ষণ। বহুদিন-মাস-বছর। শহরের লোকেরা বেঁচে থাকে; বড়ছেলের অফিস ঘরের ঝোলানো ফ্রেমে- কনিষ্ঠ কন্যার মুঠোফোনের পর্দায়- নাতিদের জন্মোৎসবের সময় জানা-অজানায় নেয়া অজস্র স্থিরচিত্রে। অথচ এই সকল স্থিরচিত্রে কিন্তু মুখের পরিবর্তে মুখোশটাই দেখা যায়। নবীনেরা তা জানে না, প্রবীণেরা না-জানাটা না দেখিয়ে জেনে থাকে কেবল। তবে লোকে প্রাণপণে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণে মুখোশ খুলে রেখেই পুরুষেরা আর মহিলারা নির্জনপুরের কথা বলে। নইলে তারা তো আর নির্জনপুরের সন্ধান করতে পায় না। মৃত্যুপথযাত্রীর সে ফিসফিস ডাকের সাথে নাকি একটা ছাই রঙের হাওয়া ভেসে আসে শহরের দিকে। সে হাওয়ায় কয়েকজন লোক নির্জনপুরের দিকে ভেসে যায়। যেমন যায় আলী মর্তুজা।

আর এই মুহুর্তে, নির্জনপুরের উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা আলী মর্তুজার উদ্দেশ্যে নিজস্ব পেশাগত ঢঙে ইচ্ছামানুষ প্রশ্ন রাখে, কোন ঘুমভাঙানি স্মৃতি তাকে এই নির্জনপুরের পথ পাড়ি দিয়ে নিয়ে এসেছে।

এর পূর্বে আমরা দেখেছিলাম, নির্জনপুরে আসবার পথে আলী মর্তুজা খুব দ্রুত অগ্রসর হতে পারেনি মোটেও। সরু হাঁটা পথে একপেয়ে জলদস্যুর মতো শ্লথগতির এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের উপস্থিতি তার গতি মন্থর করে। বৃদ্ধকে সে পথেই চলতে দেখে আলী মর্তুজা বিরক্ত হয়। বৃদ্ধদের কেউই পছন্দ করে না। সেও নয়। কারণ তারা বিড়বিড় করে। দুর্বাসা মুনির মতো ক্ষণে ক্ষণে শাপ দেয়। রাবারের মতো অতীতকে টেনে নিয়ে দীর্ঘায়িত করে। পথে পরিচিত বৃদ্ধটি হয়তো শাপান্ত করে না, তবে সে দোষমুক্ত না। আলী মর্তুজাকে বৃদ্ধের চিনিমুক্ত জীবনযাপনের কথা শুনতে হয়, শেয়ারবাজারে বৃদ্ধের ছোটছেলের অদূরদর্শীতার কথা জানতে হয়, বৃদ্ধের স্ত্রী বিয়োগের কথা শুনে শোকাহত হবার ভান করতে হয়। একসময় বৃদ্ধের আর বলবার কিছু থাকে না। তখন আলী মর্তুজা হাসি মুখে বৃদ্ধকে পাশ কাটায়। এরপরে একমনে হাঁটা শুরু হয়। নির্জনপুর, কত দূর...

অথচ, বৃদ্ধকে দেখবার পূর্বেও রাস্তায় কেউ ছিলো। গতকালের পত্রিকার মত ন্যাতানো একটা যুবক ছিলো রাস্তায়। যুবকটি পূর্বপরিচিত। চানখারপুলের পেছনটায় একটা সস্তা চায়ের দোকানে যুবকটির সাথে প্রথম দেখা হয় আলী মর্তুজার,  সে সময় মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটাল কিংবা অমলকান্তির রোদ্দুর তার হাতে ছিলো না। হাতে যুদ্ধাস্ত্র ছিলো সামরিক নয়, অর্থনৈতিক। চাকরির বিজ্ঞাপণ আর প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত। এরপরে আরো টুকিটাকি দেখা হয়েছে আরো অনেক জায়গায়- রেলস্টেশন, বাজার কিংবা অন্যান্য এইসকল জায়গার মতোই। এই নির্জনপুরের নির্জন রাস্তায় হঠাৎ তার দেখা পেয়ে আলী মর্তুজা তাই অবাক হয় না। তারা দুজনেই হাঁটতে থাকে। অন্য দিনগুলোর মত প্রাণচঞ্চল না থেকে যুবকটি আজ নিস্তেজ থাকে। হাঁটে। যুবকটি সময় কাটাতেই হাঁটে হয়তো, নয়তো গল্পগুলো বলতেই হাঁটে। সে অস্থির জনপদে বারংবার রাজা বদল হবার গল্প বলে। এরপরে সেই অদ্ভূত সময়ের প্রেক্ষাপটে সকল কিছু বদলে দেবার শপথ নেবার সেই গল্পটা করে- তারও পরে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে গলির ভেতরে তার একঘেয়ে অফিসরুমের গল্প বলে। এইসব বলতে বলতে- আলী মর্তুজা এইসব শুনতে শুনতে- একসময় বোধ হয়, যুবকটি বিষণ্ণ বোধ করে। যুবকটি পথ ছেড়ে দেয়। অতঃপর আলী মর্তুজাকে আবারো একলা চলতে হয়। গন্তব্য নির্জনপুর।

গল্পের আরেকটু পেছনে গেলে, নির্জনপুরের রাস্তায় জনৈক স্কুল পালানো কিশোরের সাথে আলী মর্তুজার দেখা হয়। কিশোরটি সস্তার সিগারেটে টান দেয় এবং তাকে ইতস্তত আহবান করে। আলী মর্তুজা তাকে বলে সে এখন নির্জনপুরের দিকেই যাচ্ছে, সেখানে লোকেরা সিগারেটের দরকার বোধ করে না। অতঃপর কিশোরটি আর বাক্যব্যয় করে না। বরং সূর্যের মাঝআকাশে পৌঁছবার পূর্বের আলোটাতে আলী মর্তুজাকে অনুসরণ করে। আলী মর্তুজা পথে এই অনাবশ্যক-অপ্রয়োজনীয় সঙ্গীকে ঠিক বিড়ম্বনা স্থির করে না। আলী মর্তুজার কিশোরটির কর্মকাণ্ড দেখতে ভালো লাগে। কিশোরটির ব্রহ্মপুত্র নদের স্থির চিলের মতো জলে টুকরো ইট ছুঁড়ে মারা ভালো লাগে। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের মাঠে ইতস্ততঃ জটলার বালক বয়েসীদের সাথে অযাচিত ভাবে ফুটবলে লাথি হাঁকানো দেখতে ভালো লাগে। বিদ্যাময়ী উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছুটির পরে ছুটে বেরিয়ে আসা কিশোরীদের দেখতে কিশোরটির অপেক্ষার দৃশ্য ভালো লাগে। এইসব ভালো লাগা শেষ করে তাই আলী মর্তুজাকে একা রেখে একসময় সে চলে যায়, কিশোরটি।

আরেকটু পেছনে গেলে আমরা দেখতে পাই, আলী মর্তুজা জনে জনে শুধোয় নির্জনপুরের ঠিকানা। আমি বলেছিলাম যে আমি ঠিক জানি না। রাজারবাগের পেছনে শান্তিবাগ থাকলে মোহাম্মদপুরের, না হলে মীরপুরের আশেপাশেই কোথাও নির্জনপুর আছে বলে আমার ধারণা হয়। সুলায়মানের ভূগোল পড়ায় জানা থাকে যে পশ্চিমবঙ্গের ওদিকে মেদিনীপুর বলে কিছু একটা আছে। চায়ের দোকানের আর কেউ খোঁজ দিতে পারে না নির্জনপুরের। খোঁজ দেয় পাবলিক লাইব্রেরীতে কাজ করা আওরঙ্গজেব। কোন একটা অপ্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থের জন্যে মৃত্যু নিয়ে সে নাকি কিছু পড়াশোনা করেছিলো। The Other Mind বা এই জাতীয় আরো কিছু বইতে নাকি বর্ণনা দেয়া আছে মৃত্যুর পূর্ব পরিস্থিতির। স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে আওরঙ্গজেব বলে, জ্ঞান হারাবার ঠিক পূর্বে একটা সোনালী রঙের আলো নাকি তাদের-মৃত্যুপথযাত্রীদের- আচ্ছন্ন করে দেয়। আর মাথার ভেতরে কেউ তাকে নির্জনপুরের রাস্তা বাতলায়। সেই ঠিকানা আমি আর সুলায়মান জানি না। আলী মর্তুজা জানে। ফলে আমরা দেখি, সে নির্জনপুরে রওনা দেয়।

কেন নির্জনপুরে যাওয়া, এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমরা আবারো সময়ের উলটো দিকে যাবো। দেখবো- আলী মর্তুজার স্ত্রী বিয়োগের সময় শহরে বিদ্যুৎ ছিলো না, কারফিউ দিয়েছিলেন ঈশ্বর। একনায়কের মত বৃষ্টির সীমাহীন যথেচ্ছ স্বাধীনতায় ঘরদোর ভিজে ভিজে একসা। তবুও সেই হাওয়াটুকু বয়ে এসেছিলো। ছাই রঙা। বেগে। প্রচন্ড হাওয়ার তোড়ে ঘরটিতে যারা ছিলেন, তারা কেউ হলফ করে বলতে পারেন না আলী মর্তুজার স্ত্রী, স্বামীকে আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করে যা বলেছিলেন- তা 'নির্জনপুর ! নির্জনপুর !' ছিলো কি না। দোতলার হাসান সাহেবের মায়ের মুখোশ খুলবার সময় সেখানে চারতলার সাবেরা বানু ছিলেন, সাবেরা বানুর স্বামীর মুখোশ খুলে যাবার কালে নিচতলার নবদম্পতি ছিলেন। এখন সেই নবদম্পতি,সাবেরা বানু, হাসান সাহেব এবং আরো সবাই সে মহিলার পাশে থাকেন। মুখোশ খুলে নেবার সময় মানুষের পাশে মানুষের থাকতে হয়। তবে আমাদের উচিৎ এখানেই মুখোশের কথা শেষবার বলে নেয়া। কারণ, এটা তো আর মুখোশের গল্প না। এটা মানুষের গল্প। তাদের নির্জনপুরে যাবার গল্প।

এরপরে বর্তমান, যেখানে সন্ধ্যের ঠিক মুখে আলী মর্তুজা নির্জনপুরে এসে উপস্থিত হয়। এটা যে নির্জনপুর সেটা রাস্তায় কাউকে প্রশ্ন করে সে জানে না, সেখানে বাংলাদেশ রেলওয়ের কোন অব্যবহৃত প্রাচীন সাদাকালো ফলকে নির্জনপুরের নাম খোদাই করা নেই। তবু সেখানে পৌঁছে ছাই রঙা হাওয়ার প্রাবল্য আর প্রবেশদ্বারে ইচ্ছামানুষের উপস্থিতি তাকে নিশ্চিত করে তোলে। কিন্তু নির্জনপুরের প্রবেশের মুখে ইচ্ছামানুষ তাকে দেখে হতবাক হয়। জীবিত মানুষের এই পথে হেঁটে এসে এই নগরে উপস্থিত হবার কথা কষ্টকল্পনাতেও আসে না। অতএব ইচ্ছামানুষ বিস্মিত হয়, গিলগামেশ দর্শনে উৎনাপিশতিম যেমন বিস্মিত হয়েছিলেন। আর তারপর; নির্জনপুরের উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা আলী মর্তুজার উদ্দেশ্যে নিজের পেশাগত ঢঙে ইচ্ছামানুষ প্রশ্ন রাখে, কোন ঘুমভাঙানি স্মৃতি তাকে এই নির্জনপুরের পথ পাড়ি দিয়ে নিয়ে এসেছে।

আর সেই মুহুর্তে, নির্জনপুরের পথে একজীবন হেঁটে আসা আলী মর্তুজা- মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের নবম শ্রেণীর প্রাক্তন ছাত্র-  বিদ্যাময়ী উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনীর সেই অনামা ছাত্রীটির চোখে চোখ রেখে কাটানো ব্রহ্মপুত্রের তীরে একটি বিকেল ফিরে পেতে চায়।..

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন