বুধবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১০

পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি আধুনিক রূপকথা

বালকদিগের সর্দার বিভীষণ পড়ালেখাদাশের মাথায় চট্‌ করিয়া একখানা নূতন ভাবোদয় হইলো। পলাশীর ধারের যেই ক্ষুদ্রাকার ভবন গুটিকয়ের সমষ্টি একটা প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হইবার অপেক্ষায় পড়িয়া ছিলো; স্থির করা হইলো তাহার এইবারের আরোপিত পরীক্ষাসূচিটিও সকলে মিলিয়া বিলম্বিত করিয়া ছাড়িবে।

যাহারা শিষ্ট বালক-  শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক মহাশয়দের মূল্যবান বক্তব্য সকল ঘর্মাক্ত কলেবরে সূচারূরুপে অনুলিপি করিয়া যাহারা মিষ্টি বালিকদের কোমল হস্তে পিএলের প্রারম্ভেই তুলিয়া দেন; তাহারা যে এই কার্যে কতখানি বিরক্তি এবং অসুবিধা বোধ করিবে তাহাই উপলদ্ধি করিয়া বালকদল এ প্রস্তাব সম্পূর্ণ অনুমোদন করিলো।


যাহারা জানেন, তাহারা মানেন নিশ্চয়ই; এবং যাহারা জানেন না- তাহাদের এইটুকু জানিয়া লওয়াই যথেষ্ট যে পলাশীর ধারের ক্যাফেটরিয়াখানাকে কেন্দ্র করিয়া স্বল্পমূল্যের যেই বিনোদন কেন্দ্রখানা একাধিক অনুষদে বিভক্ত হইয়া রহিয়াছে- সেটির নিয়মিত ভোক্তারা, যাহাদের বহু অবালেগ সম্মানসূচক ভাবে ' প্রকৌশলবিদ্যার ছাত্র ' উপাধিতে সম্বোধন করেন; তাহারা মূলত চারটি ভাগে ভাগযোগ্য। প্রথমভাগে যাহারা রহিয়াছেন- তাহারা চতুর্বর্ষীয়ান । এরপরের তিনটি শ্রেণীতে যথাক্রমে তৃতীয়বর্ষীয়ান, দ্বিতীয়বর্ষীয়ান এবং প্রথমবর্ষীয়ানগণ।

এ কাহিনীর নায়ক বিভীষণ পড়ালেখাদাশ কোন শ্রেণীর অন্তর্গত তাহা আমাদের অজ্ঞাত। সেই যে বাতাবিনেবু বিশ্বকাপের সময় দুইখানা চপোটাঘাত, পৌনে তিনগজ পাতলুন এবং সাড়ে চার তোলা চক্ষুলজ্জা সম্বল করিয়া যেই দুষ্ট বালকটি কেলাশ বন্ধ করিতে সমর্থ হইয়াছিলো- অর্থাৎ সুশীল কর্তৃপক্ষ যাহাকে ইতোমধ্যেই সকলের অগোচরে 'দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি' প্রদানে বাধিত করিয়াছে- তর্কের খাতিরে সকলে অনুগ্রহ করিয়া মানিয়া লউন যে সেই দুঃসাহসী,পরোপকারী,সমাজসেবক বালকটিই বিভীষণ পড়ালেখাদাশ।

রোসো, মূল গল্পে প্রবেশ করি এইক্ষণে।


পরীক্ষা অতীব সন্নিকট। পলাশীর ঘরে ঘরে আনন্দ।

বিভীষণ পড়ালেখাদাশ চতুর্বর্ষীয়ান চারকড়ির কামরায় প্রবেশিয়া আনন্দিত স্বরে কহিলো, " দাদা, এইবার কিন্তু আর পরীক্ষা পেছাচ্ছি না !! "

চারকড়ি গভীর মনোনিবেশ করিয়া নোলানবাবুর সামাজিক একখানা কাহিনীচিত্র দেখিতেছিলো। এমতাবস্থায় বিভীষণের এই উক্তি শুনে কেদারা থেকে এই পড়ে কি সেই পড়ে। " যা শ্লা, বেশ মন লাগিয়ে নোলানকাকুর নয়া বায়স্কোপখানা দেখছিলুম, দিলি বেশ প্যাঁচ লাগিয়ে। উফ, আবারো প্রথম থেকেই দেখতে হবে দেখছি- নইলে লিম্বোতেই আটকে রবো। ... হ্যাঁ, বল... যা বলছিলি। "

বিভীষণ পড়ালেখাদাশ পুনরায় আনন্দিত স্বরে কহিলো, " দাদা, এইবার কিন্তু আর পরীক্ষা পেছাচ্ছি না !! "

চারকড়ি মাথা চুলকে বলিলো, " তা, কথা বড় মন্দ বলিসনি। কিংবদন্তীর নায়ক বকরি খানের পোঁদাঙ্ক অনুসরণ করে টেক্সটাইল এঞ্জিনিয়ার তো প্রায় বনেই গেলুম, তা এইবেলা এসব অপকম্মো করে কি আর পাপের বোঝা ভারি করবো... তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছি। ...
পরীক্ষা পেছাবি না, এ তো বড় মধুর সংবাদ। চল, জনসমক্ষে এই বার্তাখানা প্রচার করে আসি, পাছে দুষ্ট ছেলের দল মাঝ দিয়ে দই মেরে পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়। কাউকে বিশ্বাস নেই, জোচ্চোর সব। "

অতঃপর বিভীষণ পড়ালেখাদাশ চতুর্বর্ষীয়ান চারকড়ির সহিত তৃতীয়বর্ষীয়ান আবদুছ ছাত্তারের কামরায় প্রবেশিয়া আনন্দিত স্বরে কহিলো, " দাদা, এইবার কিন্তু আর পরীক্ষা পেছাচ্ছি না !! "

আবদুছ ছাত্তার, যাহাকে ফিরিঙ্গি ভাষায় বলা যায় হাইক্লাস, রীতিমত সেই মাপের ক্লাসনোটত্তোলক। সেই মুহুর্তে সে তাপগতিবিদ্যার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ত্রয়োবিংশ উদাহরণখানা প্রাণপণে আত্মস্থ করিতেছিলো। মাদককে না বলিলেও; মিথ্যা,মহিলা এবং মুখস্থকে সে আজতক না করিতে পারে নাই। বিভীষন পড়ালেখাদাশের প্রত্যুত্তরে ছাত্তার কহিলো, " সোনার টুকরো ভাই আমার !! সাধে কি আর তোদের পুরোনো চোতা বিনা ফোননাম্বারে দিয়ে দিই... পরীক্ষা পেছানোর কুফল তোর চাইতে ভালো আর কে জানে, বল...
তুই পরীক্ষা পেছাবি না, এ তো বড় মধুর সংবাদ। চল, জনসমক্ষে এই বার্তাখানা প্রচার করে আসি, পাছে দুষ্ট ছেলের দল মাঝ দিয়ে দই মেরে পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়। কাউকে বিশ্বাস নেই, জোচ্চোর সব।"

অতঃপর বিভীষণ পড়ালেখাদাশ চতুর্বর্ষীয়ান চারকড়ি এবং তৃতীয়বর্ষীয়ান আবদুছ ছাত্তারের সহিত দ্বিতীয়বর্ষীয়ান ফজলুর রহমানের কামরায় প্রবেশিয়া আনন্দিত স্বরে কহিলো, " বুঝলে, এইবার কিন্তু আর পরীক্ষা পেছাচ্ছি না !! "

ফজলুর রহমানের নামটির ফজিলত অনেক। মধ্যপন্থী টাকশাল রাজনীতিতে সে আজিকাল ভালো নাম কামাইয়াছে। অত্র অঞ্চলে একদা মফস্বলীয় গোবেচারা ফজলুর রহমানকে সম্প্রতি বহু লোকে 'হকিদন্ড ফজলু' বলিয়া আখ্যা দেয় বটে। বিভীষন পড়ালেখাদাশের উক্তি শ্রবণপূর্বক ফজলু সবেগে তাহার লুঙ্গিতে দুই প্যাঁচ আটিয়া বলিলো, " বটে- পরীক্ষা পেছাতে চাইছেটা কে, শুনি ?? লক্ষীছাড়া অলপ্পেয়ের দল... বাপের নাম খগেন করে ছাড়বো শ্লাদের। পরীক্ষা পেছাবে, হুঁ, পলাশীর হাটে হাঁটুর বাটি খুলে নোবো, হ্যাঁ...
পরীক্ষা পেছাবেন না, এতো দাদা বড় মধুর সংবাদ। চলুন, জনসমক্ষে এই বার্তাখানা এইবেলা প্রচার করে আসি, পাছে দুষ্ট ছেলের দল মাঝ দিয়ে দই মেরে পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়। কাউকে বিশ্বাস নেই, জোচ্চোর সব।.."

 অতঃপর বিভীষণ পড়ালেখাদাশ চতুর্বর্ষীয়ান চারকড়ি, তৃতীয়বর্ষীয়ান আবদুছ ছাত্তার এবং দ্বিতীয়বর্ষীয়ান ফজলুর রহমানের সহিত প্রথমবর্ষীয়ান গঙ্গারামের কামরায় প্রবেশিয়া আনন্দিত স্বরে কহিলো, " বুঝলে, এইবার কিন্তু আর পরীক্ষা পেছাচ্ছি না !! "

ভ্যালা গঙ্গারাম নিতান্ত সুবোধ প্রকৃতির। প্রাণপাত করিয়া এই বিনোদনকেন্দ্রে 'জ্ঞান আরোহণের' সুযোগ সে পাইয়াছে। বগলে গণকযন্ত্র, নেত্রে জ্ঞানপিপাসা এবং আচরণে সহবৎ লইয়া সে নিত্য কেলাশে উপস্থিত রয়। পলাশীর পরীক্ষা তাহার কাছে উপাসনাসম বলিয়া গণ্য। গঙ্গারাম বলিলো, " আজ্ঞে, পরীক্ষা পেছাবেন না বললেন যে বড় ?? বলি, পরীক্ষা কি পেছোয় নাকি কখনো এই পবিত্র গাঙ্গেয় ভূমিতে ?? ..."

হকিদণ্ড ফজলু তাহার মাথার উর্ধ্বে হকিদণ্ডখানা দুইবার প্রবলবেগে ঘুরাইয়া বলিলো, " রে রে বেতমিজ !! গুরুজনের মুখে মুখে এড়েঁ তক্কো করিস... নে নে, ন্যাকামি ছেড়ে দে এই বেলা। অতিসত্ত্বর তোর পেন্টেলুন খানা পড়ে বেরিয়ে আয়। জনসমক্ষে অচিরেই এই বার্তাখানা এইবেলা প্রচার করে আসি সকলে, পাছে দুষ্ট ছেলের দল মাঝ দিয়ে দই মেরে পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়। কাউকে বিশ্বাস নেই, জোচ্চোর সব।.."


অতঃপর তাহারা সকলে বাহির হইয়া পড়িলো, এবং পদব্রজে যাত্রা করিলো কত্তামশাইয়ের দপ্তরের পানে। গঙ্গারামের মুখমন্ডলে নবজাতকের সরলতা, ফজলুর চোখেমুখে জ্বলন্ত প্রতিহিংসা, আবদুছ ছাত্তারের মুখে সদ্যমুখস্থ উদাহরণখানা বিস্মৃত হইবার আক্ষেপ, চারকড়ির মুখমন্ডল অভিব্যক্তিহীন। বিভীষণ পড়ালেখাদাশ গুণগুণ করিয়া গানের কলি ভাজিতেছে, " ঝালাক দিখলা যা... ঝালাক দিখলা যা..."

অনতিবিলম্বে তাহারা সকলে কত্তামশাইয়ের দপ্তরের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলো। দপ্তরের সম্মুখে পাহারা দিবার নিমিত্তে দণ্ডায়মান দ্বাররক্ষক বনমালীকে উদ্দেশ্যে করিয়া পড়ালেখাদাশ কহিলো, "বনমালীদা, আমরা সকলে কত্তাবাবুর সাক্ষাতপ্রার্থী। আমরা আসিয়াছি, তাহাকে এই কথা বলাই যথেষ্ট হইবে এখন। "

অর্থের বিনিময়ে সম্মুখের মাঠে শেখ র‍্যাচেল ক্রীড়াচক্র আজিকাল বাতাবিনেবুতে লাথি মারা বিদ্যা মকশো করিয়া থাকে। অদ্য বৈকালে তাহাদের এক দিকভ্রষ্ট গোলা আসিয়া বনমালীর পৃষ্ঠদেশে পড়িয়াছিলো, খানিকআগে  ভরপেট খাইয়াও তাহা সয় নাই। ব্যাথায় কাতর বনমালী পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাইতে বুলাইতে পঞ্চপাণ্ডবের অনুরোধখানা ঠিকমত শ্রবণ করিতে পারে নাই। অতএব বনমালী তাহার গৎবাঁধা বুলিটিই আউড়ে দিয়া কহিলো, " কত্তাবাবা ঘুমুচ্ছেন। এখন ওসব হবে না। "

এইকথা শ্রবনপূর্বক বিভীষণ পড়ালেখাদাশ অন্যদের মুখ পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ শেষে কহিলো, " বটে ??... তা বেশ। কত্তামশাইকে বলো আমরা এসেছিলুম। বলো, এইবার কিন্তু আমরা পরীক্ষা একদমই পেছাবো না।"

এই কথা বলিয়া বালকদল যেই পথে আসিয়াছিলো, সেই পথেই ফিরিয়া গেলো। উহারা দৃষ্টির অন্তরালে যাওয়া মাত্রই ক্ষীণবুদ্ধি বনমালীর মনে হইলো- বিষয়খানা গুরুতর বটে। অতএব ধীরপায়ে সে কত্তাবাবুর কামরায় প্রবেশ করিয়া গলা খাঁকানি দিলো।

কত্তাবাবু দ্বিপ্রহরে লাউচিংড়ি সহযোগে পটলের ছেঁচকি ভরপেট খাইয়া একখানা তোফা দিবানিদ্রা দিতেছিলেন। বনমালীর সাড়া পাইয়া ধড়ফড়াইয়া উঠিয়া বসিলেন। উত্তেজিত উচ্চকন্ঠে হাঁকিলেন, " কি হে বনমালী, মিছিল আসিয়া পড়িছে নাকি ?? ... আমি আগেই জানতুম, না আসিয়া কি পারে আর। ইতিহাস বারংবার ফিরিয়া ফিরিয়া আসে কী না..."

কত্তাবাবুকে থামাইবার নিমিত্তে তাহার মুখের কথা লুফিয়া লইয়া বনমালী বলিলো, " আজ্ঞে ?? মিছিল বলিলেন ?? ... মিছিল কই। সেই যে বাতাবিনেবু বিশ্বকাপের চলাকালীন কীসব গোলযোগ ঘটিয়াছিলো, তাহার পর আর গোলযোগ করিবার বুকের পাটা কোন ড্যাকরার আছে হুজুর, বলুন ?? ...

মিছিল টিছিল নয় আজ্ঞে। গোটা পাঁচেক ছোকরা বাদাম কিনতে যাচ্ছিলো বোধহয়। এই পথে আসিয়া বলিয়া গেলো যে তাহারা পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক এইবার। "

কত্তাবাবু কেদারাসন হইতে ভূমিশয্যায় পৌঁছিয়া গেলেন দণ্ডবৎ। " এঁ ?? উহারা পরীক্ষা দিতে চায় ?? ঠিক শুনিয়াছো তো বাপু ?? গণ্ডগোল করো নাই তো কোন ?? "

বনমালী ওষ্ঠ উল্টাইয়া বলিলো, " ম্যাট্রিকে মাত্র সাড়ে চারের জন্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেলুম না হুজুর, কপাল মন্দ বলিয়াই গাড়ি চালাইবার বদলে আপনার এই দপ্তর চালাইতে হয়।... অতটা অনাস্থা রাখিবেন না খোদাবন্দ, আমি ভুল শুনি নাই। উহারা পরীক্ষা দিতেই চায়। "

কত্তাবাবু প্রবলবেগে মস্তক নাড়াইতে নাড়াইতে কহিলেন, " উহাদের ভাবগতিক কেমন ছিলো বাপু ?? সকলে সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ ছিলো তো ?? হাত-পা-মস্তক ছিলো তো ঠিকঠাক ?? উহারা রাগান্বিত স্বরে ঐ কটূকথা বলে নাই তো ?? ..."

গঙ্গারাম এবং চারকড়ির ভাবলেশহীন মুখমণ্ডল স্মরণিয়া বনমালী কহিলো, " আজ্ঞে, উহাদের চোখমুখ কথা কয় নাই। ক্রিস গেইলের মতন ভাবহীন ছিলো বটে। " পরক্ষণেই আবদুছ ছাত্তারের কথা স্মরণ করিয়া বনমালী যোগ করিলো। " আর কেউ কেউ অনর্গল বিড়বিড় করিয়া কথাও কহিতেছিলো বটে, তবে খিস্তি করিতেছিলো বোধ করিয়া তাহার কথা আর শুনি নাই..."

কত্তাবাবু স্বগোতক্তি করিয়া বলিলেন, " ইশ !! পরীক্ষার বিষমচাপে পিষ্ট হইয়া পড়িয়াছে বেচারারা। সারাদিন নাক পাঠ্যপুস্তকে ডুবাইয়া রাখিতে রাখিতেই এই দশা !! আমাদের যুগে আমরা যখন পড়া করিয়াছি ম্যালা, উহারা তখন এই বয়সেই বিস্মৃত সব খেলা... "

-" আজ্ঞে খেলা বিস্মৃত হয় নাই তো, " ফজলুর হস্তের হকিদণ্ডের কথা স্মরণ করিয়া বনমালী বলিলো। " উহাদের হাতে হকিদণ্ড শোভা পাইতেছিলো যে !! "

- " এই সেরেচে ! এই কথা এতক্ষণে কচ্ছিস ব্যাটা উজবুক !! " কত্তাবাবু উত্তেজনায় দাঁড়াইয়া পড়িয়া পায়চারি আরম্ভ করিলেন। " এ যে সাক্ষাৎ হুমকি !! পরীক্ষা না পেছালেই সমস্যা। হকিদন্ড- কাঁচ ভাংচুর- রক্তপাত- মারামারি- এম্বুলেন্স- মড়া খাটিয়া ...উফফ !!! কী ভয়ংকর চক্রান্ত !!! পরীক্ষা দেখি না পেছালেই নয় এবার..."

হতভম্ব বনমালী আর্তনাদ করিয়া বলিলো, " কিন্তু উহারা যে কহিলো তা সত্ত্বেও উহারা পরীক্ষা দিতে চায়!! "

আবেগমথিত স্বরে কত্তাবাবু বলিলেন, " এত প্রতিকূলতার পরেও উহারা পরীক্ষা দেবেই ?? ... মানিক আমার !! বনমালী, লক্ষ করো। এইরুপ নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা, গুরুমান্য প্রবণতা আজিকার ছোকরাদের মাঝে কোথা পাইবে এই পলাশী ছাড়া ?? ... এই সদাচারের পুরষ্কার হিসেবে উহাদের ছুটি আমি অনির্দিষ্টকালের জন্যে দীর্ঘায়িত করলাম। "

এই বলিয়া কত্তাবাবু তাহার দেরাজের ভেতর হইতে কাগজখানা বাহির করিলেন। পূর্বের স্টক ফুরাইয়া গিয়াছিলো বিধায় গতকাল বৈকালেই পলাশীর সেলিম মিয়ার দোকান হইতে একদিস্তা অনুলিপি করাইয়া আনিয়াছেন। আগামী কয়েক লেভেল ইহাতেই চলিয়া যাইবার কথা।

বাকহারা বনমালীর হাতে কাগজখানা ধরাইয়া দিয়া কত্তাবাবু বলিলেন, " এইও বনমালী, এই লও। হলে হলে গিয়া ইশতেহারখানা সাঁটাইয়া দিয়া আইসো। অনির্দিষ্টকালের জন্যে পরীক্ষার স্থগিতাদেশ দেয়া হইলো। "

এই বলিয়া কত্তাবাবু আবারো কেদারায় শয্যা পাতিয়া হাসিমুখে কহিলেন- " আহা ! হাল ছেড়ো না একাদশ বনাম শৃগাল মাদ্রিদের এল ক্লাসিকো ম্যাচখানা নিরীক্ষণ করিতে আর কোন সমস্যা রইলো না এখন ! "

কাল পরীক্ষা নাই। পলাশীর হলে হলে কোলাহল।

অতঃপর চতুর্বর্ষীয়ান চারকড়ি পুনরায় মনোযোগের সহিত বায়োস্কোপ দেখিতে বসিয়া গেলো।

তৃতীয়বর্ষীয়ান আবদুছ ছাত্তার মুঠোফোন হাতে লইয়া মাইনক্যা নয়, আর্কি চিপার দিকেই চুপিসারে গমন করিলো।

দ্বিতীয়বর্ষীয়ান ফজলুর রহমান স্যাঙ্গাতদের আসরে বলিতে লাগিলো, " হুঁ হুঁ বাব্বা, পরীক্ষা পেছাবে না আবার। যেই না আমার হকিদণ্ডখানা ঘুরাইয়া একখানা রাম ধমক দিলাম..."ইত্যাদি।

প্রথমবর্ষীয়ান গঙ্গারাম 'পলাশীতে পরীক্ষা পেছোয়' এই নির্মম সত্য আত্মস্থ করিবার প্রাণপণ চেষ্টা করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িলো।


... ওই দিকে সকলের অগোচরে বিভীষণ পড়ালেখাদাশ কানে মুঠোফোন ঠেকাইয়া অপরপ্রান্তের উদ্দেশ্যে কহিলো, " আমার আবার ছুটি হইয়াছে মা !! আমি আবার বাড়ি আসছি ..."

৮টি মন্তব্য:

  1. সুহান ভাই, বলি রবিবুড়ো পটল তুললো বলে কি দেশে বাংলা গদ্যচর্চার অভাব পড়বে নাকি?? আপ্নাদের এই গপ্প পড়েই না দেখা যাবে কিংবদন্তী নায়ক বকরী খান এইবার বুয়েট থেকে বাংলার ডিগ্রীটা নিয়েই ছাড়বে!! তাকে দোষই বা দেয় কিভাবে!!

    আর আমরা তো একটা অন্তর্বর্তীকালীন বর্ষীয়ান দেখতে পায়!! তাদের লোপাট করে দিলেন যে!!

    আর লেখা নিয়ে তো কিছু লেখার যোগ্যতা এই অধমের নেই!! ঝাঁ-ঝাঁ হয়েছে!!

    উত্তরমুছুন
  2. না সুহান, শুধু একটি মন্তব্যই করতে চাই
    "জাঝাকাল্লাহু খাইর"

    উত্তরমুছুন
  3. SUPEEEEEEEERRRRRRR !!!
    vhai apner kolomer oneek guun. :)

    উত্তরমুছুন
  4. অগ্রজ বেড়ে লেখেছেন বটে।
    সেই মীরজাফরের সময় হতে কালে কালে কত ইতিহাসি রচিয়াছে এই পলাশীর প্রান্তরে, এবং রচিবেও বইকি আগামীতে।

    লেখা বড়ই ঊপাদেয় হইতেক যদিনা শার্দুল মাদ্রিদের নাম শৃগাল না বলিতেন।

    উত্তরমুছুন
  5. @ওয়াহিদ, কেষ্টা, নামহীন, সৌমিত্রঃ ধন্যবাদ।
    @জুনেবঃ শার্দুলেরা গোল চায়, লাল কার্ড নয়। শৃগালই প্রয়োজনে নীতিহীন হতে পারে- খেলায় জিত্তেও পারে। তবে মান থাকে না।

    উত্তরমুছুন