রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১০

ব্যারন মুনশাউজেনের গল্প

পুরোনো দিনের সিনেমা দেখবার ঝক্কি আছে। এটা একবিংশ শতাব্দীর যুগ। সময়টা গতির, যন্ত্রের আর ব্যস্ততার। সিনেমার প্রথম দৃশ্য থেকেই এখন টানটান উত্তেজনা, নায়ক-একবচন বা বহুবচনে- উদ্দাম দৌড়ঝাঁপ, মুহুর্তে মুহুর্তে কাহিনীর মোড় বদল, হাইটেক স্পেশাল ইফেক্ট। কাহিনীর বুনবার সূতোয় যতই ফাঁক থাক, রঙের জৌলুসে চোখ পর্দা থেকে সরে না। দুই ঘন্টায় চোখ-কান-মাথা সমানে খাটিয়ে দিন দুই পর ভেবে পাইনা মনে রাখার মত আসলে কী ছিলো সেই রঙিন পর্দায়। হতাশ হবার ঝুঁকি পুরোমাত্রায় আছে জেনেও, আমার ঝোঁকটা তাই পুরোনো দিনের সিনেমার দিকেই। কাহিনী শ্লথ আর দৈর্ঘ্যে দীর্ঘতর, এ দুই পিছুটানের বদলে থাকে কাহিনীর গভীরতা আর সংলাপের ইন্দ্রজাল দেখার সুযোগ। ওয়ান ফ্লিউ ওভার দা কাক্কুস নেস্ট, ক্র্যামার ভার্সেস ক্র্যামার কিংবা টুয়েলভ এংরি ম্যান- যেমন।

গুলগল্পের রাজা বলতে আমরা ভজহরি টেনিদা আর প্রেমেন মিত্তিরের নমস্য ঘনাদাকে সকলে একডাকে চিনি। মাথায় ছিটওলা সারভান্তেসের ডন কিহোতেও কম যাননি দুনিয়া কাঁপানো অভিযানে। এ লাইনে  আরো একজন আছেন, জানতাম। জেনেছি কখনো অন্য কোন গল্পের চরিত্রের মুখেই, কখনো জেনেছি পত্রিকা কি ম্যাগাজিনের মাঝেই ব্যবহৃত নাম হিসেবেই। ব্যারন মুনশাউজেন।

গুগলের শরণাপন্ন হলে জেনে যাই, কার্ল ফ্রেডেরিক ফন মুনশাউজেন নামে কেউ একজন সত্যি ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন জার্মান ব্যারন- যিনি যোগ দিয়েছিলেন রাশান সেনাবাহিনীতে। অটোমান তুর্কীদের সাথে যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে যিনি ফেঁদেছিলেন বিস্ময়কর সব গল্প। নেহাতই গুল গল্প, মুজতবা আলী হয়তো 'গুলমগীর' টাইটেলটি তার জন্যেই বরাদ্দ করতেন সুযোগ পেলে। সেইসব গল্প আজ প্রায় তিনশো বছর ধরে ঘুরছে ইউরোপের গ্রামে গ্রামে। রাশিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, জার্মানি। 'দ্যা এডভেঞ্চার অফ ব্যারন মুনশাউজেন' - সেই ব্যারনেরই সিনেমা।

রিভিউ লিখতে বসেছি যখন, তখন ভবিষ্যৎ দর্শকের জন্যে নষ্টকথা'র- স্পয়লার এলার্ট আর কি- আশঙ্কা থেকেই যায়। সেই ভাবনা মাথায় নিয়েই অল্প-স্বল্প কাহিনী বলে নেয়া দরকার।

অবরুদ্ধ এক ছোট্ট শহরের চারপাশ থেকে সমানে গোলাবর্ষণ করে চলেছে তুরষ্কের ক্রুদ্ধ সুলতানের সেনাবাহিনী। বিপর্যস্ত শহরের ভেতর শহরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হোরেশিও জ্যাকসন চেষ্টা চালাচ্ছেন সুলতানের সাথে সন্ধি করবার। জ্যাকসন ঘোর বাস্তববাদী মানুষ। শহরবাসীর মনোরঞ্জনের জন্যে ভাড়া করে আনা হয়েছে নাটকের দল। নাট্যদলের নাটকটি ব্যারন মুনশাউজেনকে নিয়ে। ব্যারন এবং তার ব্যারনের চার অনুগত শিষ্য - বার্থহোল্ড, এডলোফাস, গুস্তাভাস এবং আলব্রেখট; নাটকের কাহিনী এদের নিয়েই। চার শিষ্যের রয়েছে বিশেষ চারটি গুণ। বার্থহোল্ড হাওয়ার বেগে দৌড়াতে পারে। এডলোফাস তীক্ষ্মদৃষ্টির বন্দুকবাজ- অর্ধেক পৃথিবীর ওপার থেকেও লক্ষ্যভেদে পারঙ্গম। গুস্তাভাসের শ্রবণশক্তি অতিমানবিক। আর আলব্রেখট পৃথিবীর সেরা শক্তিশালী পুরুষ। নাটক চলবার সময়েই হঠাৎ আগমন ঘটে এক পাগলাটে বুড়োর। খাপখোলা তলোয়ার হাতে সে বুড়ো বাঁধিয়ে দেয় বিরাট হল্লা। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বুড়ো বলে, সে আর কেউ নয়। স্বয়ং ব্যারন মুনশাউজেন। এরপরে ঘটতে থাকে নানা অদ্ভূত ঘটনা।

এই হলো সিনেমা। খাঁটি রুপকথা এবং কমেডি। মন্টি পাইথন এন্ড দা হলি গ্রেইলের মতো প্রথম শ্রেণীর কমেডি নির্মাতা টেরি গিলাম পরিচালনা করেছেন এই সিনেমা। মন্টি পাইথনের মতো কালজয়ী কমেডি হতে পারেনি সিনেমাটি, কাহিনী হয়তো গতি হারিয়েছে জায়গায় জায়গায়। তবুও এই সিনেমা এতোটা ভালো লাগার কারণটা খুঁজে পাইনা প্রথমে। এবং তারপর পাই।

সেটি হলো, ব্যারন মুনশাউজেনের বিলকুল আষাঢ়ে গল্পের রুপকে ঘোরতর বাস্তবের সাথে যুদ্ধঘোষণা।

শতাব্দীর পর শতাব্দী নেহাত গুলগল্প জেনেও মানুষ অজ্ঞাত কোন কারণে আশ্রয় নেয় ব্যারন মুনশাউজেনের কাছেই। কিছুই করতে পারবার ক্ষমতা নেই যে ব্যারনের , ঘুরেফিরে তাকেই পাশে পায় মানুষ। কল্পনা, শহরবাসীকে বাঁচিয়ে রাখে বাস্তবের কুচ্ছিত রুপটি থেকে। কল্পনারও হয়তো ক্লান্তি পায়। ব্যারনের নিজের ভাষায় বলতে গেলে- Because I'm tired of the world.... Because it's all logic and reason now.... Laws of this, that...and the other. No place for three-legged cyclops...in the South Seas. No place...for cucumber trees..and oceans of wine. No place for me.

কাজেই ব্যারনের নিয়তিই হয়তো থাকে শেষটায় বাস্তবের কাছে হেরে যাওয়ার। যুক্তির কাছে ঘাড় নত করার। যেমন সিনেমার শেষের দিকে ঘোর বাস্তববাদী জ্যাকসন বলেছিলেন। বলেছিলেন- There are certain rules to the proper conduct of living. We cannot fly to the moon. We cannot defy death. We must face the facts. Not the folly of fantasists like you who don't live in the real world...


খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে সিনেমা দেখতে বসিনি। জ্বালাপোড়ার হরতালে ফাঁকতালে দেখে ফেলা সিনেমা। অভিনয় টানেনি খুব বেশি। শিশুতোষ রুপকথা দেখে ভালো লেগেছে, ভালো লেগেছে সংলাপ আর সংলাপের উইট। কিন্তু সময়টা খারাপ। সময়টা স্পাই কিডস, ডার্ক নাইট আর সিক্রেট এজেন্টদের। সময়টা কল্পনার টুঁটি চেপে ধরা যুক্তিনির্ভর ট্যাকটিশিয়ান হোসে মরিনহোদের জয়জয়কারের।

'সেরা' সিনেমা না হয়েও তাই 'ভালো লেগে যাওয়া' সিনেমা হয়ে যায় ব্যারন মুনশাউজেনের কাহিনী। ভালো লেগে যায়, ব্যারন মুনশাউজেনকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন