বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১০

আমরা করেছি জয়

দেশ দখলের লড়াইয়ে অতি কর্মঠ ছাত্রদল আর ছাত্রলীগ।...

আমিনবাজারে তুরাগ নদীতে ডুবে গেছে বাস, মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫০ ধরে ফেললো।...

মোটা চালের দাম প্রায় ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা, শঙ্কিত নিম্নআয়ের মানুষ।...




জাতি হিসেবে আমরা বড়ই বিস্মৃতিপ্রবণ, অতএব এইসব খবরে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। পূজার ছুটির প্রথমদিন হওয়া সত্ত্বেও সকাল ৮টা ৫০এ কেন ঘুম ভেঙ্গে যাবে, এইসব মহাজাগতিক চিন্তায় ব্যস্ত থেকে চোখটা খেলার পাতায় এনে ফেলা মাত্রই দৌড় দিয়ে টিভির সামনে। এই প্রথম ঘরের মাঠে পূর্ণশক্তির একটি ক্রিকেট দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের সুযোগ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সামনে।

 
বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন দিনের শুরুর আশা নিয়ে টিভির সামনে ঘুমঘুম চোখে বসে যাই বেলা ন'টা বাজতেই। এতোটা আশা নিয়ে টিভি সেটের সামনে বসেছিলাম শেষ কখন ?? ...


মনে পড়ে, ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের কথা। বাংলাদেশ বনাম ভারত ম্যাচ। দুঁদে ভারতের সামনে দূর্ঘটনায় অকাল মৃত বোলিং অলরাউন্ডার মানজারুল রানা'র স্মৃতিতে-শোকে আচ্ছন্ন বাংলাদেশ দল। সেই বিষাদকে শক্তিতে রুপান্তর করে অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন এই ম্যাচের পূর্বেই ঘোষণা করেছিলেন- এই ম্যাচের 'জয়'কে রানার জন্যে উৎসর্গ করতে চান তাঁরা। RUN for RANA ...সেই বাংলাদেশ পেরেছিলো। বিশ্ব ক্রিকেট দেখেছিলো তামিম ইকবাল নামের এক অনালোকিত বিস্ময়ের, দেখেছিলো রাজ্জাক-রফিক-সাকিবের বাঁহাতি স্পিনে স্পিন জাদুকর ভারতীয়দের বধ, দেখেছিলো সদ্য কৈশোর পেরুনো তামিমের ব্যাটে দিশেহারা মুনাফ প্যাটেল আর জহির খানের পিচ্চি সাহিত্যে অনুচ্চারণসম্ভব কথামালা...

বলে কয়ে ধারে এবং ভারে পরাক্রান্ত প্রতিপক্ষকে হারানোর অভিজ্ঞতা সেই ছিলো প্রথম। সেই কাজটা সেই বাংলাদেশ পেরেছিলো, এই বাংলাদেশ পারবে তো ??


... সন্দেহ হয়। টিভি সেটের সামনে বসা মাত্র পত্রপাঠ ড্রেসিংরুমে ইনফর্ম শাহরিয়ার নাফীস। উইকেটের চারপাশে চারের ঠিকমত ফুলঝুড়ি ফোটানোর পূর্বেই বিদায় নিলেন জুনায়েদ সিদ্দিকী। ধীরস্থির রাকিবুল হাসানের বিদায় খানিক পরেই হলো। পঞ্চাশ পেরুনোর পূর্বেই সাজঘরে তিন ব্যাটসম্যান, একপ্রান্ত আগলে আছেন রক্ষণাত্বক ওপেনার ইমরুল কায়েস। টসে জিতে ফিল্ডিং বেছে নেওয়া কিউই অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেটোরির সাজানো চিত্রনাট্য অনুযায়ীই যেন চলছিলো সব।...

চললো না। চললো না, কারণ ইমরুল কায়েসের সাথে তিনি ছিলেন। তিনি বিশ্বক্রিকেটের শীর্ষ অলরাউন্ডার, বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা প্রতিনিধি, প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে কাউন্টি দল উস্টারশায়ারে খেলতে গিয়ে পতনোন্মুখ দলটিকে প্রথম বিভাগে তুলে দিয়ে আসা খেলোয়াড়- তিনি, সাকিব আল হাসান ছিলেন।

ইমরুল কায়েসকে সাথে নিয়ে টুকটাক সিঙ্গেল আর মাঝে মাঝে চারের মার- এই নিয়ে সাকিব প্রথমে মেরামত করলনে স্কোরবোর্ড। দলীয় শতরানের কাছাকাছি এসে অদ্ভূত এক শটে উইকেটকীপারকে ক্যাচ দিয়ে আসা ইমরুল বিদায় নিলেও সাকিব ছিলেন। এলেন ছোটোখাটো চেহারার মুশফিকুর রহিম। আরেকটি পঞ্চাশোর্ধ্ব জুটি। এই জুটি ভাঙ্গলো দেড়শো এর কাছাকাছি এসে। এলেন মাহমুদউল্লাহ। বোলিংটাই মূল কাজ হলেও মাহমুদউল্লাহ ব্যাটিংটাও ভালোই পারেন। স্বভাবসুলভ দ্রুত গতিতে রান তোলার সাথে সাথে চলছিলো সাকিবের সাথে সমানে স্ট্রাইক বদলের প্রতিযোগিতা। সাকিব অপরপান্তে পুরোটা সময় জুড়ে স্বচ্ছন্দ। এই কবজির মোচড়ে মিড উইকেট দিয়ে বল পাঠাচ্ছেন সীমানার বাইরে, এই লং অনের উপর দিয়ে মারছেন বিশাল ছয়। সাইডস্ক্রীনের উপর দাঁড়িয়ে আয়েশ করতে থাকা দর্শকদের সরাতে গিয়ে খেলা যখন বন্ধ, তখন আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে সাকিব নিজেই ছুটে গেলেন বাউন্ডারি লাইনে। 'Eat cricket, Drink cricket, Think cricket'- ভারতীয় মিডিয়ার ক্রিকেট বিজ্ঞাপণের সবচেয়ে সেরা মডেলতো বাংলাদেশের অধিনায়ককেই বলতে হবে, না কি ?? !! ...

অধিনায়ক সাকিব সেঞ্চুরি করলেন। কান্ত হয়ে পড়ে দূর্বল শট তুলে দিয়ে এলেন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক ভেটোরির হাতেও। মাহমুদউল্লাহ থাকলেন, সাক্ষী হলেন আরেকটি পাওয়ার প্লে ট্রাজেডি'র। হাতে যথেষ্ট উইকেট নিয়েও বরাবরের মতোই বাংলাদেশ পাওয়ার প্লে নিতেই চাইলো না শেষ পাঁচ ওভারের আগে। মাহমুদউল্লাহের বিদায়ের পর ওই সময়টা ব্যাটিং করলেন লোয়ার অর্ডারের শুভ, রাজ্জাক, শফিউল আর রুবেল। যে স্কোর অনায়াসে পেরুতো পারতো ২৬০-২৭০, আড়াইশো হবার আগেই থামতে হলো তাকে, 'মাত্র' ২৪১ রানে...


ঘুমঘুম দুপুরে টিভি সেটের সামনে বসে থাকার কষ্টটা করবো কি না ভাবছিলাম, আর হলো না। কারণ ঘুমোচ্ছিলো না বোলিং-এ নামা টাইগারেরা। কিউই শিবিরে প্রথম ধাক্কা দিলেন স্পিনার হয়েও বোলিং ওপেন করা আবদুর রাজ্জাক। খানিক পরেই আপদের অপর নাম- ম্যাককালাম ভাইদের বড়টি- ব্রায়ান ম্যাককালামকে ফলো-থ্রুতেই দুর্দান্ত এক ক্যাচ নিয়ে ফিরিয়ে দিলেন শফিউল ইসলাম। ব্লাকক্যাপদের শুরুটা অবিকল বাংলাদেশের হলো, যখন ৩৫ রানেই গতম্যাচের নায়ক সোহরাওয়ার্দী শুভকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে সীমানার কাছে ধরা পড়লেন রস টেইলর।

যন্ত্রণা শুরু হলো এরপরেই। অনভিজ্ঞ দুই নিউজিল্যান্ডার হাল ধরলেন ডুবন্ত জাহাজের। রেমন্ড আর উইলিয়ামসন। স্কোরবোর্ড আরেকটু সচল হতেই আঘাত হানলেন সেই সাকিব, তুলে নিলেন রেমন্ডের উইকেট। খানিক পরেই রানের গতি বাড়াতে গিয়ে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক এবং সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ভেটোরিও যখন শিকার হলেন মাহমুদউল্লাহের- মনে হওয়া শুরু হলো, দিনটা বাংলাদেশেরই আজ।

কাজটা সহজ হলো না। কারণ আমাদের ত্রাতা সাকিবের পথ অনুসরণ করে দাঁড়িয়ে গেলেন তরুণ তুর্কি কেন উইলিয়ামসন। ইমরুল আর মুশফিকুরের ভূমিকায় নামলেন প্রথমে গ্রান্ট এলিয়ট, এরপর কাইল মিলস। ১৭২ রানে সপ্তম উইকেট তুলে নেওয়ার পরেও যে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা কমলো না, তার কারণ ওই কেন উইলিয়ামসন আর নাথান ম্যাককালাম-  ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে টাইগারদের আরেকটা পরাজয়ের স্বাদ দিতে তাঁকে দেখালো বড় একাগ্র।

কেন উইলিয়ামসন একেকটা চার মারেন, সমগ্র  বাংলাদেশে হতাশার আওয়াজ শোনা যায়। এডি মরগানের কথা মনে পড়ে, ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষেকের ম্যাচে যে স্কটিশ তরুণ শেষ দুই ওভারে ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ইংল্যান্ড বধের স্বপ্ন। ইংল্যান্ডকে হারানোর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে কিছুদিন আগেই, অথচ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন ফিকে হতে থাকে ক্রমাগত। কিন্তু না, ফিকে হয় না। ডাবলস চুরি করতে ব্যস্ত ম্যাককালামের স্ট্যাম্প মিড উইকেট থেকে এক রকেট থ্রোতে উড়িয়ে দেন বদলি ফিল্ডার নাইম ইসলাম, 'ছক্কা নাইম' দলে না থেকেও এমন এক ছয় হাঁকালেন- যার জের আরো বহুদিন বয়ে বেড়াবে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট। পরের বলেই উড়িয়ে মারতে গিয়ে ড্যারেল টাফির বিদায়ে ম্যাচ হেলে পড়ে বাংলাদেশের দিকেই।

শেষ ওভারে ১৬ রান। শফিউলের প্রথম দুই বলে ব্যবধানটা কমিয়ে ৪ বলে ১০ রানে নিয়ে আসেন কেন উইলিয়ামসন। পরের বলেই ইতিহাস। মিড উইকেটে সীমানার কাছে রাকিবুলের হাতে ধরা পড়লেন অসাধারণ শতক হাঁকানো উইলিয়ামসন... সিরিজ জয় !!! বাংলাদেশ ৩- নিউজিল্যান্ড ০ !!!


আমি নিশ্চিত, ষোলো কোটি বাংলাদেশীর সকলেই না হলেও একটা বিশাল বড় অংশ তখন আমার মতই দু'হাত উর্ধ্বমুখী করে " জিতসি, জিতসি !! " বিজয়োল্লাসে ফেটে পড়েছে। ভার্চুয়াল বন্ধুজগৎ ফেসবুকের পুরো হোমপেজ জুড়ে মুহুর্তের মাঝে টাইগারদের বন্দনা, নতুন দিনের বাংলাদেশের জন্যে উল্লাস- শুভকামনা...


মাঠে তখন দর্শকের উন্মাতাল উৎসব। কোচ জেমি সিডন্সের মুখে উদাস হাসি- যে হাসিতে স্বস্তি মিশে আছে, হয়তো মিশে আছে একটা অলিখিত বার্তাও- ' আমরা প্রস্তুত। দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ... '।  নতুন দিনের বাংলাদেশের মুখপাত্র সাকিব আল হাসান খুব বেশি হাসেন না, কেবল দু'হাত দুপাশে মেলে দিয়ে বোঝালেন নিজের ভেতরের চেপে রাখা আবেগটাকে। জানালেন, শেরে-বাংলা নগর স্টেডিয়াম তখন লাল সবুজে ছেয়ে গেছে। ...


জাতি হিসেবে আমরা বড়ই বিস্মৃতিপ্রবণ। দূর্ঘটনায় মৃত্যু, দ্রব্যমূল্য আকাশমুখী বৃদ্ধি, রাজনৈতিক কোন্দল আমাদের মনে থাকবে না। অথচ এই ইতিহাস গড়বার মুহুর্তটি, আমি ঠিক জানি, আমরা ভুলবো না কখনো। আমাদের ছেলেরা থেমে যেতে মাঠে নামেনি। তারা অতি অবশ্যি এগিয়ে যাবে। একদিন না একদিন তারা বিশ্বসেরা হবেই। আমরা পারবোই, আমরা নিশ্চিত।


অধিনায়ক সাকিব বলছেন, " Things will fall into place if we can improve our performance."

১৯৯৬ সালে বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্র চিরকালের জন্যে পালটে দেয়া শ্রীলঙ্কা দল বিশ্বকাপের ঠিক পূর্বে এই নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েই প্রস্তুতি শুরু করেছিলো বিশ্বকাপের। বাকিটা ক্রিকেট রুপকথার অংশ। 'মাতারা হারিকেন' জয়সুরিয়া, রুমেশ কালুভিথারানা, অরবিন্দা ডি সিলভা, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, মুরালিধরণ আর ভাসেদের ইতিহাস লিখতে দেখেছিলাম আমরা।

ইতিহাস বাংলাদেশও লিখবে। লিখবেন সাকিব-তামিম-মুশফিকুর-মাশরাফি-রাজ্জাকেরাই। বিশ্বকাপ আমরা জিতবোই। এবার না হলে পরেরবার, কিংবা তার পরেরবার। জিতবোই, এতে সন্দেহ নেই। আমরা করবো জয়...


আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

[ছবি কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক প্রথম আলো, অনলাইন এডিশন]

৪টি মন্তব্য:

  1. আমার মনের ভাষ্য লেখার মাঝে এসেছে...দাদা কে ধন্যবাদ ।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো লিখছেন
    নজরুল

    উত্তরমুছুন
  3. বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান আমাদের দলে, সেরা বোলার আমাদের দলে, সেরা অলরাউন্ডার আমাদের দলে, নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ, বাংলাদেশের খারাপ করাটাই হবে একটা আপসেট

    উত্তরমুছুন