বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১০

স্কুল ইউনিফর্ম পরা লোকটা

আগস্টের ২৫ তারিখ, সাল ২০০৪। তাঁর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো ওই দিনটায়। ভদ্রলোকের পরণে ছিলো আদ্যন্ত মফস্বলের বয়েজ স্কুলগুলোর ইউনিফর্ম। ...ঠাট্টা নয়, সত্যিই তাই ছিলো। ধবধবে সাদা হাফহাতা শার্ট, গুঁজে রাখা কালো প্যান্টের মাঝে, চোখে ধাতব ফ্রেমের তেলাপোকা রঙের চশমা। নটরডেম কলেজে আমাদের ছাত্রত্বের আয়ূ তখন মাত্র তিনটে পিরিয়ড। তিনি ক্লাসে ঢুকলেন, ডায়াসের উপরে চেয়ারে বসে চোখে স্বপ্ন আর হৃদয়ে আশা নিয়ে বসে থাকা স্পন্দিত বক্ষের শ'দেড়েক সদ্য নটরডেমিয়ানের আসনবিন্যাস যথাযথ আছে কি না- তা দেখে নিলেন এক নজর, তেলাপোকা রঙের ধাতব ফ্রেম নামিয়ে রাখলেন টেবিলে। এবং মুখ খুললেন।


" কী করি, কেনো করি, জানতে চাই...। আমরা তো স্যার সবা-আ-ই এ প্লাস। আই ?? ... নটোরডেম কোলেজে প্রথম পরীক্ষায় অঙ্ক দিসে আটটা। দোস্তোরে জিগাই- কয়টা হইলো স্যা-আ-র ?? ... কয় চাইরটা দিসি, দুইটা ভুল, একটা সন্দ্‌ আসে...


অভিজ্ঞ ডাকতার যেমোন রোগীর নাড়ি ধরলেই বোলতে পারে, তার কি অসুখ-আমিও তেমন আপনাদের অসুখ ধরতে পারি স্যা-আ-র। ...ঐ যে, সাতাইশ বচ্ছরের অভিজ্ঞতা স্যা-আ-র।..."


বলা বাহুল্য, নটরডেমিয়ানেরা নিজে ছাড়া অপর কারো ভাব নেয়া সহ্য করে না। অতএব, এই অযাচিত ভাব নেয়া লোকটিকে আমরা প্রথম দিনেই বেশ অপছন্দ করে ফেললাম। আমাদের নির্বাচিত শ্রেনী প্রতিনিধি বরুন সেই প্রথম ক্লাসেই ভদ্রলোকের ধমকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো।


অঙ্ক করাতে এসে পরের কয়েকদিন ভদ্রলোক পড়ালেন অদ্ভূত সব 'অপ্রয়োজনীয়' জিনিস। 'রাশি কাকে বলে জানতে চাই স্যার !!' অথবা 'সাইন থেটা কারে কয় ??'  কিংবা 'কুন বলতে আমরা কী বুঝি ??'... আশ্চর্য - আশ্চর্য !!! ...

অথচ দিন কয়েকপরে দেখা যায়, আমার মত দু'চারটে গাবর বাদে গ্রুপ ফোরের মোটামুটি সকল ছাত্র গণিত বস্তুটার ভেতরের অংশ ধরে ফেলেছে। খালি চার দিয়ে ভাগ করে দুই যোগ আর সাত বিয়োগ করাটা যে আঁক কষার আসল উদ্দেশ্য না, এইটা বুঝে নিয়ে অঙ্ক করতে আমাদের বেশ মজাই লাগে। এবং ভালো লাগতে থাকে স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে প্রতিদিন পড়াতে আসা লোকটাকেও।


তবে এই লোকটার ক্লাস করা মহা ঝামেলার বিষয়। তাঁর ক্লাসে পাশের ছেলের খাতায় বেইলী রোডের কলেজটা নিয়ে আজেবাজে কথা ছড়ানো যায় না, ফিজিক্সের প্র্যাকটিক্যাল খাতা লেখা যায় না, মাসুদ রানা পড়া যায় না, কলম দিয়ে সামনের বেঞ্চের লুথা ছেলেপিলেরেও গুঁতানো যায় না। ধরা পড়েছো কী মরেছো। "এই লাল গ-ঞ্জী, তুমি দাঁড়া-আ-আও !!" উঠে দাঁড়ানোর পরে লাল গেঞ্জীর আক্ষেপের সীমা থাকবে না। তাকে "কোন্‌  ইশ,কু-উ-ল ??" এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, তাকে জানানো হবে তার এরুপ আচরণ নটরডেম কলেজের দীর্ঘ ঐতিহ্যের পরিপন্থী, এবং এরপর ঢাকা শহরের অলিতেগলিতে সদ্য কলেজ ছাত্রের জন্যে ছড়িয়ে থাকা অগণিত প্রলোভন সম্পর্কে তাকে মিনিট পাঁচেক আলোকিত করা হবে।


আস্তে আস্তে দিন কেটে যায়। আমরা নটরডেমের আলো-বাতাস পেয়ে চালাক-চতুর হয়ে উঠি। অঙ্কের ক্লাসে মাঝে মাঝে প্রক্সি দিতে নতুন কোন শিক্ষক আসেন। আমরা তাঁদের সাথে ব্যবহার করি সেই রামকুমড়ো তর্কালঙ্কারের মতন, ক্লাস শেষে বলি- ''বালাই ষাট !! কীসব ছাঁইপাশ পড়ায় দেখেছিস নন্টে ?? ... এরচেয়ে আমাদের স্কুল ইউনিফর্ম পড়ুয়া ঢের ভালো !!"


দেখতে দেখতে খাতার পাতা ফুরোয়, সাথে ফুরোয় ফার্স্ট ইয়ার। সেকেন্ড ইয়ার যায় আলোর বেগে। পরিচয়পত্র পুরোনো হয়, পুরোনো হয় সায়েন্স ক্লাবের আড্ডা আর গুটিবাজি, পুরোনো হয় স্কুল ইউনিফর্ম। একদিন শেষ বিকেলে তাই স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত লোকটাকে ডায়াসে দেখে আমরা খেয়াল করি যে নটরডেম কলেজে আমাদের শেষ ক্লাস হয়ে যাবে এখন- চিরদিনের মত। লোকটা কিন্তু আপন খেয়ালে সম্ভাব্যতার তাস ভাগাভাগি সংক্রান্ত কিছু একটা বোঝান আমাদের। কেবল ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে ধাতব ফ্রেমের তেলাপোকা রঙের চশমাটা নামিয়ে রাখেন চোখ থেকে। কেনো জানি তাঁকে বড় দুঃখিত দেখায়। মনে হয় তিনি যেনো বহু দূর থেকে আমাদের দেখছেন; যেমন দেখেছেন আরো সাতাশ বছর ধরে। কেউ আমাদের বলে দেয়নি- অথচ আমরা জেনে যাই, শেষবারের মত তিনি আমাদের সাথে কথা বলবেন। এবং বলেন - ''আমি স্যার লোক অনে-এ-এক খারাপ। আপনাদের স্যার বহু-উ বকাবকি করসি। ... কিন্তু স্যার একটা বিষয় খেয়াল রাইখেন, আমি স্যার বকাবকি করসি আপনাদের ভালোর জন্যে।... আপনাদের মঙ্গলের জন্যে স্যার।"

স্কুল ইউনিফর্মের লোকটা ডায়াস থেকে নেমে করিডোরে হাঁটা ধরেন।

এরপর কী হয়েছিলো, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কেবল এটুকু জানি, নটরডেমের কলেজের তিনতলার ৩০১ নম্বর রুমের মাঝে ছড়িয়ে থাকা দেড়শ জন 'আমি' একই সাথে উঠে দাঁড়ায়, মাথা উঁচু করে হাততালি দিয়ে যায়, আবেগে- শ্রদ্ধায়। স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে থাকা লোকটাকে আর দেখা যায় না। ঝাপসা চোখে কতটুকুই বা আর দেখা যায়...


... ভুল বললাম। পরিষ্কার চোখেও দেখা যায় না।  জওহরলাল সরকার স্যারের মতন মানুষগুলো এই অসময়ে বড় দুষ্প্রাপ্য। তাঁদের কেবল জন্ম হয়, মৃত্যু হয় না কোনদিন।

[পহেলা জুলাই, সচলায়তনের জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধেয় প্রকৃতিপ্রেমিক (সচলের পিপিদা) কর্তৃক প্রকাশিত 'কলেজ স্মৃতি' নামক ই-বইতে দেবার উদ্দেশ্যে লেখা। নানা রঙের কলেজ স্মৃতিতে মোড়ানো ই-বইটি পাওয়া যাবে এখানে।]

৬টি মন্তব্য:

  1. স্কুল পরবর্তী সময়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক।।
    এই লোকটার কাছে ক্লাশ না করলে হয়তো কোনোদিন ম্যাথ শিখতে পারতাম না।।

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ লিখেছেন ভাই।


    -রাফফান

    উত্তরমুছুন
  3. bhaiya ekta jaigay amar shotti shotti rom khara hoye giyechilo.uni amar viva niyechilen khuub ador kore mamoni bolechilen r onek proshongsha korechilen.r khub basic kichu question korechilen
    moshfeqa

    উত্তরমুছুন
  4. রাফি ভাই, কিষাণ, রাফফান, মোশফেকা ও আরো যারা পড়েছেন, তাঁদের ধন্যবাদ।

    স্মৃতির কাছে কৃতজ্ঞ রই, কারণ এই মানুষটিকে ভুলে যাই নাই...

    উত্তরমুছুন
  5. লিখা পড়ে আপসোস বাড়লই কেবল। এই মানুষটাকে আমরা গ্রুপ-১ এর মহাজ্ঞানী ছাত্ররা পাইনি।

    জয়

    উত্তরমুছুন