মঙ্গলবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০

সেরিওজা এক্সপ্রেস-০৩

দিনলিপি

ঢাকার রাস্তায় বেরোতে ইচ্ছে হয় না। ভার্সিটি বন্ধ থাকায় সেহরির পর বেশ প্রেমসে একটা ঘুম দেয়া যায়, সেটা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে দশটা কি এগারোটা। পাখির কুজন মুখরিত সকাল বা মৃদুমন্দ বাতায়ন টাইপের জিনিসপত্রগুলো, যা কেবল সত্যযুগের কবিদের জন্যেই তৈরী হতো- ঠা ঠা রোদের মধ্যে ঢাকার রাস্তায় আজকাল খুঁজে পাওয়া যায় না। রাইফেলস স্কোয়ার কি বসুন্ধরা শপিং মলেও না, নিউমার্কেট কি বঙ্গবাজারেও না। অতএব চালাও ল্যাপটপ। এক জানালায় সচলায়তন এবং আরেক জানালায় ফেসবুক খুলে ফেলে রাখো। হাতে একখানা বইটই নিয়ে পড়তে থাকো, এই তো। দুপুরের দিকে আরেকবার ঘুমিয়ে নেয়া যায় সুযোগ বুঝে, আর ঘুম থেকে উঠে এদিকওদিক হাঁটাহাঁটি করতে করতেই যে রোযা  ভাঙ্গবার সময় হয়ে যায়, ঐটা না বললেও নিশ্চয় চলে।



ঐ ইফতারের পরের দিনলিপি অবশ্য অতটা একঘেঁয়ে থাকে না। ছবির হাটের মাশ্রুমাড্ডায় চলে যাও। ঐখানে পৃথিবীর সকল কিছু নিয়ে রাজা-উযির মারা যায়। দুতিন কাপ চা খেতে খেতেই রাত দশটা। এরপরে বাসায় এসেই জমিয়ে রাখা আরেকটা মুভি দেখতে পারো, মাঝে মাঝে নোটিফিকেশন চেক করতে করতে চশমা মুছতে পারো। ...

মজাটা জমে কোন ইফতারের ছুতোয় করা আড্ডা থাকলে। জনৈক দুর্ভাগা তরুণকে কাঁদিয়ে ক্লাস বন্ধ হবার দিন হলে এরকম একটা আড্ডা হলো, ধানমন্ডিতে আড্ডা আরেকটা জমলো গতকাল। কিছুদিন আগে স্কুলের পুরনো বন্ধুদের নিয়েই আড্ডা দিলাম একটা। আশ্চর্যের বিষয়, স্কুল ছাড়ার সাত বছর পরেও দেখলাম জলদস্যুগুলা একই বিষয়ে আলাপ করে। এখনো স্কুলের সবচেয়ে ইয়ে মেয়েটা কোনখানে পড়ে, অমুক স্যার কারে কীভাবে কী বলেছিলেন, কোন বাঁদরে কোন স্যারের বেতন না দিয়ে সিনেমা দেখতে গেসিলো, মাসুদ রানার 'সংকেত' জনিত এডভেঞ্চারের কততম পৃষ্ঠায় কী ছিলো - এইসব হাবিজাবি। ...

বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টিলিজেন্সের দুর্ধর্ষ- দুঃসাহসী স্পাই মাসুদ রানার বয়স কখনো বাড়ে না, স্মৃতির মতোই।...





কী পড়ি, কী দেখি

ছুটিতে জমে থাকা বইগুলো শেষ করবো বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। সকালের দিকেই তাই বইগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আবদুশ শাকুরের 'গল্পসমগ্র'- দ্রুত পড়ে শেষ করা যাচ্ছে না। ভদ্রলোক প্যাঁচান বেশি, বিষয়বস্তুর - যেটাকে সচরাচর প্লট বলা হয়- সেটাতে খুব বেশি বৈচিত্র্য না থাকলেও তার শব্দজ্ঞান এবং শব্দজট পাকানোর ক্ষমতা ঈর্ষা করার মত। শনৈঃ শনৈঃ টেনশন হতে থাকে।

জাকির তালুকদার সাহেবের ছোটগল্পের প্রতি আগ্রহ বোধ করেছিলাম। বর্ষার বইমেলা থেকে সংগ্রহ করা গল্পসমগ্রও তাই জমে থাকা বইয়ের তালিকায় ছিলো। এবং বেশ আগ্রহ জাগানিয়া বিষয়বস্তু। শাকুর সাহেবের চেয়ে ইনি বিষয়বস্তুতে বেশ বেশিই বৈচিত্র্য রাখেন। এই বইটা পড়ে বেশ ভালো লাগে। ... এই জাতীয় সিরিকাস ছোটগল্প পড়ে হাঁপিয়ে গেলে তার জন্যে শরদিন্দুবাবু আছেন, তার গল্পসংকলন আছে। অপরাধ সাহিত্য এবং মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে আমার মতে শরদিন্দুর অবস্থান একান্তই আলাদা।

একটানে পড়ে শেষ করেছি দুটো বই। প্রথমে সৈয়দ শামসুল হকের গল্পগুলো। তাঁর উপন্যাস আগেই পড়েছিলাম- গল্পে তাঁর দক্ষতা যাচাই করা হয়নি। সত্যি বলতে আমি মুগ্ধ। হক সাহেবের লেখায় একটা ব্যাপার, খুব সহজেই গল্পের পেছনে তাঁর পরিশ্রমটুকু ধরা পড়ে যায়। এতে অবশ্য আমার চোখে কৃতিত্ব কমে যায় না। ভাস্কর্যে তো ছেনি-বাটালিও ধরতে হয়, না কি ?? ... দ্বিতীয়ত, "জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা"। ওয়ারি, বনগ্রাম, রায়সা বাজার, ভূতের গলি- আপাত নিরীহ এবং ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুর মার্কা এসব জায়গায় কী করে যে এমন পরাবাস্তব আবহ তিনি তৈরী করতেন, তা কেবল শহীদুল জহিরই জানতেন। সচল নিবিড় ভাইয়ের কাছ থেকে ধার করে এই বইটাও পড়া হয়েছে একবসাতেই।


কী কী দেখলাম বলি নেই এই বেলা। এঞ্জেলিনা জোলির একশন মুভি 'সল্ট' ভালো লাগেনি। ভালো লেগেছে রোমান পোলানস্কির 'গোস্ট রাইটার', উইল স্মিথ তনয় জ্যাডেন স্মিথ (ঐ যে, 'পারস্যুট অফ হ্যাপীনেস' এর পিচ্চিটা আর কী) এবং জ্যাকি চ্যানের 'দা কারাটে কিড'। টুকটাক আরো কিছু মুভি দেখা হয়েছে। মনে রাখার মত মুভি বলতে দুইটা। নাগীব মাহফুজের নোবেল বিজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে সালমা হায়েকের মেক্সিকান ছবি "মিডাক এলী" এবং ইতালিয়ান থ্রিলার "আই এম নট স্কেয়ারড "।

... রোযা রমযানের মাস বলে খেলাধূলা বন্ধ। খেলাধূলা দেখাও বন্ধ হবার পথে। আমাদের ডিজিটাল সরকার নিশ্চিত এন্টি-বার্সেলোনা সমর্থক। শালারা সুপার স্পোর্টস ব্যান করসে। (আজকে আর্জেন্টিনা-স্পেন ম্যাচটাও দেখতে পারবো না। ... গররর...)বার্সার মৌসুমের প্রথম ম্যাচটাই দেখতে পারলাম না !! তবে ৩-০ গোলে রেসিংকে হারায়ে মৌসুম ভালোভাবেই শুরু করা গেসে।

ক্রিকেটে আর কিছু না হোক বাটদের বাটে পড়া দেখে ব্যাপক বিনোদন পাইলাম।

এদিকে ইউএস ওপেন চলে। হাইলাইটস হিসেবে এই তৃতীয় রাউন্ড শেষ হবার পরেও চোখে ভাসতেছে প্রথম রাউন্ডে ব্রায়ান ডাবুলের বিপক্ষে পেছনে ছুটে গিয়ে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে মারা সেই অবিশ্বাস্য শট... ক্লাসিক ! ! !




জাকির নায়েক, আম্মা এবং...

কোন বিতর্কে জড়াতে চাই না বলে আগেই পরিষ্কার বলে দেই, আমি নাস্তিক বা সংশয়বাদী নই। এরপরেও আমি আমার পরিচিত মহলে প্রচন্ড রকম জনপ্রিয় বক্তা জাকির নায়েক সাহেবকে দেখতে পারি না। উনি ইসলাম ধর্মের মহিমা প্রচার করেন, পাশ্চাত্যে মুসলমানদের সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করেন- খুবই ভালো কথা, এইখানে আমার মত সাধারণ মানুষের নাক গলানোর কিছু নাই। আমার আশঙ্কা, বিরাট কৃতিত্বের সাথে বিশাল দায়বদ্ধতাও থাকে- সেই বিষয়ে সচেতন হয়ে জাকির নায়েক সাহেবকে হতে হবে সম্পূর্ণ নির্ভুল। বিশ্বের মুসলিমদের একটা বড় অংশ তার মুখের কথাকে সত্য বলে মেনে নেবে কোন প্রমাণ ছাড়াই, সেটা মাথায় রেখেও যে কোন ধরণের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দানে তার উচিত সমস্ত বিতর্কের উর্ধ্বে থাকা। দুঃখজনক, আমার কাছে তার অনেক উদাহরণই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে হয়েছে।

... আমার এই জাকির নায়েক অপ্রীতি যাদের বেশ অপছন্দের, তাদের একজন হচ্ছেন আমার আম্মা। "তুই বাবা আগে পাঁচ ওয়াক্ত নামায রোযা ঠিকভাবে কর, তারপর ধর্ম নিয়ে বাদবাকি কথাবার্তা বল্‌ "- আমার আম্মার কথাবার্তা এই মনোভাবের। হেহ হেহ,  আম্মা তো, কিছু বলাও যায় না... । খুব সঙ্গত কারণেই প্যালেস্টাইন ইসরায়েল বিরোধের কারণে আমার আম্মার মাঝেও মুসলিমদের প্রতি বেশ সহানুভূতি কাজ করে। এর সাথে যোগ হয় জাকির নায়েক সাহেবের প্রতি আমার মনোভাব। " ইশ, ইহুদি লোকজন কত খারাপ !! "- খবর দেখে আম্মার এই জাতীয় সংলাপে বলতেও পারি না যে ইহুদীরাও অন্যান্য জাতির মতোই ভালো খারাপ মিশিয়েই মানুষ। ভেদাভেদটা ধর্মীয় আর রাষ্ট্রীয়ভাবে সৃষ্টি। বিজ্ঞানের আলবার্ট আইন্সটাইন আর শিল্পের স্টিভেন স্পিলবার্গ- এই দুইজনই আমার খুব পছন্দের মানুষ। বলাবাহুল্য আম্মা আমার যুক্তিতে কান না দিয়ে পারলে আমার কান টেনে দেন। ধর্মকর্মে মন না দিয়ে (জাকির নায়েকের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ যার অন্যতম লক্ষণ) আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি- এই জাতীয় সর্বহারা সংলাপ দেন। সে সংলাপ শুনে নিজেকে আমার বাংলা সিনেমার ত্যাজ্য নায়ক বলে বোধ হয়।

... তা আম্মাকে আজ টেনে ধরে বসিয়ে সিনেমা দেখালাম, আমার প্রিয়তম সিনেমা। লাইফ ইজ বিউটিফুল। জীবন বড় সুন্দর। আম্মা দেখেন। ইহুদীদের উপর জার্মান সেনাবাহিনীর নিপীড়নে ফুঁপিয়ে ওঠেন। ইহুদী পিতা গুইডোর পুত্র জোশুয়ার প্রতি ভালোবাসা দেখে বিস্মিত হন। জীবনের সবটুকু হারিয়েও শুধু ভালোবাসায় ভর করে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে জোশুয়াকে আড়াল করতে দেখে আম্মা হাসেন। গুইডোর আচমকা মৃত্যুতে কাঁদেন। আমি কিছু বলি না...


...মানুষই তো মানুষের জন্যে কাঁদে। ধর্ম আর জাতিভেদের আড়ালে মানুষ তো মানুষ-ই। মানুষের জন্যে মানুষের এ জীবন সুন্দর না হয়ে যায় কোথায় ??...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন