রবিবার, ১১ জুলাই, ২০১০

স্পেনের জয় !! সুন্দর ফুটবলের জয় !!

"লা ফুরিয়া রোজা"দের ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা খেলে। ...

কথাটা অদ্ভূত শোনায়। বিশ্বকাপের অংশ নেয়া আরো ৩২টি দেশও তো ফুটবলই খেলে। কথাটা সত্যি। কিন্তু স্পেন খেলে কেবল খেলবার জন্যেই, শুধুই খেলা। ফলাফল প্রত্যাশী এই আধুনিক ফুটবলের যুগে বাকি সমস্ত দলগুলো যখন যেনতেন ভাবে জয় করায়ত্ত করতেই 'সুন্দর ফুটবল', 'জোগো বনিতো' জাতীয় শব্দগুলো ফুটবলীয় মিথে পরিণত করে ফেলেছে, তখনো বিশ্বকাপ ফুটবলে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বসে অঘটনের জন্ম দিয়ে প্রবল চাপের মুখে পড়ে যাওয়া স্পেন দলের সবাই বলছিলো সেই কথাই- "যত যাই হোক, সুন্দর ফুটবলের সাথে কোন আপোষ নয়।"

কোচ ভিসেন্তে দেল বস্কের এই কথায় সাংবাদিকেরা মুচকি হাসেন, বড় বড় অক্ষরে পত্রিকায় হেডিং দেন। আমরা গণমানুষেরা সেই খবর পড়ে অবাক হই- অবজ্ঞার মুচকি হাসি দিই- ভাবি, এই 'সোনালী প্রজন্ম'ও কাগজে কলমে বাঘ হয়েই থাকবে। শিরোপা লড়াই থেকে স্পেনের বাদ পড়তে আর বেশি দেরী নেই... এই চলে গেলো বলে।


এরপরে একেকটা ম্যাচ যায়। স্পেন দল কেবল খেলেই যায়, শুধু খেলার আনন্দে। খেলবার আনন্দেই মুগ্ধ করতে থাকে বিশ্বের অগণিত ফুটবল সৌন্দর্য্য-পিপাসু দর্শকেদের। লাতিন আমেরিকান সৃষ্টিশীলতা আর ইউরোপীয়ান ঘরানার সুশৃঙ্খল ফুটবলের মিশেলের এই ফুটবল কেবল দর্শকদের তৃপ্তি দিয়েই সন্তুষ্ট করে না, স্কোরবোর্ডেও এগিয়ে থাকে প্রতিপক্ষের চাইতে। "লোহিত অঙ্গার" ডাকনামের স্পেন দল জবাব দিতে থাকে যুগে যুগে তাঁদের বিপক্ষে জমা হওয়া সমস্ত অপবাদের, দূর করতে দিতে থাকে সুন্দর ফুটবল খেলে বিশ্বকাপ জিততে না পারার তাদের চিরকালীন বৈষম্য...


এবারের বিশ্বকাপে আসার আগে থেকেই হট ফেভারিটের এই বিষম চাপ সঙ্গী স্পেনের। ১৯৬৪ সালের ৪৪ বছর পর ২০০৮ সালের ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতা এই স্পেনের গায়ে লেগে গেছিলো "সোনালী প্রজন্মের" তকমা। তা, সোনালী প্রজন্মই বটে। মাঠে নামা ১১ জনের নামটা দেখুন একবার। বারের নীচে ইকার ক্যাসিয়াস, রক্ষণভাগ সামাল দিচ্ছেন- জেরার্ড পিকে আর কার্লোস পুয়োল। রক্ষণ থেকে দুই উইং দিয়ে অনবরত উপরে ছুটে গোলমুখে হানা দিচ্ছেন সার্জিও রামোস আর জোয়ান ক্যাপডেভিলা। মাঝমাঠে স্পেন চাইলে সারাদিনই বোধহয় বল ধরে রাখতে সক্ষম। জাভি আলোনসো আর সার্জিও বুসকেটসের সাথে সেখানে যে আছেন জাভি আর আন্দ্রেই ইনিয়েস্তা !!! এরপরে আক্রমণভাগে দুনিয়া কাঁপানো দুই স্ট্রাইকার ডেভিড ভিলা আর ফার্নান্দো তোরেস। এখানেই শেষ নয়, রিজার্ভ বেঞ্চটা দেখুন একবার ... বসেই থাকতে হবে সেস ফ্যাব্রিগাস, পেদ্রো, পেপ রেইনা আর ভিক্টর ভালদেসকে। অথচ যে কোন শীর্ষ পর্যায়ের ইউরোপিয়ান ক্লাব দলে এদের স্থান অনিবার্য !! "ড্রিম টিম" কাগজে কলমে বোধহয় বলা হয় অনেক দলকেই, কিন্তু কারো ক্ষেত্রেই বোধহয় এই ট্যাগিং এতোটা সপ্রযুক্ত হয় না।


অথচ স্বপ্ন থেকে বাস্তবে নেমে আসতে দেরী হয় না একদমই। কাগজে কলমে গ্রুপ এইচের থেকে পরের রাউন্ডে যাওয়া নিশ্চিত ছিলো স্প্যানিশদের। ১৬ জুন রাতে সুইজারল্যান্ডের সাথের খেলাতেও থাকলো স্প্যানিশ মধ্যমাঠের প্রাধাণ্য। আক্রমণের পর আক্রমণ সাজিয়েও কেনো যেন ঠিক সুবিধে করতে পারছিলো না স্পেন। প্রথমার্ধে গোলশুণ্য ড্র নিয়ে দুই দল বিরতিতে গেলেও বিরতির পর খেলা শুরু হতেই সুইস খেলোয়াড় ফার্নান্দেসের গোলে পিছিয়ে পড়লো স্পেন। খেলার ধারার সম্পূর্ণ বিপরীতে এই গোল খেয়ে পালটা আক্রমণে উঠতে সময় নেয়নি স্পেন। কিন্তু সুইসদের ডিফেন্সের সাথে সাথে তাঁদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালো ভাগ্যও। দুই-দুইবার বল পোস্টে লাগালেও গোলের দেখা পেলো না তাঁরা।




ভিসেন্তে দেল বস্কের উপর হামলে পড়তে সময় নিলেন না নিন্দুকেরা। গুঞ্জন উঠলো বেশ জোরেই। 'হট ফেভারিটেরা বিশ্বকাপে ফ্লপ করে'- বহুল জনপ্রিয় এই তত্ত্ব বাতাসে ভাসতে শুরু করলো। ' এই স্পেন ইংল্যান্ডের মতোই কাগুজে বাঘ- এদের খেলোয়াড়েরা কেবল ক্লাবের জন্যেই খেলে।' এই কথাও শোনা গেলো। স্প্যানিশ টিভি চ্যানেল টেলেসিনকোর সুন্দরী সাংবাদিক সারা কারবোনেরো'কে নিয়ে ছড়ালো সবচেয়ে রসালো গুজবখানা। স্প্যানিশ গোলরক্ষক এবং অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াসের এই বান্ধবী নাকি লাইভ খবর সম্প্রচার করছিলেন ঠিক গোলবারের পেছনে দাঁড়িয়ে। সুন্দরী প্রেমিকার উপস্থিতি ক্যাসিয়াসের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটিয়েই নাকি হারিয়েছে স্পেনকে। কর্তব্যে গাফিলতির দায়ে মিডিয়ায়
অভিযুক্ত হতে লাগলেন ক্যাসিয়াস।


সমস্ত অভিযোগের জবাব পাওয়া গেলো পরের ম্যাচে, ২১ জুনের রাতে - হন্ডুরাসের বিপক্ষের ম্যাচে। যথারীতি পাসিং ফুটবল খেলে শুরু করেছিলো স্পেন, কিন্তু গোলপোস্টের সামনে এসে মুখ থুবড়ে পড়ছিলো দলীয় সমঝোতা। প্রয়োজন ছিলো বিশেষ কিছুর, আর সেই কাজটিই করলেন ডেভিড ভিলা। বামপ্রান্ত থেকে ম্যাচের ১৭ মিনিটের সময় একক প্রচেষ্টায় দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডি-বক্সে ঢুকেই মারলের জোরালো এক শট... বিশ্বকাপে স্পেনের প্রথম গোল !! এই এক গোলেই নিজেদের স্বাভাবিক চাপমুক্ত খেলাটা খেলতে শুরু করেছিলো স্পেন, কিন্তু গোলের সুযোগ নষ্ট করেও মিস করছিলেন প্রায় সকলেই। ৫১ মিনিটের সময় দ্বিতীয় গোল করে স্পেনের জয় নিশ্চিত করেন ভিলা। নাটকের এখানেই শেষ নয়। ৬২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়ে নিজের হ্যাট্ট্রিক মিস করেন এই ভিলাই। ২-০ গোলেই ম্যাচ জিতে স্পেন জানান দিলো, বিশ্বকাপে তারা এখনো টিকে আছে।



২৬ জুন, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্পেনের প্রতিপক্ষ ছিলো লাতিন আমেরিকার গতিময় ফুটবল খেলা দল চিলি। কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে চিলি গ্রুপ পর্বের আগের দুই ম্যাচেই জয় লাভ করে তখনো পর্যন্ত গ্রুপ শীর্ষে। স্বভাবতই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের পর্বে যেতে চাইছিলো দুটো দল, কারণ গ্রুপে দ্বিতীয় হলে পরের রাউন্ডে ফিফা'র শীর্ষ বাছাই ব্রাজিলের মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা। খেলার শুরুতেই আগুয়ান তোরেসের কাছ থেকে গোল বাঁচাতে বার অরক্ষিত রেখে বেরিয়ে আসলেন গোলরক্ষক ভেলাডেরাস, তোরেসের কাছ থেকে বল ক্লিয়ার করলেও গোল বাঁচাতে পারলেন না শেষতক। অরক্ষিত গোলপোস্টে প্রায় মাঝমাঠ থেকে অসাধারণ ফিনিশিং দক্ষতা দেখিয়ে গোল করেন সেই ভিলা। এরপরে ইনিয়েস্তার চমৎকার ফিনিশিংয়ে প্রথমার্ধেই দুই গোলে এগিয়ে গেলো স্পেন। দ্বিতীয় গোলের সময় চিলির মারকো এস্ত্রাদাকে বিতর্কিত এক লাল কার্ড দেখিয়ে রেফারি চিলিকে পরিণত করেন ১০ জনের দলে। তবুও দর্শকদের তৃপ্ত করে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে স্পেনকে কঠিন পরীক্ষার সামনেই ফেলেছিলো চিলি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে এক গোল ফিরিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলেই হার মেনে মাঠ ছাড়তে হয় চিলিকে। স্পেন গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন এবং চিলি রানার-আপ হয়ে উন্নীত হয় নকআউট পর্বে।
 



২৯শে জুন রাতের খেলায় নকআউট পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হলো পর্তুগাল। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচে পর্তুগাল খেলেছে অসম্ভব রকম নেতিবাচক-রক্ষণাত্বক ফুটবল। তিনম্যাচের দুটোতেই গোল না দিয়েও পর্তুগাল হয়েছে গ্রুপ রানার-আপ। এহেন পর্তুগাল এই বাঁচা-মরার ম্যাচেও 'গোল না হয় নাই দিলাম, গোল যেন না খাই' এই নীতি মেনেই খেলা শুরু করলো। স্পেন যথারীতি পাসিং ফুটবল খেলে গেলো এটাকিং থার্ডে তাদের পুরোনো সমস্যা অনুযায়ী ফিনিশ করতে পারছিলো না- আর দশজনের পর্তুগাল ডিফেন্স ভেদ করেও আটকে যাচ্ছিলো পর্তুগীজ গোলরক্ষকের অসামান্য দৃঢ়তার কাছে। ...কিন্তু ঐ যে, 'তারা তিনজন' আছেন না ?? ভিলা-ইনিয়েস্তা-জাভি ?? পর্তুগালের বাঁধা পেরিয়ে গেলো স্পেন এই তিনজনে ভর করে। ইনিয়েস্তা বাড়ালেন ডিফেন্স চেরা এক পাস, নিখুঁত পাস সম্পন্ন করাকে যিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে- সেই জাভি হার্নান্দেজ ইনিয়েস্তার বাড়িয়ে দেয়া বলটা ধরে রাখলেন একটা প্রয়োজনীয় মুহূর্ত; ঠিক যেটুকু সময় প্রয়োজন ছিলো বক্সের বাম প্রান্ত থেকে ভিলার দ্রুত গতির দৌড়ের জন্যে, এরপরেই জাভি আলতো ব্যাকহিলে বলটা ঠেলে দিলেন আগুয়ান ভিলার উদ্দেশ্যে। ভিলার প্রথম শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বল জালে পাঠিয়ে পর্তুগালের দুর্গ পতন ঘটালেন। অবশিষ্ট ম্যাচে পর্তুগাল চেষ্টা করেও তেমন কিছুই করতে পারেনি।



৩রা জুলাই, প্যারাগুয়ের সাথে কোয়ার্টার-ফাইনালের ম্যাচের চিত্রনাট্য মোটামুটি পর্তুগালেরটাই অনুসরণ করেছে। নাটক যা হবার, তা হলো দ্বিতীয়ার্ধে। জেরার্ড পিকের ফাউলের কারণে ৫৮ মিনিটে পেনাল্টি পায় প্যারাগুয়ে। কার্ডোজার নেয়া পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে দেন 'সেইন্ট ইকার' ক্যাসিয়াস। অথচ মিনিট পরেই মাঠের অপর প্রান্তে ডেভিড ভিলাকে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় স্পেন, জাভি আলোন্সোর নেয়া প্রথম শটে গোল হলেও রেফারি গোল বতিল করে দেন- কারণ শট মারার পূর্বেই বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন স্পেনের খেলোয়াড়েরা। ফিরতি শট ঠেকিয়ে আবার ম্যাচে সাম্যবস্থা বজায় রাখেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক জুস্তো ভিলার। ৮২ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় পেদ্রো মাঠে নামার খানিকপরেই তার শট ফিরে আগে পোস্টে লেগে, গ্যালারীতে মাতম ওঠার পূর্বেই ফিরতি বলে শট করেন ভিলা- দুই দিকের দুই পোস্টে চুমু খেয়ে সেই বল ঢুকে যায় জালে !! ন্যুনতম ব্যবধানে জিতেই সেমিতে ওঠে স্পেন।




জার্মানি বনাম স্পেন !!!! ৭ই জুলাই বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল ম্যাচের আগে ম্যাচপূর্ব আবহ একে পরিণত করলো বিশ্বকাপ ফাইনালের চেয়েও আকর্ষণীয় ম্যাচে। জোয়াকিম লো'র অধীনের তরুণ জার্মান দল এই বিশ্বকাপে খেলেছে সবচেয়ে বিধ্বংসী ফুটবল। গত দুই ম্যাচে ইংল্যাণ্ড এবং আর্জেন্টিনাকে যথাক্রমে ৪-১ এবং ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে জার্মানি বুঝিয়ে দিয়েছে তারা বিশ্বকাপ ঘরে তোলার সামর্থ্য রাখে। অপরদিকে দুই বছর আগে এই জার্মানিকেই হারিয়ে ৪৪ বছর পর ইউরোপ সেরা নির্বাচিত হয়েছিলো স্পেনের এই 'সোনালী প্রজন্ম'। দুই দলের লড়াইকে তাই ভাবা হচ্ছিলো ফাইনালের আগের ফাইনাল। ... মাঠে কী দেখা গেলো তবে ??

মাঠে অনুদিত হয়েছিলো এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবল। ভিসেন্তে দেল বস্ক প্রণয়ণ করলেন এক উঁচু মাত্রার ট্যাকটিক্স এবং এই ট্যাকটিক্স বাস্তবায়নে তিনি পেয়েছেন একঝাঁক অসাধারণ প্রতিভাবান ফুটবলার। খেলার শুরু থেকেই জার্মানির অর্ধ থেকে এটাকিং থার্ড পর্যন্ত নিজেদের ভেতর বলের আদানপ্রদান শুরু করলো স্পেন, মাঝে মাঝেই ডিফেন্সের ফাঁক গলে বারে শট। বলের পেছনে ছুটে ছুটে জার্মানদের মস্তিষ্ক আর পা হলো ক্লান্ত, রণকৌশল গেলো হারিয়ে। ওজিল-শোয়াইন্সটাইগার- খেদিরা-পোডলস্কি সমৃদ্ধ জার্মান মাঝমাঠকে কার্যত অদৃশ্য হতে হলো। কাউন্টার এটাকে পারদর্শী জার্মানেরা মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্ত আক্রমণ করছিলো বটে, তবে সেগুলো ঠেকাতে তেমন অসুবিধে হয়নি স্পেনের। তবুও জার্মানির বিপক্ষে গোলের দেখা পেতে স্পেনকে অপেক্ষা করতে হলো ৭৩ মিনিট পর্যন্ত। জাভির কর্ণারে দুর্দান্ত এক হেড করে দলকে এগিয়ে নিলেন বহুদিন ধরে স্পেনের রক্ষণভাগের অক্লান্ত যোদ্ধা- বার্সেলোনা অধিনায়ক, দ্যা টারজান, কার্লোস পুয়োল। এই এক গোলেই ইতিহাস রচনা করে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলো স্পেন। স্কোরবোর্ড বলছিলো ১-০। কিন্তু হায়, পরিসংখ্যানের সাধ্য কী স্পেনের খেলার সৌন্দর্য্য ব্যাখ্যা করে...



সদ্যসমাপ্ত ফাইনালের বর্ণনা আর কীভাবে দেবো। শুরু থেকেই গা-জোয়ারি ফুটবল খেলে স্পেনের স্বাভাবিক খেলা বিনষ্ট করতে চেয়েছে নেদারল্যান্ড এবং তারা সফলও হয়েছে। রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েব বাধ্য হয়েছে আট-আটজন ডাচকে হলুদ কার্ড দেখাতে। স্পেনের স্বাভাবিক ফুটবল বাঁধা পেয়েছে আর এই ফাঁকে ডাচেরা চেয়েছে গোল দেয়ার কাজটি সেরে ফেলতে। দুই-দুইবার একা গোলরক্ষককে একা পেয়েও পরাস্ত করতে পারেনি ডাচ উইঙ্গার রোবেন। এই একই ভুল করেছেন স্পেনের সেস ফ্যাব্রিগাসও, একবার। আকাঙ্খার সেই গোল এলো ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ের ২৫ মিনিটের মাথায়, নেদারল্যান্ড দশ জনের দলে পরিণত হবার পরে। সুন্দর ফুটবলের বাহক স্পেনের যে খেলোয়াড়টির পায়ে সবচেয়ে সুন্দর করে ফোঁটে ফুটবলের শিল্প, সেই "ডন" আন্দ্রেই ইনিয়েস্তা তোরেসের বাড়িয়ে দেয়া বলে ভাংগলেন ডাচ ডিফেন্স , করলেন গোল, ইতিহাস লিখলেন নতুন করে।


পাঁচ মিনিট পরেই রেফারির বাঁশি জানালো বিশ্ব ফুটবলে নতুন চ্যাম্পিয়ন স্পেন। স্পেনের সেই প্রজন্ম, যাদের গল্প নিশ্চিতভাবেই করা হবে আরো বহু বছর পরেও, সেই "সোনালী প্রজন্মের" মাথায় তুলেছে বিশ্বসেরার মুকুট !!!


অভিনন্দন স্পেন !!!!


সুন্দর ফুটবলের পূজারী স্পেন কতটা পরিচ্ছন্ন খেলেছে এই বিশ্বকাপে, তা বোঝাতে হলে কেবল পরিসংখ্যানটা উল্লেখ করলেই চলে। সেমিফাইনাল পর্যন্ত ছয়টি ম্যাচে স্পেনের অর্জিত হলুদ কার্ডের সংখ্যা মাত্র ৩টি। বিশ্বাস হয় ?? সাফল্যের জন্যে মরিয়া এই যুগেও যে কেবল পরিচ্ছন্ন ফুটবল খেলেই সাফল্য পাওয়া যায়- স্পেন তো তাই প্রমাণ করলো...।


সুন্দর ফুটবলের চূড়ান্ত রুপ দেখিয়ে দর্শকদের হৃদয় জিতে নিয়েও ১৯৭৪-এ বিশ্বসেরা হতে পারেনি ইয়োহান ক্রুইফ, রেনসেনব্রিঙ্কের নেদারল্যান্ড। ১৯৫৪-এ হাঙ্গেরীর হয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন ফেরেঞ্চ পুসকাস,ন্যান্দর হিদেকুটি,স্যান্ডর ককসিসে'রাও। এই স্পেন পেরেছে। এই স্পেন দর্শকদের ভালোবাসার সাথে সাথে শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয়নি।

ফুটবল ইতিহাসে কখনো প্রথম ম্যাচে হেরে কোন দল বিশ্বসেরার আসনে বসতে পারেনি। এই স্পেন পেরেছে। এই স্পেন অঘটনে দমে যায়নি, এই স্পেন ইতিহাস নতুন করে লিখে নিতে চেয়েছে।

...১১ জুলাই,২০১০ রবিবার রাতে দঃআফ্রিকার জোহানেসবার্গ সকার সিটি স্টেডিয়ামে স্পেনের জয় তাই ফুটবলেরই জয় !!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন