মঙ্গলবার, ২২ জুন, ২০১০

সেরিওজা এক্সপ্রেস-০২

বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপ

"গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ" চলছে মহা আড়ম্বরে। আকাশে-বাতাসে পতাকা, টিভিরুম- ক্যান্টিনে তর্ক, ফেসবুকের স্ট্যাটাসে গলাগলি-গালাগালি।


মোটের উপর বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের খেলা দেখে খুব প্রীত হয়েছি, এমন বলা যাবে না। আর্জেন্টিনা প্রথম খেলায় কোনমতে জিতলো, ব্রাজিলকেও বেগ পেতে হলো বিপক্ষের ডিফেন্স ভেদ করতে। ইতালি-ফ্রান্স-ইংল্যান্ড করলো ড্র। সাম্প্রতিক সময়ের সেরা দলটি নিয়ে বিশ্ব কাঁপাতে আসা স্পেন তো হেরেই বসলো অঘটনের জন্ম দিয়ে। প্রথম রাউন্ডে দুর্দান্ত খেলে মনে আতঙ্ক তুলে দিয়েছিলো জার্মানি। গতি-টিম কেমিস্ট্রি-পাসিং ফুটবলে অদম্য সেই জার্মানিকে মনে হয়েছিলো বিশ্বকাপ ঘরে তুলতেই তাদের আসা।




হিসাব-নিকাশ পালটে গেলো দ্বিতীয় রাউন্ডের শুরুতেই। ফরাসী ফুটবল শিল্পের মৃতপায় রুপ দেখলাম। উড়ন্ত জার্মানিকে মাটিতে নামিয়ে আনলো পুঁচকে সার্বিয়া। ইংল্যান্ডকে নিয়ে কিছু না বলাই ভালো, এই একটা ফুটবল দল- যাদের মিডিয়ার প্রতিবার ধারণা থাকে তাদের দল এবার কাপ নিয়ে যাবে- বাস্তবে মাঠে এদের দেখলে ঢাকা লীগের রহমতগঞ্জ টাইপ ফুটবল দলগুলোর কথা মনে হয়। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে এখনো পর্যন্ত মন ভরিয়েছে আর্জেন্টিনা, বলা ভালো লিওনেল মেসি'র দল। আহা !! মেসির মত একটা খেলোয়াড় যদি বিশ্বকাপ না পায়, সেটা ইতিহাসে কী বাজে একটা আক্ষেপ হয়েই না থাকবে। মেসি তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে !!!!



বিশ্বকাপের আসল মজাটা বোধহয় আড্ডায়। কখনো এমন আড্ডায় যে অংশ নেয়নি, তার পক্ষে কিছুতেই ধারণা করা সম্ভব না- কী ভীষণ তীব্র থাকে এইসব আড্ডার ঝাঁজ়। বুয়েট ক্যাফের নিষ্কর্মা কর্ণারে একেকটা আড্ডা ভয়ানক জমে উঠতো। আড্ডার মূলধারা অবশ্যই ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা। যুক্তি দিয়ে শুরু হয়ে এইসব আড্ডা অনেক আগ্রহোদ্দীপক দিকে গড়ায়। কেউ আর্জেন্টিনাকে ন্যাংটুপুটু লোকের দল বলে আখ্যা দেয়, কারো দাবি উত্তর কোরিয়ার সাথে মাইকনের গোলের একমাত্র কারণ তার হলদে জার্সির সাথে শিশুসাহিত্যের দুষ্টু-চরিত্র সুলভ চেহারা।... দুঙ্গা-ম্যারাডোনা ছাড়াও আড্ডায় বাজির দর থাকে, 'ন্যাড়াডোনা' ভেরন থাকে, গুণগুণিয়ে গাওয়া ওয়েভিং ফ্ল্যাগ থাকে।


নতুন ধরণের একটা বিশ্বকাপ যুদ্ধ চলে খোমাখাতায়। একেকজন বিশ্ব কাঁপানো স্ট্যাটাস মারেন !! কেউ ছড়া লেখেন, কেউ কোন বিশেষ দেশের পতাকায় মূত্ররত শিশুর ছবি আপ্লোডান...। ভালোই লাগে দেখতে। তবে এই সব অগণিত বিশ্ব কাঁপানো স্ট্যাটাসের মাঝে মনে গেঁথে আছে ছড়াকার স্বপ্নাহত ভাইয়ের দুর্দান্ত সেই ছড়াটা।


দূরে যাও বাকিরা, কাছে আসো শাকিরা !!!


দিনলিপি

বিশ্বকাপের মৌসুমে ফুটবল ছাড়া আর কিছুই বলবার মতন নাই।

তবু সপ্তায় দুই দিন নিয়ম করে ফুটবলে লাথি মারি। আজিজের মাশ্রুমাড্ডা কয়েকদিন মনে হয় আধমরা, সেইখানে যাওয়া হয় না। খোমাখাতায় ঝগড়া করি। নতুন কিছু বিশেষ পড়ি না। ল্যাপটপে সেইভ করা অজস্র ই-বুকের মাঝে হঠাৎ কোন কোন গল্প সংকলন কি ইতিহাস বই নিয়ে চোখ বুলাই। গান-টান বিশেষ শুনি না। খেলা দেখার পাশাপাশি ইএসপিএন-এর মায়ান্তি ল্যাঙ্গার'রে ভালো করে দেখতে থাকি...



... এবং বুয়েট

বুয়েটে অনির্দিষ্টকালের জন্যে ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কাল। হল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো, এবং সেটা পালিতও হয়েছে। নিষ্কর্মা কর্ণারে এই বিশ্বকাপে আর আড্ডা হবে না, প্রতিটা হলে নতুন কিনে আনা ৪২ ইঞ্চির ব্রাভিয়া টিভি'র পর্দায় দল বেঁধে খেলা দেখাও আর হবে না।


বিভিন্ন পত্রিকার বিবরণ পড়লে মনে হয় বিশ্বকাপের খেলা দেখা উপলক্ষে ক্লাস না করতে চাওয়া ছাত্রেরা মারামারি করে বন্ধ করে দিয়েছে বুয়েট। বিষয়টা আসলে তা নয়। বরং তা এতোটা তুচ্ছ, যে বর্ণনা করলে লজ্জিত হতে হবে। ছোটভাইদের মাঝে অভাব রয়েছে শ্রদ্ধাবোধের, বড়ভাইদের মাঝে অভাব রয়েছে সহনশীলতার। দোষ কাকে দেবেন ?? ... চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ একটা রাষ্ট্রের চমৎকার একটা ক্ষুদ্রায়তনিক উদাহরণ হয়ে উঠছি আমরা। শ্রদ্ধাবোধ নেই, সহনশীলতা নেই, স্মৃতিশক্তি নেই, মূল্যবোধ নেই।


ব্রাজিলের সাথে ম্যাচের পূর্বে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে গিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন উত্তর কোরিয়ার জং সে তাই।

...আমরা নিমতলী অগ্নিকাণ্ড ট্রাজেডিতে কাঁদি না, আমরা বুয়েট ছাত্র সম্রাটের অকাল মৃত্যুতে কাঁদি না, আমরা পাহাড় ধসে পড়া মানুষের মৃত্যুতে কাঁদি না। আমরা কাঁদি কেবল ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন