রবিবার, ১৩ জুন, ২০১০

পাসওয়ার্ড রহস্য

ইষ্পাতের স্নায়ূর কারণে এসপিওনাজ জগতে 'বরফমানব' উপাধি লাভ করা রাশান সিক্রেট সার্ভিসের জেনারেল সের্গেই তুর্গেনিভকে কেউ কখনো বিচলিত হতে দেখেনি। অথচ হাতের কার্টিয়ারের দিকে চেয়ে "আর মাত্র ৫২ মিনিট !" বলবার সময় তার মাঝেও যেন খানিক অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেলো।

ফ্রুলাইন মারিয়া টিশবাইনের হাতের আঙ্গুলগুলো প্রবল বেগে আরেকবার ঝড় তুললো কীবোর্ডের উপর। "হলো না।" মারিয়া টিশবাইন কেঁদে ফেলবেন যেন। "এবারো হয়নি। 'আইজ্যাক আসিমভ' লিখে টাইপ করেছিলাম- এটাও পাসওয়ার্ড নয় !! "



গোয়েন্দা চূড়োমণি মোজাম্মেল হক মুখ খুললেন এবার। "হুম্মম। 'ফাউন্ডেশন সিরিজ লিখে' দেখুন। ছোকরার ওদিকে বেশ দিলচসপি আছে।"

মারিয়া টিশবাইন মাথা নাড়লেন সাত সেকেন্ড পর। "নাহ !! এটাও নয়... এদিকে মাথায়ও যে আর কিছুই আসছে না। আর কী হতে পারে ??"

কুইজার্স বিডি-র সদস্যরা এবার সমস্বরে মাতম তুললেন। " ওগো !! আমাদের এবার কী হবে গো। আমরা যে ধনে প্রাণে মারা পড়লুম গো... চোখের সামনে এরকম বোনাস পয়েন্ট -থুক্কু- ডলার পাচার হয়ে যাচ্ছে গো... দেউলিয়া হয়ে গেলাম গো..."

সের্গেই তুর্গেনিভ একটু বিরক্ত হলেন। "আ- হ ! এতো ভেঙ্গে পড়ছেন কেনো ?? এখনো ঠিক ৪৭ মিনিট বাকি আছে, হ্যাঁ... ছোকরা সুইস ব্যাঙ্কের গোপন একাউন্টে ডলার পাঠিয়ে দেবার সময়সীমার আগেই আমরা ঐ পাসওয়ার্ড উদ্ধার করে ডলারগুলো হাত করে নোবো... ঘাবড়াও মাৎ !!"

গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক মুখ খুললেন এবার। "ফ্রুলাইন মারিয়া, 'নটরডেম কলেজ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল' লিখে দেখুন তো একবার...এটা হবার একটা ভালো সম্ভাবিলিটি আছে..."

মারিয়া টিশবাইনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আবার। এবং কীবোর্ডে খানিক সময় কাটানোর আবারো চুপসে গেলেন তিনি। আবোলতাবোলের সেই বুড়োর মত সুর করে টেনে টেনে বললেন," হয়নি, হয়নি ... ফেল !!"

কুইজার্স বিডি-র সদস্যরা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কথা শুনেই নীচু স্বরে কথা বলা শুরু করেছিলেন, যখন তারা নিশ্চিত হলেন যে, ঐ উৎসবে 'খোঁজ-দা সার্চ' দেখানো হয়নি, সে মুহুর্তেই যাবতীয় আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন তারা। গোলযোগ শুরু হলো আবার।

 "হুম, ছোঁড়ার যেহেতু লুলাভ্যাস নেই- তবে তো নায়িকাদের নাম লিখেও বিশেষ লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে না। " মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করেন সের্গেই তুর্গেনিভ।

"হেহে, লুল ফ্যালে না- তাতে ওর বয়েই গ্যালো। ..." বাঁকা একটা হাসিতে অঙ্কন ভাইয়ের মুখটা ভরে গেলো। "তাতেই যা করে বেড়াচ্চে... ও দুর্নাম দেবেন না স্যার, নটরডেমের চালু ছোকরা- খেটে খায়- হ্যাঁ !!"

সহমত জানালো বাকি সবাই।

গোয়েন্দা মোজাম্মেল হকের হাতে কার্টিয়ার নেই। পল্টনের ফুটপাথ থেকে কেনা চোরাই ঘড়ি দেখে তিনি কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেন সকলকে। " সময় কিন্তু বেশি নেই হে, আর মাত্র ৩৮ মিনিট। "


জেনারেল তুর্গেনিভ ঠোঁট কামড়ে ধরে প্রাণপণে কী একটা মনে করবার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। বলে উঠলেন হঠাৎ- " হেহে, রহস্য মনে হয় ধরে ফেলেছি হে। চটজলদি 'টু কিল অফ আ মকিংবার্ড' টাইপ করোতো মারিয়া- ছোকরা এ বই বলতে অজ্ঞান !! "

কুইজার্স বিডির সদস্যদের মাঝে বেশ উত্তেজনা দেখা যায়। তাইতো !! উফ, কী দারুণ পর্যবেক্ষণশক্তি- কী নিখুঁত আশ্বাস !!! একেই বলে গোয়েন্দা !!

ফ্রুলাইন মারিয়া চটপট টাইপ করে নেন পাসওয়ার্ডটা। লাভের লাভ কিছুই হয় না, কালোপানা স্ক্রীনে কোন আশার বাণী ভেসে উঠে না।

 রাশান জেনারেল চুপসে যান।

নিখিল বিশ্ব-আন্ডারগ্রাউন্ড সিক্রেট এজেন্ট সমিতির দঃএশীয় আঞ্চলিক মহাপরিচালক গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক কেবল বলেন, "হুম্মম !! "...-  এই বলেই তিনি ভাবনায় মগ্ন হয়ে যান।

জেনারেল তুর্গেনিভ আবার বলেন, "ইয়ে, 'চেয়ারম্যান' টাইপ করে দেখুন তো। ছোকরা না কি সম্প্রতি সোঁদরবন ভ্রমণে গিয়ে ঐ নাম কুড়িয়ে পেয়েছে।" ... তা, টাইপ করতে আর কতক্ষণ-ই বা লাগে। চেয়ারম্যানেও কূল মেলে না। 

মারিয়া টিশবাইন এদিকে বসে নেই চুপ করে। গুগলের সাহায্যে ইতিমধ্যেই মহাকাশ সম্পর্কিত গোটাপাঁচেক মহাজাগতিক শব্দ বের করে তিনি চালিয়ে দিলেন কী-বোর্ডের বুকে। এবং হতাশায় কঁকিয়ে উঠলেন আরেকবার...। "কিছুই হচ্ছে না। এন্ডেভার, ফোরট্রান, জিপিএস- কোনটাই তো মিললো না হে- শেষে এই হাঁটুর বয়েসী ছোকরার কাছে ঘা খেয়ে এই নগদ ডলারগুলো হারাবো না কি!! "


গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক ভুরু কুঁচকে কেবল ভেবেই চলেছেন।

জেনারেল তুর্গেনিভ ঘড়ির দিকে চেয়ে আতঁকে ওঠেন এবার। "আর মাত্র ৩০ মিনিট !!... জলদি করুন, জলদি করুন- যে যা পারেন খুঁজে বের করুন।" হঠাৎ কী মনে করে নিজেই খুশি হয়ে ওঠেন তিনি। "আচ্ছা, ইয়ে- 'জব্বার কাগু' টাইপ করে দেখুন তো !! প্রোগ্রামারদের বশ করতে সে ব্যাটা নাকি ভারী ওস্তাদ লোক শুনি আজকাল!! "

মারিয়া টিশবাইন নেতিবাচক উত্তর দিতে বেশি সময় নেন না। "নাহ, এটা পাসওয়ার্ড নয়। এমনকী 'মেহদী হাসান'ও নয় !!!"

ভাবনায় ব্যস্ত মোজাম্মেল হক আর মাথা চুলকাতে ব্যস্ত জেনারেল তুর্গেনিভকে দেখে এবার নিজেরাই কর্মক্ষেত্রে নেমে পড়েন কুইজার্স বিডির সদস্যরা। বাজার ছাড়াও একের পর এক সম্ভাব্য পাসওয়ার্ড আসতে থাকে।

কেউ বলে, 'চেলসি !'।

কেউ বলে 'ফ্রুটো !'।

কেউ বলে 'সায়েন্স ফেয়ার'।

কেউ বলে ' হ্যাপী কুইজিং'।

কেউ বলে, 'জাপান'।

কেষ্টা বলে 'শা-কি-রা  !!' ...

কেউবা হাঁকে, 'কামড়ে দেবে, সাবধানেতে তুলিস !!'।



আরো খানিক চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত মুখে কাপড় চাপা দিয়ে কেঁদে ফেলে স্ক্রীনের সামনে থেকে উঠে পড়লেন ফ্রুলাইন মারিয়া। " অসহ্য !! আমি আর এই স্নায়ূচাপ্ সইতে পারছি না...দম আটকে মারা পড়বো আমি। এ কেবল কুইজারদের পক্ষেই সম্ভব। প্লীজ, আমায় ক্ষমা করবেন !! "

ঘড়িতে মাত্র ২৫ মিনিট অবশিষ্ট থাকতে দেখে বরফ গলে গিয়ে জেনারেল তুর্গেনিভ পরিণত হলেন চুইংগামমানব-এ। ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলেন ধ্যানরত গোয়েন্দা মোজাম্মেল হকের উদ্দেশ্যে। "ভাই আমার, ক্ষ্যামা দিচ্ছি এযাত্রা- বাঁচাও ভাই !!  এই ঘোর বিপদ থেকে সকলকে উদ্ধার করা আমার কম্মো নয় দাদা। তোমার বাঙ্গাল বুদ্ধিই ভরসা এখন..."

গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক চোখ বন্ধ করে গর্জে উঠলেন, " চোপ রও !!!... ভাবতে দিন আমায়।"


গোয়েন্দা চূড়োমণি ভাবতে থাকেন। সকলে চোখ বন্ধ করে অপেক্ষায় থাকে...


ঠিক ২১ মিনিট বাকি থাকতে লাফ দিয়ে মনিটরের সামনে চলে যান মোজাম্মেল হক। সকলের জিজ্ঞাসু চোখের সামনে দিয়ে দ্রুত হাতে কী যেন প্রবেশ করান তিনি কী-বোর্ডের মাঝ দিয়ে। এরপর হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন কিছুর জন্যে। দেখতে দেখতে নিঃশব্দে পাঁচ মিনিট কেটে যায়।


উসখুস করতে থাকা বাকি সকলের মুখপাত্র হয়ে মারিয়া টিশবাইন বলেই ফেলেন শেষ পর্যন্ত, "ইয়ে, মানে- বলছিলাম কী- মানে, ... হের মোজাম্মেল, কী হচ্ছে কিছুইতো বুঝতে... "


গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক খ্যাঁকিয়ে উঠলেন, "চুপ করুন মশাই... টোপ পেতেছি। আশা করি শিকার ফাঁদে ধরা দেবে।"


শিকার ফাঁদে ধরা দিলো।... অন্ততঃ মোজাম্মেল হকের মনিটরের সামনে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে তাই বুঝলো সকলে। চূড়ান্ত সময়সীমার তখন মাত্র মিনিট সাতেক অবশিষ্ট আছে। দ্রুত হাতে ক্লিক করে কী একটা দেখেই মোজাম্মেল হকের মুখটা খুশি খুশি হয়ে উঠলো। চটপট কীবোর্ডের চাবিগুলো চেপে কিছু একটা লিখেও ফেললেন তিনি। এরপর আবার অপেক্ষা করলেন খানিক সময়।


মিনিট দুয়েক পর আবারো মনিটরে আলোর আভাস পেয়ে হামলে পড়লেন তিনি। এবং খানিক পরেই বিমলানন্দের এক হাসিতে ভরে গেলো তার মুখ। "লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান !!! সুইস ব্যাঙ্কের ছোকরার গোপন একাউন্টের পাসওয়ার্ড এখন আমাদের হাতে !! এই যে দেখুন, তের অক্ষরের পাসওয়ার্ড... যার শুরুটা হয়েছে এম দিয়ে !!!"


ফিসিফিসিয়ে, যেন ভূত দেখেছেন, এমন স্বরে জানতে চাইলেন রাশান জেনারেল সের্গেই তুর্গেনিভ, "কিন্তু ... কিন্তু... কীভাবে হলো মিঃ মোজাম্মেল ?? কীভাবে পাসওয়ার্ডটা বের করলেন আপনি ??"


...একগাল বিনয়ী হাসি দিয়ে বললেন মোজাম্মেল হক। "এ আর এমন কী !!! 'চটপটকথাকই এড দুষ্টুমেয়ে ডট কম' নামের ইমেইল খুলে ফেসবুকে ছোকরাকে এড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম। ছোকরা এড করতেই তার দেয়ালে গিয়ে লিখে দিলাম "ওগো, তোমার সুইস ব্যাঙ্কের পাসওয়ার্ডটা জানতে মঞ্চায়... ...


ব্যাস, আর কী !! এতেই ওয়াসিক মুরসালিন রুশাফি তার পাসওয়ার্ড ফাঁস করে দিলো... "



***************************************************


২০০৪ সালের শেষের দিকে নটরডেম ব্লু টিমের ভাইবার সময় আমার সাথে এক সিনিয়র বড় ভাইয়ের পরিচয় হয়েছিলো। দীর্ঘদেহী সেই বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয়ের প্রথম দিনেই তাঁকে বেশ ভালো লেগে যায়। প্রথম দর্শনে যাদেরকে ভালো লেগে যায়- ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি তাদের বেশিরভাগ লোকই খুবই খারাপ হয়। কেউ বাপের পকেট মেরে ভাব মারে, কেউ কেবল বেইলী রোডের কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের রাতেবিরেতে মোবাইলে মিসকল দিয়ে উত্যক্ত করে, কেউ গভীর রাতে ইন্টারনেটে সবিতা ভাবী খুঁজে বেড়ায়...


আলোচ্য ভাইয়ার ক্ষেত্রে এর কোনোটাই হয়নি। বরং নানা ব্যাখ্যানীয়- অব্যাখ্যানীয় কারণে আমার মনের ব্ল্যাকবোর্ডের উপর আমার প্রিয় ভালো মানুষদের যে লিস্টি রয়েছে- তাতে আমি তাঁর নাম রঙ্গিন চকে বেশ বড় করে লিখে রেখেছি। আজ সেই সিনিয়র ভাইয়া, ওয়াসিক মুরসালিন রুশাফির জন্মদিন...

শুভ জন্মদিন রুশাফি ভাই !!!  ভালো থাকুন চিরকাল...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন