বুধবার, ১২ মে, ২০১০

জাকির তালুকদারের "মুসলমানমঙ্গল"

০১।

"মুসলমানমঙ্গল" বইটি পাঠের পর জাকির তালুকদার সম্পর্কে খোঁজ নিতেই হলো।  লোকমুখে শোনা ভদ্রলোক একজন  গল্পকার। ছোটগল্প লেখেন। গুগলে খোঁজ নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে তাঁর লেখা গল্পের কিছু পাঠপ্রতিক্রিয়ার সন্ধান পাওয়া গেলো। দারুণ লাগলো একটি অপঠিত ছোটগল্পের প্রেক্ষাপট, যেটির নাম 'বিশ্বাসের আগুণ'। কেউ একজন পবিত্র কোরান মাজিদ পুড়িয়ে ফেলছেন ঘৃণায় বা ক্রোধে নয়- স্থির বিশ্বাসে, যে বিশ্বাসে তিনি জানেন কোরান মাজিদ পোড়ে না, সেটি অবিনশ্বর।...



"মুসলমানমঙ্গল" উপন্যাস এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে আনা। আকারে বড় হওয়ায় ইতস্ততঃ করছিলাম এতে মন দেয়া সহজ হবে কী না। হালকা চালেই তাই শুরু করেছিলাম। বইয়ের প্রকাশক রোদেলা প্রকাশনী ফ্ল্যাপে দাবি করছেন-  এই ধরণের উপন্যাস বাংলাভাষায় এটাই প্রথম। একই মত পোষণ করি আমিও।



সেই সাথে এতেও সায় দিচ্ছি যে-  জাকির তালুকদার, কারো কারো মতে, হয়ে উঠতে যাচ্ছেন, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে অগ্রগামী চিন্তার কথাসাহিত্যিক।

 ০২।

 সুবিশাল এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইউসুফ আহমেদ। পার্শ্বচরিত্র গুলোর মাঝে কাউকেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি। লেখক খুব সম্ভব সচেতন ভাবেই এইসব চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস আর তথ্য প্রদানের মাধ্যম রুপে। একালের তথ্য আর বিগতকালের ইতিহাস।


লেখক স্বয়ং উপন্যাসকে ভাগ করেছন দুটি পর্যায়ে। আত্নসমালোচনা পর্ব এবং মোকাবেলা পর্ব। এইরকম নামকরণের কারণ খুব সম্ভবতঃ এই পর্যায় দুটির অন্তর্নিহিত সমস্ত আলোচনার জন্যে। তবে সাধারণ পাঠকের চোখে উপন্যাস পাঠ করতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে উপন্যাসটির ঘটনাক্রমকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে থাকে চলনবিলের গ্রাম্য পরিবেশে ইউসুফের ঘুরতে যাওয়া। দ্বিতীয় ভাগে থাকে নিজের মফস্বল শহরে মদনের চায়ের দোকানে সাদী ওস্তাদ-মোটকা বাবু- বাপ্পী- ধীমানদের আড্ডায় ইউসুফের উপস্থিতি। সর্বশেষ এবং তৃতীয় ধাপে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক শ্বেতাঙ্গিনী লিসবেথের আগমন এবং তার সাথে ইউসুফের আলোচনা।


উপন্যাসের কাহিনী বেশ শ্লথ, গতি ঝুলে পড়েছে প্রায়ই। তবে এর সঙ্গত কারণ আছে বলেই মনে করি- কেনো মনে করি, তা পরে বলছি। বিশালাকার কাহিনীর শেষ ঘনিয়ে আসে কোন ইঙ্গিত না দিয়েই, বড় তাড়াতাড়ি যেন, এই সমাপ্তি সাথে করে নিয়ে আসে এক অশুভ আশঙ্কা।

০৩।

... সংক্ষেপে এই হলো উপন্যাসের মূল ঘটনাপ্রবাহ। এমন আহামরি কিছু মনে হয় না পাঠ করে, যদি না উপন্যাসে থাকতো আরো কিছু। এই অংশটুকু হচ্ছে ইসলামের ইতিহাস, ইতিহাসের অজানা অপঠিত চাঞ্চল্যকর সব দিক। গল্পের সমান্তরালে একই সাথে এগিয়েছে এই ইতিহাসের পর্যালোচনা, যা অনেক ক্ষেত্রেই মূল গল্পকে ছাপিয়ে পাঠককে টেনে নিয়েছে কেবল ইতিহাস অংশে। উপন্যাসটি যদি হয় ক্লান্ত ময়াল অজগর তবে এই অংশটুকু হলো তার নির্মম পেষণ ক্ষমতা, শিহরণ জাগায় অক্লান্ত ভাবে।


চলনবিলের গ্রাম্য পরিবেশে চারিদিকের কাঠমোল্লা এবং তাদের ফতোয়ার আগ্রাসন দেখে পার্শ্বচরিত্রগুলোর সাথে মুক্তমনা ইউসুফের আলাপে উঠে আসে ইসলামের একবারে প্রাথমিক পর্যায়ের ঘটনাবলী। আমাদের চোখে এতদিনের জমে থাকা যে ধূলোর আস্তরণে প্রাচীন আরবের সকলকেই দেবদূত বলে মনে হতো, সে আস্তরণ ধুয়েমুছে যায়। আমরা অবহিত হই সেকালেও মানুষ ছিলেন মর্ত্যের সমস্ত সীমাবদ্ধতা নিয়ে। মানবীয় ত্রুটি আর পরিস্থিতির কারণে অনেকেই বিচ্যুত হন মুহাম্মদ (সঃ) এর দেখানো পথ থেকে, যার ফলে ইসলামে আসে অবিশ্বাস-ভুল-একাধিক মতের উৎপত্তি; যার দায়ভার এখনো বয়ে চলতে হচ্ছে মুসলিমদের। অনেক ক্ষেত্রেই অবিশ্বাস্য ঠেকে এই অংশ। যেটির নিরসনে সুবিশাল এক সহায়ক গ্রন্থের তালিকা সংযোজিত হয়েছে। আর লেখক বলেছেন- মানুষ খোঁজ করে না, পড়ে না, তাই জানতে পারে না। এই সকল বই তো বাজারেই পাওয়া যায়। সেগুলো নিষিদ্ধও নয়। মানুষ যেভাবে চলছে সেভাবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারলে খুশি হয়। নতুন কিছু জিনিস মানেই নতুন চিন্তা। আর নতুন চিন্তা করার ধাক্কা সব মানুষ সহ্য করতে পারে না।


উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগে, মদনের চায়ের দোকানের আড্ডায় উঠে আসে মধ্যযুগ, ইউরোপীয় রেঁনেসা, ইংরেজ শাসনের অধীনে বাঙালি মুসলমানদের জাগরণ, দ্বি-জাতি তত্ত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, ভারত বিভাজন।


আর উপন্যাসের শেষ অংশে,   লিসবেথের সাথে আলোচনায় এসেছে সাধারণভাবে পশ্চিমাদের চোখে মুসলমানদের অবস্থান, নাইন এলেভেনের অব্যবহিত পর পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসন আর এগুলোর যৌক্তিকতা- বিরোধিতা প্রসঙ্গে মুসলিমদের কী অবস্থান হওয়া উচিৎ এই সমস্ত বিষয়।

 ০৪।

ইতিহাস আর গল্পের এমন চমৎকার সহাবস্থান দেখেছি খুব অল্প। কল্পনার সাথে তথ্যের সংমিশ্রণ ঘটানোটা নিশ্চিতভাবেই খুব কঠিন কাজ। প্রচুর ঢোল পিটিয়েও শ্রদ্ধেয় হুমায়ূন আহমেদ এই কাজটি করতে পারেননি ''জোছনা ও জননীর গল্প"-তে। পাশ্চাত্যের ড্যান ব্রাউনের "দি 'দা ভিঞ্চি' কোড"  আর পশ্চিমবঙ্গের সুনীল গাঙ্গুলীর "পূর্ব-পশ্চিম" অথবা " সেই সময়" উপন্যাসে দেখেছি এই মিশ্রণ খুব ভালোভাবে ফোটাতে।


বাংলাদেশে এই জাতীয় উপন্যাসের উদাহরণ আর দুর্লভ হয়ে থাকলো না। "মুসলমানমঙ্গল" এই ধারায় একটা চমৎকার সংযোজন হয়ে থাকলো।

০৫।

বাঙালি মুসলমান পরিচয়ে অবিরাম রক্তাক্ত হচ্ছি আমরা। উন্নত বিশ্বের উন্নাসিকতা, কাঠমোল্লাদের স্বপ্রয়োজনের নিমিত্তে ইসলামী বিধানের যথেচ্ছা প্রয়োগ, ধর্মের নামে প্রতারিত হতে উন্মুখ হয়ে থাকা সমাজ নিয়ে এই অসময়ে "মুসলমানমঙ্গল" একটু হলেও ভাবনার উদ্রেক করে। সাহস দেয় আরেকটু গভীরে তলিয়ে দেখার।

...আশা দেয়, সাগর মন্থনে অমৃতই উঠে আসবে শেষতক- গরল নয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন