সোমবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১০

কালজয়ী ক্লাসিক, খোঁজ- দা সার্চ

চলচ্চিত্র একটি মহতী শিল্পের প্রানবন্ত, গতিশীল রুপ। আঙ্গিকের নান্দনিক উচ্ছ্বাস, বিষয়বস্তুর তাৎপর্য বিবেচনায় চলচ্চিত্র আজ আধুনিক বিশ্বে কোন উপেক্ষনীয় বিষয় নয়। অতএব আধুনিক বিশ্ব্বের সাথে তাল মেলাতে আমি এবং আমার আপন কালাতো ভাই কেষ্টা ( যার পোশাকি নাম রিফাত ), ইচ্ছা প্রকাশ করলাম কেবল নায়িকাপ্রেমী না হয়ে খাঁটি চলচ্চিত্রপ্রেমী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবো। এম-এ-জলিল (ওরফে অনন্ত) প্রযোজিত, ইফতেখার চৌধুরী-ই পরিচালিত, নায়কের ভূমিকায় অনন্ত (ওরফে এম-এ-জলিল) অভিনীত- "খোঁজ- দা সার্চ" নামক কালজয়ী চলচ্চিত্রটি উপরের প্রেক্ষিতেই আলোচনার দাবি রাখে।




ছবি শুরু হতেই বি-এস-এসে'র হর্তাকর্তা চীফ দুঃসাহসী চিরতরুণ স্পাই নারীলোভী মেজর মাসুদ রানা'কে রোলকল করলেন। বেচারা রানা'র হয়ে কেউ প্রক্সি না দেয়াতে চীফ তলব করলেন নিউইয়র্ক শহরে কর্মরত মেজর মাহমুদ হাসানকে। এই মেজর মাহমুদ হাসানই হলেন ছবির মূল নায়ক ওরফে প্রযোজক। প্রথম দর্শনে বিকট আলখাল্লা পরিহিত মেজর মাহমুদকে মনে হয় ভেন্ট্রিলোকুইস্ট। কারণ ভদ্রলোক প-বর্গীয় ধ্বনিকে কেবল মাত্র প- দিয়ে 'পকাশ' করেন। এই ভদ্রলোক নিউইয়র্কের মতো জায়গায় গিয়েই গন্ডগোল পাকিয়ে দিলেন। তার হোটেল রুমে হামলা চালালো দুই মুশকো ভিনদেশী। আমি ভাবলাম আগের মুহুর্তেই খাটে আয়েশ করতে থাকা মেজর এখন স্পাইডারম্যান স্টাইলে সিলিংয়ে লটকে আছেন। ভাই কেষ্টা দেখা গেলো বাংলা ছবির বিষয়ে আমার থেকেও ভালো জানে, কারণ তার ব্যাখ্যা হলো আরো বেশি রোমাঞ্চকর- তার ধারণা বক্স খাটের নিচে নায়ক লুকিয়ে পড়েছেন। কিমাশ্চর্যম !! আমাদের কারো মাথাতেই আসেনি যে মেজর মাহমুদ সরাসরি পাশের রুম থেকে দৌড়ে এসে মারামারি শুরু করতে পারেন !! যা হোক, মারামারি শেষ করতে না করতেই বসের ডাকে দেশের ছেলে দেশে ফিরে এলেন।


পরিচালক অবশ্য এই মেজরকে কাজে লাগানোয় বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। মেজর সারা ছবিতে কথা কম, মারপিট বেশি নীতিতে চলেছেন। না চলে অবশ্য উপায় ছিলো না। আমার ধারণা ছিলো দেশে ফিরে মেজর মোঃ আশরাফুলের কাছে ইংরেজী শিখবেন, কেষ্টা ধারণা করলো মেজর সাইফুর'সের নতুন কোন শাখার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হবেন। দেশে থাকতে ভদ্রলোক অবশ্য কেবল শরীর বানাতেন। আবহমান সবুজ গ্রাম বাংলার পথেঘাটে দৌড়ে, এঁটেল মাটিতে বুকডন দিয়ে, মায়ের মুখে নিজের বিয়ের আলাপ শুনে লজ্জা পেয়ে তার সময় কাটতো। চীফ এইদিকে মিটিং-য়ে বসলেন মেজর কুমড়ারুল আর ক্যাপ্টেন ববির সাথে। ক্যাপ্টেন ববি দেক্তে বেশ চিকন-চাকন, আবার বেশ বড়সড়......ক্যাপ্টেন ববিই প্রথমে চীফকে জানালেন যে এই দেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করছে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন অপরাধী "নিনো" (খাচ্চর কেষ্টাটা এইখানে স্বরবর্ণের যোজন-বিয়োজন করে একটা অন্য নাম বলেছিলো, মাফ করবেন- ভদ্র সমাজে আমি ঐ নাম বলতে পারবো না।)।


নিনো-কে ধরবার জন্যে কাজে লেগে গেলেন মেজর মাহমুদ। তাকে ব্রিফ করতে বিকেলে মাঠে ডাকলেন ক্যাপ্টেন ববি। নায়ক তখনো গলফ খেলে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে খেলা শেষে তিনি ব্রিফ শুনতে এলেন। ক্যাপ্টেন ববি বললেন, "ইউ আর টেন মিনিটস লেইট মেজর।" মেজরের উত্তর শুনে মনে হলো, উগাণ্ডাবাসী কীরুপে ইংরেজী বলে তা বুঝতে পেরেছি- " ন, ইউ আর ট্যান মিনিটশ আর-লি ..." ( কসম খোদার, এইটাই বলেছিলেন)।


পরের দৃশ্যে ব্ল্যাক ফরেস্টের জঙ্গলে গেলেন মেজর। গোটা চারেক রাখাইন চেহারার বিডিয়ারের পোশাক পরা গার্ডের সাথে মারামারি শেষে উনি নিনোর হাতে গুলি খেয়ে আটকা পড়লেন "মাস্টারের" হাতে। এইখানে আমরা পরিচালকের মুন্সীয়ানা সম্পর্কে আরেকবার নিশ্চিত হই। কারণ, অশিক্ষিত মেজর মাস্টার বলে ডাকলেও আমরা বুঝতে পারি পরিচালক 'দ্যা ভিঞ্চি কোড' এর অনুকরণে  সেই চরিত্রের নামটি রেখেছেন টিচার। এই টিচার যখন হাতে পায়ে হাতুড়ির বাড়ি মেরে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক রুপে ব্রেন ওয়াশ করে মেজরের নাম পালটে তাকে 'অনন্ত' বানিয়ে ফেলেন, তখন আমরা নিশ্চিত হই, তিনি 'জেসন বর্ন' সিরিজের একজন দর্শক।


চলচ্চিত্রের মাঝামাঝি অবস্থায় নায়িকা বুবি চাকভুম নৃত্য সম্বলিত "আই এম সার্চিং ফর মাই লাব " শিরোনামের যেই দুষ্টু গানটি গেয়েছিলেন, সম্ভবত ছবির নামকরণ সেই গানটি থেকেই। এদিকে নায়ক অনন্ত তখন মাস্টারের অধীনে ভাঙ্গা যায় এমন যাবতীয় জিনিসপত্র (যেমন-কাঁচ, বরফ, মাটির কলসী ইত্যাদি) ভেঙ্গে ট্রেনিং নিচ্ছেন অপরাধী হবার। তার ট্রেনিং শেষ হবার পর তাকে প্রথম এসাইনমেন্ট দেয়া হলো- একজন ব্যবসায়ীর শিশুকন্যাকে হত্যা করতে হবে। নায়ক অনন্ত জেসন বর্ন স্টাইলে গেলেন স্নাইপার রুপে এসাইনমেন্ট সারতে। কিন্তু পরিচালক এখানেও নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগালেন। প্রথাগত স্নাইপার স্টাইলে অনন্তকে না শুইয়ে তিনি জাভেদ ওমর বেলিম গোল্লার ব্যাটিং-এর সময় সিলি পয়েন্টে চ্যাগিয়ে দাঁড়ানো ফিল্ডার আর নামাযের রুকুতে যাওয়া ব্যক্তি- এই দুই স্টাইল মিলিয়ে এক আজব ভঙ্গিতে তাকে স্নাইপার বানালেন। কিন্তু শিশুটির জন্যে হ্যাঁ বলতে চাইলো না অনন্ত। কাজেই মাস্টার তাকে দুনিয়া থেকে খেদাতে চাইলেন। ক্যামনে ক্যামনে জানি অনন্ত ভাই পালিয়ে গিয়ে তিনমাস পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে মুখ খুললেন গ্রামের এক গৃহস্ত পরিবারে।


এরপরে কাহিনীতে আরো অনেক প্যাঁচ এবং আরো অনেক চরিত্র আছে। লিপস্টিক দেয়া গডফাদার শামসুদ্দীন নওয়াব (আমার ঘোরতর সন্দেহ, পরিচালক জানে মাসুদ রানার লেখক শামসুদ্দীন নওয়াব- কাজী আনোয়ার হোসেনের নাম সে শুনে নাই।) আছেন, আছে তার যোগ্য সহচর নবাব সিরাজউদ্দৌলার ভাঁড় গোলাম হোসেনের পোশাক পরিহিত ফিফটি-ফিফটি, আছেন নিনো ভাই, আছে নিনোর গা ম্যাসাজ করবার জন্যে রাখাইন চেহারার এক ভ্যাম্প-গার্ল। অতি অবশ্যি আছেন দ্বিতীয় নায়িকা - গডফাদারের বোন এলিসা; এই মেয়েটাও দেক্তে বেশ চিকঞ্চাকন, হ্যান্ডি, পোর্টেবল, এবং বড়সড়...


এরপর কী ভাবে নায়ক পরিচিত হলো এলিসার সাথে, কী ভাবে তারা একই ঘরে রাত্রিযাপন করলো, কী ভাবে নায়ক অনন্ত ফিরে পেলো নিজের পরিচয়, কী ভাবে নায়ক "পোফেশনালদের পেচন তেকে গুলি করা মানায় না মাশ-টার" এই সংলাপ থ্রো করলো; তা আমি আর বলবো না, নিজেরা দেখে নেবেন। তবে ছবির শেষ সংলাপটা বলবার আমি লোভ সামলাতে পারছি না। চলন্ত ট্রেনের গায়ে লোকাল বাসের যাত্রীদের মতন ঝুলতে ঝুলতে নায়ক অনন্ত ভিলেন নিনোকে বললেন- " ইউ উয়ান্টু ডিশটয় মাই কানটি, আই উইল ডিশটয় ইউ..."...


মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সংলাপের পরেই পর্দায় ভেসে উঠলো সাত দিন পর - এরপরেই ছবি শেষ। পরিণতিতে কী হইলো কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার ধারণা নায়ক প্রথম নায়িকার বুকেই ঠাঁই করে নিয়েছে- কারণ এই নায়িকারে আমি ভালু পাইসি আর এই নায়িকা নায়কের মা মরবার সময় নায়কের পাশে ছিলো। অপরদিকে কেষ্টার ধারণা নায়ক দ্বিতীয় নায়িকার বুকেই ঠাঁই নিয়েছে- কারণ ঐ নায়িকার ঘাড় ধরে নায়ক ঝাঁকুনি দিয়েছে আর ঐ নায়িকারে কেষ্টা ভালু পাইসে (আজকালকার পোলাপানের চয়েস বলতে কিছু নাই।)। কাজেই শেষে আসলে কী হয়েছে, ইপ ইউ ডনট মাইন্ড- নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারলে আমায় জানিয়ে দিয়ে যাবেন- কৃতজ্ঞ থাকবো।


বলাকা সিনেমা হল থেকে বের হবার সময় জানতে পারলাম সন্ধ্যের শো'তে বলাকায় আসবেন ছবির নায়ক অনন্ত আর দ্বিতীয় নায়িকা বর্ষা। বাইরে তুমুল ভীড়। আমি আর কেষ্টা দুজনেই একমত হলাম সাহারা খাতুনের পরে এই দেশের রম্য সংস্কৃতিতে এতো বড় আন্দোলন আর আসেনি। "খোঁজ- দা সার্চ" নামক কালজয়ী চলচ্চিত্রটির কলাকুশলীদের সাথে ছবিটি দেখে ইতিহাস গড়তে উন্মুখ হয়ে থাকা দর্শককূলের দিকে তাকিয়ে উদাস হাসি হেসে আমরা দুই কালাতো ভাই বেরিয়ে এলাম।...

১০টি মন্তব্য:

  1. "চবি দেকার আগে এক দপা একানেই হেছে নিলাম" ... :D

    উত্তরমুছুন
  2. হুউম। ভালোই তো। বিনোদনের সার্চ-এ তোমাদের বলাকাগমন তো সফলই হইছে তাইলে। :) আর, তোমার রম্যরচনাও মজা হইছে। :)

    _ সাইফুল আকবর খান।

    উত্তরমুছুন
  3. রেজওয়ান ভাইঃ হেচে নিন, এই বেলা...

    সাইফুল ভাইঃ দেইখ্যা না নিন, না দেক্লে পস্তাবেন...

    লুলুপমদাঃ হ...

    হাসিব্বাইঃ থ্যাঙ্কো বস, আমিও এডাইতাসি আপ্নেরে...

    উত্তরমুছুন
  4. good post.you can try this too http://www.somewhereinblog.net/blog/raihan90blog/29141004

    উত্তরমুছুন
  5. vai ami sure nayok ar bari laksmipur..i mean lakkhipur(noakhali)..akmatro orai প borgio dhoni re প bole..bepok moja paisi review poira..pics deikha to vabsi national heart foundation a na jaite hoy..hahahhaha

    উত্তরমুছুন
  6. ভালু পাইলাম । আজ দেইখা আইসা তারপর পড়লাম ।

    উত্তরমুছুন
  7. O allah! Eida ki porailen??? Hashte hashte oggan howar moto obostha.

    Uf! Jobbor

    উত্তরমুছুন
  8. ami shuhan er lekha pore bujlam j ami ki miss korci ajke etihash gorte uddogi ei movieti na dekhe.........shuhan k dhonnobad......amra jara durvaga ei movieti miss korechi tader jonno ei lekhati movietir ek jholok hisebe bibechito hobe.....abaro ami shuhan k antorik dhonnobad janai ei kaljoyi movieti somporke amader obohito korar jonno........jisha

    উত্তরমুছুন