বুধবার, ২১ এপ্রিল, ২০১০

রবীন্দ্রনাথের 'ছুটি' গল্প ও বৃক্ষপুরাণ

নগরীর দীপ নিয়েছে পবনে,
দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে,
নিশীথের তারা শ্রাবণগগণে ঘনমেঘে অবলুপ্ত।
-শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
[অভিসার- বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা।]

গল্পটা আরম্ভ হতে পারতো সেই লোকটাকে দিয়ে। আরামবাগের সবুজ রঙের একটা মেসবাড়ির তেতলার কোণার ঘরে থাকা সেই লোকটা। সকাল বেলার ইঁদুর দৌড়ে যখন শহর ব্যস্ততায় জাগতে চায়, তখন ভীড় ঠেলে আরামবাগ থেকে নিউমার্কেটের বাসে ওঠার পর অপরিষ্কার শার্টের যে লোকটাকে আপনি প্রায়ই সহযাত্রী হিসেবে খুঁজে পান-এই গল্পের আরম্ভ হতে পারতো সেই লোকটার কথা দিয়ে। লোকটার সাথে আপনার আরো সাক্ষাৎ হতে পারে নিউমার্কেট ডাক অফিসের করণিকের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে, সাক্ষাৎ হতে পারে অলস বিকেলে লালবাগ দূর্গের বাগানে, সাক্ষাৎ হতে পারে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে টিএনটি কলোনীর বাদামের খোসা ছাড়ানো রাস্তায়। লোকটা এমনই। লোকটা এভাবেই মিছিলের একজন হয়ে যায়। লোকটাকে আলোচ্য করে আমাদের গল্প তাই এভাবে শুরু হতে চায়।




অথবা গল্পটার আরম্ভ হতে পারতো অন্য কোথাও। সেটি হতে পারতো বিদ্যুৎহীনতার রাতে গরমে বিপর্যস্ত আরামবাগের লোকেদের খিস্তিখেউড় দিয়ে। এবং অব্যবহিত সময় পর সেই একই এলাকাবাসীর বিস্ময় মিশ্রিত নিচুস্বরের আলোচনা থেকে। যে বিস্ময়ের জন্ম এক অজ্ঞাত আলোক উৎস হতে।...সন্ধ্যা রাত পেরিয়ে গেলেই নিয়মিত এক অনিয়মিত বিরতিতে মেসবাড়িটার তেতলার কোণের ঘরটির জানালায় খেলা করা ঐ আলোর উৎস কোথায় ?? লোকটা কিছু স্বীকার করতে চায় না। লোকটা কেবল হাসে। কিন্তু ঐ সাতবর্ণী আলোর উৎস সম্পর্কে অজ্ঞানতা আপনাকে তবুও পীড়িত করতে থাকলে আপনি উত্তর পেতে পারেন নিউমার্কেট ডাক অফিসে লোকটির সহ করণিক আবদুর রবের কাছে। আলোচ্য, অমিশুক লোকটা একমাত্র আবদুর রবকেই জানিয়েছে তার গোপন কথা। তার রংধনু সংগ্রহের কথা। লোকটা রংধনু জমায়। ... চমকে উঠলেন না কি ?? ডাকটিকিট জমান না আপনি ?? ভিনদেশী মুদ্রা ?? দুষ্প্রাপ্য উপন্যাস ?? তবে রংধনু সংগ্রহে কেন অযথা ধর্মগ্রন্থ বিকৃতির আশঙ্কা ??... সেই আশঙ্কা থাকলেও সেটি সরিয়ে রেখে অপেক্ষমান গল্পটার কাছে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।


গল্পটা অগ্রসর হতে পারে কোন এক বিকেলে আরামবাগ ফেরতা বাস ধরতে ব্যর্থ লোকটার অলস-উদ্দেশ্যহীন হাঁটা শহীদুল্লাহ হলের সামনের পুকুরঘাটে এসে শেষ হলে। পুকুরের এককোণে শালপ্রাংশু এক নাম-না-জানা গাছের আকর্ষনে লোকটা দীর্ঘক্ষণ অনড় বসে থাকে। লোকটা জেনে অবাক হয়, এবং তার ভাবতে ভালো লাগে এই শহরে এখনো অচিন বৃক্ষেরা আছে, এই শহরের অচিন বৃক্ষে এখনো নীল বর্ণের অজানা কোন ফুলের কুঁড়ি ফোটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের লাইব্রেরীতে দিনদু'য়েক বই ঘেঁটেও অচিন বৃক্ষের পরিচয় আবিষ্কারে ব্যর্থ লোকটা এখন প্রায় বিকেলেই শহীদুল্লাহ হল সংলগ্ন পুকুরঘাটে আসে। লোকটা বোঝে- অচিন বৃক্ষের উপর তার একটা যেন সহজাত অধিকার আছে। সে-ই যেন এই বৃক্ষের একমাত্র অভিভাবক। নতুন রংধনুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত প্রায় বিকেলে বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে অচিন বৃক্ষের ফুল ফোটার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে তার বেশ লাগে। ফাঙ্গাস সংক্রমণে অচিন বৃক্ষে ফুল আসার অপেক্ষা দীর্ঘতর হয়। লোকটা অপেক্ষা করে যায়। লোকটা যেন নিশ্চিত জানে, অচিন বৃক্ষের ফুল তার জন্যে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসবে।


সংবাদপত্রে খবর আসে, উত্তরের পাহাড়ী শহরের জোড়া-রংধনু দেখা যাচ্ছে আজকাল। রংধনু জমানো লোকটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। রংধনু সংগ্রাহক লোকটা জানে, জোড়া রংধনুর মত দুষ্প্রাপ্য বস্তুটি সংগ্রহশালায় অন্তর্ভুক্ত করতে অতি দ্রুত তাকে উপস্থিত হতে হবে পাহাড়ী শহরটায়। অতএব, ডাক অফিসের বড়কর্তার কাছে ছুটির আবেদন করে। বড়কর্তার আমাদের আলোচ্য, অমিশুক লোকটির প্রতি কোনরকম স্নেহবোধ না থাকায় ছুটির আবেদন নামঞ্জুর হয়। দ্বিতীয় বার। তৃতীয়বারও। লোকটা জানে জোড়া রংধনুর টুকরো- যা সংগ্রহ করা প্রত্যেক রংধনু শিকারীর এক পরম আরাধ্য- সংগ্রহ করবার জন্যে তাকে একমাসের মাঝে উত্তরের পাহাড়ী শহরে পৌঁছতেই হবে। লোকটা তাই চতুর্থবার ছুটির আবেদনপত্র জমা দেয় এবং আবেদনপত্রের প্রসঙ্গস্থলে 'ছুটি' শব্দটি লিখতে গিয়ে তার মনে এক বিচিত্র ভাবের সৃষ্টি হয়। লোকটা হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের 'ছুটি' গল্পের ফটিকের চরিত্রের সাথে নিজের সাদৃশ্য খুঁজে পায়। চারপাশের ছোট হয়ে আসতে থাকা শহরে লোকটার শ্বাস থেমে যেতে চায়। লোকটা তাই ছুটির আবেদন করে আবার।


গল্পের ধারাবাহিকতায় আলোচ্য লোকটা নীলক্ষেতের পুরাতন বইয়ের দোকান থেকে মাধ্যমিকের একটা গদ্য সংকলন যোগাড় করে। আরামবাগের তেতলা মেসবাড়ির সেই সন্ধ্যাটি কাটে বারংবার 'ছুটি' গল্প পাঠের মধ্য দিয়ে। লোকটা বুঝতে পারে, সে অথবা মেসবাসীরা, অথবা শহরবাসীরা প্রত্যেকেই, একেকজন ফটিক। তার রংধনু সংগ্রহের জন্যে ছুটি না-প্রাপ্তির আশঙ্কা লোকটাকে চেপে ধরে। সে আশঙ্কা সত্যি হয়। চতুর্থবারেও তার ছুটির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। লোকটা তখন এই শহরে তার একমাত্র বন্ধুজন, সহ করণিক আবদুর রব কর্তৃক তার পঞ্চম আবেদনপত্রটি পরিমার্জিত করে বড়কর্তার দপ্তরে পুনরায় দেয়। লোকটা বোঝে যে তার ফটিকের মতো ছুটি হবে না, লোকটা তাই একটা অলৌকিকের প্রত্যাশায় থাকে। লোকটা তাই শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপ্রান্তে অচিন বৃক্ষতলায় আরেকটা বিকেল কাটায়, একটা ফুল ফোটার আশায় থাকে। ফাঙ্গাস সংক্রমণের আধিক্যে কোন ফুল সে বিকেলেও গাছে আসে না। লোকটা ব্যর্থ হয়ে মেসে ফিরে যায়।


ছুটির আবেদন গৃহীত অথবা প্রত্যাখ্যাত হবার বিজ্ঞপ্তি আশা-আশঙ্কার মাঝে নিউমার্কেট ডাক অফিসে লোকটার কর্মদিবস অতিবাহিত হয়। লোকটা অপেক্ষা করে যায়। এবং, লোকটার বিস্মিত চোখের সামনে সে বিকেলে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটে, শহীদুল্লাহ হলের পুকুর সংলগ্ন অচিন বৃক্ষে ফুল আসে। লোকটা বুঝতে পারে তার ছুটি মঞ্জুর হতে চলেছে। একজন রংধনু শিকারীর শ্রেষ্ঠতম সংগ্রহ উপাদান- জোড়া রংধনু; প্রাপ্তির সম্ভাবনায় লোকটা উত্তেজিত হয়। আরামাবাগের মেসবাড়িতে সেই রাতে লোকটি তাই "আমার ছুটি হয়েছে মা, আমি বাড়ি যাচ্ছি।" এই উক্তি বারংবার নিজের উদ্দেশ্যেই বলে যায়। বলতে তার বড় ভালো লাগে। পরদিন ডাক অফিসের দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে বড়কর্তার ডাক পেয়ে লোকটি তাই বিস্মিত হয় না। বড়কর্তাকেও বিস্মিত বা উত্তেজিত বলে মনে হয় না। বড়কর্তা, নিরুত্তাপ ভাবে, চশমার আড়ালের গম্ভীর চোখের দৃষ্টির সাথে মুখে বলেন যে, লোকটির আর কোন আবেদনপত্র লিখবার প্রয়োজন নেই- কারণ তাকে কোনভাবেই ছুটি দেয়া হবে না। তাকে ছুটি দেয়া যায় না। এই শহরে কখনো কোন লোকেদের ছুটি দেয়া হয় না।


সেই বিকেলে আরামবাগ অভিমুখী বাসগুলোর জন্যে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সারিতে লোকটি অনুপস্থিত থাকে। অবধারিত ভাবে তাকে দেখা যায় তার প্রিয় অচিন বৃক্ষের সামনে, অপলক চোখে অচিন বৃক্ষের নীল বর্ণের ফুল দেখতে থাকা লোকটির নানা কিছু মনে পড়ে। প্রকান্ড একটা ধাউস ঘুড়ি লইয়া উড়াইয়া বেড়াইবার সেই মাঠ, 'তাইরে নাইরে নাইরে না' করিয়া উচ্চৈঃস্বরে স্বরচিত রাগিণী আলাপ করিয়া অকর্মণ্যভাবে ঘুরিয়া বেড়াইবার সেই নদীতীর, দিনের মধ্যে যখন-তখন ঝাঁপ দিয়া পড়িয়া সাঁতার কাটিবার সেই সংকীর্ণ স্রোতস্বিনী, সেই-সব দল-বল উপদ্রব-স্বাধীনতা...। লোকটা কিছুতেই বুঝতে পারে না, অচিন বৃক্ষের ফোটা ফুল তবে তার জীবনে কীসের ইশারা দিতে ফুটেছিলো। অথচ সহসা সে বুঝতে পারে। বালকদিগের সর্দার ফটিক চক্রবর্তীর মাথায় চট্‌ করিয়া একটা নূতন ভাবোদয় হয়...। লোকটা উঠে দাঁড়ায়, লোকটা হাঁটতে থাকে, লোকটা মিলিয়ে যায়।


সকাল বেলার ইঁদুর দৌড়ে যখন শহর ব্যস্ততায় জাগতে চায়, তখন ভীড় ঠেলে আরামবাগ থেকে নিউমার্কেটের বাসে ওঠার পর অপরিষ্কার শার্টের লোকটিকে আজকাল আর দেখা যায় না। বিদ্যুৎহীনতার রাত্রে আরামবাগের মেসবাড়িটার তেতলার কোণের ঘরটির জানালায় আজকাল কোন আলো খেলা করে না। নিউমার্কেট ডাক অফিসে করণিক আব্দুর রব অথবা বড়কর্তা'রা উপস্থিত থাকলেও লোকটা আর কখনো উপস্থিত হয় না। ... লোকটা নিজের ছুটি যেন নিজেই নিয়ে নিয়েছে। গল্পটা এখানে শেষ হয়ে যায়।


অথচ, গল্পের প্রকৃত শেষটা হয় আরো পরে। সেই সমাপ্তির শুরুটা হয় যখন আপনি নীলাঞ্জনপুর নামের ছিমছাম কোন মফস্বল শহরে অবকাশ যাপনে গিয়ে সন্ধ্যারাতে হাঁটতে যান, অথবা উত্তপ্ত ক্লান্ত দুপুরে ময়ূরাক্ষী নদী তীরে কোন অশ্বথ গাছে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নেন- তখন লোকটার সাথে আপনার সাক্ষাৎ হওয়ার মাধ্যমে। লোকটা আপনাকে আশ্বস্ত করে বলবে, সে নিজের ছুটি নিজেই নিয়েছে। লোকটা আপনাকে অচিন বৃক্ষের কথা বলবে, আপনি আকৃষ্ট হবেন। অবকাশ যাপন শেষে আপনি পরিচিত শহরে ফিরে এসে শহীদুল্লাহ হলের পুকুরঘাটে যাবেন, চারপাশের অগণিত বৃক্ষরাজির মাঝে আলাদা করে অচিন বৃক্ষ খুঁজে না পেয়ে আপনি স্থানীয় ছাত্রদের কাছে জানতে চাইবেন অচিন বৃক্ষ কোনটি।...


ছাত্ররা আপনাকে জানাবে, এইখানে এখন কোন অচিন বৃক্ষ নেই। এই শহরে কখনো কোন অচিন বৃক্ষ ছিলো না...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন