একটা ফুটবল ম্যাচে একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠতম পারফরম্যান্সও দেখেছিলাম ২০০৬ এর বিশ্বকাপে। ব্রাজিল বনাম ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনাল। একজন খেলোয়াড়ই যেনো খেললেন মাঠজুড়ে। বাকি ২১ জন দর্শক। চোখে ভাসে সেই ম্যাচের একটা দৃশ্যও। আলতো করে 'তিনি' একটা ৩৬০ টার্ন নিলেন, সামনে পেলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় কাকা'কে। শিল্পীর এক আলতো ভলিতে বল নিয়ে গেলেন কাকার মাথার ওপর দিয়ে তার পেছনে। তিনি- গত ৫০ বছরে ইউরোপের নির্বাচিত সেরা খেলোয়াড়,ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের একমাত্র পুরুষ মডেল- জিনেদিন ইয়েজিদ জিদান।
১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনায় জন্ম নেয়া ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির লিওনেল আন্দ্রেই মেসি'র সম্পর্কে এরকম বলার মত করে কোন বিশেষত্ব নেই। রোনালদিনহোর মত বল নিয়ে অবিশ্বাস্য কারিকুরি তিনি তেমন আহামরি কিছু করতে পারেন না। শিল্পীসম সৌন্দর্য্যতেও জিদানের তুলনায় তিনি অনেক পিছিয়ে। বরং নিন্দুকেরা বলে তার মানবীয় দূর্বলতা অনেক। ডান পায়ে জোরালো শট নেই, ফ্রী-কিকে তিনি একদম সাধারণ, উচ্চতায় খাটো বলে হেডও দিতে পারেন না ভালোভাবে।
তবুও গেটাফের বিপক্ষে স্প্যানিশ লীগে মাঝমাঠ থেকে ৫ জনকে কাটিয়ে নিয়ে এসে ম্যারাডোনাকে মনে করিয়ে দেয়া সেই গোল, অথবা ২০০৮ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে শাখতার দোনেৎস্ক এর মাঠে ৮৯ মিনিট পর্যন্ত ০-১ এ পিছিয়ে থেকে মেসি মহিমায় ২-১ গোলে বার্সেলোনার জয়, অথবা এই মৌসুমেই আবুধাবিতে কনফেডারেশনস কাপে মাঠে নামার ৪০ সেকেন্ডের মাঝে গোল দিয়ে ধারাভাষ্যকারকে 'ইয়োহান ক্রুইফ, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, জর্জি বেস্ট- হু ক্যান বি কম্পেয়ার্ড উইদ দিস আমেজিং লিটল ম্যান ???' বলতে বাধ্য করা- এসবের কিছুই নয়, আজকের মেসি বন্দনার একটাই ছুতো, ১০ ঘন্টা আগে স্পেনের ন্যু-ক্যাম্পে ৪-১ গোলে বার্সেলোনার (পড়ুন, মেসির) আর্সেনাল বধ। আজ কেবল এই ম্যাচ নিয়েই কথা বলবো।
সেমিফাইনালে যেতে হলে ড্র করলেই চলে বার্সেলোনার। কিন্তু কার্ডের খাঁড়ায় পড়ে মাঠে নামেননি বার্সার বহু যুদ্ধের যোদ্ধা রক্ষণভাগের পিকে এবং পুয়োল। শুরু থেকেই তাই বার্সেলোনার নিয়মিত সুন্দর পাসিং ফুটবলের পরিবর্তে আমরা সাবধানী বার্সেলোনাকে পাই, অতিরিক্ত সতর্কতার খেসারত বার্সাকে তাই দিতে হয় ১৮ মিনিটেই এক গোল হজম করে। আর্সেনাল শিবিরে উল্লাস, স্তব্ধ বার্সেলোনার মাঠ ন্যু-ক্যাম্প... এবং প্রস্তুত লিওনেল মেসি।
লখিন্দরের বাসর ঘরের ফুটো ছিলো। আর্সেনালের সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা চার ডিফেন্ডারের মাঝে সেই ফুটো বের করা তার চেয়েও কষ্টের হওয়ার কথা। দুই মিনিট পরেই ডানপ্রান্ত থেকে আড়াআড়ি ভাবে তিন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তৃতীয় আর চতুর্থ ডিফেন্ডারের মাঝের এক অদৃশ্য ফুটো দিয়ে শট নিলেন মেসি। হতভম্ব দর্শকদের সাথে সাথে গোলরক্ষক আলমুনিয়াও নড়ে উঠতে পারলেন না। গোল !!! মেসি ১- আর্সেনাল ১।
৩৭ মিনিটের মাথায় আবার সেই মেসি। মাঝমাঠ থেকে নিজেই থ্রু বল বাড়ালেন বাঁ প্রান্ত থেকে উপরে উঠতে থাকা এরিক আবিদালকে। আবিদালের ক্রস বার্সেলোনার স্ট্রাইকার আর আর্সেনালের ডিফেন্ডারদের জটলার মাঝ থেকে ফেরত আসতে আসতেই মেসি দৃশ্যপটে। চিপ করে বল জড়ালেন জালে। মেসি ২- আর্সেনাল ১ ।
আর্সেনালের নিস্তার নেই। চার মিনিট পর, ৪১ মিনিটের মাথায়, আবার...। আবার মেসি। ৮৬ বিশ্বকাপে আগুয়ান গোলরক্ষকের মাথার উপর দিয়ে চিপ করে অদ্ভূত এক গোল দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা, রেকর্ড ক্লিপে দেখেছি। সেই দৃশ্যের যেনো পুনরাবৃত্তি দেখলাম ২৪ বছর পর, আরো গতিময় ফুটবলে। বল পেয়েই বিনা বাঁধায় ছুট, ছুটতে ছুটতেই এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টিনন্দন চিপ, আলতো করে, ফুটবলের সবটুকু সৌন্দর্য্য নিয়ে মেসির হ্যাট্রিক গোল !!! মেসি ৩- আর্সেনাল ১।
মোটামুটি নিষ্প্রাণ সেকেন্ড হাফের শেষভাগে এসে ৮৭ মিনিটের মাথায় আর্সেনালের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন ঐ আর্জেন্টাইন যাদুকরই। তিনজনের ঐ জটলার মাঝে থেকে বল কীভাবে বের করলেন তিনি, সে এক রহস্য। বারে নেয়া প্রথম শট ঠেকিয়ে দিলেন গোলরক্ষক। এবং ফিরতি শট তার পায়ের ফাঁক দিয়েই জালে জড়ালেন মেসি। মেসি ৪- আর্সেনাল ১ !!!
আগ্রহীরা ম্যাচের হাইলাইটস দেখতে পারেন এখান থেকে। তবে এটা ইংরেজী কমেন্ট্রি নয়। কেউ সেটার লিঙ্ক মন্তব্যে জুড়ে দিলে খুবই ভালো হয়।
লেখার শেষে এসে আবার ফিরে যাই প্রথমে। সেরা কে ?? রোনালদিনহো, না জিদান ?? ... ভ্যাট!! এর কোন উত্তর হয় না। যাদুকর আর শিল্পীর মাঝে তুলনা হয় কখনো ?? রোনালদিনহো ফুটবলের যাদুকর আর জিদান ফুটবলের শিল্পী। প্রশ্ন ওঠেই, জাদুকর নন, শিল্পীও নন- মেসি তবে কী ??
...মেসি, মর্ত্যের মানুষের সবটুকু সীমাবদ্ধতাকে সাথে করে ফুটবলের ঈশ্বরদের প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে যাওয়া সদ্য কৈশোর পার করা এক তরুণ, যে আমাদের পাশের বাড়ির ছেলেটির মতই আপন, মেসি- আমাদের, ফুটবল ভালোবাসিয়েদের ভালোবাসার মানুষ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন