মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

গল্পটা কেবল কুইজারদের জন্যে

ডাক্তার রিফাত হায়দার পাংশু মুখে উঠে দাঁড়ালেন, " সরি, হি ইজ ডেড।" মেঝেতে পড়ে থাকা নিখাদ কুইজপেয়ী'র নিথর দেহের দিকে ইঙ্গিত করে ডাক্তার আবারো বললেন, " হি ইজ ডেড। বহু আগেই। প্রায় বারো ঘন্টা। "


ডাক্তারী পড়ুয়া আশা উঠে দাঁড়ালো অপর প্রান্ত থেকে। "হ্যাঁ ভাইয়া, সব শেষ। আমাদের প্রিয় কুইজার নিখাদ কুইজপেয়ী আর নেই। গতকালের কুইজই ছিলো তার জীবনের শেষ কুইজ। সেটাতেও কুইজপেয়ীর দলই জিতেছিলো শেষ পর্যন্ত। ...আহা, বড় ভালো কুইজার ছিলো..."। আশার গলা আবেগে বুজে এলো।


গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক এ আবেগে সাড়া দিলেন না। "হুমম, ...কুইজার, এঁ?? মৃত্যুর কারণ কি, ডাক্তার??" সিনিয়র ডাক্তার রিফাত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছোঁড়েন মোজাম্মেল হক।

রক্তে ভিজে যাওয়া নিখাদ কুইজপেয়ীর মুখটির দিকে চেয়ে রিফাত ভাই বলেন, " যদ্দুর বুঝছি- কানের পর্দা ছিঁড়ে মৃত্যু। প্রায় সাথে সাথেই। ডাক্তারী ভাষায় বলতে গেলে..."

"চোপ রও !!" মোজাম্মেল হকের গলা সচকিত করে তোলে উপস্থিত সকলকে। "এ নৃশংস হত্যাকান্ডের ডাক্তারী নাম নয়, বরং এ খুনের পেছনে কে আছে সেটা জানতেই আমার এখানে আসা। বলুন, কেউ জানলে বলে ফেলুন- কে ? কে এই ভয়ানক হত্যাকান্ডের জন্যে দায়ী ?? কে, কে ?? "

ভিএনসি অডিটরিয়ামে উপস্থিত সকল কুইজারের মাঝে এক অটুট নীরবতা নেমে আসে। প্রশ্নটা ওপেন রাউন্ড না ক্লু রাউন্ডের, সেটা বুঝতেই কষ্ট হতে থাকে সকলের। এবং ক্ষণকাল পরে মোজাম্মেল হক আরেকবার, "কী ?? জানেন না কেউ ?? " বলে প্রশ্নটি পুনরুচ্চারণ করলে সকলে নিশ্চিত হয় প্রশ্নকর্তার কাছে আর কোন ক্লু নেই। এতে নীরবতা আরেকটু অটুট হয়। এমনকি 'পাস' বলার দুঃসাহস দেখাতে পারেনা কেউই।


"অন্যান্য সকল অপরাধের মতই যে কোনো হত্যাকান্ডের পেছনেও অবশ্যি একটা মোটিভ থাকবে।" মোজাম্মেল হক সকলকে শুনিয়ে বলতে থাকেন। "কিন্ত আমার প্রশ্ন হলো, নিখাদ কুইজপেয়ীর মতো এরকম একটি কোমল ফুলের মত কিশোরকে হত্যা করা হলো কোন মোটিভে ?? দেখুন, একবার তাকিয়ে দেখুন ঐ নিষ্পাপ সদ্য গোঁফ ওঠা মুখটির দিকে। আহা হা, কোন পাপ ওকে স্পর্শ করেনি এখনো পর্যন্ত। ... আপনারাই বলুন, কোন পাপ কাজ ওর পক্ষে করা কি সম্ভব ?? দেখে মনে হয় ??" মোজাম্মেল হকের কন্ঠ ভেঙ্গে যায় শোকে।

"নিষ্পাপ কী বলছেন স্যার, " অঙ্কন ভাই মাথা নাড়েন। "ছোঁড়া ছিলো হাড়-বজ্জাত। এই বয়সেই যাকে বলে একদম নারীলিপ্সু হয়ে উঠেছিলো ছোকরা। ... এইতো গতকালই স্কুল লেভেলের কুইজটা জেতার পর আমার কাছে গিয়ে ছোঁড়া বায়না ধরলো সাইন্স ফেয়ারের দুটো ভলান্টিয়ারের ফোন নম্বর যোগাড় দিতে। আস্পর্ধাটা দেকুন একবার...আমি হলুম গে বড় ভাই, আর আমাকে কি না..."


ভলান্টিয়ারদের ফোন নম্বর যোগাড়ের বায়না শুনেই কবুতর মিয়া পকেট হতে একটা ছোট্ট নোটবুক বের করে। দ্রুত হাতে পাতা উলটে এসে কবুতর মিয়া থামে এক জায়গায়। নোটবুকের সে পাতার উপর লেখা "যাদের নামে ফেসবুকে ফ্যানপেজ খুলতে হবে "। তালিকায় শাকিব খান এবং রসু খাঁ'র পরে কবুতর মিয়া যোগ করে নিখাদ কুইজপেয়ীর নাম। নোটবুক সে পকেটে ঢুকিয়ে নেয় আবার।


মোজাম্মেল হক হাত তুলে থামিয়ে দেন অঙ্কন ভাইকে। "থামুন। ম্যালাই বকবেন না। ...লোক চিনতে আপনার ভুল হতে পারে, আমার নয়। যা হোক, কথা বলছিলাম খুনের মোটিভ নিয়ে। নিখাদ কুইজপেয়ীকে খুন করে কার কি লাভ হতে পারে ?? আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে এক সাধারণ খুনের ঘটনা। কিন্তু আমার অভিজ্ঞ মন বুঝতে পারছে এর পেছনে রয়েছে কোন সুতীক্ষ্ণ, সুতীব্র, সুঁচালো মোটিভ ..."


আকিফ দুম করে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। "ইয়ে, বস্‌- মানে... মোটিভ কি একটা থাকতেই হবে ?? "

"কেনো ?? থাকতে পারে না ?? " পালটা প্রশ্ন করেন মোজাম্মেল হক। "মোটিভ নেই - এ বিষয়ে তোমার কোন মত আছে নাকি ?? "


"অনুমতি দিলে একটা কথা বলি স্যার, " অথচ এই বলে অনুমতির তোয়াক্কা না করেই আকিফ বয়ান করতে থাকে। " নিখাদ কুইজপেয়ীর ডেডবডিটা কোথায় পড়ে আছে দেখেছেন স্যার ?? ঠিক সবগুলো বাজারের তারের সংযোগস্থলে। তারচেয়ে বড় কথা, প্রতিটা বাজার-ই এই অবস্থাতেও কানেকশন পাচ্ছে , আমি সকালে নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি। ... ভিএনসির এই মঞ্চে স্যার, খোদার কসম বলছি- একটা মাছির পক্ষেও সবগুলো বাজারের কানেকশন নষ্ট না করে ওঠা সম্ভব না। কাজেই কোন মানুষের পক্ষে এমন দামড়া ডেডবডিটা এভাবে রেখে যাওয়া স্যার, বড় অকল্পনীয় ব্যাপার। বিশ্বাস না হয় আপনি বক্সকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন...।"


পেন্সিল বক্স, থুড়ি ওয়াহিদ বক্স ততক্ষণে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে। " ওরে আকিফ রে, আমাদের কি হবে রে... তাকিয়ে দ্যাখ- গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক তো ইতিমধ্যেই উনার জুতোর সঙ্গে তিনটে বাজারের কানেকশন খুলে এনেছেন। আবারো দু'ঘন্টার মামলা... ওরে নিখাদ কুইজপেয়ী' রে - এই ছিলো তোর মনে ?? মরে গিয়েও আমাদের এইভাবে ফাঁসিয়ে গেলি ভাই..."


অপ্রস্তুত গোয়েন্দাপ্রবর কথা ঘোরানোর চেষ্টায় এক চেষ্টাকৃত ধমক দেন আকিফকে।"রাবিশ !! ফাজলামির আর জায়গা পাওনি ?? মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় তাই না ?? তবে কি কোন এলিয়েন এসে খুন করে রেখে গেছে এই দুধের বাচ্চাকে ?? এইটেই তোমার বক্তব্য ??"


"হতে পারে, ...হতে পারে।" রুশাফি ভাই লম্বা মানুষ হলেও ইদানীং কোন এক অনিবার্য কারণে তিনি কেবল নীচের দিকে তাকিয়ে থাকেন। " খুবই সম্ভব ব্যাপারটা। আজিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের কোন একটায় ঠিক এরকম একটা পরিস্থিতিতে... "


ফাউন্ডেশন সিরিজ সকলের এটেনশন কাড়তে ব্যর্থ হয়। সকলেই ফুল-পাতা-গাছ-বোদলেয়ারের মেঘদল খুঁজার চেষ্টা করে যায়... কেবল, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন, সকলের অগোচরে দুবার কপাল চাপড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।


"রাখুন আপনার ফাউন্ডেশন। " মোজাম্মেল হককে বেশ রাগান্বিত দেখায়। " আসল কথায় আসুন। মোটিভ দরকার আমার। মোটিভ। "

"উম, ... হতে পারে- হতে পারে নিখাদ কুইজপেয়ী চেলসি সমর্থক ছিলো।" বলে ওঠেন এভার্টনের কাছে হারের ধকল এখনো সামলাতে না পারা চেলসি সমর্থক সেতু ভাই। "হতে পারে কোন দাঙ্গা-প্রিয়, হুলিগান, এভার্টন সমর্থকের সাথে ঝগড়ায় কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সেই সমর্থক কুইজপেয়ীকে মেরে বসে। ... আহা, কি বীরের মরণই না মরলো ছোঁড়া..."


"ইয়ে, আমার মনে হয় ছোকরার মৃত্যুর জন্যে দায়ী সচলায়তন ব্লগের মডারেটররা। " মোটিভ নির্ণয়ে আমিই বা কম যাই কীসে ?? "মানে এই ছোকরা শুনেছি ছদ্মনামে কোবতে লিখতো। দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করার পরেও তাকে সচলের সদস্যপদ না দেওয়ায় তার সাথে সম্ভবতঃ মডারেটরদের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এরই ফলশ্রুতিতে মডারেটরেরা ভাড়াটে খুনী লাগিয়ে তাকে খুন করেছে বলে মনে হচ্ছে। ... "


আমাকে কথা বলতে দেখেই আমার আপন কালাতো ভাই কেষ্টা ওরফে রিফাত সাহস পায় বোধহয়। "ধুর। এগুলো কোনটাই মোটিভ নয়। ছোঁড়ার মরণের একমাত্র কারণ হলো লুল প্রক্ষেপণ দোষ। গুছিয়ে বলতে গেলে, ' কুইজমাস্টার কুইজপেয়ীরে বলে 'উত্তর ভুল, লিখে রাখ কয় ফোঁটা ফেলেছিলি লুল'।"


রাকা ইসলাম
কৌতূহল দমাতে পারে না, "ইয়ে, ভাইয়া- কবিতাটি কার ??"


... গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক গলার স্বর বেশ আপ- করে " শাটাপ !! " বলে চ্যাঁচিয়ে ওঠেন। "মোটিভ না ছাই। কিচ্ছু বলতে পারেননি আপনারা। গন্ডগোল করছেন কেবল। ... আমার মাথায় মোটিভ নিয়ে নিজস্ব একটা আইডিয়া এসেছে। তবে তার আগে আমাকে কেউ গতকাল থেকে আজ সকালে ডেডবডি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত ঘটনা গুছিয়ে বলুন। হারি আপ, হারি আপ। "


সবচেয়ে সত্যবাদী বলে একাজে আমরা অপু ভাইকেই ঠেলে ঠুলে পাঠিয়ে দেই। ঢোঁক গিলে অপু ভাই বলতে থাকেন " ইয়ে, আসলে গতকাল দুপুরের দিকে শুরু হয়ে স্কুল লেভেলের কুইজটা বিকেলের দিকে শেষ হয়ে যায়। নিখাদ কুইজপেয়ী'র দল তীব্র প্রতিদ্বন্ধিতা পূর্ণ এক প্রতিযোগিতার পরে স্বাগতিক স্কুলকে হারিয়ে পচা সাবান আয়োজিত চৌদ্দতম সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব লাভ করে। কুইজে জেতার পর নিখাদ কুইজপেয়ী কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলো তা অবশ্য আমি লক্ষ্য করিনি। তবে, ইয়ে, অঙ্কন কী বলেছে, তা তো আপনারা ইতিমধ্যেই শুনেছেন। আমার অবশ্য বেশ ক্ষুধা লেগেছিলো। বাজে আয়োজন স্যার, সারাটা দিন উদয়াস্ত পরিশ্রম করে হেদিয়ে গেলাম, বিনিময়ে দিয়েছে এক প্যাকেট নানখাটাই বিস্কুট। ... তবে মোশফেকা মেয়েটা আসলে বেশ ভালো। কি একটা কেক্কুক, না কি যেনো..."

"ক্যাভিয়ার ভাইয়া, ক্যাভিয়ার..." মোশফেকা পাশ থেকে কথা যুগিয়ে দেয়।

"হ্যাঁ হ্যাঁ- ক্যাভিয়ার। " অপু ভাই খেই পান। "মানে, আসলে বেশ পরিশ্রান্ত ছিলাম কী না- তাই খাওয়ার জন্যে ক্লাবরুমে চলে গিয়েছিলাম, কাজেই এরপরে কী হয়েছে তা আসলে বলাটা ঠিক..."


ক্লাবের পক্ষে সিফাত কথা বলে ওঠে। " বেশ, এরপরে আসলে হয়েছে কী, মানে প্রখ্যাত গায়ক হার্ট খান আমাদের পচা সাবান আয়োজিত চৌদ্দতম সাইন্স ফেয়ার দেখতে এসেছেন- এই রকম একটা খবর পাওয়ার পর আমাদের মেয়েরা আসলে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। আমি শতবার বলেও ভলান্টিয়ারদের কাজে ফেরত পাঠাতে পারিনি। একরকম জোর করেই আমাকে দিয়ে ওরা সকলকে বিদায় করে অডিটরিয়ামের দরজায় তালা দিতে বাধ্য করে। কিন্তু নিখাদ কুইজপেয়ী তবুও কীভাবে ভেতরে রয়ে গেলো, সেটা অবশ্য এখনো বুঝে ঊঠতে পারছি না।

সকালে এসেই অবশ্য আমি ডেডবডি আবিষ্কার করি। কিন্তু কুইক রাউন্ডের মতো যথেষ্ট দ্রুততার সাথে আমি কর্তব্য নির্ধারণ করে ফেলি। শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত কুইজীয় হত্যাকান্ডটি কে সমাধান করবেন, সেটা ঠিক করতে অনু ভাইকে কুইজমাস্টার হিসেবে নিয়ে একটা চটজলদি কুইজের আয়োজন হয়। জেমস বন্ড রিটেন রাউন্ডেই বাদ হয়ে যান, শার্লক হোমস আগেভাগে বাজার চেপে ডিসকোয়ালিফাইড ঘোষিত হন। অতএব, কুইজবিজয়ী গোয়েন্দা মোজাম্মেল হককেই আমরা নিয়োগ দেই। আর এরপরের ঘটনাতো সকলেরই জানা। "...


মোজাম্মেল হক হাতের মোবাইলটার স্ক্রিনে চোখ বুলানো শেষ করে একটা নির্মল হাসি দেন। "হেহ হেহ, আমার থিওরী সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখানে আসবার পথেই আমি দেখে এসেছি, নিখাদ কুইজপেয়ী তার অংশ নেয়া প্রতিটি কুইজেই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছে। তবুও তার খুনের কোন মোটিভ নেই দেখে আমি এসএমএস পাঠিয়েছিলাম প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ কামাহিত মালকে। ডঃ মাল আমার থিওরীর পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। আমি প্রশ্ন করেছিলাম- 'এমন কি হতে পারে, দীর্ঘদিন ধরে একই কুইজারের কাছে পরাজিত হতে হতে কোন এক কুইজমাস্টারের সাইকোলজিকাল ডিজওর্ডার সৃষ্টি হয়েছে ?? যার কারণে তিনি সেই কুইজারকে সরিয়ে দিতে খুন পর্যন্ত করতে পারেন ??' ডঃ মাল উত্তর দিয়েছেন সম্ভব। ...
অতএব, দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, নিখাদ কুইজপেয়ীর খুনী আপনাদের মাঝেই কেউ। আমার কাজ হবে তাকে খুঁজে বের করা। "


-"ইয়ে, ডঃ মাল কেবল এসএমএস দেখেই বলে দিলেন ??" আমার কেমন জানি সন্দ হলো।

-"আলবাত। আপনাদের মাঝেই কেউ খুনী, এতে আমার এবং ডঃ মালের বিন্দুমাত্র সন্দ নেই।"


কবুতর মিয়া আবার নোটবুক বের করে। শাকিব খান, রসু খাঁ, নিখাদ কুইজপেয়ী'র পর তালিকায় চতুর্থ নাম ওঠে। ডঃ কামাহিত মাল।


হাবিব ভাই ডুকরে কেঁদে ওঠেন। "জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশভূমি। এমন কথা বলতে পারলেন স্যার ?? কতদিন পর বাঙ্গালির ছেলে দেশে ফিরে কুইজাতে এলুম, আমায় কি না এমন সরাসরি খুনে বলে দিলেন ?? সইবে না স্যার, এমন অধম্মো সইবে না... "


মোজাম্মেল হক অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। "আহা, এমন ভেঙ্গে পড়ার কী আছে ?? আমি তো এখনি খুনী কে- তা বের করে নিচ্ছি। দু'মিনিটের ব্যাপার মাত্র। "

প্রথম ধাক্কাতেই আমি, কেষ্টা রিফাত, ওয়াহিদ বক্স, রাকা, সিফাত এবং আকিফ বাদ পড়ে যাই। "না না, এরা কী খুন করবে। বুয়েটের পোলাপান, কালরাতে পলাশীতে মিছিল করে পরীক্ষা পেছানোতেই ব্যস্ত ছিলো। বাদ, এরা বাদ।"

দ্বিতীয় চোটে বাদ পড়েন অপু ভাই। "নাহ, নিতান্ত ভালো মানুষ আপনি- নৃশংস খুনীর ভূমিকায় ঠিক মানাচ্ছে না। আপনিও বাদ।

দুই ডাক্তার রিফাত ভাই এবং আশাকেও বাদ দেয়া গেলো। কারণ গতরাতে ঢাকা মহানগরীর সমস্ত ডাক্তারকে নিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে যে আপনারা দুজনই ছিলেন, সেটা ডঃ কামাহিত মাল নিশ্চিত করেছেন।

কবুতর মিয়া, তুমিও বাদ। কারণ রাতে কবুতরের খাওয়ানো শেষ না করে তুমি নিশ্চয়ই খুন করতে বেরোতে পারো না, এতে কবুতরেরা চ্যাঁচামেচি করে পাড়া মাথায় করবে।"

মোশফেকার সামনে এসে থমকে যান গোয়েন্দা চূড়োমণি। "দাঁড়াও, দাঁড়াও- তুমি যদি কাল রাতে খুনই করে থাকো, তবে নিজের হাতে আজকে আমাদের সবাইকে যেটা খাওয়ালে, অমন অখাদ্য কেকটা কখন বানালে ?? নাহ, তোমার এলিবাইও বেশ শক্ত। তুমিও বাদ।"


"তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে, " সেতু ভাই, অঙ্কন ভাই, হাবিব ভাই, রুশাফি ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন মোজাম্মেল হক। "সিনিয়রমোস্ট কুইজমাস্টার হিসেবে আপনারাই সবচেয়ে বেশি অপদস্ত হয়েছেন নিখাদ কুইজপেয়ীর কাছে। তার প্রতি ক্ষোভ আপনাদেরই সবচাইতে বেশি। ঐ বিপজ্জনক সাইকোপ্যাথটি হবার সম্ভাবনা আপনাদেরই সবচে বেশি। তদুপরি, আপনাদের কোন এলিবাইও নেই।কাজেই চটজলদি স্বীকার করে ফেলুন, কে খুন করেছেন। ... "


"এহহহ, বললেই হইলো..." সখেদে বলেন হাবিব ভাই। "খেলুম না। এত্তো খায় না... " স্বভাবসুলভ কুইজ করার ভঙ্গীতে কলম ছুঁড়ে মারেন হাবিব ভাই এবং পরক্ষণেই তার মনে পড়ে এটা কোন কুইজ নয় এবং কোন সুন্দরী ভলান্টিয়ার তাকে কলম তুলে দেবে না। লজ্জিত ভঙ্গীতে তিনি কলমটা খুঁজতে মঞ্চের কোণার দিকে চলে যান।

কবুতর মিয়া ঈর্ষার দৃষ্টিতে হাবিব ভাইয়ের গমন পথের দিকে চেয়ে নোটবুক বের করে, তালিকায় পঞ্চম নাম যুক্ত হয়। হাবিব ভাই।


"এ ছোকরাকেও তালিকা থেকে বাদ দেয়া যায়।" আপন মনেই বলেন মোজাম্মেল হক। "দীর্ঘদিন ধরে সে প্রবাসী। কাজেই তার সাথে ভিক্টিমের দ্বন্দ্ব থাকবে, নাহ বিষয়টা সম্ভব না।" পরক্ষণেই সেতু ভাই, অঙ্কন ভাই, রুশাফি ভাইয়ের দিকে রুদ্র রোষে তাকিয়ে তিনি বলেন- "কিন্তু আপনারা, আপনারা কীভাবে প্রমাণ করবেন আপনারা যে খুনী নন ??"


"বিশ্বাস করুন স্যার, " কাঁদোকাঁদো গলায় বললেন অঙ্কন ভাই। "আমাদের কেউই খুনী নই। খুনের সময় আমরা, মানে আমি আর সেতু ভাই, ফেসবুকে রুশাফির দেয়ালে চিকা মেরে তাকে ধুয়ে দিচ্ছিলাম। কসম বলছি স্যার..."

"হ, কথা ঠিক।" সেতু ভাই বলেন।

"বিলকুল ঠিক।" রুশাফি ভাই না পারতে স্বীকার করে নেন।

"বটে ?? শক্ত এলিবাই দেখছি। সকলেই তো বাদ হয়ে গেলো। তবে কে হতে পারে খুনী ?? কে ?? " ধন্দে পড়ে যান গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক।


"ইউরেকা ! ইউরেকা ! পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি। " মঞ্চের কোণা থেকে উল্লাস করতে করতে দৌড়ে আসেন হাবিব ভাই। হাতে কলম নয়, রক্তমাখা টেপরেকর্ডার একটা। "দেখুন স্যার, রক্তের দাগ লেগে আছে। নিশ্চয়ই ধস্তাধস্তির সময় খুনী বা নিহত কুইজপেয়ী 'র মাঝে কেউ একজনের পকেট থেকে বেরিয়ে এসেছে। চালিয়ে দেখুন না স্যার, নিশ্চয়ই খুনীর পরিচয় জানা যাবে।"


গোয়েন্দা মোজাম্মেল হককে ঘিরে দাঁড়ায় সকল কুইজার। টেপরেকর্ডার চালু করেন গোয়েন্দাপ্রবর। দুটো গলা শোনা যায়। একটা গলা সকলের পরিচিত, নিখাদ কুইজপেয়ী'র কোকিলচাঁছা রব। অপর গলাটা পাতলা, চেনা চেনা ঠেকে সকলের কাছেই, কিন্তু ঠিক নিশ্চিত হওয়া যায় না।

প্রথমে পাতলা গলার খুনী- " এখন হবে ডু অর ডাই রাউন্ড। করুন অথবা মরুন। ছুরি দেখেন ?? আমার হাতের ছুরিটা দেখেছেন ?? বলুনতো ছুরিটা কার ??"

- "ডবল। ... ছুরিটা নান্দাইলের ইউনুসের।"

- " হয়নি। হয়নি। ডু অর ডাই রাউন্ডে তুমি আটকে গেলে হে কুইজপেয়ী, এবার এটা কেবল ডাই রাউন্ড। ব্রিলিয়ান্ট রঙ এন্সার ..."

এরপরেই, টেপরেকর্ডারে ভেসে আসে নিখাদ কুইজপেয়ীর মরণ-চীৎকার...।


গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক মৃদু হেসে বলেন, "বুঝতেই পারছেন, খুনী আর কেউ নয়।... তার নাম ফাহিদ হাশান ভীতু !!"

এবার কেবল কবুতর মিয়া নয়, একযোগে সবাই নোটবুক বের করে।

৩টি মন্তব্য:

  1. আমার নোটবুক্টা যে কৈ গেলো......আপ্নার নামটা টুক্তে হবে !!

    অনন্যসাধারণ হইসে ভাইজান!!

    ওয়াহিদ

    উত্তরমুছুন
  2. গোগ্রাসে গিললুম গল্পটা । একটিই মন্তব্য হতে পারে ব্রি-ল্-লি-য়া-ণ্ট জ-ব !!!! শুধু নিষাদ কুইজপেয়ী নামক দুর্ভাগাটি কে হতে পারে তাই ভাবছি.....:P

    আশা

    উত্তরমুছুন