রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

ম্যাগনাম ওপাস ও কয়েকটি গল্প


০১।

ড্যান ব্রাউনের অথবা শাহাদুজ্জামানের বইয়ের রিভিউ লেখা এরচেয়ে সহজ। এ বড় সত্য কথা। তাঁদের লেখা পড়বার দশ কী বিশ মিনিটের মাঝে সেটার মাঝে মন্তব্য করি না, অগল্প বা ব্যাডভেঞ্চার গল্প লেখার বিস্তারে সমস্যা বোধ করলে পদেপদে তাঁদের সাহায্য চেয়ে বসি না, তাঁদের কামরাঙ্গা ছড়াযুক্ত খোমাখাতা স্ট্যাটাসে লাইক্স দিস বোতামে চাপ দেই না- হিমু ভাইয়ের ক্ষেত্রে এর প্রতিটাই করি। নিয়মিতই। শাহাদুজ্জামান কী ড্যান ব্রাউন আমার কাছের মানুষ নন, অথচ অনলাইনে লেখার মাধ্যমে এবং টুকটাক কুইজিং-এর সাথে সম্পৃক্ততার খাতিরে পরিচিত জার্মানি প্রবাসী হিমু ভাইকে বড় কাছের মানুষ বলে ঠেকে। জানবেন, মানবেন- কাছের মানুষের বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখন সহজ কাজ নয়। মাহবুব আজাদের "ম্যাগনাম ওপাস ও কয়েকটি গল্প " বইয়ের রিভিউ লিখতে বসে সেই কঠিন কাজটির কাঠিন্য বুঝতে দেরী হচ্ছে না।

প্রশ্ন ওঠেই। মাহবুব আজাদ কেন ?? "ম্যাগনাম ওপাস ও কয়েকটি গল্প " বইয়ের লেখক হিমু নন কেন ?? এর উত্তর লেখক নিজেই দিয়েছেন অন্যত্র। লেখকের ভাষ্যমতে-

যতদূর বুঝি, মাহবুব আজাদ হিমু নয়। সে অন্য কেউ। হিমু সচলে লেখে, ফেসবুকে লুলুবৃত্তিতে সময় দেয়, জিটকে হাসিতামাশা করে, মাহবুব আজাদ তখন বেরিয়ে আসে অনেক দূরে সিলেটের কোনো এক প্রেস থেকে। হিমু লেখে এই পোস্ট, মাহবুব আজাদ হাঁটা দেয় ঢাকার পথে। হিমু দেশ থেকে বহুদূরে বসে একাকী শীতের সকালে চুপচাপ এক কাপ চা বানায়, তাতে এক দানা এলাচ দেয়, ভাবে কখনোই তার ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকা হলো না, আর চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবে, এই অনুপস্থিতির জন্যে শোক তাকে মানায় না, আর মাহবুব আজাদ পড়ে থাকে বিতর্কের ডিসপ্লেতে, কয়েকজনের হাতে, কয়েকজনের ব্যাগে, তার মায়ের বালিশের নিচে।

অতএব আমি আশ্বস্ত হই। আমি "ম্যাগনাম ওপাস ও কয়েকটি গল্প" -তে মনোনিবেশ করি।.....




০২।

ছয়টি ছোটগল্পের সংকলন "ম্যাগনাম ওপাস ও কয়েকটি গল্প "এর ফ্ল্যাপের গুটি গুটি লেখনী মন কাড়ে। সচলায়তনের অগ্রজ মূলত পাঠক গোছানো স্বরে বলেন লেখকের সম্পর্কে। জানিয়ে দেন - তাঁর অনেকগুলি গল্প, যা পড়ে আমরা হেসেছি, গম্ভীর হয়েছি, চিন্তার রেখা ফুটেছে কপালে, তার থেকে কিছু প্রতিনিধিত্বমুলক গল্প এই সংকলনে রয়েছে।

অতঃপর, আন্তঃনগর সুবর্ণ এক্সপ্রেসে আমার সময় কাটে মাহবুব আজাদের ছোটগল্প পাঠে।


সংকলনের প্রথম গল্প "পুরনো বাড়ি"- সচলায়তনে গত বছর পঠিত আমার প্রিয় গল্পগুলোর মাঝে শীর্ষস্থানীয় একটি গল্প। কাকশিকারে ব্যস্ত ছোট্ট শিকারী টুলু করবেট দস্যু বীরাপ্পনের চেহারার এক ডাকাতে লোককে তাঁর বাড়ির আঙ্গিনায়। টুলুর চোখে রহস্যময় লোকটিকে পাঠক ক্রমশঃ আবিষ্কার করে হাসান নামের এক স্মৃতিকাতর ব্যক্তির রুপে, বিশ বছর পর স্মৃতির শহরে ফিরে যে খুঁজে পায়- কেবল কাকেরাই অপরিবর্তনশীল থেকে যায়।


পরের গল্প " সেতু সঙ্কট"- আকারে ছোট, সহজিয়া, তবে দারুণ লক্ষ্যভেদী। ছোটগল্পের মোড়কে এক আধুনিক রুপকথা যেন। যেমনটা রুপকথায় থাকে, তেমনি এক দেশে ছিলো এক নদী। আর ছিলো দুই রাজনৈতিক দল- সোজা দল আর উল্টো দল। অতএব গল্প এগোয়।


"তোমার ঘরে বাস করে কারা" গল্পে দেখা মেলে লেখকের চূড়ান্ত রসবোধের। গল্পের ভেতরের এক গল্পে চৌধুরী সাহেব, খান সাহেব আর সৈয়দ সাহেবকে বর্ণনা করতে থাকেন পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা। জনৈক ভুঁইয়ার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার স্বল্পতা আর তার ফলে পাড়ায় সৃষ্ট জটিলতার জট উন্মোচিত হতে থাকে আড্ডার মাঝ দিয়ে। সে জটিলতায় থাকে আক্কাস, মরিয়ম, মওদুদ, থাকে - সুডোকু খেলা !!!


সংকলনের পরের গল্প "নিদপিশাচ"- বইয়ের একমাত্র গল্প যেটির গোত্র আমি বুঝে উঠতে পারিনি। এটা হতে পারে প্রতিবেশী ভিনধর্মী স্বাগতার প্রতি বুয়েট পড়ুয়া নাসিমের তীব্র শারীরিক আকর্ষণের গল্প, হতে পারে তন্ত্রসাধনা করা স্বাগতার পিতা পরিতোষবাবুর অন্যের মনের কথা বুঝবার ক্ষমতা নিয়ে একটি অতিপ্রাকৃত গল্প, হতে পারে ঘটনাক্রমে ছোট্ট শিশিতে বন্দী এক নিদপিশাচের মুক্ত হয়ে নাসিমের উপর ভর করার ভৌতিক গল্প। সংকলনের অন্যান্য গল্পের তুলনায় এ গল্পের প্রথমাংশের ভাষাও একটু যেন অস্থিতিশীল।


অপরপক্ষে, অস্থিতিশীল এই ভূখন্ডের পটভূমিতে এক অসাধারণ ছোটগল্প- "বিলুপ্তি"। আমার মতে সংকলনের সেরা গল্প। ২০৩৩ সালের টিভি নিউজ রিপোর্টার নাজনীন আর ক্যামেরাম্যান সাইফুলের গল্প। এক হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বৃদ্ধকে নিয়ে মিডিয়া আর রাজনৈতিক দলগুলোর মাতামাতির গল্প। সেই বৃদ্ধ- বাংলাদেশের শেষ জীবিত মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমানের গল্প। একরাশ লজ্জার গল্প।


সংকলনের শেষ গল্পটি - "ম্যাগনাম ওপাস"। স্বল্পজ্ঞানে জানতাম, ম্যাগনাম ওপাস হলো কোন শিল্পীর সৃষ্ট কালজয়ী শিল্পকর্ম। গল্পে সেই অর্থেই এর ব্যবহার দেখি। এ গল্প রকিব নামের বন্ধুহীন যুবকের, চা-য়ের দোকানে যার সাথে পরিচয় হয় পাঁচ বছর আগে সমালোচকদের কারণে অজ্ঞাতবাসে যাওয়া গল্পকার আনিস চৌধুরীর ও রমা নামের আকর্ষণীয়া যুবতীটির। আনিস চৌধুরী গল্পের জগতে ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন তার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি- তার ম্যাগনাম ওপাস রচনার পর। কিন্তু আনিস চৌধুরীর গল্প জানার জন্যে মরিয়া রমার সাথে রকিবের সম্পর্কের এই জটিলতা কী হতে উদ্ভূত- সেটা জানতে এগোতে হয় গল্পের সাথে সাথে।

০৩।

"ম্যাগনাম ওপাস ও কয়েকটি গল্প " সংকলনের প্রচ্ছদে ব্যবহৃত চমৎকার আলোকচিত্রটি আরেক অগ্রজ সচল মেহদী হাসান খানের তোলা। দেখতে দারুণ সংকলনটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮০। বাঁধাই বেশ ভালো। শস্যপর্ব প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটি একুশে বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে পাঠসূত্রের স্টলে। মূল্য সুলভ, ৭৫ টাকা। মাহবুব আজাদের "ম্যাগনাম ওপাস ও কয়েকটি গল্প " পড়ে আশাহত হবার সম্ভাবনা কম। কাজেই পড়ে ভালো লাগবে আশা করি।


০৪।

একুশে বইমেলা ফুরোবার পূর্বে সচলদের প্রকাশিত কোন বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখবো না বলে মনঃস্থির করেছিলাম। কিন্তু প্রবাসী সচলদের অনেককেই নতুন বইগুলো হাতে না পাওয়ায় আক্ষেপ করতে দেখে সাহস করে লিখেই ফেললাম। কারো কাছে এতে অপঠিত বইয়ের আমেজ ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে হলে দুঃখিত। স্বনামধন্য সচল রিভিউয়ার অতন্দ্র প্রহরী বা অন্য কেউ অচিরেই বইমেলায় প্রকাশিত অন্যান্য সচলদের বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া দেবেন বলে আশা রাখি।

পরিশেষে মাহবুব আজাদের জন্যে শুভকামনা। আপনার ম্যাগনাম ওপাস এখনো আমরা দেখিনি, দেখবার আশায় রইলাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন