রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১০

কুয়াশার মৃত্যু

"I have now understood that though it seems to men that they live by care for themselves, in truth it is love alone by which they live."
- Leo Tolostoy [ What Men Live By (1881)]



গতরাতে কুয়াশা নেমে এসেছিলো। অপার্থিব, ভীতিপ্রদ সে কুয়াশা - যার সাথে গঞ্জের মানুষদের পরিচয় হতো কেবল মাওলানা ইদ্রিস আলীর বিশেষ অভিযানের রাতগুলোতে। সেইসব রাত, যে সব রাতে মাওলানা ইদ্রিস আলী বেরোতেন গঞ্জের পথে, কুয়াশা নামিয়ে আনতেন। আনতেন ব্যাখ্যাতীত আরো কিছু। গতরাতের কুয়াশা তাই মাওলানা ইদ্রিস আলীর একমাত্র পুত্র ইউসুফ আলীর মনে একধরণের স্মৃতিকাতরতা জাগিয়ে তোলে। সে স্মৃতিতে আসে কুয়াশা, আসেন মাওলানা ইদ্রিস আলী, আসে তাঁর মৃত্যুদৃশ্য। কিন্তু দেখা যায়, এই স্মৃতিকাতরতাই ইউসুফ আলীকে ভীত করে তোলে। এই ভীতির উৎস কুয়াশা, এই ভীতির উৎস ব্যাখ্যাতীত আরো কিছু।


ইদ্রিস আলীর শবযাত্রায় কি গঞ্জের অগণিত মানুষের সাথে কুয়াশাও এসেছিলো ?? হাজিরা দিয়েছিলো নাকি সে, মৃত্যু আর মাওলানা ইদ্রিস আলীর মধ্যেকার অন্যান্য বৈঠকগুলোর মতোই ??......
ইউসুফ আলীর তা মনে পড়ে না - বরং ইউসুফ আলীর কাছে শবযাত্রা পাটীগণিতের নামতার নামান্তর হয়ে ধরা দেয়। খাটিয়ার চারকোণে চারজন। তাঁরা দশ পা এগোয় এবং এরপর তাঁরা স্থান পরিবর্তন করে। সামনের ডানপাশে থাকা ইউসুফ জায়গা করে নেয় নীচের ডানপাশে মহিউদ্দীনের জায়গায়। মহিউদ্দীন সরে যায় তার বামপাশে আজগর মৃধার ছেড়ে দেয়া জায়গা নিতে। আজগর মৃধা সামনে চলে যায় জমির মুন্সীর জায়গায়, যে স্থান জমির মুন্সী ছেড়ে গিয়েছিলো ইউসুফ আলীর রেখে দেয়া শূণ্যস্থান পূরণ করতে। তাঁরা আবার দশ পা এগোয় এবং তাঁরা আবার স্থান পরিবর্তন করে। জমির মুন্সী- ইউসুফ আলী- মহিউদ্দীন- আজগর মৃধা। পুনরায় আবর্তন হয়, চক্র পূর্ণ হয়। সে চক্রে ইদ্রিস আলী থাকেন, থাকে ইউসুফ আলী এবং থাকে কুয়াশা।


গঞ্জের লোকজন কথা বলে- নানা বিষয়ে কথা বলে। সে আলোচনায় তাদের নিজেদের কথা থাকে, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের কথা থাকে, জমির মুন্সী- মহিউদ্দীন থাকে, থাকে আজগর মৃধা প্রসঙ্গ। ঘুরেফিরে সেটি হয় আজগর মৃধার পুত্র আলতাফ মৃধা প্রসঙ্গ। চৈত্র মাসের সেই সকালে উজ্জ্বল রোদ থাকা সত্ত্বেও আলতাফ মৃধার আয়ূ থাকেনি- ফলে বাদ আসরের জানাজার নামাযের পরে মসজিদ সংলগ্ন মাওলানা ইদ্রিস আলীর বাড়ির দরজায় আজগর মৃধাকে দেখা যায়। "অঁনর ফা ধরি কইদ্দি বদ্দা, অঁনে আর ফোঁয়ারে আনি দেওন...অঁনে ইতেরে আনি দেওন..."- আজগর মৃধার এই আর্তনাদ অনেকে শুনতে পায় বোধ করি, শুনেছিলেন ইদ্রিস আলীও। "ওঁয়া, বাড়িত য গুই।... আঁই হায়াতুর মালিক না ওঁয়া ?? তুঁই বাড়িত য গুই। ... দরুদ ফড়ো। "
... ইদ্রিস আলী এর বেশিকিছু বলেন না, আজগর মৃধাও ক্রন্দনরত অবস্থায় বাড়ি ফিরে যায়। তবুও এশার আযানের জামাত শেষে বাড়ি ফিরে মাওলানা বলেন - " আজিয়ে খোয়া ফড়িবু। " খোয়া হলো কুয়াশা এবং অনিবার্য কোন কারণে সে রাত হয়ে উঠে কুয়াশামুখর রাত। অবর্ণনীয়, অবিশ্বাস্য সে কুয়াশার মাঝে ইদ্রিস আলী হারিয়ে যান- একসময় ফিরেও আসেন। হারিয়ে যাওয়া আলতাফ মৃধাও ফিরে আসে, পরের দিন বাদ আসর। ......


অজানা সে কুয়াশার মাঝ থেকে মাওলানা ইদ্রিস আলীর ডাকে উঠে আসে কেনো একেকটা মৃত মানুষ ?? মাওলানা কি জ্বীন চালান দিয়ে থাকেন ?? নাকি কুফরি-কালাম পাঠে অথবা অন্য কোন উপায়ে তাঁর এই মন্ত্রের সাধনা ?? গঞ্জের লোকের কাছে সেটা অবোধ্যই থাকে। ঘুরেফিরে তাই তারা নিজেদের মতোই আলোচনা চালায়। সে আলোচনায় তারা নিজেদের কথা বলে, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের কথা বলে, জমির মুন্সী- আজগর মৃধার কথা বলে, এমনকী মহিউদ্দীনের কথাও বলে। চৈত্র মাসের স্থলে শ্রাবণ মাস আসে এবং আলতাফ মৃধার স্থলে আসে খাদিজা খাতুন- মহিউদ্দীনের বোন। অথচ এইবার "আজিয়ে খোয়া ফড়িবু " বলে মাওলানা ইদ্রিস আলী বের হবার পর তুমুল বৃষ্টি আসে। কুয়াশা ধুয়ে মুছে যায়। মাওলানা ফিরে আসার পরেও খাদিজা খাতুন ফিরে আসেনা। ...গঞ্জের লোক সিদ্ধান্তে পৌঁছে- ইদ্রিস আলী মানুষই বটে। উনি ঈসা মসীহ নন।


গঞ্জের জীবনযাত্রা ঢিমেতালে চলতে থাকে। মাওলানা ইদ্রিস আলী জামাতে নামায পড়ান, মানুষকে কোরান শিক্ষা দেন, সৎপথে আসতে বলেন সবাইকে। তবুও মাঝে মাঝে এশার নামাযের পর মাওলানা মসজিদেই থেকে যান রাত্রিযাপন করবার জন্যে এবং গঞ্জের লোকের কাছে তিনি কী করেন তা অজানাই থাকে কুয়াশাজনিত কারণে। গঞ্জের লোক ইদ্রিস আলীকে কী চোখে দেখে তা অবশ্য কোন প্রকার কুয়াশা ছাড়াই আড়ালে থাকে। কারণ আলতাফ মৃধার পরেও অনেকে ফেরত এসেছিলো; সারোয়ার মিঁয়া- শৈলেন মিত্র- মরিয়ম বিবি। যেমন আসেনি মিজানুর রাহমান- আদিল হুসেন, যেমন আসেনি মাওলানার ছোট ছেলে ইয়াকুব আলী। শোনা যায় পুকুরের পানি হতে ইয়াকুবের মৃতদেহ উদ্ধারের পর হতে তার দাফন পর্যন্ত ইদ্রিস আলী শোকের কোন লক্ষণ প্রকাশ করেননি। বরং সন্ধ্যার একান্ত প্রতীক্ষায় থাকা মাওলানা সেদিন নামাযে বসে " মাবুদ, আজিয়ে যেন খোয়া ফড়ে..." বলে প্রার্থনা পর্যন্ত করেছিলেন। তবুও কুয়াশা আসেনি, ফেরত আসা হয়নি ইয়াকুব আলীরও। কাজেই মাওলানা ইদ্রিস আলীর অলৌকিক ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়। সকলের কাছে।


...এবং প্রমাণ হয়ে যায় মাওলানা ইদ্রিস আলী অসামান্য, অমরণশীল কেউ নন। কারণ কৃষ্ণপক্ষের এক গভীর রাতে বুকের বামপাশ চেপে ধরে আর্তনাদ করা ইদ্রিস আলীর সে আর্তনাদে ইমাম বাড়ি বিলীন হয় এক কর্তব্যবিমূঢ়তায়। ইদ্রিস আলী সেদিনও কলেমা পড়েন, তবে পরেরদিন ভোরে ফযরের নামায আদায় করা তাঁর হয় না। গঞ্জের মানুষের ঢল নামে। ঢল নামে ভীতি, কৌতুহল, ভালোবাসা, বিস্ময়ের। মাওলানা ইদ্রিস আলীর সাথে মৃত্যুর বৈঠক বসে আরেকবার, শেষবারের মতো। তারপর পাটীগণিতের নামতা গুণন। জমির মুন্সী- ইউসুফ আলী- মহিউদ্দীন- আজগর মৃধা। তারা দশ পা এগিয়ে স্থান পরিবর্তন করে। মাওলানা কবরে শায়িত হন।


গঞ্জের জীবনযাত্রা থেমে থাকে না। তারা নিজেরাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়, আলতাফ মৃধা- সারোয়ার মিঁয়া- শৈলেন মিত্র- মরিয়ম বিবিরা হেঁটে চলে বেড়ায়। এখন ইউসুফ আলী জামাতে নামায পড়ায়, মানুষকে কোরান শিক্ষা দেয়, সকলকে সৎপথে আসতে বলে। মাঝে মাঝে ইউসুফ আলীর স্মৃতিতে কুয়াশা আসে, সেইসব দিন আসে, সেই শবযাত্রা আসে। পিতার প্রশ্নবিদ্ধ অলৌকিকত্ব সত্ত্বেও সে অভিভূত হয়। সে বলে বেড়ায় যে তার পরলোকগত পিতা বড় ভালো মানুষ ছিলেন। সকলেই সে কথায় সাড়া দেয়। তবুও কুয়াশা নামে মাঝেমধ্যেই, যেমন নামতো ইদ্রিস আলীর ডাকে। গতরাতেও কুয়াশা নেমেছিলো। ভীতিপ্রদ সে কুয়াশায় ইমাম বাড়ি আবারো বিলীন হয় কর্তব্যবিমূঢ়তায়।


... তবুও ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর পর মাওলানা ইদ্রিস আলীর ফিরে আসা কেউ মেনে নিতে পারে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন