শনিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০১০

কুইজোম্যানিয়াকেরা...

একসময় 'কুইজমাস্টার' শব্দটা শুনলেই ভয় পেয়ে যেতাম। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে গম্ভীর চশমা চোখে ডায়রী দেখে দেখে উনি সমানে প্রশ্ন ছুঁড়বেন। প্রশ্ন তো না, ভীম-ভবানীর গদা একেকটা। 'টিপু সুলতানের শ্যালিকার নাম কি ?' , 'বারাক ওবামা গতকাল কার সাথে চা খেয়েছেন ?', ' গ্যাংটকে গন্ডগোল করবার সময় ফেলুদা কয়বার গুলি ছুঁড়েছিলেন ? '... অসহ্য, অসহ্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মনে মনে এই কুইজমাস্টার পিঠে কুঁজো ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দেখলাম একসময় আমাকেও কুইজমাস্টার হিসেবে নানা জায়গায় হাজিরা দিতে হচ্ছে। সেবারই প্রথম বুঝলাম যে কুইজমাস্টার হচ্ছেন বিয়েবাড়ির কাজীর মতো। উপস্থিত থাকলে তাকে ব্যাপক অগ্রাহ্য করা হয়- অনুপস্থিত থাকলে সাড়া পড়ে যায়। আসে নাই, আসে নাই।


... সিফাত মেয়েটাকে বড়ই ভালো ভাবতাম। সেটা দেখা গেলো ভীষণ কুচক্রী। খোমাখাতায় একদিন একটা গণমেসেজ।....

-"ভাইয়া এবং আপুরা, অনু ভাই দেশে এসেছেন। তিনি প্রাক্তন কুইজারদের নিয়ে একটা কুইজ করতে চান। প্লীজ আপনারা দলে দলে যোগদান করুন।" কী গেরো !! তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছি, এখন আবার কুইজ করতে যেতে হবে ?? ওহহো, কুইজ তো অনুভাই করাবেন... হুমম, ভীষণ লোভনীয় ঠেকে।


তবুও হয় না। হাতে অনেক কাজ। তারমাঝে খোমাখাতায় প্রচুর মেসেজ চালাচালি। কুচক্রী ছোটবোন সিফাতের ফোন। 'ভাইয়া আসেন, ভাইয়া আসেন'।আজব, পোলাপাইন অযথাই ত্যক্ত করে। ...যামু না কইলাম না ??


গতকাল, শুক্রবার, কুইজের দিন সকালে রুশাফি ভাইয়ের ফোন। 'আরে, চইল্যা আসো। কুইজ হবে। মজা হবে।' মাথায় বাঁই উঠলো। যামু না মানে, একশোবার যামু !! কুইজ করার সে ভয়ানক মজাদার অনুভূতি আরেকবার জানান দিলো মস্তিষ্ক। ফোন দিলাম আমার প্রাণের কুইজমেট রিফাতকে ওরফে কেষ্টাকে। 'কেষ্টারে, ক্লাস টেস্টের জন্যে অত পড়িসনি, টেঁশে যাবি ওরকম করলে। বরং আয়, গিয়ে আমরা দুই কালাতো ভাই কুইজ করি।' কেষ্টা প্রথমে গররাজি। পরে নিমরাজি। শেষে লুলরাজি। ...


ভিএনসি অডিটরিয়ামে ঢুকলাম দুপুর তিনটার দিকে। কে যেনো সদর দরজায় জিজ্ঞেস করলো, 'পার্টিসিপেন্ট ??' ... এক লহমায় ফিরে গেলাম চার বছর আগে। যখন নটরডেমের হয়ে কুইজ করতে ছুটে বেড়াতাম ঢাকা শহরের নানা কলেজে। আহ, আজকে আবার কুইজ করবো !!! অডিতে ঢুকেই পরিচিত বড়দারা। অপু ভাই, সেতু ভাই, অঙ্কন ভাই। অনেকগুলো মুখচেনা ছোটভাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। কুইজমাস্টার অনু ভাই আমাদের লজ্জা দিতে আমাদের আগে এসে পৌঁছেছেন। যাই হোক, কুইজ পূর্ব আলোচনায় প্রথমেই এলো সাম্প্রতিক বিশ্ব অথবা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি বিভাগ। অথবা বলা যায় একটা ছবি। ইয়ে, ছবির বিষয়বস্তু আসলে মোশফেকা-রাকা-সিফাত সাহিত্যে ছাপা হবার অনুপযোগী; তাই বিস্তারিত ক্লু দিলাম না। আগ্রহী কুইজাররা উত্তরটা নিশ্চয় জানেন !!! ... ছবি নিয়ে আলোচনা চলতে চলতেই এসে গেলেন রুশাফি ভাই। ওয়াহেদ। মিশুক। রাকা। আরো অনেক খুচরা পিচ্চিরা।


এবার টিম নির্বাচন। পুরা বিশ্বকাপ ড্র এর মত লটারী করে দেখা গেল টিম নির্বাচন করা হচ্ছে। ছয়ভাগে ভাগ হয়ে গেলো আঠারো জন কুইজার। রীতিমত যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে আমরা মঞ্চে উঠলুম। আফসুস, দীর্ঘদিন পর আমার কালতুতো ভাই কেষ্টাকে ছেড়ে কুইজাতে হলো গতকাল। আমার সাথে কুইজমেট হিসেবে অপু ভাই আর রাকা।

... শুরু হলো কুইজ। ভাবীকে সামনে রেখে 'নার্ভাস' অনু ভাই কুইজ শুরু করলেন। এবং আবারো পরবর্তী দুই ঘন্টা ভেসে গেলাম কুইজ সুধারসে আর তাঁর সাবলীল-ঈর্ষণীয় কুইজিংয়ে। ধন্যবাদ অনু ভাই, আরো একবার।


এই কুইজে কেউ জেতার জন্যে কুইজায় নাই। তবুও অতিদ্রুত 'সুপাত্র' বলে গণ্য হবার জন্যে অঙ্কন ভাই আর সেতু ভাই উঠে পড়ে লাগলেন। বাজে লোক এরা দুইজন- কুইজকে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়ার মতলব। অপু ভাইয়ের এখন আর এসব দুঃশ্চিন্তা নেই। তবুও, মাঝে মাঝে নিজের অভিজ্ঞতা জাহির করতেই ঝটপট দিয়ে যাচ্ছিলেন সঠিক উত্তর। মিশুক এবং মোশফেকার দল কেকের লোভ দেখিয়েও অনু ভাইয়ের কাছ থেকে সহজ প্রশ্ন আদায়ে সক্ষম হয়নি। রুশাফি ভাই, ঐশ্বী ভাই আর ওয়াহেদের দল নাকি কুইজের সময় ওয়াহেদের শ্বাসরুদ্ধকারী এক প্রণয়োপাখ্যান শুনতে ব্যস্ত ছিলো। আদিত্যকে সাথে নিয়ে কেষ্টা কী দেখছিলো তা আমি জানি, আপনাদের না জানলেও চলবে।

... শেষ পর্যন্ত যে সেতু ভাইরা জিতলেন, এর মূল কারণ সম্ভবতঃ তার দলের সদস্যদের গড় পুরুত্ব। এদের একজন ভুল উত্তর দিলেই অপরজন নিশ্চয় গাট্টা মারছিলো। অঙ্কন ভাইয়ের দলের ওরকম বপুওয়ালা কেউ ছিলো না বলেই তারা দ্বিতীয়। অপু ভাই এবং রাকাকে ধন্যবাদ তৃতীয় হবার জন্যে। প্রসঙ্গতঃ আমি আসলে দলীয় স্বার্থ বিবেচনা না করে কুইজটিকে আরো প্রতিযোগীতামূলক করে তুলবার জন্যেই লিপ্ত ছিলাম। যে কারণে রাকা এবং অপু ভাই চমৎকার সব উত্তর দেবার পরেও 'বাংলাদেশের রাজধানী কোথায় ?' -এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তরে আমি তাদের কানের কাছে 'নোয়াখালী' জাতীয় উত্তর দিয়ে তাদের মনের মাঝে প্রায়ই সংশয় বুননের চেষ্টা করেছি। বলাবাহুল্য, নিজ ভূমিকায় আমি সর্বাংশে সফল।


কুইজ শেষে কেক্কুক খাওয়া এবং ছবি তোলার পালা।রুশাফি ভাই ফিসিফিসিয়ে বলেন, 'বলসিলাম না, কুইজ হবে। মজা হবে।' মোশফেকা যথারীতি ক্লাবের হয়ে কৃচ্ছতা সাধন করেছে একটা ডিডিটি/এমোনিয়া ভরপুর কেক এনে। ... তদুপরি, পবিত্রকুরুশ স্কুল বা কলেজের কাউকে আমন্ত্রণ না জানানোর জন্যে তাকে তেব্র ধিক্কার।

সিফাতের দশটা যমজ বোন আছে- এটা আমি আগে জানতাম না। তাদের কেউ বাদকদলের পাশে, কেউ ড্র অনুষ্ঠানে, কেউ মাইক হাতে নিয়ে স্কোরারের পাশে শোভা পাচ্ছিলো। তাদের সবাইকেই ধন্যবাদ।

আকিফ এবং আরো এক আপু (নাম মনে নাই, আমি কারেন্ট এফেয়ার্সে কাঁচা)- তোমরা স্কোরিং করে কাল কুইজের আসল মজাটায় পানি ছিটিয়েছো। বাগে পেলে তোমাদের এরপর কঠিন প্রশ্ন করবো...।


এরপর আরেক প্রস্থ আড্ডা জমলো ভিএনসির বাইরে। অঙ্কন ভাই লুল ফেলার সুবিধার্থে কোটপেন্টুলুন পড়ে আসলেন। আমি, রিফাত, সেতু ভাই, রুশাফি ভাই, পেন্সিল বক্স আর কবুতর মিয়াও ছিলাম সেই লুল সফরে। সেইখানে জানা গেলো নানা রকমারী তথ্য। আসিফ ভাই এখন কী করেন, জ্যাক নিকলসন কত বড় মাল, খোমাখাতায় কে কি ছবি আপ্লোডায়... এইসব। একদিনের জন্যে যথেষ্ট লুল ফেলা হলে আমরা বিদায় নিলাম। রুশাফি ভাই বলেন ' বলসিলাম না, কুইজ হবে। মজা হবে।...'


আবার এক বছরের প্রতীক্ষায় আছি। দেখিস, একদিন আবার কুইজ করবো...

৭টি মন্তব্য:

  1. "পবিত্রকুরুশ স্কুল বা কলেজের কাউকে আমন্ত্রণ না জানানোর জন্যে তাকে তেব্র ধিক্কার।"

    আল্লা বাঁচাইসে।। আর কত??

    উত্তরমুছুন
  2. ডিস্লাইক,ঘেন্না আর যত বাজে বিশেষন আছে সব্‌, কইষ্যা মাইনাস,সব কুইজ -ফুইজ আমি আসার আগে শেষ হয়ে যাচ্ছে ঃ-(

    হাবিব

    উত্তরমুছুন
  3. ওয়াহেদ বলছে ,

    আমি ওয়াহিদ, মাগার আপনার লেখাই নিজের নাম আমি আরো ১০০০ বার ওয়াহেদ দেখলেও খুশি হবো :D

    উত্তরমুছুন
  4. সুহান, একদিন চল কোঞ্চিপার লুল্‌দের নিয়ে একটা প্রীতিম্যাচ খেলা যাক। এই বিষয়ে উৎসাহী লুলের সংখ্যা যথেষ্ঠ হবার কথা। তাদের উৎসাহ বাড়ানোর জন্য তুমি হায়ারড্‌ লোকজন আনতে পারো।

    ষষ্ঠ পাণ্ডব

    উত্তরমুছুন
  5. বেশি ভালো হইসে সুহান ভাই, বান্ধাই করে রাখা উচিত
    মোশফেকা

    উত্তরমুছুন