বুধবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১০

থ্রী ইডিয়েটস


০১

হিন্দী মুভি দেখা হয় কালে-ভদ্রে। সবার মুখে মুখে নাম ঘুরছে এমন বক্স অফিস কাঁপানো কোন মুভি অথবা সমালোচকেরা সিনে ম্যাগাজিন বা রিভিউতে কোন মুভির অকৃপণ প্রশংসা করছেন- এরকম ক্ষেত্রেই কেবল সেই বিশেষ হিন্দী মুভির প্রতি আকৃষ্ট হই। তবে বাছাই করে মুভি দেখার বয়স হতেই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি বছরে নিদেনপক্ষে যদি একটা হিন্দী মুভিও দেখি- সেটি হবে আমির খান অভিনীত মুভিটি। আমার পছন্দের সবচেয়ে প্রিয় পাঁচটি হিন্দী মুভির চারটিই এই খান সাহেবের। ধারাবাহিক ভাবে একটার পর একটা চমৎকার মুভিতে অভিনয় করে যাওয়ার পর আমির খান পুরো হতবাক করা হতাশ করে দিলেন "গজিনী" মুভিতে। যতই আকর্ষণীয় হেয়ার কাট কিংবা মারকাটারি বক্স অফিস সাফল্য থাক; এককথায় গজিনী ছবিতে আমির অন্যান্য সাধারণ হিন্দী নায়কদের মতোই বলে গণ্য হলেন আমার কাছে। কাজেই এরপরের ছবিগুলোতেও আমিরের আমিরী চাল বজায় থাকবে, না কী আমির এবার ভালো ছবির বদলে বক্স অফিস কাঁপানোতেই মনোযোগ দিলেন সেটা জানার জন্যে মনেপ্রাণে অপেক্ষায় ছিলাম তাঁর পরের ছবিটির জন্যে।

অপরদিকে, পছন্দের সবচেয়ে প্রিয় পাঁচটি হিন্দী ছবির পঞ্চমটির [লাগে রাহো মুন্নাভাই] পরিচালক হচ্ছেন রাজকুমার হিরাণী। অসাধারণ সূক্ষ্ণ রসবোধের পরিচয় পেয়েছি তার "মুন্নাভাই এমবিবিএস" ছবিতেও। কাজেই এই রাজকুমার হিরানী যখন জুটি বাঁধবেন খুঁতখুঁতে আমির খানের সাথে, সেটার ফলাফল কী দাঁড়াবে ??

ফলাফল দাঁড়িয়েছে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ব্লকবাস্টার হিট " থ্রী ইডিয়টস"।...

মুক্তির একহপ্তার মাথায় দর্শক জরিপে ২০০৯ সালের সেরা ছবি নির্বাচিত হওয়া এই ছবির মাঝে কী আছে ??... দেখতে বসলাম আজ দুপুরে।

০২


দেশসেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ইম্পেরিয়াল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রাক্তন দুই ছাত্র, ফারহান কুরেশী এবং রাজু রুস্তোগী দশ বছর পর এক ফোনকল পেয়ে উড়ে আসে তাদের ক্যাম্পাসে। পুরোনো সহপাঠী এবং প্রাণের শত্রু চতুর রামালিঙ্গন তাদের স্মরণ করিয়ে দেয় দশ বছরের পুরোনো এক বাজির কথা। জীবনের যুদ্ধে অগাধবিত্তের মালিক চতুর ওরফে সাইলেন্সার জানতে চায়, কেমন আছে থ্রী ইডিয়টস ?

ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় ভার্সিটির ডিন ডঃ ভিরু সুহাস ওরফে ভাইরাসকে। নিয়মের কঠোর বেড়াজালে আর প্রতিনিয়ত পুঁথিগত পড়াশোনার কবলে যিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাত্রদের জন্যে করে রেখেছেন নিরানন্দ এক জায়গা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনেই তিন রুমমেট রাজু, চতুর এবং রাঞ্চোদাশ চাঁন ওরফে থ্রী ইডিয়টসের পরিচয় ঘটে পরষ্পরের সাথে। যথাক্রমে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন বহন করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আসা ফারহান এবং রাজু অচিরেই আবিষ্কার করে তাদের তৃতীয় রুমমেট রাঞ্চো চিন্তা আর কাজে বাদবাকি সকলের চেয়ে আলাদা। ভাইরাসের কর্মপদ্ধতির বিরোধিতা করে চলে রাঞ্চো আর ভাইরাসের হয়ে পদেপদে বাঁধার সৃষ্টি করে চতুর। কাহিনীতে আসে ভাইরাসের ডাক্তারী পড়ুয়া কন্যা প্রিয়া...

দশবছর পর, আজ থ্রী ইডিয়টসেরা কে কোথায় আছে ?? তৃতীয় ইডিয়টকে খোঁজার অভিযানে বেরোয় রাজু, ফারহান এবং চতুর...


০৩


ছবির দৈর্ঘ্য ১৬৩ মিনিট এবং বলা যায়, মুহুর্তের জন্যেও পর্দা থেকে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না। রাঞ্চো চরিত্রে আমির খানের অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নেই, ৪৪ বছর বয়েসেও তাকে ২০ বছর বয়েসী ভার্সিটি পড়ুয়ার চরিত্রে বেমানান লাগেনি। তবে ফারহান চরিত্রের মাধবনের চাইতে রাজু চরিত্রের শারমান যোশীর অভিনয় একটু বেশি পোক্ত ছিলো। ভাইরাস চরিত্রে বোমান ইরানী ছিলেন দুর্দান্ত, আর প্রিয়া চরিত্রে কারিনা কাপুরের তেমন কিছু করবার ছিলো না। তবে চতুর চরিত্র রুপদানকারী ওম স্রেফ ফাটিয়ে দিয়েছেন। রীতিমত ঈর্ষনীয় অভিনয় ছিলো তার।

অভিনয় বাদে ছবির প্রশংসনীয় দিক হলো এর সংলাপ। নানারকম উভয়ার্থক, বাস্তব এবং ছাত্রসুলভ সংলাপ ছবির বিনোদনের একটা বড় অংশ যুগিয়েছে। দুটো বাণিজ্যিক গান বাদ দিলে সানন্দ এবং শান্তনুর বাকি তিনটে গান খুবই চমৎকার। ইন্সপায়ারিং। Give me some sunshine, give me some rain, give me another chance- i wanna grow up once again... গানটাতো আজ কয়েকদিন ধরেই খোমাখাতায় পরিচিত লোকেদের স্ট্যাটাসে ঘুরছে।


০৪

তারমানে কী ?? "থ্রী ইডিয়টস" একটা মাস্টারপিস??... দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, প্রিয় ছবির তালিকাতে কোন নড়নচড়ণ হলো না। দারুণ সম্ভাবনা থাকার পরেও শেষ পর্যন্ত এটা রাজকুমার হিরানীর "লাগে রাহো মুন্নাভাই" এর চেয়ে পিছিয়েই থাকলো।

ছবির একটা বেশ স্থূল হাসির দৃশ্য আছে, বাকি ছবির সাথে সেটা মানানসই নয়। কারিনার বৃষ্টিভেজা নাচ অপ্রয়োজনীয় ছিলো। ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার প্রমাণ রাখতে রাঞ্চোর ম্যাকগাইভারগিরি একটু অতি নাটকীয়। 'আল ইজ ওয়েল' - এই ইন্সপায়ারিং সংলাপের কিছু উদ্ভট প্রয়োগ আছে।...
বলতে পারেন, ওসব তো এক-আধটু থাকবেই; নাহলে ছবি হয় নাকি। কোন ছবি যখন অনন্যসাধারণ কিছুর আশা জাগিয়ে শেষ পর্যন্ত তা হয় না- তখন মনে মনে আমি কিন্তু ঐ একআধটুকেই বড় করে দেখি। তবে এটা একান্ত ব্যক্তিগত মত। 'হোম এলোন' আমার কাছে 'আমেরিকান পাই'এর চাইতে প্রিয়; কারো কারো নিশ্চয় 'আমেরিকান পাই' য়ের স্বাদই বেশি প্রিয়।


০৫

আঁতলামি বাদ দেই এবার। ছবিটা বেশ আকর্ষক, মজার, ইন্সপায়ারিং, মেসেজটাও ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। টিপিকাল একটা টিনেজ কমেডি। ভার্সিটি লাইফ মিসকরুয়ার দল দেখলে তাদের ভালোই লাগবে আশা করি।

...তবে দেখে ফেলুন "থ্রী ইডিয়টস"। কী বলছেন, প্রচুর কাজের চাপ ?? একটু জোরে জোরে আওড়ান- ALL IS WELL...

ব্যাস, এবার দেখতে বসে যান !!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন