শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০০৯

রবার্ট ল্যাংডনের তৃতীয় অভিযানঃ দ্যা লস্ট সিম্বল


হাতিরপুল কাঁচাবাজার সংলগ্ন সর্মা-ভবনের উপরের ঘরটার বামকোণার টেবিলে বসে সর্মায় প্রথম কামড় দিয়ে আমি বললাম, " ছিলো রুমাল, হয়ে গেলো একটা বেড়াল..."

এনকিদু ভাই মাথা দুলিয়ে বললেন, "হুম, ধুমসে সুকুমার পড়া হলো বুঝি ??"

বললাম, "না, সুকুমার নয়- ড্যান ব্রাউন।"

শাহেনশাহ সিমন মুখভর্তি সর্মা নিয়ে কথা বলতে পারছিলেন না। তারই মাঝে কোঁকালেন- "কিছুই বুজতে পাল...য়াম না। ..."

এনকিদু ভাই আবারো বললেন," এখানে ড্যান ব্রাউন কোথা হতে আসলো সুহান ? তার তো শুনলাম রিসেন্ট বইটার নাম The Lost Symbol"

বললাম, "লস্ট সিম্বলের কথাই তো বলতে চাচ্ছিলাম। যেটা এখন হয়েছে লস্ট সিম্বল- সেটাই হবার কথা ছিলো The Solomon's Key."

সবজান্তা ভাই এবার মুখ খুললেন- "আরে তাইতো !! আমিও তো এই কথাটা শুনসিলাম...
। লস্ট সিম্বল অবশ্য আমার এখনো পড়া হয় নাই। কে কে পড়সো বইটা ? "

দেখা গেলো, কটূভাষী আমি- স্বল্পভাষী নিবিড় ভাই এবং নম্রভাষী মেহদী ভাই ছাড়া বাকি চারজনের এই বইটা অপঠিত রয়ে গেছে। চতুর্থ জন, অর্থাৎ তারেক ভাই জানালেন যে কবিতা ছাড়া তার আর অন্য কোন বিষয়ে আগ্রহ নাই। এবং এই কথাটা বলার পরক্ষণেই এনকিদু ভাইয়ের গ্লাস থেকে সিমন ভাইয়ের নিজের গ্লাসে কোক স্থানান্তরের নির্লজ্জ প্রয়াস দেখে তারেক ভাই আজকে দ্বিতীয়বারের মতো বললেন- "ছিহ ! ছিমন ভাই, আপনে একটা ছিক !!"

সিমন ভাই অক্লেশে কথাটা সহ্য করে এবার মূল আলোচনায় অংশ নিলেন। " হে হে... এবার আড্ডায় একটু মন দিই। কী নিয়ে যেনো কথা হচ্ছিলো ?? ও- লস্ট সিম্বল। কি আছে এই বইতে? মূল চরিত্রগুলা কে কে ?? দাঁড়া, দাঁড়া- সুহান তুই না। তুই বেশি কথা বলিস। মেহদী- তুমিই কও..."

মেহদী ভাই কোকের গ্লাসে একটা চুমুক মেরে শুরু করলেন। "চরিত্র নিয়ে তো বেশি কিছু বলবার নাই। The 'Da Vinci' Code আর Angels & Demons এর সেই যে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিম্বোলজির প্রফেসর, রবার্ট ল্যাংডন- এইটাতেও মূখ্য চরিত্র সে। আর লস্ট সিম্বলের পূর্বনাম সলোমন'স কী রাখার কারণ ছিলো মনে হয় এই বইয়ের অন্যতম শীর্ষ চরিত্র পিটার সলোমনের নামে। পিটার আর তার বোন ক্যাথরিন সলোমন এই বইতে আগাগোড়া রবার্ট ল্যাংডনের সাথেই সমান গুরুত্ব নিয়ে ছিলো। এরপরে কাহিনীর প্রয়োজনে আরো কিছু চরিত্র স্বাভাবিক ভাবেই আসে।"

-"এইটা তো মেহদী তুমি বেশি সিম্পল কইরে বললা, একটু ডিটেইলসে ক ব্যাটা।" এনকিদু ভাই নাক গলান।

-"আচ্ছা- এইবার আমি বলি।" মেহদী ভাইকে রক্ষা করতে সর্মার শেষ টুকরো দ্রুত চিবিয়ে নিয়ে নিবিড় ভাই বলে ওঠেন এবং তারদিকে একটা কৃতজ্ঞ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেহদী ভাই নিজের সর্মাতে আবার মনোযোগ দেন। "কাহিনীর শুরু হয় হার্ভার্ডের পুলে সাঁতার কাটতে থাকা প্রফেসর ল্যাংডনকে নিয়ে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে তিনি বিশেষ একটা বক্তৃতার আমন্ত্রণ পান আমেরিকার ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী গুপ্ত সংঘ ফ্রী-ম্যাসনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং তার পারিবারিক বন্ধু- মিলিওনিয়ার পিটার সলোমনের কাছ থেকে। সকালে ফোন পেয়ে সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন ডিসিতে এসে উপস্থিত হয় ল্যাংডন। ইউএস ক্যাপিটাল বিল্ডিং- যেটা আমেরিকার নিজস্ব ইতিহাসের ঐতিহ্যবাহী এক বিশাল দালান- সেখানে বক্তৃতা প্রদানের জন্যে প্রবেশ করে ল্যাংডন এবং ঘটনা মোড় নিতে শুরু করে। ল্যাংডন বুঝতে পারে বন্ধু পিটার সলোমনকে আবার জীবন্ত দেখতে চাইলে তাকে অদ্ভূত এক লোকের নির্দেশ পালন করে যেতে হবে নির্দ্বিধায়। খুঁজে বের করতে হবে একটা প্রাচীন দরজা- যেটা লুকিয়ে আছে এই বিশাল ওয়াশিংটন শহরের কোথাও- ভেদ করতে হবে শতাব্দী প্রাচীন ফ্রীম্যাসনদের ম্যাসনিক পিরামিডের রহস্য।"

-"কিন্তু এই রহস্যের মধ্যে ক্যাথরিন সলোমন আসলো কোথা থিকে ??" সিমন ভাইয়ের মুখের ভিতর অদৃশ্য হতে থাকা একের পর এক সর্মার দিকে বিরসবদনে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন সবজান্তা ভাই- চাকরীর প্রথম মাসের বেতনপ্রাপ্তি উপলক্ষে আজকের বিলটা তিনিই দিচ্ছেন কী না।

-"ইয়ে, ক্যাথরিন হইলো একজন নিওটিক সায়েন্টিস্ট।" সুন্দরী নারীর বিষয় আসতেই মাথা না গলিয়ে থাকতে পারিনা আমি। এ আমার স্বভাব, একে অনেকটা সহজাত প্রবৃত্তি বলতে পারেন।

-"কী বললা ? নিওটিক সায়েন্টিস্ট ?? এই নিওটিক সাইন্স আবার কী বস্তু ??" এনকিদু ভাইয়ের এসব দিকে প্রবল আগ্রহ- নারী তো বটেই, তায় আবার বিজ্ঞানী।

-"নিওটিক সাইন্স হইলো, সোজা বাংলায় বলতে গেলে 'যন্ত্রে নয়, মন্ত্রেই সিদ্ধি' বাক্যে বিশ্বাসী বিজ্ঞান। যতই দিন যাচ্ছে মানুষ মনের উপর নিজের শক্তিটা হারিয়ে ফেলছে। প্রাচীন পুরাণে মুনিরা দেখতেন না, ক্যামন সব অবিশ্বাস্য কান্ড করতো কেবল মনের জোরে ?? ক্যাথরিনের গবেষণাটা ঠিক সেই ধরণের। যাতে করে মানুষের মনের শক্তিতে মানুষ নিজেই আস্থা অর্জন করে নানা অসাধ্য সাধন করতে পারে। কিন্তু অজ্ঞাত যে প্রতিপক্ষ পিটার সলোমনের জীবনের উপর আঘাত হানে- সেই একই প্রতিপক্ষ বিশেষ কারণে পছন্দ করে না ক্যাথরিনের এই গবেষণা। অতএব আসে দ্বি-মুখী আঘাত। আক্রান্ত হয় ক্যাথরিনও।"

-"ক্যাথরিনকে আমি ভালু পাই !!" - সামনের টেবিলের মাংসল ভাবীটির দিকে তাকিয়ে শেষ হয়ে আসা কোকের গ্লাসে স্ট্র দিয়ে উদ্দেশ্যমূলক 'ছিক' 'ছিক' শব্দ করার ফাঁকে বললেন সিমন ভাই।

তারেক ভাই আবারো বললেন- "ছিহ ! ছিমন ভাই, আপনে একটা ছিক !!"

-"তোমরা বইটা নিয়া এতো ভালো ভালো কথা বললা, কিন্তু পরিচিত অনেকে যে বললো, এই বইটা ভালো হয় নাই ? বোরিং লাগসে ??" এনকিদু ভাই প্রশ্ন ছোঁড়েন।

জবাব দেন নিবিড় ভাই। "এইটার একটা মাত্র কারণ হইতে পারে। সেটা হলো ড্যান ব্রাউনের নিজের তৈরী ফর্মূলায় নিজেরই আটকা পড়া। খেয়াল করে দেখলাম, ল্যাংডনের তিনটা উপন্যাসের প্রতিটাই একই ছকে বাঁধা। শুরু থেকেই একাধিক পথে জাল ছড়িয়ে সেটা কেন্দ্রের দিকে টেনে আনা। একটা গুপ্ত সঙ্ঘ, একটা আততায়ী, টুইডের সুট পরা আধুনিক ইন্ডিয়ানা জোন্স রবার্ট ল্যাংডনের সাথে এক সুন্দরী রমণী, প্রাচীন কোন ধাঁধার সমাধান করতে গিয়ে চমৎকার সব কোড ব্রেকিং, বারো থেকে চব্বিশ ঘন্টার কাহিনী, একরাতেই পুরো পৃথিবী উলোট-পালট করে দেয়া ইঁদুরবেড়াল দৌড়।"

-"এই কাহিনীও কি একদিনের নাকী মিয়া ?" সবজান্তা ভাই এবিষয়ে কিছুই জানেন না, বোঝা যায়।

-"হ, একরাতের।" মেহদী ভাই সর্মাটা শেষ করে নিশ্চিন্ত গলায় বলেন। "ঠিক করে বলতে গেলে, দশ ঘন্টার। ল্যাংডনরে জটিল লাগে আমার। গতবার ইন্টারপোল- আর এইবার সিআইএ সিকিউরিটি চীফ স্বয়ং তার পেছনে লাগে তারে ধরবার জন্যে। মজার দৌড়। "

-"হুম, তা হইলে বিষয়টা কী দাঁড়াইলো ? পড়া উচিৎ বইটা ?" এনকিদু ভাই প্রশ্ন ছোঁড়েন।

-"আমার মতে," আমি বললাম, "পড়লে মজা পাবেন। বিশেষ করে যারা থ্রিলার, এডভেঞ্চার, গুপ্তধন উদ্ধারের টানটান উত্তেজনায় ঠাসা গল্প পড়তে ভালোভাসেন- তাদের তো এইটা অবশ্যই পড়া উচিৎ। বোনাস হিসেবে ব্রাউনের নিজস্ব টিপিকাল কোডব্রেকিং এর স্বাদতো পাওয়া যাবেই। উম্ম... যেমন ধরেন একটা বলি। jeova sanctus unus- প্রাচীন এই হিব্রুলিপির অর্থ জানেন ?? আচ্ছা, আমিই বলে দিই। এই প্রবাদের অর্থ হলো একমাত্র প্রকৃত ঈশ্বর। মজার বিষয় হচ্ছে, বিখ্যাত এক বিজ্ঞানী সর্বদা নিজের নাম সাক্ষর করবার সময় এই লিপিটাই ব্যবহার করতেন। কারণ, হিব্রু থেকে এই লিপি ল্যাটিনে অনুবাদ করার পর উলোটপালট করে সাজালে পাওয়া যেতো ঐ বিজ্ঞানীর নামটাই- issac newton !!! "

মেহদী ভাই আরো যোগ করেন- " এই নিউটন সাহেব কিন্তু তাপমাত্রার একটা নিউটনীয় স্কেল নির্ধারণ করসিলেন। সেই স্কেলে ফুটন্ত পানির তাপমাত্রা নির্ধারণ করা হইসিলো ৩৩ ডিগ্রী। মজাটা অন্য জায়গায়। কারণ নিউটন নিজে ছিলেন ফ্রী-ম্যাসন সঙ্ঘের একজন সদস্য এবং ম্যাসনদের কাছে এই ৩৩ সংখ্যার মাহাত্ব্যই আলাদা। "

- "ক্যান ? ৩৩ দিয়া কী হয় আবার ??" বিলের অংকের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা গলায় বলেন সবজান্তা ভাই।

-"কারণ, " জবাব আসে নিবিড় ভাইয়ের কাছ থেকে, " ৩৩ ছড়ায়া আছে সব ধর্মগ্রন্থে। বেহেশতে সকল পুরুষের বয়স হবে ৩৩, জেসাসকে ক্রুশে চড়ানো হইসিলো ৩৩ বছর বয়সে, এমনকী- মানুষের মেরুদন্ডে আছে ৩৩টা কশেরুকা !!! এই রকম আরো কত মজার ফ্যাক্ট যে আছে বইটায় !!"

এনকিদু ভাই প্রায় লাফ দিয়ে ওঠেন। "ওহ নিবিড় ! আর বইলো না, আর বইলো না। আমার তো এক্ষনি পইড়া ফেলাইতে ইচ্ছা করতেসে। দাম কত নিসে বইটার ?? "

-"ইংরেজী আর বাংলা- দুইভাবেই বইটা এখন পাওয়া যাইতেসে।" আমি বলি। "আমি ইংরেজীটা এক বন্ধুর কাছ থেইক্যা বাগাইসি আর বাংলা কিনলাম একটা। দুইটাই নীলক্ষেত এডিশন- কাজেই দাম মূলত নির্ভর করবে মুলামুলির উপর। তবে ইংরেজী ৯০ থেকে ১০০ টাকা আর বাংলা যেহেতু একাধিক প্রকাশনীর অনুবাদ বের হইসে- মোটামুটি ১৮০ থেকে ২০০ এর মাঝেই পাওয়া যাবে।"

-"তো বইটার মোদ্দা কথা কী ? বল দেখি কেউ। শুনে ধন্য হই।" শাহেনশাহ সিমনের গলায় দুটো সর্মা, একটা আস্ত পিজা এবং দু'গ্লাস কোক সাঁটানোর পরের অবধারিত পরিতৃপ্তির আভাস।

-"মোদ্দা কথা হচ্ছে," নিবিড় ভাই বলেন। "মানুষের অগাধ মানসিক শক্তিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা উচিৎ। কবির ভাষায় বললে 'মানুষের মাঝেই স্বর্গ নরক' আর হলি বাইবেল থেকে বললে 'তোমরাই ঈশ্বর'। "।

-" হুঁহ," বললেন সিমন ভাই, "এইসব ছাইঁপাশ পড়বার জন্যে আমি ঐ মাথার বই পড়ুম ??"

- "ছিহ ! ছিমন ভাই, আপনে একটা ছিক !!" তারেক ভাই আবার বললেন। এবংএইবার ক্যান বললেন- এটা এখনো বুঝতে পারি নাই...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন