সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০০৯

ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা- ফুটবলের ইতিহাসের পাতা ঘুরে

পাক-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ,অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড এশেজ অথবা আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল ম্যাচের মত যুদ্ধ যুদ্ধ আবহ এই ম্যাচে অনুপস্থিত। কিন্তু আবেগ, সুন্দর ফুটবলের পূজারীদের আকাশছোঁয়া চাহিদা আর লাতিন ফুটবলের চিরন্তন সৃষ্টিশীলতা এই ম্যাচকে ঘিরে একটা অন্যরকম কিছুর ইঙ্গিত দেয় সবসময়। আর তাই আগামীকাল বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে সাতটায় আর্জেন্টিনার রোজারিও স্টেডিয়ামে হতে যাওয়া ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের সময় পুরো ফুটবল বিশ্ব যথারীতি ভাগ হয়ে যাচ্ছে দুইভাগে।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের সময় পাড়ার গলিতে বুইড়া বুইড়া আঙ্কেলেরাও হলুদ আর আকাশি নীলের জার্সি পরে দুইভাগ হয়ে খেলা শুরু করেন, বাংলাদেশ দলের কোচ আর সহকারী কোচ আলাদা হয়ে যান, বুয়েট হলে প্রাণপ্রিয় বন্ধুরা যোগ দেয় শত্রুশিবিরে, এমনকী টেলিভিশনে 'ফাউল' নামের নাটক পর্যন্ত বানানো হয়। কী আছে এই দুদলের লড়াইয়ে ??

চেষ্টা করলাম এই দুই দলের মাঝের সব বিখ্যাত ম্যাচকে একত্র করবার। দেখা যাচ্ছে,এদের ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। একবার চোখ বুলিয়ে নিন।

১৯৩৭ সাল

দঃআমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে [যেটা এখন 'কোপা আমেরিকা' নামে পরিচিত] বুয়েন আয়ার্সে মুখোমুখি হলো দুই দল। স্বাগতিক আর্জেন্টাইন দর্শকেরা পুরোটা ম্যাচ জুড়েই ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বানরের ভাষায় চ্যাঁচিয়ে গেলো। ৯০ মিনিটের খেলায় গোলশুণ্য ড্র এর পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে আর্জেন্টিনা করলো দুই গোল।
দ্বিতীয় গোলটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং স্বাগতিক দর্শকদের আচরণের প্রতিবাদে খেলা শেষের আগেই মাঠ ত্যাগ করলো ব্রাজিল।
ব্রাজিলিয়ান মিডিয়া এই ম্যাচকে অভিহিত করে 'লজ্জার ম্যাচ' নামে!!

১৯৩৯ সাল

রোকা কাপের এক ম্যাচে রিও ডি জেনিরোতে দুই দলের লড়াইয়ে এক সময় ২-২ গোলে সমতা। ঠিক এই সময় রেফারি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এক সন্দেহজনক পেনাল্টির রায় দিলে লোপেজ নামের এক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় আক্রমণ করে রেফারিকে- যাকে থামাতে মাঠে পুলিশ ঢুকতে হয়। রেফারির সিদ্ধান্ত আর পুলিশি আচরণের প্রতিবাদে এবার আর্জেন্টিনা মাঠ ত্যাগ করে। ফাঁকা মাঠে পেনাল্টি নেয় ব্রাজিল এবং ৩-২ গোলে বিজয়ী হয় সে ম্যাচে।

১৯৪৬ সাল

দঃআমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক জোসে সলোমানকে ফাউল করে তাঁর টিবিয়া ফিবুলা ভেঙ্গে দেন ব্রাজিলের জোয়াররিজো পিন্টো। মাঠে খেলোয়াড়দের মারামারি শুরু হবার পর দর্শকেরাও মাঠে নেমে আসলে খেলা বন্ধ হয়।
পুনরায় খেলা শুরু হলে আর্জেন্টিনা জেতে ২-০ গোলে। উল্লেখ্য, আর কখনো প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে খেলতে পারেননি জোসে সলোমান।

১৯৭৮ সাল

বিশ্বকাপের ইতিহাসে 'রোজারিওর যুদ্ধ' বলে পরিচিত ম্যাচে গোলশুণ্য ড্র করে দুই দল। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। গ্রুপ পদ্ধতিতে ফাইনালিস্ট নির্ধারিত হবে বলে ব্রাজিল পোল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানোয় আর্জেন্টিনার পেরুর বিপক্ষে প্রয়োজন ছিলো ৪-০ গোলে জয়। আর্জেন্টিনা সে ম্যাচ আশ্চর্যজনক ভাবে জেতে ৬-০ গোলে, ব্রাজিলিয়ানেরা দাবি করে এ ফলাফলে পেরুর গোলকিপারের ভূমিকা আছে- যিনি জাতিতে আর্জেন্টাইন ছিলেন।

১৯৮২ সাল

বিশ্বকাপের 'গ্রুপ অফ ডেথ'এ একত্রে ছিলো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-ইতালি। ইতালির সাথে হেরে যাওয়ায় ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় অনিবার্য হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার। কিন্তু উলটো ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবলের কাছে মার খেয়ে ১-৩ গোলে হেরে বসে আর্জেন্টিনা।
ম্যারাডোনা স্বয়ং মেজাজ হারিয়ে লাথি মেরে বসেন ব্রাজিলের বাতিস্তাকে।

১৯৯০ সাল

পুরো ম্যাচ দেয়ালে পিঠ ঠেকে থাকার পরেও আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনার জাদুকরী পাস থেকে শেষ মুহুর্তে ক্যানিজিয়ার করা গোলে ১-০ তে ম্যাচ জেতে। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ম্যারাডোনা বলেছিলেন-' ব্রাজিল খেলেছে ৮৯ মিনিট, আমরা ১ মিনিট। ওদের হারাতে এটাই যথেষ্ট।'
ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ব্রাঙ্কো এক বিচিত্র অভিযোগ তোলেন। তার দাবি ছিলো, ম্যাচের মাঝে এক আর্জেন্টাইন কোচিং স্টাফ তাকে যে পানির বোতল দিয়েছিলেন, তাতে ঘুমের ঔষধ মেশানো ছিলো- মাঠের মাঝেই তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন। বিতর্ক উসকে দেন ম্যারাডোনা, দাবি করেন এই অভিযোগ সত্য। আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্মকর্তারা পরে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
'হোলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল' বা 'পবিত্র পানি রহস্য' নামে এই ঘটনা পরিচিত।

১৯৯৫ সাল

কোপা আমেরিকা কাপের ম্যাচে ব্রাজিলের টুলিও কস্টা ম্যাচের শেষ মুহুর্তে হাত দিয়ে বল থামিয়ে গোল করে ২-২ গোলে ম্যাচ বাঁচান। রেফারি দাবি করেন তিনি হ্যান্ডবলটি দেখতে পাননি।
আর্জেন্টিনার মিডিয়া এই ঘটনাকে নাম দেয় 'শয়তানের হাত' বলে ।

দেখলেন তো ?? দুইদলের লড়াইতে বহুবার অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটেছে। কালকেও যে হবে না, সেটা কে বলতে পারে ?? প্রিয় দলকে দেখতে বসে যান আগামীকাল টিভির সামনে।
ওহ! যাবার আগে একটা অবধারিত প্রশ্ন। ব্রাজিল ?? না আর্জেন্টিনা ??

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন