রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০০৯

আমরা যারা রাইফেলস পাবলিকে স্কুলে পড়তাম...

আমরা যারা রাইফেলস পাবলিকে স্কুলে পড়তাম- তারা কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে ক্লাস করতাম। একদলে থাকতো নিপাট ভালো ছাত্ররা (যাদের চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, যারা নিয়মিত বাড়ির কাজ বাসা থেকেই করে আনে, যারা কিশোর অপরাধ নিরসনকল্পে সমাজ বিজ্ঞানী গলাবাজস্কি বালছালভ কি বলেছেন- সেটা হুবহু মুখস্থ বলতে পারে।), একদলে থাকতো কর্পোরেট ছাত্রদল (এদের কাজ ছিলো সবকিছু আয়োজন করা। ক্রিকেট ম্যাচ হবে, ডাকো কর্পোরেটদের। ক্লাস্পার্টি করবা - চাঁদা তুলবো কর্পোরেটরা। অমুক সুন্দরী মেয়ের মুখে ব্রন হইসে- কর্পোরেটরা ব্যবস্থা করবে হাসপাতালে ক্যাম্নে যাইতে হবে।), একদলে ছিলো ফিচলা ছেলের দল (মেয়েদের দিকে তাকায়ে নীচুস্বরে ফুসুরফুসুর করে কথা বলে শয়তানী হাসি হাসা ছিলো এদের একমাত্র কাজ।), আরেকদলে ছিলো মাঝারী পোলাপান (যারা সবকিছুতেই মাঝামাঝি। এরা ক্লাস্টেস্টে ১২-১৩ পাইতো, ধুমায়া পচানি খাইতো, স্মার্ট মেয়েদের দেখলে দূরে সরে যাইতো।)। মেয়েদের শ্রেণীবিভাগ করাটা আমার কাছে খুবই কঠিন মনে হওয়ায় আমি সকল মেয়েদের দুই ভাগে ভাগ করতাম। একভাগে ছিলো যাদের আমি ভালো পাই - তারা, অন্যভাগে বাকি সবাই।......




আমরা যারা রাইফেলস পাবলিকে স্কুলে পড়তাম- তারা স্যার ম্যাডামদের পিতৃপ্রদত্ত নামের পরিবর্তে অন্য কোন নামে ডাকতাম। আমরা মোয়াজ্জেম হোসেনকে মজু বলতাম, কুন্ডু স্যারকে বস বলতাম, মুকুল স্যারকে বলতাম টাইগার (প্রি-টেস্টের পরে স্কুলে আসা নূপুর ম্যাডামকে কী বলতাম সেটা অবশ্য বলা যাবে না...)।


আমরা যারা রাইফেলস পাবলিকে স্কুলে পড়তাম- তারা যথেষ্ট সুখী ছিলাম। আমরা প্রায়ই মোস্তফা কামাল স্যার কিংবা এনবিএ ম্যাডামের ৫০টা অবজেক্টিভ তৈরী করে নিয়ে যেতে ভুলে যেতাম, আমরা সাইদুন নাহার ম্যাডামের 'জিকু, স্ট্যান্ড আপ- কিপ স্ট্যান্ডিং...' জাতীয় সংলাপ হুবহু মুখস্থ আওড়াতে পারতাম, আমরা পিছনের দেয়ালের সাহায্যে মাঝেমাঝেই পিলখানার বিশাল বাউণ্ডারীতে ঘুরে বেড়াতে পারতাম।


আমরা যারা রাইফেলস পাবলিকে স্কুলে পড়তাম- তাদের মাঝে নানা পেশার লোক সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রেখে একত্রে বসবাস করতো। সুমন ভাইদের মত পড়ালেখা পিপাসু একটা শ্রেণী ছিলো, ইকবালদের মত চমৎকার কয়েকটা আয়োজক দল ছিলো, দামড়ার মত সর্বজনগ্রাহ্য প্রেমিক পুরুষ ছিলো কয়েকটা, আবার জাহিদের মত রক্তপিপাসু মস্তিষ্ক-বিকৃত কয়েকটা পাষণ্ডও ছিলো। তবে এদের সবাইকে নিয়েই আমরা খুশি ছিলাম; হারুণ স্যার-মোখলেস স্যার- নুরুল ইসলাম স্যারের বাড়াবাড়িও আমাদের পৃথক করতে পারে নাই।


আমরা যারা রাইফেলস পাবলিকে স্কুলে পড়তাম- তারা কেবল পড়াশুনাই করতাম না। কয়েকজন "প্রেমের কারণে পরিবার দিয়া বলি" বাড়ী থেকে পর্যন্ত পালিয়ে যেতো; কয়েকটা ছিলো অকারণেই পুরা নিউমার্কেট আর রাইফেলস স্কোয়ার দৌড়ে বেড়াতো; কয়েকজন খেলাধুলায় ভীষণ ভালো ছিলো; কয়েকজন করতো ভালো বিতর্ক। নিখুঁত ছবি আঁকতো আর নিদারুণ গান গাইয়েও ছিলো কিছু।


... ধানমন্ডি লেক দিয়ে কত জল বয়ে গেলো, আমরাও বড় হলাম। নাইন-টেনের কয়েকটা অসামান্য স্মৃতি আমার আছে। কাউকে দেখে নিজেকে প্রথম 'বড় হয়ে গেছি' বলে ভাবতে শিখেছিলাম, মুন্সি আবদুর রউফ আর নূর মোহাম্মদ হাউসের মাঝের একটা অসাধারণ ক্রিকেট ফাইনাল দেখতে পেরেছিলাম, পেয়েছিলাম সত্যিকারের ভালো কয়েকটা বন্ধু।


দুই বছর কেটে গিয়ে প্রি-টেস্ট এলো, এলো টেস্ট, এসএসসি পরীক্ষা। জিপিএ পাঁচের ছড়াছড়ির দিনে স্কুলে রেসাল্ট আনতে যাওয়া- এরপর কলেজ ভর্তির দৌড়। ভাঙ্গন ধরলো। কেউ গেলো নটরডেমে, কেউ ঢাকা কলেজ, কেউ সিটি কলেজ, কেউ রাজউক। একটা অংশ রয়ে গেলো বিডিআর চার নম্বর গেটের ভেতরের টানে - কিন্তু মাত্র দুই বছরের জন্যে ছিলো সেই এক্সটেনশন...।


এরপরে ফাটলটা আরেকটু বড় হয়। বয়সে বড় হলে সবকিছু করে ফেলা যায়- এই মিথ্যাটা আমরা প্রায় ধরে ফেলেছি তখন। ছড়িয়ে পড়ছি সবাই। কেউ মেশিন থিওরী পড়ছি, কেউ বিবিএ, কারো কাঁধে আর্কি ডিপার্টমেন্টের বিশাল চাপ। পুরো ম্যাপ জুড়ে রাইফেলস পাবলিক স্কুলের পাবলিকেরা আছে। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা। আমেরিকা, কানাডা, চায়না, অস্ট্রেলিয়া।


এখনো নভেম্বর মাস আসে। দেরী করে ঘুম থেকে উঠা হয় না, স্যারেরা শীতের আমেজে ধীরে ধীরে ক্লাসে পড়ান না, শীতের বিকালে স্কুলছুটির পর পিলখানার রাস্তায় গল্প করতে করতে হেঁটে বাসায় ফেরা হয় না। এখন প্রজেক্ট করতে হয়, রাইফেলস স্কোয়ারের পাশ দিয়ে যেতে গেলে মন খারাপ করতে হয়, মন খারাপ ভাব সযতনে আড়াল করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে হয়।


ফেসবুকে অনেকের সাথেই যোগাযোগ হয়। কারো ছবিতে/ স্ট্যাটাসে লাইক্স দিস মারি-কমেন্ট দিই। কী চমৎকার ভাবে বন্ধুত্বের দায় সারি !! জন্মদিনের শুভেচ্ছায় এসএমএস পাঠাই। রাস্তায় দেখা হলে তিরিশ সেকেন্ড পরেই বলি, "দোস্ত, ভালো লাগলো অনেক দেখা হয়ে...। আজকে একটা কাজ আছে। যাই তাহলে ?? দেখা হবে..." ।
দেখা হয় না।



আমরা যারা রাইফেলস পাবলিকে স্কুলে পড়তাম- তারা অনেক রকম স্বপ্ন দেখতাম। কেউ ইঞ্জিনিয়ার হবে, কেউ ক্যালটেকে পড়বে, কেউ চারুকলায় যাবে, কেউ মহাকাশবিজ্ঞানী হবে। কিন্তু বড় হতে হতে স্রেফ আবাল হয়ে গেছি সবাই ; এখন আর সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে আসা সম্ভব না- সম্ভব না এমন কী একটা রি-ইউনিয়ন করাও...।

২টি মন্তব্য:

  1. একজন গর্বিত রাইপাবলিকান হিসেবে বলছি, লেখাটা অসাধারণ!!!

    উত্তরমুছুন
  2. কি রে ভাই, সকাল বেলাই মনটা খারাপ করে দিলেন...

    উত্তরমুছুন