রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৯

ক্রোধের বশে বারোজনা...


আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের সবচেয়ে গরম দিনটিতে তারা একত্রিত হলেন বিচারকক্ষ সংলগ্ন ছোট ঘরটিতে। ঘরটিতে তারা সকলেই ছিলেন। ছিলেন প্রচন্ড যুক্তিবাদী স্থাপত্যবিদটি, ছিলেন বাতিকগ্রস্থ বৃদ্ধটি, খেটে খাওয়া দিনমজুর রংমিস্ত্রী ও ছিলেন, এমনকি সেই টুপি মাথায় লোকটিও ছিলেন- যিনি তাড়ায় ছিলেন রাতের বেসবল ম্যাচটি নিয়ে। কেউ এ ঘরে এসেছেন এই প্রথম, কেউ আবার দাবি করছেন তিনি এই অভিজ্ঞতায় রীতিমত পোক্ত। তারা ছিলেন বারোজন জুরি- যারা সিদ্ধান্ত নেবেন বাইরের বিচারকক্ষের সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ ছেলেটি তার পিতাকে হত্যার অভিযোগে দোষী কী না।


উত্তপ্ত আবহাওয়া অসহ্য ঠেকে, বারো জন জুরি তাই 'নিশ্চিত দোষী' ছেলেটিকে ফাঁসিতে ঝোলানো বিলম্বিত করতে নারাজ। প্রথমেই তাই হয় ভোট গ্রহণ। সকলেই ছেলেটি অপরাধী বলে নিশ্চিত, হাত তোলেন না কেবল মাত্র স্থাপত্যবিদটি। তিনি 'নিশ্চিত নন' বলে নির্দেশ করেন সুবিচারের সেই ধারায়- যেখানে সংশয়ের অবকাশ একজনকে 'নির্দোষ' বলে স্বীকৃতি দেয়।

এগারো জুরির বিস্ময় !! কী করে ছেলেটির নিরপরাধ হতে পারে ?? মৃতদেহের বুকে বিদ্ধ ছুরিটি তো ছেলেটির। নীচতলার বৃদ্ধ যে ছেলেটিকে 'আমি তোমায় খুন করবো' বলে হুমকি দিতে শুনেছেন ?? আর পাশের বাড়ির মহিলা যে ছেলেটির হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ?? তবে ??

যুক্তি-প্রদান আর যুক্তি-খন্ডনের মধ্যে দিয়ে এগোয় ঘটনা। 'সংশয়ের অবকাশ'এর অস্তিত্ব নিয়ে ভিন্ন পেশা, ভিন্ন মানসিকতার বারোজন জুরির মধ্যে চলে মনস্তাত্বিক লড়াই- কখনো যা শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। জুরিগণ দলবদল করেন একাধিকবার, ক্ষণে ক্ষণে দুলতে থাকে অভিযুক্তের জীবন-মরণ।

প্রচন্ড গরমে অভিশপ্ত শহরটি ছবির শেষে পুনর্জ়ীবন পায় এক পশলা বৃষ্টিতে; আর একটি মানবজীবনের নির্ধারক জুরিগণ কী অভিযুক্তকে নতুন করে বাঁচবার সুযোগ দেন ?? নাকি মৃত্যুই তার ললাটলিপি ??

সিডনী লুমেট পরিচালিত 'টুয়েলভ এনগ্রি ম্যান' নামের ৯৬ মিনিটের এই সাদাকালো মাস্টারপিসটির সম্পুর্ণ চিত্রায়ণ একটি মাত্র ঘরে। স্বল্প বাজেটের এই চলচ্চিত্রটি প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ সংলাপ এবং অভিনয় নির্ভর।

অভিনেতাদের মাঝে হেনরী ফন্ডা (গ্রেপস অফ র‌্যাথ, ওয়ার এন্ড পিস) ছাড়া বিখ্যাত তেমন কেঊ ছিলেন না; কিন্তু জ্যাক ওয়ার্ডেন, এড বিনস, জন ফিডলার প্রমুখ প্রত্যেকেই নিজ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুচারূভাবে। একটি মাত্র ঘরে অভিনীত বলে চিত্রগ্রহণে বৈচিত্র্য আনা বোধহয় খুব একটা সহজ ছিলো না; তা সত্বেও কথা কাটাকাটির মাঝে বেশ কিছু সংলাপ দীর্ঘদিন স্মরণ থাকার কথা।


আইএমডিবি রেটিং-এ ৮.৬ এর উপর থাকা চলচ্চিত্রগুলো কেন জানি আমার মত সাধারণ দর্শকের কাছে সবসময় ঠিক উপভোগ্য ঠেকে না (একান্ত ব্যাক্তিগত মত), সে কারণে এই চলচ্চিত্রগুলো দেখার বিষয়ে আমি কিছু সতর্ক থাকি। তবে 'ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাক্কুস নেস্ট'[৮.৯] কিংবা 'সিন্ডলার্স লিস্ট'[৮.৯] এর মত 'টুয়েলভ এনগ্রি ম্যান'[৮.৯]-ও আমায় হতাশ করেনি। নির্দ্বিধায় আমার দেখা সেরা চলচ্চিত্রগুলোর মাঝে এটিকে গণ্য করছি।

কাজেই,সংলাপধর্মী চলচ্চিত্র যারা পছন্দ করেন- সময় করে একটু ঠান্ডা মাথায় চলচ্চিত্রটি উপভোগ করতে বসে যান। পছন্দের চলচ্চিত্রের তালিকায় একে আপনি যুক্ত করতেই পারেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন