রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৯

ছেলেবেলার ডায়েরীঃ রবিন হুড

তখনো পেন্টুলুন পরবার বয়স শেষ হয়নি। বাবার হাত ধরে একুশে বইমেলায় গিয়ে ভূত এবং গোয়েন্দা- দের সাথে তাকেও বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম । এখনো চোখ বুজলে পরিষ্কার দেখতে পাই; সবুজ বনের পটে সবুজ পোশাক পরিহিত এক তীরন্দাজ - বিশাল ধনুক উঁচিয়ে প্রস্তুত তীর ছুঁড়তে। লাল হরফে বড় করে লেখা "রবিন হুড"। ভূত আর গোয়েন্দাদের পালা শেষ হতেই পরেছিলাম তাকে নিয়ে। লেখকের সাথে হারিয়ে গিয়েছিলাম শেরউডের সেই গহীন সবুজ বনে। ভুলে গিয়েছিলুম আর সব।

রবার্ট ফিযুথ নামের যুবকটিকে দস্যু রবিন হুডে পরিণত হতে দেখে থমকে গিয়েছিলাম, অত্যাচারী নর্মান শাসক শ্রেণীর প্রতি ঘৃনা ছুঁড়েছিলাম,নটিংহ্যামের কুচক্রী শেরিফকে বারবার রবিনের অপদস্থ হতে দেখে খুশি হয়েছিলাম। বন্ধুত্ব এবং প্রভুভক্তির শেষ কথা হিসেবে নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিলাম লিটল জনকে, হেসে উঠেছিলাম ফ্রায়ার টাকের ভোজনপ্রীতিতে, এলান-এ-ডেলের বীণা বাদনে মুগ্ধ হয়েছিলাম, ভালোবেসেছিলাম সুন্দরী মেরিয়ানকে। জেনেছিলাম উইল স্টিউটলি আর উইল স্কারলেটের মত আরো সাতকুড়ি দুর্ধর্ষ অনুগত নিয়ে কীভাবে রবিন কাঁপিয়ে দিয়েছিলো শোষক-নিপীড়ক নর্মানদের, কেন তাকে নিয়ে রচিত হয়েছিলো চারণ কবিদের কবিতা। দস্যুদের পরণের লিংকন গ্রীনের সাথে শেরউড বনের সবুজ আমায় নিয়ে গিয়েছিলো সেই মুক্ত জীবনে- যেখানে 'ব্লু বোর' সরাইখানায় ঢুকে পান করা যায় একপাত্র এল, যেখানে রাণীর আহবানে রবিনের অব্যর্থ ধনুক বিজয়ী হয় রাজার ধনুর্বিদের সাথে, যেখানে সিংহ হৃদয় রাজা রিচার্ডের আহবানে দস্যু রবিন থেকে হয়ে ওঠা যায় 'আর্ল অফ হান্টিংডন'। বদ্ধ সে জীবন আমার মতো রবিনেরও অসহ্য ঠেকে, আর তাই সিংহাসনলোভী রাজা জনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আরো একবার দস্যু হয় রবিন। এবং...শেরউডের গহীন অরণ্যে চিরনিদ্রায় শায়িত হবার পুর্বে আরো অনেক বীরের নিয়তি মেনে নিয়ে শিকার হয় রমণীর বিশ্বাসঘাতকতার।

ধন্যবাদ কাজী আনোয়ার হোসেন, সেবা প্রকাশনী'র কাজীদা। রবিনের মৃত্যুতে নিদারূণ কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন, প্রাইমারী স্কুল পড়ুয়া এই আমাকে কান্না লুকোতে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো ছেলেবেলার লুকোনোর জায়গা- বারান্দার কোণে। বই পড়ে এরপরেও আরো তিনবার কেঁদেছি। আর্কাদি গাইদারের 'ইশকুল', আলেক্সান্দার বেলায়েভের 'উভচর মানুষ' আর আমাদের মুহাম্মদ জাফর ইকবালের 'আমার বন্ধু রাশেদ'। কিন্তু ওই রবিন ছিলো প্রথম। কাজীদা; আপনার জানার কথা নয় - এই বই পড়ার পরের কতরাত আমার স্বপনে হানা দিয়েছিলো রবিন, কতদিন কল্পনার খেলার সাথী করেছিলাম সোনালী দাঁড়ির রবিন হুডকে, কত নির্ঘুম দুপুরে চলে গিয়েছিলাম শেরউডের সবুজ আর নটিংহ্যামের শুটিং ম্যাচে।

তারপর এই গতকাল...। স্মৃতি এবং কালের ধূলো ঝেড়ে,পুরোনো বইয়ের ভেতর থেকে আবার বের করলাম সেই রবিনকে। অবাক হয়ে মিলিয়ে দেখলাম,সব কেমন যেন পালটে গেছে। টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলার বদলে আজ রিমোট চেপে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতেই আমার বেশী ভালো লাগে, সমকোণী ত্রিভুজ আঁকতে শেখার স্তর পেরিয়ে আমি আজ থার্মোডাইনামিক্সের জটিল সেশনাল করতে পারি। কিন্ত তবুও সব পাল্টায়নি,অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে। যেমন রয়ে গেছে সাতকুড়ি দুর্ধর্ষ অনুচর যাকে নিয়ত রাজার সম্মান দিতো-সেই রবিন হুড, বিপদে সাহায্য চেয়ে কেউ কখনো যার কাছ থেকে ফেরেনি- সেই রবিন হুড, শেরউডের সবুজ বনে অব্যর্থ ধনুকের টঙ্কার তোলা সেই রবিন হুড, আমার ছেলেবেলার রবিন হুড।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন