বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০০৯

শহরে যখন গল্প নেই

"A wastepaper basket is the only true friend of a Writer"- Isaac Bashevis Singer


আজকাল আর শহরে গল্প খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা যারা একসাথে গল্প খুঁজি; তাদের কেউই প্রথমে খেয়াল করিনি যে আমাদের গল্পের ভাঁড়ার ফুরিয়ে এসেছে। আমাদের সময় কাটে গল্প লিখে যাওয়াতে, নির্বিবাদে, অনায়াসে। আমরা কেবল আড্ডা দিই, এমনকী লোকাল বাসে রুশো-রুশদী-রশোমনের তত্ত্ব নিয়ে কথা বলি, ঈদ আর পূজা উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যায় মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপণ আছে এমন পাতায় আমাদের গল্প দিতে সম্পাদকদের নিষেধ করি। কিন্তু আমরা খোঁজ নিই না, আমাদের গল্পগুলো কেমন আছে- তারা ঠিক মত বড় হচ্ছে কি না- তাদের সকলের চেহারা আলাদা হয়েছে কী না।


আমরা তাই গল্প নিয়ে ভাবি না। গল্প লিখতেই আমাদের যত সময় ব্যয় হয়- তাই আমাদের আর গল্প নিয়ে ভাবা হয় না। আমরা জানি গল্পগুলো বেঁচে আছে; আমাদের ডায়রীর পাতায়, আমাদের মাথার কোটরে, আমাদের ল্যাপটপের সেইভ করা নোটপ্যাডের মাঝে। আমরা জানি আমাদের গল্পগুলা ভালোই আছে- তারা ঠিকমতই বড় হচ্ছে- তারা দেখতে আর চরিত্রে সবাই আলাদা। গল্পদের খোঁজ করার সময় কোথায় আমাদের?? সময় নেই। কিন্তু গল্পগুলো আছে, আমরা ঠিক জানি, আমরা নিশ্চিত।



তাই যখন একদিন গল্পকার ছোটন আহমেদ আমাদের আড্ডায় এসে জানায় যে তাঁর গল্পগুলোকে পাওয়া যাচ্ছে না, আমরা তখন তাকে পাত্তা দেই না। আমরা বাদাম খাই, হাসি, ভয় পাওয়া ছোটনকে নিয়ে তামাশা করি- তাঁর আশঙ্কা আমাদের স্পর্শ করে না। একটু ধাতস্থ হবার পর ছোটনকে আমরা বলি যে এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, অনেকদিন ধরে টানা গল্প লেখার পর এরকম হতে পারে- তারপর আজকাল ঢাকা শহরে গরম একটু বেশিই পড়েছে। কিন্তু আমাদের উপদেশ দীর্ঘস্থায়ী হয় না, হাবিজাবি সব উপদেশের পরে আমরা আবার হাসি; ছোটনের পালিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে নিয়ে রসিকতা করি...। কিন্তু বাসায় এসে আমরাও সবিস্ময়ে আবিষ্কার করি আমাদের সযতনে রেখে দেয়া গল্পগুলোও নিখোঁজ হয়েছে। আমরা এইবার একটু অবাক হই। তারপর আবার খোঁজা শুরু করি- ডায়রীর পাতা খুঁজি- ল্যাপটপের সেইভ করা নোটপ্যাডের মাঝে খুঁজি- মাথা শীতল করার জন্যে টিভি বিজ্ঞাপণে দেখা সবচেয়ে কার্যকরী তেল মেখে পুরাতন গল্পগুলো মনে করার চেষ্টা করি। এবং আমরা সেগুলো খুঁজে পাই না।


পরদিন আড্ডায় আমরা সবাই আবার একত্রিত হই। ধানমন্ডির কয়েস চৌধুরীর লেখার টেবিলের ড্রয়ারের, শাঁখারীবাজারের বিজয় বসুর শোবার বিছানার তোষকের নীচের অথবা মালিবাগের নুরুল হুদার বুকপকেটে রাখা ডায়রীর থেকে গল্প নিখোঁজ হবার সংবাদ আমাদের কানে আসে। আমরা এইবার অসুবিধার মধ্যে পড়ি। আমরা এইবার মুখস্থ করা রুশো-রুশদী-রশোমনের তত্ত্ব আওড়াই না, সম্পাদকের বারংবার আসতে থাকা মুঠোফোন বার্তার জবাব দেই না। আমাদের গল্পগুলো যে অবাধ্য হয়ে গেছে, সেই বিষয়ে আমাদের সংশয়ের কোন অবকাশ থাকে না এবং আমাদের প্রভূত যত্নের পরেও গল্পগুলোর এইরকম পালিয়ে যাওয়া যে তাদের কৃতঘ্নতার উদাহরণ মাত্র এই নিয়েও আমরা নিঃসংশয় হই। তবুও এই পালিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে ফিরিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর হয়ে উঠি, ফলে জনপ্রতি মাত্র দুই কাপ চা আর দুইটা সিগারেট পুড়িয়েই আমাদের অনুসন্ধানে নামতে হয়।


আমরা তাই গল্পগুলোর খোঁজে আজিজ মার্কেটে যাই এবং আমরা নিরাশ হই। সেখানে পোস্ট মর্ডান কবি আর গল্পকারদের ভীড়ে আমরা পালিয়ে কিংবা হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে খুঁজে পাইনা। আজিজের কিছুদিন আগেও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকা গলিতে গলিতে সদ্য খোলা বুটিক শপের মালিকেরা আর টি-শার্ট কিনতে আসা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবকেরা আমাদের অনুসন্ধানে বিরক্ত হয়- " কোত্থেইক্যা যে আসে এইসব আজাইরা লোকজন... এত্তো বিরক্ত করতে পারে এরা !" বলে আমাদের নিরস্ত করতে চায়। কিন্তু আমাদের মাঝে স্বার্থক এবং জনপ্রিয় প্রেমের গল্পকার হাসানুজ্জামান হাসুকে দেখে এই যুবকেরাই আমাদের চা-নাস্তা খাওয়ানোর জন্যে পীড়াপীড়ি করে আর কি খুঁজছে না জেনেই আমাদের খোঁজাখুঁজিতে সাহায্য করে কিংবা সাহায্য করবার ভান করে। অযথাই। আমরা আজিজে ব্যর্থ হই, একই ভাবে ব্যর্থ হই বাংলাবাজারে, নীলক্ষেতের মোড়ে।


গল্পের খোঁজে এইবার আমরা লাইব্রেরীতে যাই। পাবলিক লাইব্রেরী, বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরী। সেখানকার বইয়ের পাতার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের গল্পগুলো অথবা তাদের কিছু ভ্রুণ থাকতে পারে বলে আমাদের ধারণা হয়। আমরা তাই বইগুলোর পাতা উল্টাই। নানাবিধ গল্পের মাঝে আমাদের গল্পগুলো খুঁজি। সাকির গল্প, বনফুলের গল্প, পি এইচ লাভক্র্যাফট, বিক্রম শেঠ অথবা খুশবন্ত সিং এর গল্প। সবিস্ময়ে আমরা দেখি - আমাদের গল্পগুলোর নামগন্ধ পর্যন্ত নেই এইখানে। আমরা অনেক পাতা উল্টিয়েও আমাদের গল্পগুলোর সাড়া পাই না। হতবুদ্ধি আমাদের মাঝে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গল্পকার সরাসরি এইসব বই থেকে গল্প তুলে দেয়ার কথা বললে আমরা তাঁকে তিরষ্কার করি- তাঁর কথায় ব্যথিত হই। গল্পগুলোও ব্যথিত হয় বোধহয়- কারণ কোন চিহ্ন না রেখেই আমাদের হাতে ধরা বইগুলো থেকে তারা স্রেফ উড়ে যায়। হারিয়ে যায়।


কাজেই ঢাকা শহরের জন্যে নির্ধারিত "নগর গল্প-পিতা"র কাছে যাওয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায় থাকে না। প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে এই শহরের জন্যে যেই লোকটা গল্প যুগিয়ে আসছে; আশ্চর্যের বিষয়, আমরা শহরের খ্যাতিপ্রাপ্ত গল্পকারেরা তাঁর ঠিকানাটাই মনে করতে সমর্থ হই না।কিন্তু পরক্ষণেই, কেবল প্রতিষ্ঠা লাভের পূর্বে লিটল ম্যাগে লিখে যাওয়া গল্পকারেরা ছাড়া কেউ তাঁর কাছে যায় না- এই জাতীয় একটা ধারণা মনে এনে আমরা নিজেদের দুর্বল স্মরণশক্তির গায়ে প্রলেপ লাগানোর চেষ্টা করি। এই দুর্বল স্মরণশক্তি আমাদের আরো কিছুক্ষণ তাঁর বাসা কোথায় হতে পারে- এই ভ্রান্তিতে দোলায় এবং অবশেষে আমাদের মাঝের অপেক্ষাকৃত নবীন গল্পকার নেয়ামুল করিম ঝিগাতলার কোন এক তস্য গলিতে নগর গল্প-পিতার আবাস, এই তথ্য মনে করার প্রয়াস পায়।


শেষ বিকেলে সেই তস্য গলির এক বিবর্ণ তেতলা বাড়ির চিলেকোঠার উদ্দেশ্যে উঠবার সময় সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে আমাদের মাঝে কিছু স্মৃতিকাতরতা ভর করে এবং আমাদের মাঝে কেউ কেউ তাদের প্রথম গল্পটি নির্মানের সময় কী ভীষণ উত্তেজনা নিয়ে তারা এই সিঁড়ি বেয়ে চিলেকোঠার নগর গল্প-পিতার কাছে গিয়েছিলো সেই স্মৃতি বর্ণনার প্রয়াস পায়। যে সকল গল্প ভাঙ্গিয়ে আমরা গল্পকারেরা পরবর্তীতে অঢেল পুরষ্কার গ্রহণ করেছি, সেইসব গল্পের প্রায় প্রতিটির ভ্রূণ যে নগর গল্প-পিতার সবরাহকৃত এই সত্য মনে করে আমরা একটু লজ্জাও বোধ করি। কাজেই চিলেকোঠায় উঠে গল্প-পিতার দৈন্যদশা এবং ভগ্নস্বাস্থ্য দেখে আমরা তাঁর কুশল জিজ্ঞাসা করবার খানিক নীরবতা পালন করি। গল্প-পিতা তাঁর ঘড়ঘড়ে স্বরে আমাদের দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং আমাদের আগমনের হেতু তাঁর কাছে বোধ্য হচ্ছে না বলে মত প্রকাশ করেন। নীরবতা ভেঙ্গে তাই প্রবীন গল্পকার দেবাংশু সাহা গল্প-পিতাকে আমাদের গল্প সংকটের কথা জানান। আমাদের প্রত্যেককে তিনজোড়া গল্পের ভ্রূণ দেবার আবেদন জানিয়ে দেবাংশু সাহা-আমাদের মুখপাত্র- হয়তো সাশ্রয়ের আশাতেই যোগ করেন যে প্রতি জোড়া গল্পের জন্যে আমরা হাজার টাকা দিতে প্রস্তুত। গল্প-পিতার হতদরিদ্র অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে দেবাংশু সাহা আরো বলেন যে এরকম অবস্থাতে এতগুলো পুরোনো খদ্দেরকে হাতছাড়া করা তাঁর কিছুতেই উচিৎ হবে না- বিশেষতঃ যেহেতু প্রায় তিন দশক পূর্বে গল্প-পিতা স্বয়ং আমাদের কাছেই প্রতি জোড়া ভ্রুণ কুড়ি টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন।


গল্প-পিতা অতি কষ্টে উঠে দাঁড়ান। এই সামান্য কাজেই তাঁর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা এবং মুখে কষ্টের ছোপ দেখতে পেয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি। আমাদের মনে সন্দেহ জাগে যে গল্প-পিতার ভ্রূণ উৎপাদন ক্ষমতা অব্যহত আছে কি না। খানিক নীরব সময় পরে - যে সময়টাকে গল্প লিখতে ব্যাকুল ছোটন আহমেদ কিংবা কয়েস চৌধুরী অথবা বিজয় বসুর কাছে অনন্তকাল বলে ঠেকে- তিনি কথা বলেন। গল্প-পিতা আমাদের সকলের মুখের দিকে চেয়ে , জড়ানো স্বরে বলেন- তাঁর কাছে অবশিষ্ট আর কোন গল্প নাই।

তাঁর কাছে ১৯৭১ আছে কেবল...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন