শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০০৯

যাপিত জীবন বুয়েটে যেমন

সকাল সাতটা থেকে আরম্ভ হয় সংগ্রাম। আটটার ক্লাস হতে ক্রমাগত হাই তোলার ফাঁকে ফাঁকে নিতান্ত দয়ার বশে স্যারকে অনুগ্রহ করতে মাঝে-মধ্যে ক্লাসনোট উত্তোলন (ব্যক্তি ভেদে ক্যাফেটরিয়ায় রীতিমত রবিন লীগ পদ্ধতিতে টুয়েন্টি নাইন-এর 'কোপানো'।); দুপুরের ক্লাস তথা দুঃস্বপ্ন ভঙ্গের পর ক্যাফেতে এসে ক্ষনিক পরনিন্দা করা; এরপর দুপুরে কিছু গড়াগড়ির পর বিকেল হতেই 'ক্যাফে ক্রিকেট' নামক উপদ্রব দ্বারা বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সুন্দরীদের গাত্রে বল লাগানোর অপচেষ্টা; সন্ধ্যার সময় আবার টিভি রুমে মাইকেল বাল-আক এবং মাইকেল ক্যারিক এর পক্ষ নিয়ে দু'পক্ষের খন্ডযুদ্ধ; অতঃপর গল্পের বই নিয়ে কিছুক্ষণ ঘাটাঘাঁটির পর নিশ্চিন্ত মনে ইন্ডিয়ানা জোন্স অথবা জুলিয়া স্টাইলসের সাথে বেরিয়ে পরা ; সবশেষে রাতে ঘুমোতে যাবার আগে বাধ্যতামুলক ভাবে ফেইসবুকে এক ঘন্টার নন-ক্রেডিট কোর্স... এতো কিছুর পরও কী পাস করা সম্ভব ?? সেটাও আবার প্রায় 3.00 এর উপর সিজিপিএ নিয়ে ?? জেনে রাখুন, "এই বুয়েটে অসম্ভব বলে কিছু নেই।"।


প্রকৃত শ্রেণীবিভাজনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অবশ্যি প্রতীয়মান হবে যে, BUET (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ এন্টারটেইনিং উইদ টুয়েন্টি-নাইন) এ পড়ুয়া সকল ছাত্র কেবল মাত্র তিনটি ভাগে বিভক্ত। .....
প্রথম ভাগে রয়েছেন ভবিষ্যতের আদর্শ প্রকৌশলীরা; যাদের বিচরণ কেবল কেলাসরুম এবং লাইব্রেরীতে সীমাবদ্ধ, যাদের যাদের সিজিপিএ রীতিমত অশ্লীল এবং সর্বোপরি গণমানুষের পাস করবার পেছনে তাদের তৈরীকৃত 'চোথা'র অবদান সর্বাধিক।

দ্বিতীয় ভাগে যারা রয়েছেন তারা আবার সবকিছুতেই মাঝামাঝি। এদের কাজ বলতে এমনকী রামমোহন রায়ের চেয়েও বেশী প্রাণশক্তি নিয়ে শিক্ষাবিস্তারে ব্রতী থাকা, রাতদুপুরে উচ্চ-মাধ্যমিক পড়ুয়া মেয়েদের মিসকল দিয়ে বিরক্ত করা এবং কারণে-অকারণে ফেইসবুকে 'ইয়ো'ভঙ্গীমায় ছবি আপলোড করা [বলতে নেই,এ জাতীয় সকলকে আমরা আড়ালে 'খেত'বলে ডাকি !!]।

তৃতীয় ভাগ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে আমার মতো সংখ্যালঘু অল্প কয়েকজন -যারা ক্যাফেটরিয়ার এককোণে চোখেমুখে "আহা, কী পাপময় এই দুনিয়া !! একে উন্নততর ও মহত্তর করতে যদি কিছু করতে পারতাম !!"এই জাতীয় একটা অভিব্যাক্তি নিয়ে বসে থাকি। আমাদের মাঝে কেউ হচ্ছেন ক্রীড়াবিশেষজ্ঞ, (যারা সুযোগ পেলেই স্বর্ণময় নটিংহ্যাম টেস্টের পঞ্চম দিন কী ঘটেছিলো তার বর্ণনা দেন।) কেউ আছেন চলচ্চিত্রবোদ্ধা (যারা ইংগমার বার্গম্যানের 'সাইলেন্স'ছবির নান্দনিকতা আলোচনায় বিশেষ দক্ষ।), কেউ আছেন পিউর আঁতেল (এদের আগ্রহ প্রধানতঃ সাবাতিনির অনুবাদ অথবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে।)।
ছাত্রদের কথা শেষে পড়াশোনার বিষয়ে আসি। একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা যে আমরা ক্লাসে পড়াশোনা করি। আসলে যেহেতু আমরা স্যারদের ভাষায় 'ক্রীম অফ দ্যা ক্রীমস'- সেই হেতু বশতঃ আমাদের পড়াশোনার জন্যে শিক্ষকেরা অনাবশ্যক; আবশ্যক কেবল পলাশীর সেলিম ভাইয়ের ফটোকপি মেশিন- কুলীন সম্প্রদায়ের প্রস্তুত করা চোথাগুচ্ছ- এবং বড় ভাইদের উপদেশ বানী [ খোদার কীরা, আমার যেই সব বন্ধু একটা ক্লাসও না করে একাধিক কোর্সে পাস করেছে- তাদের রেফারেন্স দিচ্ছি। ]।
মাটি কোপানো, রাস্তা মাপা- এই জাতীয় শ্রমিক সুলভ কাজ করাবার পরেও আমাদের সেশনাল/প্র্যাকটিকাল কেনো যেন খুব উপভোগ্য হয়; সেই সাথে সেশনাল ভাইভাগুলোও। স্যারেরা অবশ্য কেনো যেন আমাদের উত্তরগুলো পছন্দ করেন না। কারণ হিসেবে আমাদের দেয়া অসংখ্য স্মরণীয় উত্তরের মাঝে কেবল একটির কথাই বলবো, যেদিন আমার এক সহপাঠী প্রশ্নোত্তর পর্বের এক পর্যায়ে স্বয়ং ডিপার্টমেন্টাল হেডকে বলেছিলো- "স্যার, আপনি মনে হয় থিওরীটা ঠিকমত বুঝতে পারতেসেন না..."। সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই বুয়েট !!
বুয়েটের স্যারেরা খুবই কঠোর এবং দুর্মুখ- এই জাতীয় একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। আসলে তারা মানুষ হিসেবে প্রথম শ্রেণীর। তাদের বললেই তারা ক্লাসটেস্ট পিছিয়ে দেন, তাদের না বলে প্রক্সী দিলেও তারা আপত্তি করেন না। একবার পহেলা ফাল্গুনের দিনে এক ননডিপার্টমেন্টাল কোর্সের স্যারকে বসন্ত-হলদে শাড়ী-তরূণীকূলের দোহাই দিয়ে আমরা ছুটিও আদায় করে নিয়েছিলাম। বুয়েটের ইতিহাসে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণে সেশনাল মওকুফের এটি এখনো সম্ভবত একমাত্র নজির।
এরপর পরীক্ষা আসে। এক সপ্তাহ পিএলের প্রথম তিনদিন আমরা ফিলিম-ফেশটিভ্যাল করি। তারপর পড়তে বসে যদি দেখি সিলেবাস শেষ হচ্ছেনা; তখন দুদফা পরীক্ষা পেছানোর জন্যে আন্দোলন করি। পরীক্ষা যথারীতি পেছায়।
পরীক্ষার হলে গিয়ে আবিষ্কার করি ২৮০ নম্বরের মাঝে বড়জোর ৮০ নম্বর আমাদের পারা উচিত। বাকিগুলা তো স্যারেরাও পারে না- এই যুক্তিতে আমরা নিশ্চিত হয়ে পরীক্ষা দেই। হল থেকে বের হয়ে হিসাব করে ল্যাগ নিশ্চিত করবার পরেও আমাদের মুখের হাসি মলিন হয়না; বরং পাশের সীটের পরীক্ষার্থী মেয়েটা কোন ডিপার্টমেন্টের তা জানতে ব্যাগ্র হয়ে পড়ি।
এরপর একদিন রেসাল্ট দেয়। আমরা আবসারাপ একটা গ্রেড পাই। মন ব্যাপক খারাপ আমরা কোন কোন ডিপার্টমেন্ট এ জঙ্গী হামলা চালানো উচিত তার খসড়া তৈরী করি। পরের সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন করাইএবং ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে লিখতে বসি। তারপর করি কী ...(আগ্রহী পাঠকেরা লেখার প্রথমে গিয়ে আবার শুরু করতে পারেন।)।
বিঃদ্রঃ 'ক্রীম অফ দ্যা ক্রীমস'এর একজন হওয়া সত্তেও সুহান রিজওয়ান এতো খারাপ কিভাবে লেখেন ?? এই লেখা তিনি আবার ব্লগে কোন সাহসে দেন ?? -পাঠকের এইসব প্রশ্নের উত্তরও আমি লেখার প্রথমে সবিনয়ে দিয়ে দিয়েছি। জেনে রাখুন, "এই বুয়েটে অসম্ভব বলে কিছু নেই।"।

1 টি মন্তব্য: