বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

একটি অপরাধের গল্প

সতর্ক চোখে আরেকবার আজগর চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। এই কাক-ডাকা ভোরে এখনো এই রাস্তায় লোক চলাচল শুরু হয়নি। এই জায়গাটাও বেশ নির্জন,প্রাতঃভ্রমণকারীদের দল এদিকটা আসে না খুব একটা। ভালো একটা জায়গা বেছে নিয়েছে- এই ভেবে আজগর নিজেকেই নিজে বাহবা দেয়।

দিনের পর দিন,মাসের পর মাস...পুরো দু'দুটা বছর। মফস্বল থেকে এই মহানগরীতে পা রাখবার পর থেকেই ওই লোকটা হয়ে উঠেছে তার এক ভীষণ আতঙ্ক। প্রথম প্রথম অনেক সহ্য করেছে আজগর। সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেলে সে প্রথমে লোকটাকে অনুরোধ করেছে- তার এতো বড় ক্ষতি যেন সে না করে। অনুরোধে কাজ না হলে সে মিনতি করে দেখেছে- একাধিক বার। লাভ হয়নি কিছুই। ঠিক বাংলা সিনেমার গ্রাম্য জোতদারদের মতই তার শত্রু দাঁতের ফাঁক দিয়ে সজোরে পানের পিক ফেলে বলেছে- "আফনের এতো ক্ষতি দেখলে চলে ?? এডি হইলো আমগো বিসনেস..."

প্রতিদিন লোকটার অত্যাচার সইতে পারেনি তার শরীর। সেই সাথে 'পরের দিন কী হবে' -এই আতঙ্কে তাড়িয়ে নিয়েছে তাকে প্রতিনিয়ত। ভয়াবহ অবসাদ গ্রাস করেছিলো তাকে। কিন্তু সেদিন যখন আইডিয়াটা চট করে তার মাথায় এলো... সিদ্বান্ত নিতে তার একটুও ভাবতে হয়নি। এই শহরে আরো একটা অপরাধের জন্ম দেয়ার সিদ্বান্ত নিতে তার একটুও আটকায়নি। কেনো জানি নিজের বিবেকের কাছেও সে অপরাধী হয়ে ওঠেনি। বরঞ্চ তার মনে হয়েছে এটা লোকটার প্রাপ্য - কারণ প্রতিনিয়ত সে তার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে হাসিমুখে।

এরপর থেকেই এই দিনটার প্রহর গুণে এসেছে আজগর। পুরো সপ্তাহ জুড়ে সে নজরে রেখেছে ওই লোকটার কার্যকলাপ। ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে তার শত্রুর আসা-যাওয়া। কাজেই সঠিক সময় অনুযায়ী সে এসে দাঁড়িয়েছে বাছাই করা জায়গাটায়। আসন্ন অপরাধটির একমাত্র সাক্ষী হতে পারতো এপার্টমেন্টের দারোয়ান রহমত মিয়া। গতকাল রাতেই ছুটি নিয়ে রহমত মিয়া চলে গেছে দেশের বাড়ি - রহমতের মেয়ের অসুখ। শুনে হেসেছে আজগর। গতকাল দুপুরে একটা ফোনবুথ থেকে ফোন করে রহমতকে মিথ্যা খবর দিয়েছে সে। শেষ সাক্ষীটিকেও সরিয়ে দিয়ে সারারাত ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে আজগর। এখন কেবল তার শত্রুর-ওই লোকটার- আগমনের অপেক্ষা ...।

রাস্তার মোড় থেকেই লোকটাকে আসতে দেখা যায়। আজগর প্রস্তুত হয়। কিছুতেই কারো চোখে পড়া চলবে না। কেবল এক মিনিটের মামলা। শেষবারের মত চারপাশ জরিপ করতে গিয়েই স্তম্ভিত হয়ে পড়ে আজগর। এপার্টমেন্টের গেট থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনতালার ভদ্রলোকটি। আশ্চর্য ! আশ্চর্য ! ভাগ্যকে আরো কিছু গালি দিয়ে নেয় আজগর। এবার ?? প্ল্যানে কি তবে পরিবর্তন করবে ?? আরো একবার সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে ?? মুহুর্তের মাঝেই সিদ্বান্ত নিয়ে ফেলে আজগর। যা থাকে কপালে। কাছে চলে আসা শত্রুর মুখোমুখি হতে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে...।

**** **************** **********

তেতলার আবিদ সাহেব সবিস্ময়ে দেখেন দোতলার ক্ষ্যাপাটে যুবকটি দৌড়ে গিয়ে হকার জলিল মিয়ার কলার চেপে ধরেছে। যুবকের উচ্চকিত কন্ঠ শোনা যায়- " মাতচুরানি'র পোলা !তোরে না কতবার মানা করসি সকাল ছয়টায় পেপার দিয়া বেল বাজাবি না ?? কইছি না আমার ঘুমের অসুবিদা অয় ??..."

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন