বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

কয়েক রকম ভালো মানুষ


কর্নেল নাথানিয়াল জেসাপ,কমান্ডিং অফিসার,আমেরিকান মেরিনস অফ গুয়ানতানামো বে,কিউবা। কঠোর নিয়মানুবর্তীতা,শৃঙ্খলা ও আনুগত্য- এই তিনটি গুণ এই ভদ্রলোককে করে তুলেছে তাঁর সমসাময়িকদের তুলনায় কার্যক্ষেত্রে অধিক সফল। সেনাবাহিনীর কঠিন জীবন যাপন তাঁকে করেছে ইষ্পাতদৃঢ়। তিনি জানেন কী করে একটা সেনাদল চালাতে হয়, কী করে বজায় রাখতে হয় শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার যেটিকে স্বীকৃতি দেয় না, সেই 'কোড রেড' [সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীন নিয়ম- যার আওতায় পড়ে শৃঙ্খলাভঙ্গকারীকে খেতে না দেয়া,শারিরীকভাবে নিগৃহীত করা ইত্যাদি।] জারি করতেও তাঁর দ্বিধা নেই। তিনি জানেন, মানবাধিকারের বুলি কপচানো ঐ নিয়ম যারা বানিয়েছে-তাদের কেউ এই গুয়ানতানামো বে'র নরকতুল্য পরিবেশে প্রতিমুহুর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করেনি। সব মিলিয়ে কর্নেল জেসাপ একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক, যে কোন সেনাবাহিনীর গর্বের বস্তু বলে তিনি গণ্য হবেন। কখনো আপোস না-করা একজন সৎ,ভালো মানুষ; সন্দেহ নেই।
কর্নেলের সহকারী কমান্ডিং অফিসার- ম্যাথু মার্কিনসন। কর্তব্যনিষ্ঠ,সৎ। তিনি আবার কর্নেলের মত কঠোর নন, ঈশ্বরে বিশ্বাসী এই ভদ্রলোকের জীবন কাটে টানাপোড়েনে। কর্নেলের অধঃস্তন বলে তাঁর দমননীতি তাঁকে সহ্য করে নিতে হচ্ছে- আর ভেতরে তিনি দগ্ধ হচ্ছেন। তিনি একজন ভালো মানুষ।
প্লাটুন কমান্ডার জোনাথন কেনড্রিক। কর্নেল জেসাপের ডান হাত। অবিকল কর্নেলের আদর্শে বিশ্বাসী- কর্নেলের যাবতীয় আদেশ বাস্তবায়ন করেন। সেনাবাহিনীর এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত- সন্দেহ নেই। ইনিও একজন ভালো মানুষ।
উইলিয়াম সান্তিয়াগো- গুয়ানতানামোতে পাঠানো শিক্ষানবিস এক সৈন্য। সদ্য তারুন্যে পা দেয়া এই তরুণ পারে না কঠোর পরিশ্রম আর নিয়মের এই বেড়ায় নিজেকে আটকে ফেলতে। নিজের দলনেতা বা প্লাটুন কমান্ডারকে না জানিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একের পর এক চিঠি লিখে যায় সে, তাকে অব্যহতি দেয়ার জন্যে। ছবি শুরু হয় এই সান্তিয়াগোর মৃত্যু দিয়ে।
হত্যা দৃশ্যে উপস্থিত এবং সান্তিয়াগোকে হত্যার জন্যে সামরিক আদালতে অভিযুক্ত দুই মেরিন- প্লাটুন লীডার হ্যারল্ড ডসন ও তাঁর অধঃস্তন লাউডেন ডাউনী। 'Unit-Cops-God-Country' এই মন্ত্রকে জীবনের মূল করে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। রেকর্ড বলে, সান্তিয়াগোকে হত্যা করার যথেষ্ট মোটিভ রয়েছে হ্যারল্ডের। অথচ, এই দুজনও নিঃসন্দেহে ভালো মানুষ।
খুবই কাজপাগল এক মহিলা- কমান্ডার জোয়ানা গ্যালাওয়ে। ডেস্ক ওয়ার্ক থেকে নিজে থেকে অনুমতি প্রার্থনা করে ডসন ও ডাউনীর পক্ষের অন্যতম সহকারী আইনজীবি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। সে বিশ্বাস করে অভিযুক্ত মেরিনরা সান্তিয়াগোর মৃত্যুর জন্যে দায়ী নয়। কারণ প্রতিরাতে সে ঘুমোতে যাবার আগে এই মেরিনেরাই আমেরিকার রক্ষা প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে বলে- 'Nothing will hurt you tonight, Not on my watch'। এই ভালো মানুষটি মেরিনদের রক্ষার জন্যে প্রতিনিয়ত প্রেরণা যুগিয়ে যায় অভিযুক্ত পক্ষের প্রধান আইনজীবি - ড্যানিয়েল ক্যাফীকে।
ড্যানিয়েল ক্যাফী,হাভার্ড স্নাতক - তার প্রয়াত পিতা লিওনেল ক্যাফী ছিলেন সামরিক আদালতের প্রবাদপ্রতিম এক আইনজীবি। লোকে ড্যানিয়েলের মাঝে ইদানীং খুঁজে পায় তার পিতার ছায়া। প্রচন্ড ছটফটে,অস্থির,সবকিছু হালকাভাবে নেয়ার প্রবণতার সাথে ড্যানিয়েলের আছে ক্ষুরধার এক আইনজীবির মস্তিষ্ক। এই কেস নিয়ে তার আক্ষরিক কর্মজীবনের শুরু, এর আগে কখনো এমনকী কোর্টরুম স্বচক্ষে দেখেনি সে। অভিযুক্ত ডসন এবং ডাউনীকে অপরাধী ধরে নিয়ে তাদের সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়া উচিৎ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে কেস আরম্ভ করলেও অচিরেই পরিস্থিতি পালটে যায়। ভুল করলেই শেষ হয়ে যেতে পারে ড্যানিয়েলের ক্যারিয়ার...।
সত্যি বলছি- 'এ ফিউ গুড ম্যান' নামের আমার অসম্ভব প্রিয় এই ছবিটার কাহিনী আপনাদের বলিনি,কেবল সব পরষ্পরবিরোধী অথচ সঠিক চরিত্রগুলোর আদর্শের বর্ণনা দিয়েছি কেবল। রব রেইনার পরিচালিত ১৩৩ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবিতে ছিলেন জ়্যাক নিকলসন,টম ক্রুজ,ডেমি মুর,কেভিন বেকন প্রমুখ। ছবিতে গতি আসতে একটু সময় লাগলেও কাহিনী আর সংলাপ এতই অসাধারণ- অনায়াসে উপভোগ করা যায়।
সু-অভিনয়ের জন্যে আলাদা করে দুইজনের কথা বলতেই হয়। স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও অসামান্য বিস্তারের একটা চরিত্রে অভিনয় করেছেন জ্যাক নিকলসন [কর্নেল জেসাপ]। আর আমার দেখা টম ক্রুজের [ড্যানিয়েল ক্যাফী]সেরা অভিনয় দেখা গেছে এই ছবিতে।
ছবিতে মনে রাখার মত অসংখ্যা চমৎকার সংলাপ রয়েছে। ছবির একটা বড় অংশই কেটেছে কোর্টরুমে- তাই তর্কাতর্কির বেশ কিছু দৃশ্যও আমার মনে গেঁথে আছে। বিশেষ করে ছবির শেষ ৪৫ মিনিট- অবিশেষণযোগ্য !!!
তাহলে আর সময় নষ্ট না করে দেখে ফেলুন ছবিটা। কথা দিচ্ছি- হতাশ হতে হবে না।

1 টি মন্তব্য:

  1. এইখানে কমেন্ট করা পাকনামি হয়ে যাবে। কিন্তু এই থীমের উপরে আরেকটা অসাধারণ মুভি আছে। The Caine Mutiny

    কর্নেল জেসাপের প্যারালেল একটা ক্যারেক্টার আছে ওখানে ক্যাপ্টেন কুইগ। ওফ বোগার্টের সে কি অভিনয় !!

    উত্তরমুছুন